অম্বিকা (অন্তিম পর্ব)

লেখক : দামিনী সেন

গত পর্বের লিঙ্ক এখানে

৬ষ্ঠ পরিচ্ছদ

– ঐ যে কলাবাগানটা দেখেছিলি রাস্তায় আসতে আসতে, ওর পেছনদিকে একটা ভাঙা পাঁচিল মতো আছে। ফিট তিনেক উঁচু। জায়গায় জায়গায় ভাঙা, ইঁট খসে পড়া। দীপ্তিবৌদিকে ওখানেই পাওয়া গিয়েছিল। পরনের কাপড়চোপড়গুলো কিছুটা দূরে একটা ডোবার ধারের ডুমুর গাছতলা থেকে ডেলা পাকানো অবস্থায় উদ্ধার হয়েছিল।

কথাগুলো হঠাৎই যেন একটা ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে তুলেছিল অম্বিকাকে। ওদের নৌকোটা ছোট্ট নদীটার মাঝ বরাবর একটু একটু করে ফিরে আসছিল। একটু দূরে তাকালে তখনও টের পাওয়া যাচ্ছিল মোহনাটা। অম্বিকার ভারি ইচ্ছে ছিল ওদিকে আরেকটু এগিয়ে দেখার। কিন্তু রাজি হয়নি শুভ্র। ওর নিজের হাতের পটুত্বের উপর আসলে অতটা ভরসা ওর ছিল না। ঐ অত বড় নদীটার দিকে এগিয়ে যেতে তাই কিছুতেই রাজি হয়নি ও।

অগত্যা কী আর করা। ওরা ফিরেই আসছিল। দুপুর শেষের পড়ে আসা রোদে অম্বিকা তাকিয়েছিল নদীর ঠিক পাশেই একটু উঁচু পাড় ও তারপরের ঘাসজমিটার দিকে। ওখানে সবুজ রঙের সরু সরু লম্বা মতো ছোট্ট কী একধরনের কয়েকটা পাখি চিরিক চিরিক করে উড়ে বেড়াচ্ছিল। আর তার সাথে ভেসে আসছিল ট্রিউ ট্রিউ করে একটা তীক্ষ্ণ শিস। এই বাঁশপাতি পাখি এর আগে কক্ষনো দেখেনি ও। নামটাও জেনেছে এই একটু  আগেই – শুভ্ররই কাছ থেকে। সত্যিই নামটা একদম ঠিকঠাক। একটু দূরেই একটা বাঁশঝাড়ের ঝুঁকে আসা লম্বা লম্বা পাতাগুলো দেখে সেটাই ভাবছিল ও তখন।

ঠিক সে’ সময়ই প্রায় বোমার মতোই কথাগুলো এসে ঢুকেছিল ওর কানে। ঢুকেই ফেটে পড়েছিল। চমকে ফিরে তাকিয়েছিল ও শুভ্রর দিকে। – “মানে?”

– হ্যাঁ। আর ওকে ওই অবস্থায় প্রথম দেখতে পেয়েছিল কে জানিস? ওর নিজের ছেলে। মাকে ঐ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে ভয়ে কাঁদতে শুরু করেছিল। কাউকে ডাকতেও পারেনি। ছোটো ছেলেটার কান্না শুনে তারপর লোকজন আসে। একটা কাপড় ঢাকা দেয় উলঙ্গ আচ্ছন্ন শরীরটাকে। তারপর উদ্ধার করে ঘরে নিয়ে আসে।

