লেখক : শান্তিস্বরুপ চক্রবর্ত্তী
(১)
আমি টাটানগরে থাকি। সপ্তাহের শেষে শনিবারে বাড়ি যাই, ফিরি সোমবারে। এভাবেই জীবন চলে দিন থেকে মাস, আসে বছর। ট্রেনের কামরায় এক বৃদ্ধ সাধুবাবা গেরুয়া বসন পরে, হাতে একতারা নিয়ে গান গায়, কখনও বাংলা বাউল আবার কখনও বাংলার টানে হিন্দি বাউল। বাংলা উচ্চারণে পুরুলিয়ার বাংলার টান। ফি সপ্তাহেই সাধুবাবাকে দেখি, বাবাজী গানের শেষে জয়গুরু বলে সবার সামনে হাত বাড়ায়, আমি কখনও এক টাকা দিই আবার কখনও বা মুখ ফিরিয়ে নিই। আজও শনিবার, জানলার ধারে একটা সিট পেয়েছি, দু’পাশে দলমার পাহাড় শ্রেণী, শালের জঙ্গল, নদীর সলিলধারা দেখতে দেখতে ভাবনার রাজ্যে হারিয়ে গিয়েছি। ভাবনায় ছেদ পড়ল সাধুবাবার একতারার মূর্ছনায়।
আমি চাইনা হতে রাজা উজির,
নাইবা হ’লাম জমিদার,
আমার বাউল ঘরে জন্ম যেন,
হয়গো বারে বার।
গানের কথাগুলো মনটাকে ছুঁয়ে গেল। এই বাউল নামের প্রজাতিটি আজ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। বাবাজী “জয়গুরু জয়গুরু” বলে হাত বাড়াল, আমি দশ টাকা বাবাজীর হাতে দিয়ে চোখে চোখ মিলিয়ে হাসলাম। বাবাজী জয়গুরু বলে আশীর্বাদ করে এগিয়ে গেলেন। এভাবেই আসা যাওয়ার পথে সাধুবাবার সাথে পরিচয়।
একদিন বাবাজী বললেন, “বাবু কি টাটাতে থাকেন?”
আমি “হ্যাঁ” বলে জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনি কোথায় থাকেন?”
বাবাজী বললেন, “আমার আশ্রম গড়গোবিন্দপুরে।”
আমি: “সেটা কোথায়?”
বাবাজী: “জনারডি স্টেশনে নেমে পশ্চিম দিকে মাইল পাঁচেক হাঁটলেই গড়গোবিন্দপুর।”
আমি: “ওটা কি পশ্চিমবাংলা না ঝাড়খণ্ড?”
বাবাজী: “আগে ছিল পশ্চিমবাংলা, তারপর বিহার, আর এখন ঝাড়খণ্ড। তা বাবুর কী করা হয়?”
আমি: “পেটের দায়ে চাকরি করি, আর মনের দায়ে কিছু লেখালেখি করি।”
বাবাজী: “বাঃ, বেশ বললেন তো বাবু। তা আমার আশ্রমে একবার আসবেন, হয়ত ভাল লাগবে আপনার।” তারপর গান ধরলেন-
পরবাসী আমার মন
আমার নেই কোন আপনজন
আমি ঘুরে ঘুরে খুঁজে বেড়াই,
কোথায় আমার ভোলামন
ভবে আমার নেই কোন আপনজন।
(২)
জনারডি খুব ছোট স্টেশন, মোরাম বিছানো প্ল্যাটফর্ম, প্ল্যাটফর্ম থেকে নেমে লাইন পেরোলেই জঙ্গল। যখন নামলাম, তখন প্রায় চারটে। পশ্চিম দিক বুঝতে অসুবিধা নেই, সূর্য্য তখন পশ্চিমে ধাবমান। কিন্তু মনে একটু ভয় ভয় ভাব। গত দু’সপ্তাহ বাবাজীর সাথে দেখা হয়নি। আজকাল এসব জায়গাগুলো সম্বন্ধে ধারণা খুব একটা ভাল নয়, মাওবাদী এলাকা বলে পরিচিত।
ষ্টেশনে একজন আদিবাসী লোককে জিজ্ঞাসা করলাম, “হ্যাঁ গো, গড়গোবিন্দপুর কোনদিকে যাব?”
