ভাঙা মঞ্চের মঞ্চিনী (পর্ব – ১)

লেখক: দামিনী সেন


পরিচ্ছদ – এক

পশ্চিমে নদীতীর। সূর্য ঢলে পড়ে। ঐ ওপারে। যেখানে উঁচু বাঁধটার চড়াইয়ের লালচে মেটে রংটা আকাশের দিকে উঠতে উঠতে হঠাৎ থেমে পড়ে একটা নদীরই সমান্তরাল রেখায়। তারপর ঐ আরও উপরে উঠতে চাওয়ার ব্যর্থতাকে মেনে নিতে না পারার আকুলতাতেই হয়তো বাড়িয়ে দেয় কিছু আঙুল, আরও কিছুটা উপরে। কালো মেয়ের লজ্জার মতোই সে আঙুলের রংও কালচে বেগুনি।

হ্যাঁ। এপারের এতটা দূরত্ব থেকে ওপারের বাঁধের রাস্তাটার ওপাশের গাছগুলোকে এখন অন্তত তেমনই দেখায়। অন্তত এই সময়, এই সূর্য ঢলে নামা শেষ বিকেলবেলায়। বড়জোর বিঘৎ খানেক পুরু একটা কালচে রেখা, যার নিচের মার্জিনটুকু পরিচ্ছন্ন কোনও শিল্পীর হাতে টানা, কিন্তু উপরের দিকটা তার বড় এবড়োখেবড়ো, কোনওরকম শৈল্পিক ছাঁদবিহীন। রঙেও সেখানে মসৃণতার বড় অভাব। সবুজের লেশমাত্রও বুঝে ওঠা দায়। বরং নেমে আসা সূর্যকে প্রতিরোধ করে দাঁড়ানোর স্পর্ধায় কেমন যেন পুড়ে কালো। নিচের বাঁধের লাল মাটি পরম মমতায় নিজের আভা দরাজ হাতে বিলিয়েও সে কৃষ্ণত্ব তার ঢাকা দিতে অপারগ।
ওদিকের পাড়াটার নাম পালিতপুর। বিকেলবেলার এইসময়ে ওদিকে রাস্তাটা কিন্তু ভারী মনোরম। এপার থেকে দেখতে পাওয়া ঐ এবড়োখেবড়ো পুরু রেখাটা কাছে গেলেই পরিণত হয় সবুজ গাছের হাল্কা একটা আচ্ছাদনে। সূর্যর আলো তাদের ফাঁক দিয়েই রাস্তায় পৌঁছয় বটে, কিন্তু তার তেজ হারিয়ে চারিদিকে কেমন একটা ঠান্ডা ছায়া ছায়া পরিবেশ তৈরি হয়। মনে আমেজ আসে।

তবে ওদিকটায় লোকে যায় কম। শহর থেকে বেড়িয়ে এসে অত উঁচু আর লম্বা সেতুটা পেরিয়ে তবে তো ওপার। তাও আবার বড় রাস্তা থেকে বাঁধে নেমে আসার রাস্তাটাও তেমন পাকাপোক্ত নয়। ফলে একমাত্র কারুর শখ উথলে উঠলে তবেই কেউ কেউ ওপারে পা রাখে। নাহলে নয়। তবে ঐ পাড়ার লোকেদের কথা আলাদা।

এপারেও বাঁধ বরাবর চলে গেছে রাস্তা। একইরকম। তবু কিছুটা আলাদা। বড় রাস্তা থেকে বাঁদিকে নেমে এসেই রাস্তার ধার বরাবরই এগিয়ে গেছে আরেকটি সরু পথ। পাকা নয়, লাল মাটিরই। রাস্তা থেকে নদীখাত পর্যন্ত প্রায় খাড়া বাঁধটার মাঝামাঝি উচ্চতায় যেন সিঁড়ির এক ছোট্ট সরু ধাপ। আর তার শেষপ্রান্তে পুরসভার তত্ত্বাবধানে একটা পার্ক। ঠিক সেতুর গোড়ায়। অনেকটা ভিউ পয়েন্ট গোছের। দুপুরের রোদ একটু পড়ে এলেই সেখানে এসে জোটে শহরের বহু মানুষ। একটু খোলা হাওয়া, একটু নির্জনতা, একটু অকৃত্রিম প্রকৃতির ছোঁয়ার আশায়।
বাঁধটা এগিয়ে গেছে এই রাস্তাটার সাথে প্রায় একটা সমকোণ রচনা করে। ডানদিকে তার অনেকটা নিচে নদীখাত। আর বাঁদিকে নদী বরাবরই একটা ক্যানেল। গভীর। সবসময় জলে পূর্ণ। মালবাহী স্টিমার চলাচলের জন্য নাকি এই খালটি খোঁড়া হয়েছিলো। তবে কোনদিনও এর জলে কোনও স্টিমার চলতে দেখা গেছে বলে কেউ মনে করতে পারে না।