শুভ্র অবশ্য অনেকক্ষণ ধরেই নানা কথা বলেই চলেছিল দাঁড় টানতে টানতে। তার কিছু কিছু ছেঁড়া ছেঁড়াভাবে কানে ঢুকছিল অম্বিকার, বাকিটা নদীর হাল্কা বাতাসে শুকনো পাতার মতোই ঘুরপাক খেতে খেতে উঠে যাচ্ছিল উপরে, তারপর ছড়িয়ে পড়ছিল কোথায় কত দূরে – কে জানে। শুধু ওর কথায় একটা অদ্ভুত অন্তরঙ্গতা টের পেয়েছিল অম্বিকা – একদম নতুন, অন্যরকম। একটা কেমন মন হারিয়ে যাওয়া ভালোলাগা এসে যেন কোথা থেকে জড়িয়ে ধরছিল ওকে থেকে থেকেই। নেশা – চোলাই’এর ঠেক – অপ্রকৃতিস্থতা – এলাকার গরিব মানুষ – বাইরে থেকে আসা টাকার জোয়ার – ঢেউ’এর মতোই ভেসে আসছিল শুভ্রর কথাগুলো; একটার পর একটা। প্রথমটার উপরই এসে পড়ছিল পরেরটা, তারউপর তার পরেরটা। মিশে যাচ্ছিল তারা পরস্পর, একের সাথে আরেক – বহু কথার যেন এক অবিচ্ছিন্ন স্রোত। একের পর এক এসে তারা আছড়ে পড়ছিল পাড়ে – ওর কানে, তারপর উলটো স্রোতে ফিরে যাচ্ছিল আবার কোথায়, কোন অতল গভীরতায়। দীপ্তিবৌদির নামটা হঠাৎই এসে যেন শেষে ভেঙে দিয়েছিল ওর ঘোরটাকে। সকালের স্বল্প পরিচয়ের সেই ছোটোখাটো মিষ্টি মুখের হাসিটা হঠাৎই ওকে টেনে নামিয়ে এনেছিল বাস্তবে।

– দীপ্তিবৌদি ! মানে, সকালে যার দোকানে আমরা চা খেলাম? উনি?

– হ্যাঁ, ওর কথাই বলছি।

– সে কী ! ভাবতেই পারছি না।

– হ্যাঁ, এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। কিন্তু প্রথম দিকে যা ঝড়টা গেছে ওর উপর দিয়ে। বেশ কিছুদিন পাড়ার লোকে ওর দোকানে আসত না। এমনকি ছেলেমেয়েদুটোকেও নানা জায়গায় বাঁকা কথা শুনতে হত। ওর বর – মধুসূদনদাও প্রথমে ব্যাপারটা ভালোভাবে নিতে পারেনি। নেশার ঘোরে এক রাতে মারধোর করে বেরও করে দিতে চেয়েছিল বাড়ি থেকে।   

– কেন? এতে দীপ্তিবৌদির কী দোষ? তিনি তো শিকার মাত্র।

– সেটা তো সহজ কথা। কিন্তু সেই সহজ কথাটাই তো বেশিরভাগ সময়ে সবচেয়ে কঠিন রে।

– তাহলে? তারপর কী হল?

– কী আবার। আমরা ক’জন খবর পেয়ে ঐ রাতেই ওদের ঘরে গেলাম। বোঝানোর চেষ্টা করলাম প্রথমে মধুসূদনদাকে। কিন্তু কে শোনে তখন কার কথা। নেশার ঘোরে তখন সে তড়পেই চলেছে। বাধ্য হয়ে ঐ রাতেই পাশের পুকুরের জলে প্রথমে ঘাড় ধরে চোবানো হল। তারপর একটু ধাতস্থ হতে শুরু হল বোঝানো – নরমেগরমে। প্রথমে অবশ্য গরমটাই বেশি। তারপর ধীরে ধীরে নরমে।

– কাজ হল তাতে?

– তখনকার মতো। পরেও আরও বেশ কয়েকবার নানাভাবে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। কিন্তু তার থেকেও কঠিন হয়েছিল অন্য দিকগুলোকে সামাল দেওয়া। একদিকে পাড়ার লোককে বোঝানো। আর অন্যদিকে দীপ্তিবৌদিকে নিজেকে স্বাভাবিক করা। কতদিন ধরে যে প্রায় পাহারা দিতে হয়েছে কী বলব।