লোকটা বলল, “ঐ রাস্তা ধরে মাইল পাঁচেক হাঁটলেই গড়গোবিন্দপুর।”
“ওখানে একটা আশ্রম আছে, ওখানে যাব।”
“বলরাম ঠাকুরের আশ্রম, যাকে পুছবেন বলে দেবে। ঠাকুরকে সবাই জানছে।”
আমি মোরামের রাস্তা ধরে হাঁটছি, দুপাশে ঘন জঙ্গল, চেনা অচেনা গাছ, বড় বড় শাল, মোল ও বহড়ার গাছ, মাঝে মাঝে পিয়াল ও হরীতকী গাছ, জঙ্গল আরও ঘন হচ্ছে, মোরামের রাস্তা শেষই হচ্ছে না। আমার ভীষণ ভয় করছে, মনে মনে ভাবছি যদি মাওবাদীরা পুলিশের লোক ভেবে ধরে নিয়ে যায়, কিংবা পুলিশ মাওবাদী ভেবে ধরে। এভাবে হুট করে না এলেই ভাল হত। আরও জোরে জোরে পা চালাচ্ছি। বেশ কিছুটা হাঁটার পর দেখি বাঁ দিকে একটা রাস্তা চলে গেছে। আমার মাথা পুরো গুলিয়ে গেছে, কেউ কোথাও নেই। এখন কোন দিকে যাই ভাবছি, হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন ডাকছে, “ও বাবু, দাঁড়ান।” তাকিয়ে দেখি বাবাজী হাঁপাতে হাঁপাতে আসছে।
আমি: “কী ব্যাপার, আপনি?”
বাবাজী: “এত জোরে হাঁটছেন যে দৌড়তে দৌড়তে হাঁপায় গেলাম, একটু আস্তে আস্তে চলুন আমার সঙ্গে।”
আমি: “তা আপনি কোথায় গিয়েছিলেন?”
বাবাজী: “আমার তো ঘুরে বেড়ানো কাজ, গেছলাম পাতাজুড়ি, কালির ব্যাটাটার খুব জ্বর। ইখানে আবার ডাক্তারও নাই, তাই কিছু দাওয়াই দিয়ে এলাম।”
আমি মনে মনে ভাবছি, উনি তো অদ্ভুত মানুষ। একদিকে ট্রেনে ভিক্ষা করেন, আবার মানুষের সেবা করেন সেই ভিক্ষার টাকাতে। আমার মনে এখন আর ভয় নেই, তবে ভক্তির উদয় হচ্ছে। সেদিন ট্রেনে দশ টাকা দিয়ে যে গর্বটুকু অনুভব করেছিলাম, তা মূহূর্তে চুরমার হয়ে গেল।
বাবাজী: “কী হল বাবু, আর বেশি দূর নাই, এসে গেছি মোটামুটি।”
একজন লোক উল্টো দিক থেকে সাইকেলে আসছিল, ঠাকুর তাকে জিজ্ঞাসা করল, “ও ফনি, ই অবেলায় কুথায় যাবি আবার?”
ফনি দাঁড়িয়ে বলল, “এই যে ঠাকুর ছেলাটা পড়তে গেছে, এই ট্রেনটাতে নামবেক, তাই আনতে যাবখন।”
বাবাজী: “যা যা, তাড়াতাড়ি যা।”
সূর্য্য পশ্চিমে অনেকটাই নেমে গিয়েছে, একটু দূরে একটা ছোট নদীর ধারা চিক্ চিক্ করছে পশ্চিমের পড়ন্ত আলোয়। শরৎ আসি আসি, তাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাশফুল হাওয়ায় দুলছে, একটু দূরে দেখা যাচ্ছে কয়েকটা ঘর, জঙ্গলটা একটু হালকা হতে শুরু হয়েছে।
আমি বললাম, “আর কতদূর?”
“ঐ যে কুচকি নদী, ঐ নদীটার ধারেই আমার আশ্রম বাবু।”
কুচকি নদী, জঙ্গলের মাঝে ছোট গ্রাম গড়গোবিন্দপুর, কালো কালো সরল সাদাসিধা মানুষ, ছোট ছোট সাদামাটা ঘর, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। মনে হচ্ছে, আমি যেন বিভূতিভূষণের আরণ্যকের কোন গ্রামে এসে গিয়েছি।
একটা ঘরের পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলরাম ঠাকুর ডাকল, “ও বংশী?”