রাস্তা থেকে বাঁধে নেমে এসে সামান্য একটু এগোলেই এই খালটার উপর একটা সেতু। বেশ উঁচু, পাকাপোক্ত। বড় বড় লরি এই সেতুটা দিয়েই এসে পড়ে বাঁধে। তারপর বাঁধ বরাবর ডানদিকে একটু এগিয়েই আবার বাঁক নিয়ে নেমে যায় নদীতে। সারাদিন ধরেই তাদের এই যাতায়াতে বিরাম নেই কোনও। শহরের নানা নির্মাণপ্রকল্পে দামোদরের বালির চাহিদা যে খুব।
এই পর্যন্ত বাঁধ বরাবর রাস্তাটা খুবই জমজমাট। একপাশে বেশ কিছু অস্থায়ী দোকান। লরির চাকায় চাকায় উড়তে থাকা ধুলো। এককথায় শহরটা তার একটা কর্মচঞ্চল নোংরা বাহু বাড়িয়ে দখল নিয়েছে জায়গাটুকুর।

পার্কে আসা সৌন্দর্যপিয়াসী ভিড়টার সামনে বাঁধের এই ছোট্ট অংশটুকু একটা পর্দার কাজ করে। ধুলো দেখে নাক সিঁটকে কেউ আর এদিকে পা বাড়ায় না। ফলে ঐটুকু অংশ পেরিয়েই যে নির্জন লালমাটির রাস্তাটা বাঁধ বরাবর শুয়ে শুয়েই নদী বরাবর পাড়ি জমায় দূরদূরান্তরে, শহরের সব কোলাহল এড়িয়ে সে পড়ে থাকে লোকচক্ষুর অন্তরালেই, নির্জনতা, নদীর বুক থেকে বয়ে আসা শুকনো বাতাস, ক্যানেলের দিক বরাবর গড়ে ওঠা ছোট-বড় গাছের জঙ্গলের পাতায় পাতায় সুরতোলা মর্মরধ্বনি, আর বাঁধ ও খালের মধ্যবর্তী অংশে গড়ে ওঠা সামান্য কিছু বসতিকে সঙ্গী করে।

পড়ন্ত বিকেলের রোদে বাঁধের এই অংশটাতেই দেখা পাওয়া যাচ্ছিল দুটো সাইকেলের। দুটোই লেডিজ। সামনেরটা তার রংচটা, বহু ব্যবহারে দীর্ণ। পিছনেরটা কিন্তু চকচকে। সূর্যর শেষ আলো যেন ছিটকে উঠছিল তার চাকার সরু স্টাইলিশ রিমদুটো থেকে। দূরে নদীখাত থেকে দেখলে অবশ্য এতকিছু বুঝে ওঠা দায়। সেখান থেকে দেখলে যেন দুটো ছোট্ট ছোট্ট পোকা ধুলোর ওই আবরণটুকু ছাড়িয়ে বেড়িয়ে আসছিলো ধীরগতিতে বাঁধের ঐ পরিস্কার কিন্তু জনবিরল অংশটার দিকে।

দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, সাইকেলদু’টোর গতি কিন্তু সমান নয়। অত্যন্ত ধীরে ধীরে হলেও সামনেরটা তার এগিয়ে যাচ্ছিল একটু বেশি। তারপর আবার দাঁড়িয়ে পড়ছিল, কখনও কোনও গামার, কখনও বা কোনও নিমগাছতলায় থেমে পড়ে অপেক্ষা করছিল পিছনেরটার। পিছনের সাইকেলটাও সেই সুযোগে নিজেদের মধ্যে দূরত্বটা একটু একটু করে কমিয়ে আনছিল ঠিকই, তবে চলনে তার মসৃণতার অভাবটুকু এত দূর থেকেও কিছুটা বোঝা যাচ্ছিল।

আরেকটু কাছে এগিয়ে এলে, এই ধরা যাক নদীর বালিখাতটুকু পেরিয়ে এসে বাঁধের গোড়ায়, বা হয়তো বাঁধ বেয়ে কিছুটা উপরে উঠতে উঠতে আবার যদি তাকানো যেত, তখন সাইকেলের আরোহীদের চেহারাও অনেকটা পরিস্ফূট হয়ে উঠতে পারত। স্বভাবতই চোখ টানত বেশি পিছনের জনই। ফরসা চেহারা, মাথায় স্টাইলিশ স্ট্র হ্যাট, চোখে রোদচশমা। সাদা টপটির স্লিভলেস কাঁধ থেকে নেমে আসা দুটি হাত থেকে যেন আলো পিছলে পড়ছে। পরনের নীল জিন্সটি সুচারু ফিগারটিকে যেন একরকম কামড়ে ধরে নিচের দিকে নেমে আসতে আসতে হঠাৎ করেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে হাঁটুর কিছুটা নিচে, পায়ের ডিমের কাছটায়। আর তার তলায় মসৃণ পাদু’টোর শেষপ্রান্তে দু’টো গোলাপী আবরণ – স্টাইলিশ লেডিজ স্নিকারস। সাইকেলের গতিও তার যেন কিছুটা বেখেয়ালি, ধীর; গতির আপাত ছন্দহীনতাতেও যেন স্পন্দিত প্রকৃতির সীমাহীনতার টান।

কিন্তু আরও কাছে বাঁধের উপর উঠে এলে চোখে পড়ত আরও একটু বিশদ এক ছবি। দেখা যেত, স্ট্র হ্যাটের ফাঁক দিয়ে নেমে আসা ঘামের রেখা, শেষ বিকেলের সরাসরি রোদে লাল হয়ে ওঠা স্বেদসিক্ত একটি মুখ, রোদচশমার আড়ালে ঢাকা পড়া বেদম দুটি চোখ, ঈষৎ হাঁ মুখটির দমের ঘাটতি মেটানোর চোরা প্রয়াস। সাদা টপটিও কাঁধের কাছটায় ও পিঠের দিকে ঘামে ভিজে সেঁটে বসেছে শরীরের সাথে। প্রকট হয়ে উঠেছে সেখানে অন্তর্বাসের আবছা রেখা। ক্লান্ত দুই পা বারে বারে থেমে পড়তে চেয়েও যেন শরীরের শেষ শক্তিটুকু একজোট করে ঘুরিয়ে চলেছে প্যাডেল। সাইকেলের গতিও হাঁপিয়ে ওঠা, ক্লান্ত ও অমসৃণ।

“অনি, এই অনি, আর কতদূর?” হাঁপাতে হাঁপাতেই প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল সুচি। পথের ধারে একটা পাতাবিরল গাছের সামান্য ছায়া দেখে দাঁড়িয়ে পড়া সাদা সবুজ সালোয়ার পড়া শ্যামলা চেহারাটার কাছাকাছি এগিয়ে এসে তার ক্লান্ত স্বর আরও যোগ করল, “তুই যে বলেছিলি এই কাছেই।”

“হ্যাঁ, কাছেই তো। এই তো, এসে পড়েছি। ওই যে পটাশ গাছটা দেখছিস”, বলতে বলতেই কী ভেবে যেন একটু হেসে ফেলল অনি। “ওহো। তুই তো আবার পটাশ গাছ বললে বুঝবি না। ইউক্যালিপটাস। ঐ যে, দেখতে পাচ্ছিস? ওর পিছন দিয়েই একটা সিঁড়ি নেমে গেছে ক্যানেলের দিকটায়। ওখানেই বলাইদের বাড়ি।” মুখের হাসিটা আরেকটু মিষ্টি করে তুলে বলল অনি।