– এখন তো দেখলাম উনি বেশ স্বাভাবিকই।

– হ্যাঁ, শিকার তো আর উনি একাই হননি। আশেপাশেরই আরও বেশ কিছু মেয়েকেও একই ধরনের অত্যাচারের শিকার হতে হয়। তারপর রাস্তায় হুজ্জোতি, বাড়িতে রাতবিরেতে বৌ-পেটানো – এসবও বাড়তে থাকে। চুরি-ছিনতাই শুরু হয়, বহুজনের সঞ্চিত সামান্য পয়সাও উধাও হয়ে যেতে শুরু হয় রঙিন জলের পিছনে। আমরা কয়েকজন মিলে একটা উদ্যোগ নিই এইসব ঠেকের বিরুদ্ধে এলাকার মানুষকে, বিশেষত মেয়েবউদের জড়ো করে একটা প্রতিরোধ গড়ে তোলার। দীপ্তিবৌদিকেও ওর মধ্যে জড়িয়ে নিতে পেরেছি। সত্যি বলতে কী – এই ব্যাপারে কাজে যোগ দেওয়ার পর থেকেই ওকে অনেকটা স্বাভাবিক করে তোলা সম্ভব হয়েছে। যেহেতু নিজে শিকার, তাই কাজে উৎসাহও ওর যথেষ্টই।

– বাঃ, উদ্যোগটা তো ভালোই। তা সাড়া পাচ্ছিস কেমন?

– সাড়া? গ্রামকে দেখে বাইরে থেকে তোরা যতটা সহজ সরল ভাবিস, ব্যাপারটা মোটেই তেমন নয় রে। ক্রমশ রাজনীতি ঢুকে পড়ছে বিষয়টাতে। বিভিন্ন মহল থেকে ইতিমধ্যেই নানারকমভাবে ঠারেঠোরে যা বলার চেষ্টা করা হচ্ছে – তার মানে দাঁড়ায় একটাই – চেপে যাও। কী দরকার ঝামেলায় জড়িয়ে। টাকাপয়সার অফারও আসতে শুরু করেছে, একটু ঘুরিয়ে। তবে আমরা এখনও পর্যন্ত বিষয়টা নিয়ে এককাট্টা।

কথাগুলো বলার সময় স্বভাবত লাজুক ছেলেটার কন্ঠস্বরে হঠাৎ এমন একটা দৃঢ়তা টের পেয়েছিল অম্বিকা যে, ও একটু অবাকই হয়েছিল। সেই সঙ্গে সেই অদ্ভুত মন হারানো ভালোলাগার অনুভূতিটাও ফিরে এসে ফের জড়িয়ে ধরেছিল ওকে। শুভ্র এরপরেও বলে চলেছিল আরও কতকিছু। কিন্তু সত্যি বলতে ও আর কিছু শুনছিল না। ওর দুই চোখ শুধু একাগ্র চিত্তে অনুসরণ করে চলেছিল শুভ্রর দুই ঠোঁট। কী জীবন্ত ! কত নরম, অথচ কী দৃঢ় ! দৃষ্টি যেন ওর আটকে গিয়েছিল ও দু’টিতে। সেই অদ্ভুত ভালোলাগার অনুভূতিটা যেন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল সারা দেহে, অবশ হয়ে উঠেছিল ওর সারা শরীর। উফ্‌, হাতটা তোর একবার বাড়িয়ে ধর না শুভ্র – একটিবার, একটু চেপে ধরি।

– “কি রে, হারিয়ে গেছিস নাকি? নাববি না?” শুভ্রর স্বরে হঠাৎ চটকা ভেঙে তাকিয়ে দেখেছিল অম্বিকা, নৌকা কখন যেন এসে লেগেছে আবার পাড়ে। উঠে পড়ে শুভ্র চটি দু’টো তার ছুঁড়ে দিয়েছে ইতিমধ্যেই জলসংলগ্ন কাদাটুকু পার করে অদূরবর্তী শক্ত ডাঙায়। প্যান্টের পা দু’টোও গুটিয়ে নিয়েছে দু’ পায়ের গুলি পার করে আরও খানিকটা উপরে। ওর দিকে তাকিয়ে অল্প একটু হাসি ঠোঁটে লাগিয়ে রেখে কথাগুলো ছুঁড়ে দিতে দিতেই এবার ও ছোট্ট একটা লাফে নেমে গিয়েছিল জলে। তারপর বাঁ হাতটা বাড়িয়ে ধরেছিল ওর দিকে – “কই, আয়।”