বংশী: “এলে ঠাকুর, আমি আসছি, তুমি চল।”
বাবাজী: “আয় আয়, বাবু এসেছে শহর থেকে।”
বংশী ঘর থেকে বেরিয়ে এল। আমার সাথে চোখাচোখি হতেই ও ঠাকুরের দিকে তাকিয়ে বলল, “চল ঠাকুর।”
বলরাম ঠাকুরের আতিথেয়তা নিখাদ। আশ্রমের চারদিকে বাঁশের কঞ্চি কেটে বেড়া দেওয়া, ভিতরে তুলসী গাছের বাগান, তার মাঝখানে রকমারি ফুলের গাছ, বেশিরভাগ জঙ্গল থেকে তুলে আনা চেনা-অচেনা ফুল গাছ। বাতাসে বুনো ফুলের হালকা গন্ধ। সামনে একটু দূরে ক্ষীণ স্রোতা বয়ে যাওয়া কুচকি নদী, নদীর দু’ধারে শাল গাছ, অর্জুন গাছ। আশ্রমের ডান দিকে একটা হরীতকী গাছ। এত মনোরম আশ্রম আমি জীবনে দেখিনি। ছোটবেলায় স্কুল যাওয়া আসার পথে গৌর সাধুর আশ্রমে ঢুকে অনেক আম চুরি করেছি। কিন্তু এ যেন কোন মুনির আশ্রমে হঠাৎ ঢুকে পড়েছি।
কিন্তু বলরাম ঠাকুর মুনিদের মত আদৌ নন, লম্বা কাঁচা পাকা চুল, মুখভর্তি সাদা কালো দাড়ি, রোদে পোড়া গায়ের রং, মেদহীন শরীর, ঠিক যেন গ্রামের ঘরে ঘরে ভিক্ষা করা এক অতি সাধারণ সাধু।
বাবাজী: “বাবু, আপনি বসুন ওই দাওয়ার উপরে খাটে, আমি নদী থেকে একটু আসছি। বংশী ইখানে সব জানে, ওই আমার অন্ধের লাঠি। আপনি ওর সঙ্গে কথা বলুন।”
আমি: “আসার সময় আমি একটা মুড়ির প্যাকেট এনেছি, যদি আপনার দেখা না পাই, সেই জন্য।”
বাবাজী: “ওটা আপনি বংশীকে দিয়ে দিন, বাকি ওই সব ঠিক করে দিবেক, আমি তাড়াতাড়ি আসছি।”
আমি একা বসে আছি খাটে, বংশী কিসব করছে খুটখাট আওয়াজে, কুচকি নদীর ওপার থেকে ধীরে ধীরে অন্ধকার হামাগুড়ি দিয়ে আসছে। শাল, আর্জুন আর আমলা গাছের হালকা হাওয়ায় শিরশির করছে শরীর।
আমি ডাকলাম, “বংশী,” ও কাছে এল। মুড়ির প্যাকেটটা হাতে দিয়ে বললাম, “আচ্ছা, ঠাকুর এখানে কতদিন আছেন?”
বংশী: “আমি তা জানি নাই বাবু, আমার জন্মের আগে থিকা, আমার বাবার সময় থিকা আছে ইখানে।”
আমি: “তুমি পড়াশুনা করো নাই?”
বংশী: “না বাবু, আমি ত পড়ি নাই, আমার ছেলা মেয়া দু’টা পড়তে যায়। পড়তে না পাঠালে ঠাকুর রেগে যায়। ঠাকুর বই খাতা সব আনে, আমাদের রোগ অসুখ করলে ঠাকুরই দাওয়া আনে। এই ধারেপাশের সব গেরামের মানুষগুলা ঠাকুরকে খুব মানে।”
আমি: “ঠাকুরের ঘর কোথায়, আর কেউ ঠাকুরের নেই?”
বংশী: “এইটাই ঠাকুরের ঘর। না আর কাউকে তো কোনদিন দেখি নাই। তবে আপনার মত বাবুরা কেউ কেউ আসে মাঝে মাঝে।”
কথার মাঝেই বংশী একটা হ্যারিকেন দিয়ে গেল দাওয়ায়। পরিষ্কার আকাশে জ্বলজ্বল করছে তারা, সারা জঙ্গলকে আরও রহস্যময়ী লাগছে। একটু পরেই ফিরে এল বলরাম ঠাকুর।
বাবাজী: “কী বাবু, কী ভাবছেন?”
