কবিতা যখন জীবন

লেখক: রুবাই শুভজিৎ ঘোষ

।।১।।

“শুধু কবি হয়ে বেঁচে থাকা যায় না অনি!” বলল নীলা।
“কেন যাবে না? আর আমি তো সংগ্রাম করছি এর জন্য!” একটু থেমে আবার বলল অনীক, “আজও!”
কিন্তু কথাটা নীলার মনঃপূত হল না। সে এবার আগের থেকে একটু জোরেই বলল, “তুমি থাকো তোমার এই সংগ্রাম নিয়ে। আমি চললাম।” কথাটা বলে নীলা এগিয়ে যেতে গেল কিন্তু বাধা দিল অনীকের ডান হাতটা, যেটা এখন নীলার বাঁ হাতটাকে ধরেছে। নীলা ঘুরে দাঁড়াল অনীকের দিকে। অনীক বলল, “তুমি এরম বলতে পারলে নীলা?”
“তাহলে কি বলব বলো?” নীলার মুখে কোনও হাসি নেই। নিজের হাতটাকে সে ছাড়িয়ে নিল অনীকের হাত থেকে।
“তুমি পাশে না থাকলে আমি যে ভেঙ্গে পড়ব।” অনীকের গলায় অনুনয়ের সুর; কিন্তু সেটাকে আমল না দিয়ে নীলা বলল, “তোমার এত কবি হওয়ার ইচ্ছা, তা তুমি হও, সব কিছু ছেড়ে দিয়ে হও!” নীলার স্বরে রাগ বেশ স্পষ্ট। অনীকের দুচোখে অনুনয় আর আকুতি। কিন্তু সে সবের তোয়াক্কা না করে নীলা বলে চলল, “তোমার এই কবি কবি ব্যাপার রাখো তোমার কাছে! আমার আর এসব ভালো লাগে না!”
“নীলা!” একটা অস্পষ্ট আর্তনাদ বেরিয়ে এলো অনীকের গলা থেকে, কিন্তু সেটা নীলার কানে পৌঁছল না বোধহয়। নীলা তখন বলেই চলেছে একটানা, “সারাজীবনই তো কবি হব কবি হব করে লাফালে! কোনও ফল হল? হল না। সব কাজকর্ম ছেড়ে ছুড়ে দিয়েছ। আচ্ছা আমায় একটা কথা বলবে? গ্র্যাজুয়েশানটা করে কি করলে তুমি? যদি কবিই হবার ছিল, এতদূর পড়তে গেলে গেলে কেন? আর তাও একটা যদি বই বেরত মানতাম! বেরল? না! কেন? না প্রকাশকদের নাকি পছন্দ হচ্ছে না। তা হচ্ছে না যখন ছেড়ে দাও না। একটা ভালো চাকরির চেষ্টা কর না!”
“আমার ওসব ভালো লাগে না যে!”
“ভালো লাগবে কি করে? কবিতার ভূত মাথায় চেপে বসে না! অন্য কিছু সেখানে ঢুকলে তো ভালো লাগবে! একটা কথা বলবো তোমায়?”
“বলো!”
“আমারও না তোমায় আর ভালো লাগছে না!”
এর উত্তরে অনীক কিছু বলতে পারল না, শুধু ওর ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলল, “চাকরি পাবার পর তুমি বদলে গেছ নীলা!”
“সেটাই স্বাভাবিক নয় কি?” দৃঢ়স্বরেই জানাল নীলা, “আর তাছাড়া চাকরিটা তো তোমারই আগে পাওয়া উচিত ছিল। প্র্যাকটিকালি ভাবো তো! উচিত ছিল কি না?”
অনীকের মাথাটা নীচু হয়ে যায়, নীলা বলে চলে, “কিন্তু চাকরি দূরের কথা, তুমি আছো তোমার এই কবি হওয়ার সংগ্রাম নিয়ে! তা থাকো। আমি চললাম।”
“কিন্তু আমরা যে…” অনীকের কথা শেষ হবার আগেই নীলা বলল, “যবে তোমার সংগ্রাম শেষ হবে, তুমি কবি হয়ে যাবে, তোমার বই বেরোবে, আর সবথেকে বড় কথা যবে জীবন চালানোর মত একটা কিছু ব্যবস্থা করতে পারবে, তবে এসো আমার কাছে!”