কীরকম অবশ অবস্থাতেই ডান হাত বাড়িয়ে ওর বাড়ানো হাতটা চেপে ধরেছিল অম্বিকা। কাছিয়ে এসেছিল কিছুটা ওর কাছে। একটা হ্যাঁচকা টানে ওকে একেবারে যেন বুকের মধ্যে টেনে নিয়েছিল শুভ্র। নৌকার সীমানা ছাড়িয়ে জলে উপর। হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাওয়ার ভয়ে – কোন এক অসীম নির্ভরতায় – দুই হাতে ওর গলাটা জড়িয়ে ধরেছিল অম্বিকা। একেবারে কাছাকাছি চলে এসেছিল দু’টো মুখ। নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাস মিলে গিয়েছিল যেন। অন্তত তেমনটাই মনে হয়েছিল অম্বিকার। দুই হাতে পাঁজাকোলা করে ওকে কোলে তুলে নিয়েছিল শুভ্র। চোখ বুজে এসেছিল অম্বিকার। কীসের যেন প্রতীক্ষায় ও আরও জোরে আঁকড়ে ধরেছিল শুভ্রকে। কাছিয়ে এসেছিল আরও আরও কাছে।

কাদাটুকু পেরিয়ে শক্ত জমিটায় পৌঁছেই ওকে আলতো করে আবার দুই পায়ের উপর নামিয়ে দিয়েছিল শুভ্র। হাত দু’টো আলতো করে একটু ঝেড়ে নিয়ে নিচু হয়ে গোটানো প্যান্টটা আবার নামিয়ে নিতে নিতে নিতান্তই সাধারণ গলায় বলে উঠেছিল – “এবার একটু তাড়াতাড়ি করতে হবে রে। নাহলে খেয়া পেরিয়ে ওপাশে গিয়ে স্টেশনে ঠিক সময়ে পৌঁছতে পারবি না। সাড়ে ছ’টার ট্রেনটা মিস করলে কিন্তু তোর বাড়ি পৌঁছতে অনেক রাত হয়ে যাবে।”


৭ম পরিচ্ছদ

গতি বাড়ার সাথে সাথে ট্রেনের ঝমঝম শব্দটাও যেন বেড়েই চলেছিল – কীরকম একটানা, ক্লান্তিকর। বাইরের কু-ঝিকঝিক অন্ধকারটাও যেন তার সাথে পাল্লা দিয়েই নেচেই চলেছিল, নেচেই চলেছিল। বুকটা ওর ফাঁকা করে বেরিয়ে আসা দমকা হাওয়াটা যেন ওকে করে তুলেছিল আরও গাঢ়, আরও আকর্ষক। কেমন মোহগ্রস্তের মতোই ও তাকিয়েছিল ট্রেনের ঝলমলে কামরা ছেড়ে বাইরের ঐ ঘন তমসাটুকুর দিকে।

“আলো আমার আলো ওগো” – হ্যান্ডব্যাগে অবহেলায় ফেলে রাখা মুঠোফোনটায় রিংটোনটা বেজে উঠতে চমকে ও আবার ফিরে আসতে বাধ্য হল বাস্তবে। হাত বাড়িয়ে ব্যাগের চেনটা খুলে ফোনটা বের করে তার রঙিন পর্দাটার দিকে তাকিয়েই বিরক্তিতে ভুরুটা কুঁচকে উঠল ওর। মৃদুল। আবার কী হল? এই তো সব কিছু গুছিয়ে, ক্লায়েন্টকে ফোন করে সব  বুঝিয়ে বলে, এমনকি পেমেন্ট লিঙ্কটাও পাঠিয়ে দিয়ে তবে ও বেরিয়েছে অফিস থেকে। মৃদুলের তো শুধু ফোনে ফলোআপটুকু করার কথা। আবার কী সমস্যা? ভিতরের সেই ভয়ঙ্কর ক্লান্তিটা যেন আবার উথলে উঠে গ্রাস করতে চাইছে ওর সারা শরীর।