সুচি আর কীই বা বলে। এই অনি ওরফে অনামিকা মেয়েটিকে সে এড়াতে পারে না। এত মিষ্টি করে হাসে মেয়েটা কথা বলার সময়, ওকে এড়ানো সত্যি মুশকিল। “আচ্ছা, চল”, প্রায় মুখ দিয়েই একটা খাপছাড়া নিঃশ্বাস বেড়িয়ে আসে তার। একটু বিরক্তির সুরেই বলে ওঠে সে, “এতটা দূর, আগে বললেই পারতিস। বাড়ি গিয়ে না হয় স্কুটিটাই নিয়ে আসতাম।”

“সরি রে”, ভেজা কপাল থেকে এক ঝটকায় সামনে এসে পড়া অবাধ্য চুলের গোছাটাকে পিছনে সরিয়ে দিতে দিতে বলে ওঠে অনি। সাইকেলটা তার পুরোনো, কিন্তু স্বচ্ছন্দ তার গতি। কলেজ থেকে এই প্রায় তিন-চার কিলোমিটার সাইকেলে আসার পরিশ্রমের চিহ্ন তার ঘামে ভেজা মুখেও স্পষ্ট। কিন্তু হাঁপানোর কোনও চিহ্ন সেখানে নেই। বরং চোখ দুটো তার অদ্ভুত হাসিতে উজ্জ্বল। ইউক্যালিপটাস গাছটার কাছে এসে আবার দাঁড়িয়ে পড়ে ও। সাইকেল থেকে নেমে পড়ে, ডানহাতে সাইকেলের সিট থেকে সোজা প্যাডেলের দিকে নেমে যাওয়া রডটা চেপে ধরে আর বাঁ হাতে হ্যান্ডেলটা ধরে সচ্ছন্দে সাইকেলটাকে তুলে নিয়ে তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যেতে যেতে ঘাড় ঘুরিয়ে সুচিকে ডাক দেয় সে, “নেমে আয় এখানে। এই তো বলাইদের বাড়ি।”

সাইকেল থেকে নেমে শুচিষ্মিতা কিন্তু খাড়াই নেমে যাওয়া সিঁড়িটা দেখে একরকম ভিরমি খায়। “ওরে বাবা। সাইকেল ঘাড়ে করে এবারে তবে ঐ পাতালে নামতে হবে! ও আমার দ্বারা হবে না। সাইকেল ছেড়ে এই আমি এখানেই বসে পড়লুম।”

“আচ্ছা আচ্ছা, দাঁড়া দাঁড়া। আমি তোর সাইকেলটা নামিয়ে দিচ্ছি।” নিজের সাইকেলটা নিচে স্ট্যান্ড করে তড়িঘড়ি আবার উপরে উঠে আসে অনি। এতটা দৌড়ে দৌড়ে উঠতে গিয়ে তারও একটু হাঁপ ধরে। কিন্তু সেটাকে কোনোরকম পাত্তাই না দিয়ে সে সোজা এগিয়ে গিয়ে তুলে নেয় সুচির সাইকেলটা। “নে, এবার চল।”

“সত্যি রে, তোরা আর রিহার্সালের জায়গা খুঁজে পেলি না! সারা শহর ছাড়িয়ে এই এ-ত দূরে …”, বাক্যটা অসমাপ্ত রেখেই থামতে হয় সুচিকে। অনির ঘাড় ঘুরিয়ে তাকানো হাসি হাসি মুখটা থামিয়ে দেয় তাকে। ও ততক্ষণে সাইকেল কাঁধে আবার অন্তত দশ ধাপ নিচে। সুচিও যাবতীয় অনুযোগ মুলতুবি রেখে এবার একরকম বাধ্য মেয়ের মতোই অনুসরণ করে তাকে। কিন্তু নেমে এসেই উগড়ে দেয় তার যাবতীয় বিরক্তি, “সত্যি, তুই একটা হনুমানই বটে।”

“এই এই, জেন্ডার পালটে দিচ্ছিস কেন রে!” কপট রাগে ভুরু কুঁচকে তাকায় অনি। তারপরেই হেসে ফেলে বলে, “তবে হনুমতী বলতেই পারিস।”

সুচিও হেসে ফেলে। এই জন্যই এই মেয়েটার উপর রাগ করা মুশকিল। নাহলে এমন একটা গেছো বাঁদরের সাথে কেউ বন্ধুত্ব করে!