কথাগুলো শেষ করে গটগট করে হেঁটে চলে গেল নীলা। অনীক কোনও বাধা দিল না এবার। বাধা দেবার কোনও যুক্তি তার কাছে নেই, কোনও শক্তি তার কাছে নেই। কিন্তু কিছুদূর গিয়ে থেমে গেল নীলা। তারপর এবার ফিরে এলো অনীকের কাছে। অনীক লক্ষ্য করল নীলার চোখে সেই রাগের ভাবটা আর নেই। অনীকের হাতটা ধরে যখন নীলা কথা বলল তখন তার স্বরেও কোনও রাগ নেই, বদলে আছে ভালবাসা, যে ভালবাসার স্বর এতদিন অনীক শুনে এসেছিল। চেনা নীলাকে পেয়ে আশ্বস্ত হল অনীক।
“দ্যাখো অনি! তুমি ভেবোনা আমি তোমার কবি হওয়ার পথের বাধা। আমিও চাই তুমি বড় কবি হও। কিন্তু এভাবে সব ছেড়ে দিয়ে না। তুমি কবিতা লেখো, ওটা তোমার শখ, জীবন নয়, জীবনের অংশমাত্র। কবিতা ছাড়াও তোমার একটা জীবন আছে। সেখানে আমি আছি। তুমি আমাদের কথা একবারও ভাবছ না? শুধু কবিতার কথাই ভাবছ?” একটু বিরতি নিল নীলা, তারপর আবার বলল, “শুধু কবি হয়ে বেঁচে থাকা যায় না অনি।”

অনীক কিছু বলল না। নীলা চলে গেল। অনীক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার চলে যাওয়া দেখতে থাকল। আগের মতই কোনও বাধা দেওয়ার শক্তি তার মধ্যে এলো না। নীলা যত দূরে চলে যেতে লাগল, অনীকের মনে হল তার জীবনটাও যেন ওভাবেই তার থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। দূরে চলে যেতে যেতে নীলার আকারটা ছোট হয়ে গেল, একসময় অনীকের দৃষ্টিকোণ থেকে মিলিয়ে গেল। তার মনে হল তার জীবনটাও কি এভাবেই মিলিয়ে যাবে হঠাৎ? সে কি এখন আত্মহত্যা করবে? না না! এ হতে পারে না। তাকে যে কবি হতে হবে! কিন্তু নীলা! নীলাকে ছাড়া সে বাঁচবে কি করে? অবশ হয়ে এতক্ষণ সে দাঁড়িয়ে ছিল, এবার আস্তে আস্তে বাড়ির দিকে পা চালাল। কিন্তু সারা রাস্তায় তার কানে নীলার বলা একটা কথাই বাজতে থাকল,“শুধু কবি হয়ে বেঁচে থাকা যায় না অনি।”
বাড়ি ফিরে এলো অনীক। আজ কিছু ভালো লাগছে না তার, সব কিছু কেমন মিথ্যে লাগছে। কফি হাউস, কলেজ স্ট্রীট, বিদ্যাসাগর উদ্যান, উত্তর কলকাতার আরও স্মৃতিগুলো সব ভেসে আসছে একে একে। কত স্বপ্ন বুনেছিল ওরা দুজনে, কত স্বপ্ন নীলা দেখিয়েছিল তাকে। সব পুরনো কথারা আজ মনে পড়ে যাচ্ছে, পুরনো স্মৃতিগুলো সব সে দেখতে পাচ্ছে স্পষ্ট। আর পারল না অনীক, ধীরে ধীরে চোখদুটো বন্ধ করল।

যখন চোখদুটো খুলল, তখন সেদুটো ছলছল করছে। একটা পেন আর পাতা নিয়ে এলো সে। তাতে জন্ম দিলো একটা কবিতার। কবিতাটা শেষ করে যখন নীচে নিজের সইটা করল, তখন আর তার চোখের জল চোখে রইল না, টপ করে সেই সইটার ওপর পড়ল। তার কাছে এটা শুধু একটা কবিতা না, তার নিজের হৃদয় থেকে নিংড়ে আনা একটা সত্য, একটা বাস্তব, যেটা এখনও সে মেনে নিতে পারছে না, আর তাই তো জলের একটা ফোঁটা তার চোখ থেকে নেমে এসেছে কবিতাটার ওপর।

এমন সময় তার ঘরে এসে ঢুকল তার বন্ধু ঋদ্ধিমান।
“কিরে অনি! কি করছিস?” বেশ জোরের সাথে বন্ধুকে সম্বোধন করেই দমে গেল ঋদ্ধিমান। দমে গেল বন্ধুর মুখের দিকে চেয়ে। অনীক যখন কোনও সাড়া দিলো না, তখন ঋদ্ধিমানের চোখ চলে গেল অনীকের হাতে ধরা কাগজটার দিকে। কাগজটা অনীকের হাত থেকে তুলে নিল সে। তারপর কাগজে লেখা কবিতাটা জোরে জোরে এক নিঃশ্বাসে পড়ে গেল ঋদ্ধিমান।