– “হ্যালো, কী? আবার কিছু হয়েছে নাকি।” ভিতর থেকে ঠেলে ওঠা বিরক্তিটা খানিকটা জোর করেই গিলে নিয়ে গলার স্বরটা নরম আর স্বাভাবিক করে জিজ্ঞেস করলো অম্বিকা।

– না, এমনি সব ঠিকই আছে। তবে – আমায় একটু সাহায্য করবে অম্বিকাদি। আসলে কালকের দিনটা না, আমি একটু – মানে – একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাব। দু’টো কেস আছে আমার, মানে – আমি সব গুছিয়েই রাখব। একটু যদি সামলে দাও, প্লিজ।

উফ্‌। তার মানে আবার বাংক করবার তাল। প্রেম করছিস কর না বাবা, তাবলে নিজের কাজটা খালি এভাবে অন্যের ঘাড়ে চালান করার মানে। আর সব পায়ও তাকেই। আসলে একটু নরমসরম কিনা। কই, আলিদা, মোজাম্মেল বা পায়েলের কাছে যায় না তো। এক কথায় ওরা এসব ঝামেলা নাকচ করে দেবে, তাই তো? ওকেও এবার ওরকমই হতে হবে, একদম সরাসরি কঠোরভাবেই না বলে দিতে হবে – মনে মনে ভাবে অম্বিকা। ভাবেই। কার্যক্ষেত্রে ওর গলা দিয়ে বেরোয় অন্য কথা।

– উঃ, আবার। আচ্ছা, আমি ছাড়া তোরা এইসব সময়ে কি আর কাউকে দেখতে পাস না !

– অম্বিকাদি, প্লিজ। মানে কালকের ব্যাপারটা ভীষণ জরুরি। মাকে নিয়ে একটু ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।

বাঃ, অমনি মা’র শরীর খারাপ হয়ে গেল। ভালোই পেয়েছে আমায় এরা – মনে মনে ভাবে ও। কিন্তু মুখে কি আর তা বলা যায়?

– আচ্ছা, ঠিক আছে। কিন্তু এবারই কিন্তু শেষবার। এভাবে বার বার আমি ঠেকনা দিতে পারবো না।

কথাগুলো বলেই মৃদুলের গদগদ সুরে তেল মাখানো ধন্যবাদটাকে পাত্তাই না দিয়ে ফোনটা কেটে দেয় ও। ওপাশ থেকে রুকসানা বলে ওঠে – “এই রিংটোনটা কবে লাগালে অম্বিকাদি? খুব সুন্দর শোনাচ্ছে কিন্তু।”

শুকনো একটু ভদ্র হাসি ছাড়া কী এর উত্তর দেবে অম্বিকা। উত্তর কী ওর নিজের কাছেই আছে? এই গান কী আজ আর মানায় তাকে। সবটুকু আলোকে বুকের গহীন অন্ধকারের মধ্যে ডুবিয়ে রাখাই যে আজ তার সাধনা। তবু হঠাৎ হঠাৎ কী যে হয় ওর। সক্কালবেলায় আজ শেষ ঘুমের আমেজটুকুকে আর একটু দীর্ঘায়িত করার চেষ্টায় বিছানায় শুয়ে শুয়েই মুঠোফোনের স্মৃতি ঘাঁটতে ঘাঁটতে গানটাকে আচমকা পেয়ে গিয়ে কেমন যেন উতলা হয়ে উঠেছিল ওর মন। আগুপিছু কিছু না ভেবেই হঠাৎ খুশিতে কেন কী জানি একেবারে রিংটোন হিসেবে সেট করে ফেলেছিল ওটাকে।

