ভার

লেখক : প্রিয়াংকা রাণী শীল

দু’পাশে সবুজ ধানক্ষেত । তার মাঝে কাঁচা রাস্তা ধরে দৌড়ে যাচ্ছে একটি ছোট্ট মেয়ে। হাত দিয়ে বুকে বই চাপ দিয়ে ধরে রেখেছে। মেয়েটির মাথায় দুপাশে দুটো ঝুটি। সকালের মিষ্টি হাওয়ায় সবুজ ধানক্ষেতের সাথে সাথে তা দুলে যাচ্ছে ,যেনো একটি নীরব ছন্দ তৈরি হচ্ছে। মেয়েটি তা বড্ড উপভোগ করছে। পিছনে শাড়ি পরিহিত কেউ একজন বলছে ,” আস্তে আশা,আস্তে………”
-” না মা,দেরি হয়ে যাবে, যাই মা ,যাই…………” জোরে জোরে বলতে থাকে মেয়েটি।

বাইরের রান্না করার ঘর থেকে আশার বিড়বিড় করা শব্দ শুনতে পায় সুরাইয়া। ………”নাঃ,মেয়েটা আবারও স্বপ্ন দেইখতাছে।” বলতে বলতে সুরাইয়া রান্না বাদ দিয়ে আসে আশার কাছে। পাঁচ বছরের ছোট্ট আশা ঘুমিয়ে আছে আর বিড়বিড় করছে। সুরাইয়া মুখে হাসি রেখে মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ডাকলো,” আশা… উঠ মা, কত বেলা হইছে , দ্যাখ…” । আশা একটু নড়ে উঠে।  “উঠ মা, উঠ……” সুরাইয়া তাগাদা দেয়।   আশা এবার তার ছোট্ট , নরম দুটো হাত দিয়ে চোখ দুটো ঢলতে ঢলতে উঠে বসে।

সুরাইয়া জিজ্ঞেস করে, “কিরে মা, স্বপ্ন দেইখতেছিলি……।” অাশা তার নরম তুলতুলে গালে হাসি আনে।বড্ড মায়া লাগে সুরাইয়ার তখন। মেয়েকে কোলে নিয়ে ঘর থেকে বের হয় সুরাইয়া। উঠোনের কল পাড়ে গিয়ে আশার হাত মুখ ধুইয়ে দেয়।
-“নে মা, এবার চা দিয়ে দুটো মুড়ি খেয়ে নে……।” সুরাইয়া তাগাদা দেয়।


: প্রতিটি লেখক ও পাঠকের নিকট আবেদন :

যেকোনও পত্রিকা বা ওয়েবজিনকে বাঁচিয়ে রাখার অন্যতম উপায় তার প্রচার এবং প্রসার। 

তাই শুধু লেখা পাঠিয়ে বা পড়ে নিজের দায় ঝেড়ে ফেলবেন না, লেখাগুলি বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে ও বিভিন্ন গ্রুপে শেয়ার করে আমাদেরকে সাহায্য করুন।


আশা মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে।পরক্ষণে বলে,”মা……, স্কুলে যামু না?”সুরাইয়া এতক্ষণ এই প্রশ্নের অপেক্ষা করছিলো। প্রতিদিন সকালে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। না দিয়ে উপায়ও নেই। সে নিজেই যে আশার মনে স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন বুনে দিয়েছে।

সুরাইয়াকে চুপ থাকতে দেখে আশা তার মায়ের শাড়ির আঁচল ধরে টান দিয়ে বলে, ” কি রে মা, তুই চুপ ক্যান?”

সুরাইয়া যেন সম্বিত ফিরে পেল। তারপর হাসতে হাসতে মেয়ের মুখে চুমু দিয়ে বলল,” ওরে আমার পাগলি, স্কুলে যাইবো!………আর কয়টা দিন পরে স্কুলে যামু।তোমারে ভর্তি করাই দিমু। তোমার বাবায় আইস্যা লক্।”

“কবে আইবো বাবায়?” সাথে সাথে প্রশ্ন করে আশা।

“আইবো, আইবো…………”

“কবে……?” জোর গলায় জিজ্ঞেস করে আশা।

সুরাইয়া কিছু বলে না।প্রত্যেক বছর যখন বর্ষার মৌসুম শুরু হয় , তখন তার স্বামী দুই – তিন মাসের জন্য শহরে গিয়ে কাজকর্ম করে। এসময় সুরাইয়ার নামে চিঠি আর কিছু টাকা পোস্ট করতো সে। কিন্তু এবার দুই মাস হতে চললো কোন চিঠি আসে নাই।সুরাইয়ার সে ক্ষমতা নেই যে শহরে গিয়ে খোঁজ নেবে।আর সে তো জানেই না তার স্বামী শহরের কোন জায়গায় থাকে। হঠাৎ ” কি রে মা, তুই আবার চুপ হই গেলি!”  আশার  গলার আওয়াজে সুরাইয়া হকচকিয়ে ওঠে। মুখে হাসি এনে এরপর মেয়েকে বোঝানোর চেষ্টা করে।
” আইবো……সময় হইলেই আইবো………।” একটু ভেবে সুরাইয়া বলে, ” আইচ্ছা , আজকা স্কুল তুন আহনের সময় পোস্ট অপিসে গিয়া খোঁজ নিমু নে। তোমার বাবার কোন চিঠি আইসে কিনা…… খুশ………।” আশা এবার দাঁত দেখানো হাসি দেয়। সুরাইয়াও হাসে।