আমি: “ভাবছি আপনার কথা, যদি না আসতাম আপনার আশ্রমে, তাহলে তো আপনাকে জানাই হত না। আপনি তো এখানকার মানুষের কাছে ভগবান, আমি ভগবানের মুখ থেকেই শুনতে চাই ভগবানের সৃষ্টির কথা, তাহলে আমার এখানে আসাটা সার্থক হবে। তবে যদি আপনার কোন আপত্তি না থাকে…”
বাবাজী: “আপনি ভুল করছেন। আমি ভগবান নই, সাধু নই, আর সন্ন্যাসীও নই বাবু। আমি একজন অতি সাধারণ মানুষ। আমারও দুঃখ আছে, যন্ত্রণা আছে, লোভ আছে, রাগ হয়, ভুলও হয়।”
আমি: “আপনি সাধু নন। তাহলে পরনে গেরুয়া, হাতে একতারা কেন?”
বাবাজী: “সব মানুষই তো নিজের সুবিধা মতন বেশ ধরে জীবনযাপন করে। আমিও তাই করছি, এতে আমার সুবিধা হয়।”
আমি: “আর সারাদিন অন্যের সামনে হাত পেতে পয়সা নিয়ে সেই পয়সাতে কারও রোগের ওষুধ কিনে দেওয়া, কারও ছেলের বইখাতা কিনে দেওয়া আগে কখনও দেখিনি, শুধু শুনেছিলাম।”
বাবাজী: “বাবু, ভাললাগার মোহের মধ্যেই এখনও চক্কর কাটছি। কোন তফাৎ নেই আর পাঁচজনের সঙ্গে আমার। সবাই ভাললাগার মোহের মধ্যে বাঁধা, এই ভাললাগাই আমাদের চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এর থেকে মুক্ত হওয়া খুবই মুশকিল বাবু।”
বংশী দু’টো বাটিতে করে মুড়ি নিয়ে এল, সঙ্গে গরম গরম বেগুনী। এ যেন স্বর্গে বসে অমৃত খাওয়া।
বাবাজী: “ও বংশী, তুইও খেয়ে বাবুর জন্য ভাল করে চা-টা কর।”
সন্ধে অনেকক্ষণ শেষ হয়েছে, গাছে গাছে জোনাকিরা জ্বলছে নিভছে, হাওয়াতে ঠাণ্ডার আমেজ। কুচকি নদীর বয়ে যাওয়ার শব্দ বাতাসে ভেসে আসছে। আমার মনে হচ্ছে, আমি যেন সময়যানে চেপে কয়েক যুগ পিছনে চলে এসেছি, আমার সামনের সবকিছু যেন অতীতের ছবি। আমিই মৌনতা ভাঙলাম, “আচ্ছা, আপনি কখন এসেছিলেন এখানে?”
বাবাজী: “তা প্রায় একচল্লিশ বছর আগে, তখন আমি এমএ ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি, স্কটিশচার্চ কলেজ থেকে অর্থনীতিতে গ্রাজুয়েশন করার পর। সালটা ১৯৭২।”
আমি হতবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “কেন? কি এমন হ’ল যে পড়া ছেড়ে দিলেন?”
বাবাজী: “একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম!”
আমি: “কী এমন স্বপ্ন দেখেছিলেন যে এখানে চলে এলেন? কোন মহাপুরুষের স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন?”
বাবাজী: “ঠিক তাই, তবে স্বপ্নাদেশ না বলে পথনির্দেশ বলা যেতে পারে। এই বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ সেই পথে চলতে চলতে একটা নূতন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছিল।”
বংশী এসে বলল, “ঠাকুর খাবার হয়ে গেছে।”
বাবাজী: “চলুন বাবু খেয়ে নিই। বংশীও খেয়ে ঘরে চলে যাবে।”
গরম গরম ভাত, আলুর দম, আলু পোস্ত, মসুরির ডাল – “ঠাকুর, এ যে অমৃতের স্বাদ! বংশী, কী দারুণ রান্না করেছ!”
