স্বামী বিবেকানন্দ

লেখক : মিত্রা হাজরা

স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন ভারতাত্মার মূর্ত প্রতীক। শুধু ভারতে নয়, বিশ্বের মানুষকে তিনি আধ্যাত্মিক নবজাগরণের মন্ত্রে দীক্ষা দিয়েছেন। কলকাতায় শিমলার দত্তবাড়ির এই মহাপ্রাণ মানুষটির নাম শোনেননি, এমন মানুষ খুব কমই আছেন। আমাদের ধারণা, সন্ন্যাসীজীবন মানেই শুধু আধ্যাত্মিক চিন্তা, ঈশ্বর সাধনায় মনোনিবেশ ও মোক্ষলাভ জীবনের সার্থক পরিণতি। তিনি বললেন, “না, আমি সাধু নই, দার্শনিক নই ,আমি সাধারণ মানুষ।” তাঁর গুরুভাইদের বলছেন দীন, দরিদ্র, অজ্ঞ, মূর্খ, গরীব মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে তাদের শিক্ষা দিতে, জীবিকার সন্ধান দিতে, জীবনযাত্রা উন্নত করার কাজে আত্মনিয়োগ করতে। বলছেন, “দরিদ্র দেবো ভব, মূর্খ দেবো ভব, অজ্ঞানী, অবহেলিত – এরাই তোমার দেবতা হোক, এদের সেবাই পরম ধর্ম জানবে। জীবসেবার চেয়ে আর বড় ধর্ম নেই। সেবাধর্মের ঠিক ঠিক অনুষ্ঠান করতে পারলে অতি সহজেই সংসার বন্ধন কেটে যায় – মুক্তি করফলায়তে।” বলছেন, “এই জগতের দুঃখ দূর করতে যদি হাজার জন্মও নিতে হয়, তাও নেব। নিজের মুক্তি নিয়ে কি হবে?”

স্বামীজীর দৃষ্টিতে মানুষ পৃথিবীর সমস্ত ধনরাশির থেকে বেশি মূল্যবান। মানুষ চুরি করে, মিথ্যা কথা বলে, আবার সেই মানুষই দেবতা হয়। মানুষকে পাপী বলা মহাপাপ। মানুষের যথার্থ স্বরূপের উপর কলঙ্ক আরোপ। কাউকে ঘৃণা করা, কোনরূপ নিন্দা করা অনুচিত। দোষ দেখা বড় সহজ, গুণ দেখাই মহাপুরুষের ধর্ম। একথা আমরা সারদা মাকেও বলতে শুনেছি – “কারও দোষ দেখো না, দোষ দেখবে নিজের।” তাই মায়ের প্রিয় সন্তানের মুখেও সেই একই কথা।

দেশের যুবসমাজকে বলছেন, “হে বীরহৃদয় যুবকবৃন্দ, আর কিছুর আবশ্যকতা নেই, আবশ্যক শুধু প্রেম, সরলতা ও সহিষ্ণুতা। সর্বোচ্চ বস্তু তোমাদের পায়ের তলায়। কারণ তোমরা দিব্য তারকা। তোমাদের নিজেদের শক্তিকে চিনতে হবে। সকল কুসংস্কারের পারে যাও, আর মুক্ত হও। Arise, awake, and stop not till the goal is reached. জন্ম থেকেই তোমরা মায়ের জন্য বলিপ্রদত্ত, ভারতমাতা তোমাদের আরাধ্যা দেবতা হোক।” একজন সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীর মুখে এ কোন বাণী? পরবর্তী সময় বিবেকানন্দের যুবচেতনার উত্তরসূরী ছিলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের নেতা বিপ্লবী সূর্য সেন ও তাঁর সহকর্মীরা, অনন্ত সিং, গণেশ ঘোষ, রামকৃষ্ণ বিশ্বাস, বিপ্লবী যতীন মুখার্জি প্রমুখ বিপ্লবীরা। বিবেকানন্দকে পশ্চিমের মানুষরা বলেন Cyclonic Hindu। বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, “He is the moral and spiritual force of India.” মানুষকে মানুষ বলে আর কেউ এত ভালোবেসেছে কি?