দু’জনেই হাসতে হাসতে এ ওর ঘাড়ে একটু ঢলে পড়ে। তারপর সরু রাস্তাটা ধরে এগিয়ে যায় সামনের ল্যাম্পপোস্টটা ছাড়িয়ে আরেকটু সামনে। টিনের চালের ইঁটের যে ঘরটার সামনে এসে তারা দাঁড়ায়, ওটাই তাদের লক্ষ। সামনের উঠোনের মতো জায়গাটা ছাড়িয়ে ঘরটার পাশ দিয়ে একটা ছোট্ট সরু গলি ঘরটা ছাড়িয়ে চলে গেছে পিছনের দিকে। এমনিতেই সরু গলিটার একপাশে বাড়িটা, অন্যপাশে একটা নোনা ধরা পুরোনো দেওয়াল। তার গায়ে আবার একটা কলকে ফুলের গাছ। ফুলে ফুলে হলুদ হয়ে আছে গাছটা। আর তার সামনে পেছনে দেওয়ালের গায়ে এলোমেলো করেই হেলান দেওয়া খান বারো সাইকেল। ওরাও ওদের দু’টো সাইকেল ওগুলোর উপরই ঢেলে দেয়। তারপর একটু একপাশে কাত হয়েই বাকি পড়ে থাকা সামান্য জায়গাটা দিয়েই পথ করে নিয়ে এগিয়ে যায় পিছনের দিকে।

পিছনে আরও একটা খোড়ো চালের বাড়ি। প্রথম বাড়িটার সাথে সমকোণ করে পাঁচিলের গা দিয়েই বিস্তৃত। মাঝখানে একটা সরু পথ। এই বাড়িটার দালানটা বেশ বড়। আর তার সামনের দিকটা খোলা। বেশ খানিকটা। তারপর বয়ে গেছে খালটা। এটাই আপাতত ওদের স্টেজ। ‘মঞ্চসাথী’র নতুন প্রয়াসকে ঘষামাজা করে সত্যিকারের মঞ্চে উপস্থিত করার উপযুক্ত করে তোলার সূতিকাগৃহ।

“ঐ, ঐ তো এসে গেছে অনিরা।” ওদের দেখেই হই হই করে ওঠে কতগুলি গলা। “নতুন মেয়েটাকেও এনেছে”, ওদের অভ্যর্থনা জানাতে ছুটে এগিয়ে আসে পারভিন, ওদের পারুদি। দুই হাত ধরে সে ডেকে নিয়ে যায় সুচিকে। “এই সর সর, ওকে আগে একটু বসতে দে।”

তড়িঘড়ি দালানের উপরই একটা বসার জায়গা হয়ে যায়। একটা স্ট্যান্ডফ্যান সাথেসাথেই সে জায়গাটার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ঘুরতে শুরু করে দেয়। এ’ বাড়ির হোস্ট বলাই ছোটে ঠান্ডা এক গ্লাস জলের ব্যবস্থা করতে। নতুন অতিথিকে নিয়ে সবাই বেশ ব্যস্তই হয়ে পড়ে। ব্যস্ততার অবশ্য কারণও আছে। মঞ্চসাথীর জন্য নতুন যে নাটকটা ওদের বিপ্লবদা আর সফিদা মিলে দাঁড় করিয়েছে, তার এক মুখ্য চরিত্র এক স্টাইলিশ এবং জবরদস্ত মহিলা, যে একটি স্কুলে পড়ায় আর সেই দিদিমণি মেজাজটি বয়ে নিয়ে আসে বাড়িতেও। তার ধাক্কা এসে পড়ে স্বভাবতই বাড়ির আর সকলেরও উপর। আবার বাড়ির বাইরেও সে একটি ফ্যাশনেবল নারীসমিতিরও সভানেত্রী। অর্থাৎ সব মিলিয়ে বেশ একটি সকলকে তটস্থ করে রাখা চরিত্র। কিন্তু মুশকিল দাঁড়িয়েছিল অন্যজায়গায়। এমন একটি মহিলার চরিত্রে অভিনয়টা করবে কে! ওদের এই গ্রুপে মহিলা বলতে তো দু’জন। অনি আর পারুদি। তারমধ্যে পারুদি মঞ্চের পিছনে যতটা দড়, মঞ্চে ততটা নয়। ছোটখাটো কোনও চরিত্র হলে অবশ্য উতরে দিতে পারে। কিন্তু এইরকম প্রায় সারাক্ষণই মঞ্চে উপস্থিত চরিত্র তাকে দিয়ে হওয়া মুশকিল। তাহলে বাকি থাকে অনি।