“আলো আমার আলো ওগো, আলোয় ভুবন ভরা” –

জানলার চওড়া সিলটায় হাঁটু দুটো অল্প মুড়ে পা ছড়িয়ে বসে সকালের গরম চা’এর কাপটা ঠোঁটের কাছে এনে আরাম করে চুমুক দিচ্ছিল যখন সে, তখন সারা আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল কত আলো। শরতের মন মাতানো নীল, ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘে জমা হওয়া উজ্জ্বল সাদা, আর শহরের বুকে দূরে দূরে ইতিউতি ছড়িয়ে থাকা গাছগুলোর চূড়ায় লেগে থাকা উদাসী রোদ – মনটা যেন আর কিছুতেই বশে থাকতে চাইছিল না ওর। ওদের সে’সময়ের নতুন কেনা সাউন্ড সিস্টেমটায় তখন পিছনে বেজে চলেছিল এই গানটাই, এখনও পরিষ্কার মনে আছে ওর।

আলোয় কানায় কানায় ভরে থাকা ওর সেই ভুবনটায় ভেসে বেড়াতে বেড়াতে নিতান্ত আনমনেই ও হাতে তুলে নিয়েছিল নীরবে কম্পমান মুঠোফোনটাকে। কে যে ফোনটা করেছে, সেটাও খেয়াল করে দেখার প্রয়োজন বোধ করেনি। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে শুনতে পেয়েছিল তন্নিষ্ঠার উদ্বিগ্ন গলা – “খবরটা পেয়েছিস?”

– কী?

– শুভ্রকে পাওয়া যাচ্ছে না।

– মানে !

– গত পরশু রাতে এখান থেকে ফিরে “একটু আসছি” বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। তারপর থেকে খোঁজ নেই।

– “তার মানে !” হঠাৎ একটা অজানা ভয় এসে গলার কাছটা খামচে ধরেছিল ওর। কেমন একটা ভাঙা ভাঙা গলাতেই ও উগরে দিয়েছিল বাক্যের পরের অংশটুকু – “এই জন্যই। এই জন্যই ওকে বার বার বারণ করেছিলাম, জড়াস না আর ওসবে। রোজ রোজ ফিরতে হবে না এখন ওখানে। এখানে মেসেই থাক। কী হবে ওসবে জড়িয়ে ! এখন কী হবে?”

– সে পরামর্শ তো আমরাও ওকে দিয়েছিলাম। সবে মাত্র ওখানে এলাকার সমস্ত মেয়েবউদের নিয়ে চোলাইয়ের ভাটি ভেঙে দেওয়ার মতো অত বড়ো একটা ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে। ব্যাকল্যাশ তো একটা আসবেই। আপাতত আমরাও তো ওকে ক’দিন ওখানে ফিরতে বারণই করেছিলাম। কিন্তু পরামর্শ শুনলে তো।

– এখন তাহলে কী হবে? পুলিসকে খবর দেওয়া হয়েছে?

– হ্যাঁ, ওর দাদার সাথে কথা হয়েছে। পুলিসে ডায়রি একটা করা হয়েছে। তবে তাদের অ্যাটিচিউড নিতান্তই দায়সারা। নিশ্চিতভাবেই ভিতর থেকে চাপ রয়েছে।

– তাহলে এখন কী করবি?

– আমরা তো আজই যাচ্ছি। পাল্টা চাপ না বাড়ালে পুলিস কিসসু করবে না। সেই চেষ্টাই করতে হবে। প্রফেসর বিকেবি নিজে যাচ্ছেন আমাদের সাথে। ‘অভিনব’ নাট্যগোষ্ঠীর শর্মিলাদি – উনিও যাচ্ছেন। তুই যাবি ?

– “হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।” চায়ের কাপ আর প্লেটটা ঠকাস করে জানলার সিলের উপরই নামিয়ে রেখে এক লাফে নেমে এসেছিল অম্বিকা। ছুট্টে এগিয়ে গিয়েছিল নিজের ঘরের দিকে। কোনওরকমে একটা কিছু জামা গলিয়ে নিয়ে এখুনি ছুটতে হবে না ওকে। উদ্ধার করে আনতে হবে না ওর সমস্ত আলোর উৎস বিন্দুটাকে। কীভাবে ও হারিয়ে যেতে দিতে পারে শুভ্রজ্যোতিকে – ওর শুভ্রকে !