“যার কেউ নেই
তার ছিলে তুমি।
আজ কেউই নেই।
নেই সেই বিকেলবেলার সাক্ষাৎ,
নেই সেই শপথ আর প্রতিশ্রুতি,
আছে শুধু আঘাত।
সেই আঘাতে জর্জরিত আমি।
আজ নেই পাগল হওয়ার পাগলামি।
তোমার কোনও আবদারও আজ নেই।
থাকলেই কি রাখতে পারতাম আর?
কোনও কি সামর্থ্য আছে আজ আমার?
নেই। আজ কিছুই নেই।
ছিল আমার ডান হাতের কবজিতে
তোমার নখের দাগ।
আমার ওপর অনেক আগের তোমার সেই রাগ।
মনে পড়ে নীলা?
প্রকৃতি নিয়ম মেনে মুছে দিলো সেটাও।
আজ কোনও সম্ভাবনাও নেই
অতীতে ফিরে যাবার।
তুমিও যে ফিরে আসবে না আবার।
আমাকে স্বপ্ন দেখানোর আজ কেউ নেই।
একসাথে দেখা স্বপ্নেরা সব স্বপ্নরাজ্যেই।
আমি কি নিয়ে বলো বাঁচি?
আমার যে কেউ নেই।
যার কেউ নেই, তার ছিলে তুমি।
আজ যে কেউ নেই,
কেউ নেই, নীলা!”

।।২।।

এরপর কেটে গেছে চারমাস। কিন্তু বদলায়নি পূর্বে দেখা সেই ঘরের চেহারা আর সেই ঘরে অনীকের অবস্থানটা। একই চেয়ারে বসে আছে সে, যেখানে যে চেয়ারটাতে চারমাস আগে বসেছিল। তবে তার চেহারায় পার্থক্য এসেছে অনেক। সবচেয়ে বেশি যেটা চোখে পড়ার মত, সেটা হল তার গালে অগোছালো ভাবে গজিয়ে ওঠা দাড়ি। অন্যমনস্ক ভাবে সে বসে আছে, আগের বারের মতই হাতে একটা পেন তার, কিন্তু পাতা নেই কোনও।

“কিরে অনি?”, ঋদ্ধিমানের ডাকে ঘুরে তাকাল অনীক, চোখে সেই উদাস দৃষ্টি।
ঋদ্ধিমান এবার উৎসাহ জোগানোর জন্য বলল ওকে, “সেই কবেকার দুঃখ নিয়ে এখনও পড়ে আছিস? নিজের জীবনে ফিরে আয় না এবার!”
“নীলাই তো আমার জীবন!” ঋদ্ধিমানের দিকে না তাকিয়েই বলল অনীক।
“আর কবিতা?” জিজ্ঞেস করল ঋদ্ধিমান, “যে কবিতার জন্য নীলা তোকে ছেড়ে চলে গেল? নীলা চলে যেতে যে কবিতার সঙ্গ নিয়ে বেঁচে আছিস তুই? সেই কবিতা তোর কে? সেই কবিতা তোর কি?”
ঋদ্ধিমানের দিকে এবার ঘুরে চাইল অনীক, “কবিতাও আমার জীবন রে! ওরা দুজনেই আমার জীবন। কবিতা ছেড়ে তো আমি চাকরি খুঁজতে পারব না। একদম পারব নারে!”
“এখন কে বলছেই বা চাকরি খুঁজতে?”
“নীলা!”
ঋদ্ধিমান কিছু বলবার জন্য মুখ খুলতে যায়, কিন অনীক বলেই চলে, “নীলাই বলেছিল এসব তো জীবন নয়, জীবনের অংশমাত্র। ঠিকঠাক জীবনযাপন করতে হলে আগে একটা চাকরি খুঁজতে হবে, খুঁজতেই হবে।”
“এসব পুরনো ক…”, আবারও ঋদ্ধিমানের কথা না শুনেই বলেই চলে অনীক, “নীলা বলেছিল আমি যেন কবি হয়ে ওর সাথে যোগাযোগ করি। তবে সঙ্গে একটা চাকরিও বড় দরকার জীবনযাপনের জন্য। কিন্তু কবিতা!” একটু উত্তেজিত হয়ে বলে অনীক, “হ্যাঁ কবিতা, কবিতাই আমার জীবন রে ঋদ্ধি!”, তারপর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে আবার বলল, “কিন্তু কিই বা হল? চাকরিও নেই, আর কবিতা? সে তো প্রকাশকদের পছন্দই হয় না!”
“কারণ সেগুলো হয়ত মনের খুব ভেতর থেকে লেখা হয়নি!” এবার মুখ খুলল ঋদ্ধিমান।
“মানে?”
“মানে আমি বলতে চাইছি নীলাকে নিয়ে এই চারমাসে যে লিখলি, নিজের তিল তিল আবেগ ঢেলে এতগুলো যে লিখলি, সেগুলো নিয়ে চ’ একদিন! দ্যাখ না প্রকাশকদের পছন্দ হয় কিনা!”