(৩)
১৯৭১, পশ্চিমবাংলার তখন ডামাডোল অবস্থা। প্রশাসন বেসামাল। মানুষ অসন্তুষ্ট সরকারের উপর। নকশালবাড়ি ঘটনার পর থেকেই চলছে চাপা অস্থিরতা, মানুষ চাইছে আমূল পরিবর্তন, আর মানুষকে সেই পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে কমিউনিস্টপন্থীরা। এরই মধ্যে কমিউনিস্টরা দু’ভাগে ভাগ হয়েছে, মার্কসবাদীরা চাইছে ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে কমিউনিস্ট সরকারের প্রতিষ্ঠা, অন্যদিকে মার্কসবাদী-লেনিনবাদীরা বেছে নিয়েছে সশস্ত্র বিপ্লব, রুশ বিপ্লবের অনুকরণে। বিশ্বের মানুষের সাথে পশ্চিমবাংলার মানুষ দেখছে সমাজবাদের স্বপ্ন। কমিউনিজমের হাত ধরে সমাজবাদ আসছে – এই স্বপ্নে মানুষ বিভোর।
বিমল দে সশস্ত্র বিপ্লবে গভীর বিশ্বাসী, তবুও কোথাও যেন একটা সংশয়। মেসের ঘরে বসে একমনে পড়ছে মার্কসীয় অর্থনীতি, ও ঠিকমত মেলাতে পারছে না ভারতের বর্তমান অর্থনীতির পরিকাঠামোর সঙ্গে মার্কসীয় অর্থনীতিকে। ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে শহরের অর্থনীতির একটা বিশাল দূরত্ব, আবার এই দুই অর্থনীতির মধ্যে সামঞ্জস্য আনা কি এতই সোজা! দীপাবলী পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে, বিমলের কোন খেয়াল নেই। দীপাবলী বলল, “তুমি আজও কলেজে গেলে না?”
বিমল দীপাবলীকে দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “না। কী হবে কলেজে গিয়ে?”
দীপাবলী: “তুমি কি পাগল হয়েছ? ফার্স্টক্লাস পেয়ে বিএ পাস করে এখন এমএটা করবে না?”
বিমল: “আমার এমএ করা বা না করাতে সমাজের কি কোন লাভ হবে? কিন্ত সমাজবাদকে যদি আনতে পারি, তাহলে সমাজের বা মানুষের অনেক কিছু আসে যায়, দীপু।”
দীপাবলী: “এমএটা করার পর তুমি এসব চিন্তা করবে। তাছাড়া তোমার মা তো কত আশা করে তোমার এমএ পাশ করার উপর।”
বিমল: “যে অর্থনীতির সঙ্গে আমাদের জীবনের কোন মিল নেই, সমাজের সঙ্গে কোন সামঞ্জস্য নেই, সে অর্থনীতি পড়ে কি লাভ বলতে পারো?”
দীপাবলী: “তোমার মা তোমাকে নিয়ে একটা স্বপ্ন দেখে, সেটার কি কোন মূল্য নেই তোমার কাছে?”
বিমল: “আমাদের সমাজে কত মায়ের স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়, তাদের কে কতটা মূল্য দেয়?”
দীপাবলী: “তোমার যা ইচ্ছা হয় করো। কিন্তু বিমল, তুমি একটু সাবধানে থাকবে। তোমার উপর পুলিশের নজর আছে।”
বিমল: “আমার চেয়ে কত ভাল ভাল ছেলেরা হারিয়ে গেল, তাদের কথাটা ভাবো তো। এই সরকারের সঙ্গে কি ইংরেজ শাসনের খুব একটা তফাৎ আছে?”
