আমার নক্ষত্রেরা

লেখক : ইয়াসেফ মোহাঃ রিয়ান

চারিদিকে থৈথৈ মানুষের ভিড়,
মাঠ ঘিরে—
বড়, বুড়ো, চাচা-চাচি, কিশোর-কিশোরী, বাচ্চারাও —
বল পায়ে পড়তেই ঝড়ের বেগে
ডান পা, বাম পা,
বিশাল তাবড় তাবড় রক্ষীবাহিনীকে
চকমা দিয়ে বল সোওওজা নেটে…
হৈহৈ রব ! “গোওওল !”
আবার বল, আবার গতি, আবার চকমা… আবার গোওওল !

হ্যাঁ, আমি পেলেকে, মারাদোনাকে, মেসি বা রোনাল্ডোকে
নিজ চোখে দেখিনি—
কিন্তু এই চোখ দেখেছে আমাদের নিজস্ব তারকাদের,
দেখেছে ইকবালদা, পেশকারদাসহ অন্যান্য দাদাদের—
কি শৈলী, কি সাহস, কি পায়ের জাদু !

বাৎসরিক অনুষ্ঠানের মহড়া,
চারিদিকে আলোময় ঝিকিমিকি রাত,
শীতের কুয়াশার চাদর…
তাড়াতাড়ি পড়া শেষ করে
ঠাণ্ডা চপ্পলে ছুট পুরনো বাজারের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে।
বাড়ি থেকে বেরোতেই হাওয়ায় ভেসে এল—
“আনে সে উসকে আয়ে বাহার,
যানে সে উসকে যায়ে বাহার…”
রফি-কণ্ঠী রাজুদার গান !
এই চোখ মোহাম্মদ রফিকে দেখেনি,
কিন্তু রাজুদাকে রোজ দেখেছে,
রাজুদার ম্যাজিকাল কণ্ঠ শুনেছে প্রতিটি অনুষ্ঠানে।

মোস্তর চায়ের দোকানের আড্ডাটা কি করে ভুলি !
বিকেল হলেই সামনে চৌকিতে—
লাল চা, এক মুঠো বিড়ি আর শব্দছক,
বাজপাখির মতো জ্বলজ্বলে কিছু জোড়াচোখ।
শব্দছক শেষে শব্দযাদুর সাহিত্যচর্চা—
খবরের কাগজে রাজনীতি পাতা অগ্রাহ্য করে
শেষ পাতার ক্রিকেট-ফুটবল তর্ক।
রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মানিক বা জীবনানন্দকে
নিজ চোখে দেখিনি,
কিন্তু শব্দছকের কারসাজিতে
“কচিপাতা” থেকে “অনবদ্য” হয়ে
ভিন্ন ভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায়
রবিদা‘র কবিতা পড়েছি,
রাজ্জাকদার মঞ্চ-উপস্থাপনা দেখেছি,
গ্রামের কবি ও অ-কবিদের লেখায় মুগ্ধ হয়েছি।

যাত্রাপালার মঞ্চে—
স্টেজের নিচে আড়ালে বসে থাকা আদেশদা’র প্রম্পটিং দেখেছি,
দেখেছি রাজ্জাকদা, ইকবালদা, পেশকারদাদের সাবলীল অভিনয়,
কাইয়ুমদার চকমকি পোশাকে ডিস্কো ডান্স,
যুথিকাদি, বুড়িদির রবীন্দ্রসংগীত,
বাপ্পাদার তবলা,
আর সাক্ষী থেকেছি
রাজ্জাকদা ও পারভিনদির সেই বিখ্যাত “কর্ণ-কুন্তী সংবাদ”-এর।

দুক্ষুমাস্টার, কয়েশকাকু, রাহামাতুল্লাহকাকু, বকুলদা, মাজেদদাদের
ছায়ায় শিক্ষার এক নতুন প্রবাহ প্রত্যক্ষ করেছি
গ্রামের মিলেনিয়াল প্রজন্মকে
শিক্ষার উচ্চ আসনে নিয়ে আসতে দেখেছি।

পরিণত এই কিশোর চোখ দেখেছে
একগুচ্ছ নতুন তারকাদের আবির্ভাব—
সাহিনদার প্রখর মেধা,
রোজিদি ও লিপিদির সর্বজ্ঞানপটুতা,
শামীম কাকুর ইংরেজি ও দর্শন দক্ষতা…

মিলেনিয়াল প্রজন্মের কৈশোরে
এই দাদা-দিদিরাই ছিল আমাদের নক্ষত্র,
আমাদের রোলমডেল।

জীবিকা, সংসার আর দায়িত্বের ভারে
ইকবালদা, পেশকারদা, রাজুদাদের মত
সব নক্ষত্রদের তারাখসার মত
সংসার জীবনে ঝাঁপ দিতে হয়েছিল;
দিদিরা বিয়ের পর রান্নাঘর থেকে
স্ত্রী, মা, আর আজ শাশুড়ি হবার দোরগোড়ায়।
কেউ সফল, কেউ বিফল, কেউ গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে,
কেউ চলে গেছে দূর পরকালে,
কেউ বা ফিরে এসেছে নিজের কক্ষে, সরবে, নীরবে।

আমার সেই কৈশোর চোখে
গ্রামের তারকারা আজও উজ্জ্বল, তরতাজা—
কিন্তু সময়ের নিষ্ঠুর আয়ুঘাতে
আমার প্রিয় নক্ষত্রেরা আজ ষাট ছুঁইছুঁই,
সময়ের এই নিষ্ঠুরতা
মন আগেও মানেনি
আজও মানেনা !

আমি আকাশের নক্ষত্র দূর থেকে দেখেছি,
কিন্তু আমার গ্রামের নক্ষত্ররা সর্বদা ঊজ্জ্বল, সর্ব-দীপ্ত।

সব গ্রামেই, সব পাড়ায়,
নিজ নিজ নক্ষত্র ছিল, আজও আছে—
যারা চলে গেছেন, তাঁদের প্রভা আছে—
আজও সবাই ঊজ্জ্বল, সবই দীপ্ত।


লেখক পরিচিতি : ইয়াসেফ মোহাঃ রিয়ান
ইয়াসেফ মোহাঃ রিয়ান

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up