বিবেকানন্দ মনে করতেন ভারতের দুর্দশার বড় কারণ নারীজাতির প্রতি অবজ্ঞা। তিনি বলতেন, “মেয়েদের এমন শিক্ষা দিতে হবে, যাতে চরিত্র তৈরি হয়, মনের শক্তি বাড়ে। বুদ্ধির বিকাশ হয়, নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। শিক্ষা পেলে মেয়েরা নিজেদের সমস্যা নিজেরাই মেটাতে পারবে। আমাদের মেয়েরা বরাবরই প্যানপেনে ভাবই শিক্ষা করে আসছে। কিছু হলে কেঁদেই সারা। এই সময় তাদের আত্মরক্ষা শেখা দরকার। দেখো দেখি ঝাঁসির রানী কেমন ছিলেন।”

স্বামীজীর কাছে ভারতবর্ষ শুধু ধ্যানের ও জ্ঞানের দেশ নয়, ক্ষুধা, বুভুক্ষা, অশিক্ষা ও দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের দেশ। দেশের প্রকৃত অবস্থা দেখার আগ্রহে পরিব্রাজকরূপে ভারত ভ্রমণ করেছেন। গুজরাট থেকে পূর্ববঙ্গে, কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী – এক কথায় আসমুদ্র হিমাচল। গুরু রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের আশীর্বাদে পরমেশ্বরীর যে রূপ প্রত্যক্ষ করলেন, তাই তাঁকে আমেরিকা যাত্রায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। তিনি বলছেন, “তোমরা জানো, আমেরিকায় ধর্ম মহাসভা হয়েছিল বলে আমি সেখানে যাই নি। দেশের জনসাধারণের দুর্দশা দূর করার জন্য আমার ঘাড়ে যেন একটা ভূত চেপেছিল। আমি অনেক বৎসর যাবৎ ভারতবর্ষে ঘুরেছি, কিন্তু স্বদেশবাসীর জন্য কাজ করার কোন সুযোগ পাইনি। সেই জন্য আমেরিকা গিয়েছিলাম। ধর্ম মহাসভা নিয়ে কে মাথা ঘামায়? এখানে আমার নিজের রক্তমাংসস্বরূপ জনসাধারণ দিন দিন ভুগছে, তাদের খবর কে নেয়? যে দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ মহুয়া ফুলের রস খেয়ে জীবন ধারণ করে এবং লক্ষ সাধু আর ব্রাহ্মণ এই দরিদ্রদের রক্ত শুষে খায়, সে দেশ কি সত্যই দেশ? না নরক? তা কি ধর্ম নাকি শয়তানের তাণ্ডব নৃত্য?” তিনি চেয়েছিলেন মানুষের জীবনে সামাজিক, আধ্যাত্মিক আর অর্থনৈতিক স্বাধীনতাসহ সর্বাত্মক স্বাধীনতা। তাই বলেন, “যে ভগবান আমাকে একটুকরো রুটি দিতে পারে না, সেই ভগবান স্বর্গে আমাকে অনন্ত শান্তি প্রদান করবে তা, আমি বিশ্বাস করি না।”

মানুষই তাঁর কাছে ঈশ্বর, এই মানব প্রেমের ব্রতই তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সাধনা। উদাত্ত কণ্ঠে বলেনঃ

“ব্রহ্ম হইতে কীট পরমাণু সর্বভূতে সেই প্রেমময়
মনপ্রাণ শরীর অর্পণ করো সখে এ সবার পায়
বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর
জীবে প্রেম করে যেইজন,সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।”

🙏🙏🙏জয় ঠাকুর, জয় মা সারদামণি, জয় স্বামীজী মহারাজ।


লেখক পরিচিতি : মিত্রা হাজরা
মিত্রা হাজরা, বাসস্থান ঝাড়খণ্ডের চাইবাসায়। ডিএভি পাবলিক স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষিকা, আকাশবাণী চাইবাসা কেন্দ্রের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন উপস্থাপিকা। অবকাশে গল্পের বই, কবিতা পড়ে সময় কাটান।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up