দীপাবলী: “তুমি কিছুদিনের জন্য বাইরে চলে যাও। পরিস্থিতি একটু বদলালে এখানে ফিরবে।”
বিমল: “মৈনাকদা এখন জেলে। আমার উপর বেশ কিছু দায়িত্ব রয়েছে, এ অবস্থায় আমি পালাতে পারব না দীপু। আমাদের মেদিনীপুরের সংগঠন বেশ মজবুত। কিন্তু বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ার সংগঠনকে আরও মজবুত করতে হবে এবং যা যা দরকার তা খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে। কমিউনিস্টদের কিছু কমরেড আজ অন্য সুরে কথা বলতে শুরু করেছে, পুঁজিবাদী সরকারের সঙ্গে ভিতরে ভিতরে হাত মিলিয়ে ভোটে নামার জন্য তৈরী হচ্ছে। মৈনাকদার প্ল্যানমাফিক ভোটের আগেই আমাদের সংগঠনকে কিছু করতে হবে। মানুষের আস্থা আছে আমাদের উপর, কাজেই বিপ্লব সফল হবেই। তুমি এখন এস দীপু, আমার একটু তাড়া আছে।”
দীপাবলী মাথা নিচু করে মেস থেকে বেরিয়ে এল, সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে এক গভীর শূন্যতা তার সারা শরীরটাকে আচ্ছন্ন করে। শুনশান রাস্তা, কলকাতা শহরটা যেন ভয়ে কুঁকড়ে গিয়েছে। অন্ধকার রাস্তা, ভয়ে ভয়ে দীপাবলী হাঁটছে।
বিমল ভিতর থেকে দরজাটা বন্ধ করে। দু’টো প্যাকেট বের করে ঝোলার মধ্যে ভরে। ঝোলাটাকে কাঁধে নিয়ে উল্টোদিকের জানালাটা খুলে ফেলে। জানালা টপকে কার্নিসে পা রেখে দাঁড়ায়, আবার জানালাটাকে ঠিকমত লাগিয়ে পাইপ ধরে নিচে নামে। নিচের আলো সব নিভনো। নিচের ঘরগুলোও সব মেস। বাইরেটা নিঝুম। পিছনের দরজাটা খুলে বেরোলেই বাইরে একটা বড় ড্রেন। আস্তে আস্তে ড্রেনে নেমে যায় বিমল, এ রাস্তাটা তার খুব চেনা। ধীরে ধীরে নর্দমার ধারে ধারে হাঁটতে থাকে, দু’পাশে বস্তির ঘরগুলো থেকে মানুষের বর্জ্য পদার্থ ড্রেনের মধ্যে পড়ছে। বিমল হেঁটে চলছে এক নূতন আলোর সন্ধানে। কিছুদুর ড্রেনের মধ্যে হাঁটার পর উপরে উঠে আসে। ডানদিকে বস্তির গলিতে হাঁটতে থাকে। এ গলি ও গলি দিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটার পর একটা বস্তির ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে নিচুস্বরে আওয়াজ দেয়, “রশিদ।”
দরজা খুলে দেয় রশিদ, “আরে বিমলদা, এসো এসো।”
“হ্যাঁ রশিদ, মেসের হাওয়া একটু গোলমাল, তাই এখানে চলে এসেছি।”
“এসো এসো, ভিতরে এসো, দরজাটা বন্ধ করে দিই।”
“কাকিমা আছে?”
“হ্যাঁ, মা আছে ভিতরে। তুমি হাত-পা ধুয়ে নাও।” বলে ঘরের ভিতরের দিকে তাকিয়ে ডাক পাড়ে, “ও মা, বিমলদা এসেছে।”
বিমল একটু উঁচুস্বরে রশিদের মায়ের উদ্দেশ্যে বলে, “কাকিমা, মেসে খুব গোলমাল। তাই রশিদের সাথে পড়াশুনা করে দু’একটা দিন এখানেই কাটিয়ে দেব।”
“ও নিয়ে তুমি একদম চিন্তা করো না বিমলদা। তুমি এলে মা খুব খুশি হয়। এমনিতে আমাদের বস্তির ঘরে কেউ আসে না।”
ঝোলাটা ঘরের এক কোণে রেখে হাত-পা ধুয়ে নেয় বিমল। ঘরের মধ্যে একটা জীর্ণ মাদুরে বসে আস্তে ডাকে, “রশিদ।”
“হ্যাঁ, বলো বিমলদা।”
“রশিদ, তোকে একটা কাজ করতে হবে। এই ঝোলাটাতে কিছু জিনিস আছে, যা আমাদের কমরেডদের খুব দরকার। সেন্ট্রাল কমিটির নির্দেশ মত আমরা ভোটের আগেই বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে সমাজতান্ত্রিক সরকার গঠন করব। বিশ্বের বিভিন্ন কমিউনিস্ট সরকার আমাদের মর্যাদা দেবে। ধীরে ধীরে সারা ভারতবর্ষে এই আন্দোলন ছড়িয়ে দেব। রাশিয়া হয়ত আমাদের মর্যাদা না দিতে পারে, কারন আমাদের বর্তমান পুঁজিবাদী সরকার রাশিয়ার বশংবদ।”
“কিন্তু বিমলদা, রাশিয়া তো ভিতরে ভিতরে আমাদের যথেষ্ট সাহায্য করছে।”
“কিন্তু এই সময় আমরা চায়নার উপরে যতটা আস্থা রাখতে পারি, অতটা রাশিয়ার উপর পারি না। রাশিয়া এখন কমিউনিজমের মাধ্যমে সমষ্টিগত স্বৈরতন্ত্রকে কায়েম করার পথে। থাক এখন ওসব ভাবনা। এখন আমাদের ভাবতে হবে বিপ্লবের সাফল্যের কথা, তারপর ভাবব সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার কথা। এখন শোন, এই ঝোলাটা মেডিক্যাল কলেজের তমালের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। ওদের একটা টিম জেলা সংগঠনকে মজবুত করতে জেলা সফরে যাচ্ছে। আজ রাত্রে কেওড়াতলা শ্মশানে তমাল আর প্রসূন আসবে। পারবি তো রশিদ?”