 ৮ম পরিচ্ছদ

– “এই আজকেই সকালে।” রুকসানার প্রশ্নের উত্তরে একটু হেসে হ্যান্ডব্যাগের চেনটা খুলে মুঠোফোনটা সযত্নে শুইয়ে রেখে চিরুণিটা বের করে আনে অম্বিকা। তারপর চুলে ওটা একটু টেনে নিয়ে ওয়েট ন্যাপকিনটা বের করে কপালে, গালে, চোখের পাশের ক্লান্তিটা একটু ঘষে ঘষে তুলে ফেলে। ট্রেনের গতি কমতে শুরু করেছে। এবারে তো ওকে নামতে হবে।

না, শুভ্রকে খুঁজতে সেদিন যাওয়া আর হয়ে ওঠেনি অম্বিকার। মা’র এক ধমকে পা দুটো তার আটকে গিয়েছিল বাড়ির চৌকাঠ পেরোনোর আগেই – “ধেই ধেই করতে করতে আবার কোথায় বেরুনো হচ্ছে শুনি।”

– মা জানো, আমাদের এক বন্ধুকে পাওয়া যাচ্ছে না। সেই শুভ্র, যার বাড়িতে আমার প্রকল্পের ব্যাপারটায় গিয়েছিলাম। আমাকে একটিবার যেতেই হবে।

– একদম না। কলেজে গিয়েছো পড়াশুনো করতে, বন্ধুদের পিছনে পিছনে ধেই ধেই করে নেচে বেড়াতে নয়। কলেজ এখন বন্ধ। কোত্থাও বেরুবে না। চুপচাপ ঘরে গিয়ে পড়াশুনো করো।

কিছুতেই, কোনওভাবেই মাকে বোঝাতে পারেনি সে সেদিন। কোনও অজুহাতই খাটেনি বাবার কাছেও। বাড়ি আর পড়াশুনোর বেঁধে দেওয়া নিরাপদ গণ্ডির বাইরে পা বাড়ানোটাকে মেনে নেয়নি কেউই। সে গণ্ডি ছিঁড়ে ফেলার শক্তি কি সে’দিন সে নিজেও অর্জন করে উঠতে পেরেছিল?

ট্রেনের গতি কমে এসেছে আরও। বাইরের কু-ঝিকঝিক অন্ধকারটা বিদায় নিয়ে ফুটে উঠতে শুরু করেছে নিয়ন ভেপারের বেশ জোরালো আলো। ট্রেন এবার ঢুকে আসছে স্টেশনে।

অম্বিকা উঠে দাঁড়ায়। পোশাকের ভাঁজগুলো ঠিক করে নেয় আরেকবার। তারপর কাঁধে স্টাইলিশ লেডিজ অফিস ব্যাগটা ঝুলিয়ে নিয়ে হ্যান্ডব্যাগটা হাতে নিয়ে এসে দাঁড়ায় দরজার সামনে।

তন্নিষ্ঠারা ছুটে গিয়েছিল শহর থেকে। যোগাযোগ করা হয়েছিল মিডিয়ার সঙ্গেও। ঐ অজ পাড়াগাঁয়ের খবরে তাদের আর গুরুত্ব কতটুকু? তাও যদি তেমন বড়ো কোনও রাজনৈতিক দল যুক্ত থাকত তার সঙ্গে। তবুও দু’টো চ্যানেলকে বোঝানো গিয়েছিল বিষয়টার গুরুত্ব। ছুটে গিয়েছিল তাদের ওবি ভ্যান। গ্রামের লোকও ভয় ভেঙে ছুটে এসেছিল থানায়। এমনকি দীপ্তিবৌদিও ছিল। পরে ও শুনেছে বন্ধুদের কাছে।  বাধ্য হয়েছিল পুলিস গা ঝাড়া দিয়ে উঠতে।