প্রথমদিন যখন এই নতুন নাটকের স্ক্রিপ্টটা সফিকুল পড়ে শোনায়, অনি হেসে ফেলে বলেছিল, “ও সফিদা, তুমি বুঝি আমায় ভেবে লিখেছ?” হেসে ফেলেছিল সফিও, “দূর পাগলি। তুই কী করে করবি এই রোল!” অন্যরাও একবাক্যে সায় দিয়েছিল, আর যাই হোক, অনিকে এই রোলে মানাবে না। কম বয়সী কোনও মেয়ে, ঝগরুটে ঝি, কলেজ পড়ুয়া প্রেমিকা বা এমনকি বাড়ির বউমা কি শাশুড়ির রোলেও ও চলে যাবে, কিন্তু এই রোলে চেহারার একটু আলাদা চটক চাই। সেটা অনির মধ্যে নেই। পারুদি তো একটু ঝাঁঝিয়েই উঠেছিল সফিদার উপর, “বলিহারি বুদ্ধি বটে বাবা। হাতে যা আছে তেমন করেই চরিত্র লিখবে তো। এখন কোথা থেকে নতুন মেয়ে জোটাবো! ও নাটক হবে না। আবার নতুন কিছু লেখ।”

এমনিতে সফিদা যতই ডাকাবুকো হোক, পারুদির সামনে একেবারে কেঁচো। অতএব সফিকুল ও বিপ্লবের লেখা নাটকটার ভবিষ্যত মোটামুটি সিলই হতে চলেছিল, কিন্তু রুখে দাঁড়িয়েছিল দলের ইয়ং ব্রিগেড। তাদের নাটকটা খুবই পছন্দ। ওটাই তারা করবে। উপযুক্ত অভিনেত্রী জোটানোর ভার তারাই নিয়েছিল। তারপর থেকেই চলছে ঠিকমতো একটি মেয়ের খোঁজ।
এই খোঁজের বাস্তবে তিন নম্বর ফল আজ শুচিষ্মিতা। এর আগে দু দু’জনকে দুবার জোগাড় করে আনা হয়েছে, কিন্তু কেউই দ্বিতীয় দিন আর এ’মুখো হয়নি। এও ওদের আরেক মুশকিল। ওদের রিহার্সালের জায়গাটা ওদের মতে তেমন খারাপ না, কিন্তু শহর থেকে একটু দূরে। কিন্তু কী করবে ওরা? প্রথমে তো গ্রুপ ছোট থাকতে পারুদি আর সফিদার বাড়িতেই ওরা মহড়া দিত। কিন্তু একতলার ঘরটা ছিল ছোট। ফলে জায়গা পাল্টাতে হোল। অলোকদের বাড়ির একতলাটা যে ক’দিন ফাঁকা ছিল, ওখানেই সরে গেল ওদের রিহার্সাল। তারপর ওখানে নতুন ভাড়াটে চলে এলে আবার নতুন জায়গার খোঁজ। কিন্তু রিহার্সালের চেঁচামেচিতে শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের শান্তিভঙ্গ হওয়াতে পরপর আরও দু’ জায়গা থেকে ওদের বিতাড়িত হতে হয়। শেষবার এমনকি মরিয়া হয়ে সকলে মিলে জোগাড়যন্ত্র করে একটা ঘর ভাড়া নিয়েও শেষরক্ষা হয়নি। শেষপর্যন্ত বলাইদের খালের ধারের নিরিবিলি এই দালানটাতে এসেই আশ্রয় জুটেছে তাদের।