“নিশ্চয়ই পারব বিমলদা। পারব না বলে কোন শব্দ আমার অভিধানে নেই।”
“ভেরি গুড, কমরেড। আগে বড়হো।”
“বিমলদা, তুমি কিন্তু একটু সাবধানে থেকো। তোমার উপর পুলিশ খুব নজর রাখছে, ওরা তোমাকে ধরার জন্য মরিয়া। জানো বিমলদা, মানুষ কিন্তু বুঝে গিয়েছে, এই সরকার এক সময় ইংরাজদের দালালি করেছে, আর এখন পুঁজিবাদদের দালাল।”
“হ্যাঁ রশিদ, এই বাংলা থেকেই শুরু হবে আর একটা নূতন যুগের, সমাজতান্ত্রিক ভারতবর্ষের পথপ্রর্দশক হবে এই বাংলা। শুধু মানুষ থাকবে, জাতিভেদ, উঁচু-নিচু, গরীব-বড়লোক বলে কিছু থাকবে না। আমাদের এখন আনেক কিছু করতে হবে রশিদ।”
সংগঠনের সামনে পদে পদে বাধা, কলকাতায় থেকে কাজ করা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে দিন দিন। একদিন বিমল খুব বেঁচে গেছে ধরা পড়তে পড়তে। পুলিশ টের পেয়েছে দীপাবলী মাঝে মাঝে দেখা করে, দীপাবলীর উপর নজর রাখছে পুলিশ। গতকাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের হস্টেল থেকে কয়েকজন ছাত্রকে তুলে নিয়ে গিয়েছে পুলিশ, তাদের কোন হদিশ নেই। বিমলের কলকাতা থেকে বের হওয়া খুব মুশকিল, কিন্তু বেরোতেই হবে। রশিদও ধরা পড়ে গিয়েছে পুলিশের হাতে।
এক মুখ দাড়ি, পরনে লুঙি আর পাঞ্জাবি, মাথায় নমাজ পড়ার টুপি, মাঝরাত্রি, খিদিরপুর থেকে বিমল এসে পৌঁছল হাওড়া স্টেশনে। সঙ্গে আশাদুল নবী। আশাদুল দু’টো প্ল্যাটফর্ম টিকিট কেটে এনে একটা বিমলকে দিল, গন্তব্যস্থান অজানা। সামনে একটা দূরপাল্লার ট্রেন ছাড়ছে, বিমল চেপে বসল ট্রেনটাতে। বিমলের বুকটা ঢিপঢিপ করছে, নিঃশ্বাস পড়ছে ঘন ঘন, এক একটা পল কাটছে যেন এক একটা দিন। গার্ড সাহেবের হুইসল বাজল, এই ছাড়বে তাহলে। ট্রেন ছাড়ল, ধীরে ধীরে বাষ্পীয় ইঞ্জিনটা হুস হুস করতে করতে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে এল, বিমল একটা লম্বা নিঃশ্বাস ছাড়ল।
ট্রেন ছুটছে, দুপাশে ঘন জঙ্গল, সকাল হয় হয়, এমন সময় বিমলের ঘুমটা ভেঙে গেল। এত ভাল ঘুম অনেকদিন পর ঘুমোল। ঘুমের মধ্যে টুপিটা খুলে পড়ে গিয়েছে, খেয়াল নেই। কামরার দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল, আয়নাতে একবার মুখটা দেখে নিল নিজের। না, দাড়িগুলো ঠিকই আছে। একটা ছোট স্টেশনে দাঁড়িয়ে পড়ল ট্রেনটা, যাত্রীরা সবাই ঘুমিয়ে আছে। বিমল নামল ট্রেন থেকে, একটু পরে ট্রেনটা আবার চলতে শুরু করল, তারপর ধীরে ধীরে দূরে হারিয়ে গেল। বিমল দেখল স্টেশনের নাম জনারডি।
(৪)
আমি: “আজকের বলরাম ঠাকুর সেদিনের বিমল?”
