প্রাচীন দুটি দুর্গোৎসব

লেখক: রানা চক্রবর্তী

ঘোষ জমিদার পরিবারের প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন দুর্গোৎসব

হাওড়া – বর্ধমান মেইন লাইনে রেলপথে পান্ডুয়া স্টেশনে নেমে পুনরায় সড়কপথে কুড়ি মিনিট বাসযাত্রা করে এই জামগ্রামে আসা যায়। গ্রামের দুই দিকে শস্যশ্যামলা সবুজ ধানক্ষেত পেরিয়ে কালো পীচের রাস্তা চলে গেছে নবদ্বীপ অভিমুখে। এই জামগ্রামে আসলে এখানকার প্রাকৃতিক শোভা মনকে ভরিয়ে তোলে। এই জামগ্রামের সুপ্রাচীন ঘোষ জমিদার পরিবারের সাবেক দুর্গোৎসবটি প্রায় ৩০০ বৎসরের প্রাচীন। ঘোষ পরিবারের পারিবারিক তথ্য অনুসারে, পূজাটি ১৭১৮ খ্ৰীস্টাব্দ থেকে ১৭২০ খ্ৰীস্টাব্দের মধ্যে শুরু হয়।

অতীতে একটা সময় ছিল যখন এই জামগ্রামের ঘোষ জমিদার পরিবারের দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে গমগম করতো গোটা জামগ্রাম। এখন মানুষ শহরমুখী, কাজেই উৎসাহী লোকজনের সংখ্যাও অনেক কমে গিয়েছে। যে দুর্গাদালানে সন্ধিপূজা বা আরতি কালীন এক সময়ে স্থান অকুলান হত, সেই দালানের অনেকটা অংশ ইদানিং ফাঁকাই পড়ে থাকে।

ঘোষ পরিবারে দুর্গাপূজার সকল কাজ সেই শুরু থেকে আজ পর্যন্ত, খুবই নিষ্ঠা সহকারে পালিত হয়ে আসছে। পারিবারিক সব নিয়ম মেনে দুর্গাপূজার কাজের জোগাড় করতে গিয়ে পরিবারের মহিলা সদস্যারা রাত আড়াইটে বা তিনটে থেকে ঘুম ভেঙে উঠে, স্নান করে, শুদ্ধ বস্ত্রে পূজার আয়োজনে লিপ্ত হয়ে পড়েন। অতীতের নিয়ম মেনে এখনও দুর্গাপূজোতে দেবীকে তিন কুইন্টাল চালের নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়। সেই চালের নৈবেদ্যর উপরে বসানো হয় ‘নবাত’। ‘নবাত’ হল বড় আকৃতির নারকেল নাড়ু, যার ওজন হল প্রায় এক কিলোগ্রাম। এছাড়াও মাকে নৈবেদ্যর সঙ্গে দেবীকে নিবেদন করা হয় ভোজন সাজ। চাল, সব্জি, ডাল, মশলা সাজিয়ে দেবীকে অর্ঘ্য হিসাবে নিবেদন করা হয়। পূজোর মধ্যে প্রতিদিনই চলে আত্মীয়স্বজন, আমন্ত্রিত ও প্রতিবেশীদের জন্য পংক্তি ভোজন। অতীতের নিয়ম মেনে পূজার মধ্যে একদিন আয়োজিত হয় দরিদ্র নারায়ণ সেবা। গ্রামের মানুষজন এসে পংক্তিভোজনে অংশগ্রহণ করেন। অতীতে এক সময়ে প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার মানুষ আসতেন ঘোষ পরিবারের পংক্তি ভোজনে। এখন সেই সংখ্যা প্রায় হাজার খানেক।

পান্ডুয়ার ঘোষ পরিবারের দুর্গোৎসবের আরেক অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল সাঁওতালি নাচ। সাঁওতাল সম্প্রদায়ভূক্ত পুরুষেরা নানান পোশাকে সেজে দুর্গাদেবীর সম্মুখে বিভিন্ন প্রকার বাদ্যযন্ত্র সহযোগে নৃত্য পরিবেশন করেন এবং পরিশেষে বকশিষ নিয়ে ফিরে যান।

পূজার ব্যবস্থার জন্য ঘোষ পরিবারের ঠাকুরের নামে অনেক জমি আছে এবং সেখান থেকেই পূজার যাবতীয় খরচ খরচা উঠে আসে। দশমীর দিন একটু দূরে গ্রামের প্রান্তে বসে মোরগ লড়াইয়ের প্রতিযোগীতা। এটিও প্রাচীন ঐতিহ্য মেনে বর্তমানেও চালু রয়েছে। আশেপাশের গ্রাম হইতে আদিবাসী মানুষজন তাঁদের মোরগ নিয়ে প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহণ করতে আসেন। তাঁদের বিশ্বাস এতে নাকি অশুভ শক্তির বিনাশ হয়। আজ পর্যন্ত ঘোষ বাড়ির দুর্গাপূজা কে কেন্দ্র করে চলে আসা এই মোরগের লড়াই বন্ধ হয় নি।