সুরাইয়া তাদের গ্রামের প্রাইমারী স্কুলে পরিষ্কার – পরিচ্ছন্নতার কাজ করে। স্কুল গেট দিয়ে যখন দুর-দুরান্ত থেকে ছেলেমেয়েরা ভিতরে ঢুকে, সুরাইয়া তাকিয়ে থাকে আর মনে মনে বলে ,”ইস!আশাও যদি এমন ভাবে স্কুলে আইবার পারতো।”  সুরাইয়া তাড়াতাড়ি স্কুলের দিকে রওনা দেয় আশাকে নিয়ে। কাজ করার সময় আশা স্কুলের উঠোনে খেলা করে।
স্কুল ছুটি হলে আশা সুরাইয়াকে তাগাদা দেয় পোস্ট অফিসে যাওয়ার জন্য।তাড়াতাড়ি মেয়েকে নিয়ে বের হয় সুরাইয়া। পোস্ট অফিসে গিয়ে খোঁজ নেয়। বসে থাকা একজন বয়স্ক লোককে জিজ্ঞাসা করে, “চাচা, আশার বাবার কোন কি চিঠি আইসে?”
“না, আসে নাই।” জবাব দেয় লোকটা।
আশার মন খারাপ হয়ে যায়। সুরাইয়া আশাকে লক্ষ্য করে। বড্ড খারাপ লাগে তার।পরে মুখে হাসি এনে বলে, ” চিন্তা করিস না মা, কাইল আবার আমু নে।”

আশা চুপ হয়ে থাকে। সুরাইয়ার দিকে তাকিয়ে বলে,” যদি কাইল ও চিঠি না আহে?”

সুরাইয়া নিরুত্তর।পরে বলে,” আইবো, আইবো,……।”

“যদি না আহে………আমি কি স্কুলে যামু না।”

সুরাইয়া আশার  চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। একটু পরে বলে, ” ক্যান যাবি না………যদি তোর বাবার চিঠি না আহে, তয় আমিই তোরে স্কুলে ভর্তি করাই দিমু। খুশ…………।”

আশা এবার দাঁত দেখানো হাসি দেয়।সেই হাসি যেন  সুরাইয়ার সব কষ্ট দূর করে দেয়।

রাতের বেলা বিছানায় মাকে জড়িয়ে ধরে আশা বলে,”মা, তুই আমারে স্কুলে ভর্তি করাই দিবি তো…………।”
“হুম।” সুরাইয়া আর কিছু বলে না।
বাড়িতে আসার পর আশা অনেক বার এই কথা জিজ্ঞেস করেছে। আর সুরাইয়া বার বার একই উত্তর দিয়েছে। আশা কিছুক্ষণ পর ঘুমিয়ে পড়ে। সুরাইয়া আশাকে ছেড়ে দিয়ে অন্য পাশে ফিরে । খোলা জানালায় রাতের আকাশ দেখা যায়। শত শত তারারা মিট-মিট করে জ্বলছে। সুরাইয়া চুপচাপ সেই দিকে তাকিয়ে থাকে। আর লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে ; মনে মনে ভাবে , সে কি পারবে — আশাকে স্কুলে ভর্তি করাতে ,  তাকে নিয়ে দেখা স্বপ্ন পূরণ করতে; আশাকে দেয়া কথা রক্ষা করতে……………?
আশা যে তার উপর বড্ড ভরসা করে আছে………।
সুরাইয়ার কাছে অবশ্যই এই ভার বড্ড আনন্দের কিন্তু পূর্ণ করা………! সেইটা সম্ভব কি?

 


লেখক পরিচিতি : প্রিয়াংকা রাণী শীল
আমি প্রিয়াংকা।জন্ম বাংলাদেশের চট্টগ্রামে। পড়াশোনা করেছি চট্টগ্রামেই। গল্প, উপন্যাস পড়তে ভালবাসি। আর ভালবাসি গল্প লিখতে। পড়াশোনা করা অবস্থায় স্কুল,কলেজ ম্যাগাজিনে তিনবার আমার লেখা গল্প ছাপানো হয়েছিল।বর্তমানে বাস করছি ইতালিতে। আমার লেখা গল্প পড়ে ভালো না খারাপ লাগলো তা জানালে অনেক বেশি ভালো লাগবে।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন
  •  
  •  
  •  
  •  

2 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

বিভিন্ন লেখকের কবিতা গল্প পাঠ শুনতে এখানে ক্লিক করুন

লেখালিখি লোগো