অতএব শুচিষ্মিতার জন্য এই আপ্যায়ণের আতিশয্য। কিন্তু তার মধ্যে এমন একটা আন্তরিকতার ছোঁয়া অনুভব করে সে, যে তার এতক্ষণের বিরক্তি কোথায় কর্পূরের মতোই উবে যায়। তার পোশাকী শুচিষ্মিতা নামটাও হারিয়ে যায় সেই আন্তরিকতার ছোঁয়ায়। অনির মুখের ‘সুচি’ নামটাই ছড়িয়ে পড়ে সকলের মুখে মুখে। একটুক্ষণের মধ্যেই সেও তার ‘নতুন’ পরিচয়ের অভিধা হারিয়ে হয়ে ওঠে আর সবাইয়েরই একজন।

আগামী পর্বের লিঙ্ক এখানে

অলংকরণ – শর্মিষ্ঠা দেবযানী


লেখক পরিচিতি: দামিনী সেন
গত শতাব্দীর শেষ পাদে জন্ম। ছেলেবেলা কেটেছে মফস্‌সলে। সেখানেই পড়াশুনো — স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন। ঘুরতে ভালোবাসেন, আর ভালোবাসেন পড়তে। জানেন একাধিক বিদেশি ভাষা। আগ্রহ বহুমুখী, কলমের অভিমুখও। কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস — সাবলীল তাঁর কলমের গতি। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ইতিমধ্যেই প্রকাশিত বেশ কিছু কবিতা, প্রবন্ধ, ছোটগল্প। কাব্যগ্রন্থ “ভাঙা সে সাম্পান” প্রকাশের পথে। ধারাবাহিক প্রকাশিতব্য উপন্যাস “ভাঙা মঞ্চের মঞ্চিনী”-র মধ্য দিয়েই ঔপন্যাসিক হিসেবে তাঁর প্রথম আত্মপ্রকাশ।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন
  •  
  •  
  •  
  •  

5 Comments

  1. অরিন্দম মৈত্র

    ভালো লাগলো। প্রথম বর্ণনাটা যেন সিনেম্যাটিক। একটা ম্যাক্রো স্প্যান থেকে ধীরে ধীরে স্প্যান কমাতে কমাতে এসে থিতু হল একটা মাইক্রো স্প্যানে। সাধারণ থেকে বিশেষে। অন্যরকম সূচনা। পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।

  2. মানসরঞ্জন সেনগুপ্ত

    উপন্যাসের শুরুতে প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্রমোন্মোচন যেন সিনেম্যাটিক স্লো-মোশন । বর্ণনার মাধুর্যে নদী, নদীবাঁধ, খাল, রাস্তা এবং এমনকি ইউক্যালিপটাস গাছটাও যেন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠেছে ! ঔপন্যাসিকের ভাবনা-কলমে এমনই তুলির টান দেখতে চাই ( যা সাধারণতঃ ফেসবুকের গল্পলিখিয়েরা পেরে ওঠেন না ! ) ।
    খুঁটিনাটি বৃত্তান্ত, বলাইদের বাড়ির বর্ণনা পাকা গৃহস্থকে নির্দেশ করে ! বড় সজাগ দৃষ্টি । চরিত্রগুলি খুব চেনা, কিন্তু আঁকার গুণে মনোযোগ আকর্ষণেও সফল । সূচির ও অনির চরিত্র দুটিকে দামি ক্যামেরায় লেন্সবন্দিনী করেছেন লেখিকা ।
    দেখা যাক, মহড়ার নিত্য অনিশ্চয়তা কাটিয়ে, সূচিকে নিয়মে বাঁধতে পেরে মঞ্চসাথীরা আলোঝলমল মঞ্চ শেষতক কাঁপিয়ে দিতে পারে কি না !!
    শুভেচ্ছা রইলো ………

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।