শুভ্রকে উদ্ধার করা গিয়েছিল পরের রাতে। ওর সেই মাকোন্দো – একটা কলাবাগান থেকেই। বেধড়ক মেরেছিল ওরা ওকে। সারা গায়ে ছিল কালশিটের দাগ। মাথার পিছনে এত জোরে আঘাত করেছিল যে বেশ কিছুদিন নাকি কিছুই ভালো করে মনে করতে পারত না। বিছানায় শয্যাশায়ী থাকতে হয়েছিল নাকি অনেক দিন।

সবই অবশ্য নেহাতই শোনা কথা। ও তো আর দেখতে যায়নি ওকে কোনওদিনই। ভালো মেয়ের সমাজবদ্ধ মেয়েলি গণ্ডির মধ্যেই নিজেকে বেঁধে রেখেছিল প্রাণপণে। তাকে ভাঙবার জন্য দরকার যে মনের জোর, কোনওদিনই তা আর সঞ্চয় করে ওঠা হয়নি তার।

শুধু বুকের মধ্যে রয়ে গেছে আজও আলোর একটা স্ফুলিঙ্গ – শুভ্র তার রং, কী উজ্জ্বল তার জ্যোতি ! তার সংস্পর্শে এলে যেন উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে সমগ্র চরাচর। স্পষ্ট হয় ফুটে উঠতে চায় যেন সব কিছুই – কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায়, কোনটা ঠিক, কোনটা বেঠিক। কী ভয়ালো তার আকর্ষণ ! মাঝে মাঝেই যেন তা তাকে ভুলিয়ে দিতে চায় – সে অম্বিকা। অম্বা সে নয়। সমাজের যাবতীয় অন্ধকার, অনাচার-বিধি-নিয়মকে মেনে চলা, মানিয়ে চলাই যে তার নিয়তি। তাকে ভাঙবার তার শক্তি কোথায়?

তার থেকে মেনে নেওয়াই ভালো এই অন্ধকার। এই যে ঝলমলে ট্রেনের কামরা, এই যে নিয়ন ভেপারের আলোয় ভাসা স্টেশনের এই প্ল্যাটফর্ম, কৃত্রিম আলোর এই বন্যা – এ’ ভারি আরামপ্রদ মনে হয় তার। ঝলমলে, কিন্তু তার বিস্তার ঠিক যেটুকু নাহলেই নয়, ঠিক ততটুকুই। তার বাইরে অন্ধকারের কৃষ্ণপর্দায় ঢাকা বাকি আর সব কিছু। সমাজের বেঁধে দেওয়া গণ্ডিতে আবদ্ধ ওর দরকার কী তার বাইরে চাওয়ার?

তবু, বুকের মধ্যের ঐ স্ফুলিঙ্গটা মাঝে মাঝেই এত জ্বালায় কেন ওকে ! ওকে ছাড়াই তো দিব্যি চলে যায় ওর সাজানো গোছানো পৃথিবী, সুখের ছোট্ট সংসার। ওকে যে প্রাণপণে ভুলে থাকতে চায় ও, বুকের মধ্যে গভীর অন্ধকারে মুড়ে ওকে পাঠিয়ে দিতে চায় বিস্মৃতির অতল গহ্বরে। তবু, তবু কেন ও উঠে আসে ওকে জ্বালাতে বারেবারে !    

ট্রেন এসে গতি ধীরে ধীরে আরও কমাতে কমাতে শেষপর্যন্ত স্থির হয়ে দাঁড়ায় প্ল্যাটফর্মে। অভ্যস্ত পায়ে হালকাভাবে নেমে আসে অম্বিকা। তারপর ধীর ক্লান্ত পদক্ষেপে রওনা হয় বাইরে অটোস্ট্যান্ডের দিকে জমে থাকা অন্ধকারটার দিকে। ওদিকের বড় আলোটা ক’দিন হল খারাপ হয়ে গেছে।

সমাপ্ত

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।