বলরাম: “বিমল ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল, আর আমি হয়ে গেলাম গড়গোবিন্দপুরের বলরাম। বংশীর বাবা ভুবন থাকার জন্য একটু জায়গা দিয়েছিল, ওদের সাথেই লেগে গেলাম পাথর খাদানে জনমজুরের কাজে, মরদদের আট টাকা আর কামিনদের পাঁচ টাকা রোজ মজুরি। সন্ধেবেলায় কুচকি নদীর ধারে বসে দেখতাম, ওপাশ থেকে ধীরে ধীরে নেমে আসত অন্ধকার, মনে পড়ত মায়ের মুখখানা, দীপাবলী দাঁড়িয়ে আছে দূরের অন্ধকারে, সমাজতন্ত্র ঠিক যেন কুচকি নদীর জলে প্রতিবিম্বিত হয়ে কাঁপছে। নদীর পাড়ের ঐ আমলকী গাছটার নিচে বসে আপনমনে গান গাইতাম। একদিন মাও মারা গেল, সব টান শেষ হয়ে গেল। মৈনাকদা জেল থেকে ছাড়া পেয়ে, কমিউনিস্ট প্রার্থী হয়ে ভোটে জিতে দু’বার মন্ত্রীও হয়েছিল। পশ্চিমবাংলায় কমিউনিস্ট সরকার চৌত্রিশ বছর রাজত্ব করল, কিন্তু কী পেয়েছে পশ্চিমবাংলার মানুষ? যেটুকু ছিল, সেটুকুরও তো শেষ অবস্থা। সারা পৃথিবীর মানুষের সমাজতন্ত্রের স্বপ্নটা এখন ভেঙে চৌচির হয়ে গিয়েছে। আজ সমাজতন্ত্র মানে পুঁজিবাদ আর স্বৈরতন্ত্রের মিলিত শাসন।”
আমি: “কিন্তু আপনি আর ফিরে গেলেন না?”
বলরাম: “ফিরে যাওয়ার আর কোন টান ছিল না মনে, রয়ে গেলাম এখানে এদেরই একজন হয়ে।”
গড়গোবিন্দপুরে তখন ভোর হয় হয়। আমি বললাম, “বলরামদা, সকালে একটা ট্রেন আছে। ওটাতেই আমি ফিরে যাব।”
বলরাম: “ঠিক আছে, আমি আপনাকে একটু এগিয়ে দিয়ে আসব।”
দুজনে পাশাপাশি হাঁটছি, মিষ্টি একটা গন্ধ বাতাসে ভাসছে, হালকা ঠাণ্ডা আমেজ। আমি বললাম, “আচ্ছা বলরামদা, দীপাবলীর আর কোন খবর পাননি?”
বলরাম: “কলেজ থেকে ফেরার সময় দীপাবলীকে পুলিশ একদিন তুলে নিয়ে গেল আমার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করার জন্য। তারপর আর দীপাবলীর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। পুলিশের খাতাতেও ওর নাম নেই!”
আমি স্পষ্ট দেখলাম, বলরামদার চোখদু’টো জলে চিক্ চিক্ করছে।
লেখক পরিচিতি : শান্তিস্বরুপ চক্রবর্ত্তী
আমি লিখতে ভালোবাসি, প্রকৃতির সানিদ্ধে আমি খুজেঁ পাই আমার সত্তাকে, খুজেঁ পাই আমার খুশির ইন্ধন, ভালো থেকো সবাই।