এই পূজাকে কেন্দ্র করে আশেপাশের বিশ পঁচিশটি গ্রামে সাড়া পড়ে যায়। ঠাকুর দেখার ভিড় লেগেই থাকে। এখন পান্ডুয়া এলাকায় বারোয়ারি পূজার সংখ্যা অনেক বেড়েছে, তবুও এই বাড়ির দুর্গাপূজার ঐতিহ্য ও আকর্ষণ আজও অম্লান। বিজয়ার দিন গ্রামের তালপুকুরের নিকট রংমশালের আলোয় আলোকিত হইয়া ওঠে। সেই সঙ্গে শোনা যায় হাউই বাজীর শব্দ। হাজার হাজার রংমশালের আলোয় সম্পূর্ণ হয় দেবীর বিসর্জ্জন।

বাঁকুড়া জেলার জয়পুর ব্লকের ময়নাপুর গ্রামের জমিদার বাড়ির ২২৭ বছরের প্রাচীন দুর্গোৎসব:

বাঁকুড়া জেলার প্রাচীন জনপদগুলির মধ্যে অন্যতম হল জয়পুর ব্লকের ময়নাপুর গ্রাম। বহু প্রাচীন কাল থেকেই এই গ্রাম এলাকার একটি বর্ধিষ্ণু গ্রামের মর্যাদা পেয়ে আসছে। এই গ্রামকে কেন্দ্র করেই একসময় গড়ে উঠেছিল মুখাজ্জী পরিবারের জমিদারী। ব্রিটিশ আমলের রমরমিয়ে চলা সেই জমিদারীর এখন কনামাত্র অবশিষ্ট নেই। তবু প্রাচীন রীতি মেনে ময়নাপুর জমিদার বাড়ির ঠাকুর দালানে এখনও নিষ্ঠার সাথে পালিত হয় দেবী আরাধনা।

খ্ৰীস্টিয় অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের ক্ষমতা ক্রমশ কমতে শুরু করে। ব্রিটিশ শাসকদের চাপিয়ে দেওয়া অতিরিক্ত করের বোঝা টানতে না পেরে মল্ল রাজত্বের একের পর এক তালুকের নিলাম শুরু হয়। আর এই সময়ই জমিদারী শুরু হয় ময়নাপুরের মুখাজ্জী পরিবারের। বিষ্ণু পুরের শেষ মল্ল রাজা চৈতন্য সিংহের দেওয়ান ছিলেন ময়নাপুরের বাসিন্দা চণ্ডীচরণ মুখোপাধ্যায়। তাঁর আমলেই ১৭৯২ খ্ৰীস্টাব্দে ময়নাপুর তালুকের জমিদারী সত্ব লাভ করে মুখোপাধ্যায় পরিবার। জমিদারী পত্তনের সাথে সাথে জমিদার বাড়ির ঠাকুর দালানে শুরু হয় দুর্গা পুজা। পরে দুর্গা মন্দির ও চণ্ডী মণ্ডপ সংস্কার করেন ওই পরিবারেরই নিধীকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ও তারিণী প্রসাদ মুখোপাধ্যায়। কথিত আছে সে সময় জমিদারীর একদিনের আয়ে ওই বিশাল চণ্ডী মণ্ডপ ও দুর্গা মন্দির তৈরি হয়েছিল। সে সময় পুজাকে কেন্দ্র করে ধুমধামের সীমা ছিল না। বিশাল জমিদার বাড়ির সদস্য ও তালুকের প্রজায় পুজার চারদিন গমগম করত চণ্ডী মণ্ডপ। যাত্রাপালা , রামায়ন গান এসবের পাশাপাশি চারদিন ধরে চলত ভোজসভা।পুজার সময় গোটা ময়নাপুর গ্রাম ছাড়াও নিমন্ত্রিত থাকত তালুকের প্রজারা। এখন জমিদারী না থাকায় পুজার জৌলুস কমেছে। জীবন জীবিকার তাগিদে দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছে জমিদারবাড়ির সদস্যরা। কিন্তু পুজা এলেই ফের তাঁরা ভিড় করেন পুরানো জমিদার বাড়ির জীর্ণ দরদালানে। পুজার সময় বাড়ির লোকেদের অংশ গ্রহনে ফের গমগম করে ওঠে পলেস্তরা খসা দেওয়ালের জমিদার বাড়ি।

লেখকের কথা: রানা চক্রবর্তী
রানা চক্রবর্তী পেশায় সরকারী কর্মচারী। নেশা ইতিহাসের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পড়াশোনা আর লেখালিখি। নিজেকে ইতিহাসের ফেরিওয়ালা বলতে ভালবাসেন।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published.