এতক্ষণ অনীক চেয়ারের পিছনদিকে মুখ করে বসেছিল। এখন সোজা হয়ে বসে বলল “নারে! ওগুলো নিয়ে যাব না! ওগুলোও যদি অন্যগুলোর মত বাতিল করে দেয়, তখন নিজেকে ঠিক রাখতে পারব না।”
হঠাৎ সোৎসাহে নিজের ডানহাতের চেটো দিয়ে বাঁ হাতের চেটোয় চাপড় মেরে ঋদ্ধিমান যেন লাফিয়ে ওঠে, “আমি জানতাম তুই ঠিক এই কথাটাই বলবি। তাই তোকে না জানিয়েই ওগুলো একজন প্রকাশকের কাছে নিয়ে গেছিলাম।”

চেয়ারে সোজাভাবে বসে থাকা অনীক সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে তাকায় ঋদ্ধিমানের দিকে, সেটা কয়েক সেকেন্ড। তারপরই টেবিলের নিচের ড্রয়ারটা খুলে দেখে সেটা ফাঁকা, “আমার কবিতাগুলো…”
“কাল জমা দিয়ে এসেছি…”
“মানে?”
“মানে আবার কি? কাল যখন আমি এলাম, তুই বাথরুমে ছিলিস । আমার সুবিধেই হল। ড্রয়ার থেকে ওগুলো বার করে সোজা জমা দিয়ে এলাম।” ঋদ্ধিমানের মুখে গর্বের হাসি।

অনীক একবার দেখে ঋদ্ধিমানের মুখের দিকে, একবার তার খোলা ড্রয়ারটার দিকে। ফাঁকা ড্রয়ারটা আবার দেখে রেগেমেগে ঋদ্ধিমানকে কিছু বলতে যায়, কিন্তু ঋদ্ধিমানের একটা কথায় তার সমস্ত রাগ উবে যায়। বদলে উড়ে আসে আনন্দ।
“তোর লেখাগুলো প্রকাশকের দারুণ পছন্দ! ওরা ছাপাতে চায়, আজ ওদের ওখান থেকেই আসছি আমি।”
নিজের কানকে যেন বিশ্বাস হয় না অনীকের! তার লেখা প্রকাশকদের পছন্দ হয়েছে, আর তাও হয়েছে তার বন্ধুর বুদ্ধিতে, নাহলে সে নিজে তো নিয়ে যেতই না লেখাগুলো।
দৌড়ে এসে ঋদ্ধিমানকে জড়িয়ে ধরে সে বলল, “আমি খুব ভেঙে পড়েছিলাম রে ঋদ্ধি! তাই ওগুলো নিয়ে যাওয়ার সাহস হয়নি আর! ওরা যদি আবার ফিরিয়ে দিত!”
ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে ঋদ্ধিমান বলে, “জানি রে!”
“তুই ওভাবে না নিয়ে গেলে হয়ত এখানেই পড়ে থাকত ওগুলো!”
“আসলে কি জানিস অনি!” নিজের বুক থেকে অনীককে আলাদা করে তার দু-কাঁধ নিজের দুই হাতে চেপে ধরে ঋদ্ধিমান বলল, “হয়ত যা মনের গভীর থেকে আসে না, তা কবিতা হয়ে ওঠে না কখনও! তাই হয়ত এতদিন যা লিখেছিস তা ভালো লেখা হলেও আসলে কবিতা হয়ে ওঠেনি কোনওদিন। কিন্তু যখন মনের চরম দুঃখ, মনের ভেতরকার সত্যি আবেগ নিয়ে এই কবিতা গুলো লিখলি, তা শুধু তোর ড্রয়ারবন্দী লেখা হয়ে থাকল না, ছুঁয়ে গেল প্রকাশকের হৃদয়। পাঠকেরও হৃদয় ছুঁয়ে যাবে দেখিস।”

।।৩।।

বেশ কিছুদিন পরের কথা। অনীক আর ঋদ্ধিমান কলেজস্ট্রীট মোড়ে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। বাস আসতে আজ বেশ দেরী হচ্ছে। অনীকের মুখে সেই আগের মত অগোছালো দাড়ি নেই, এমনকি নেই সেই হতাশার, দুঃখের প্রলেপও। অনীক এখন বেশ হাসিখুশি। তার পরনে পাঞ্জাবী, কাঁধে ঝোলাব্যাগ। একটা ট্রাম আসতে তাতেই উঠে পড়ল দুজনে। কিন্তু তারপর কি মনে হল, অনীক ঋদ্ধিমানকে বলল “তুই বাড়ি যা। আমি বাড়ি ফিরে তোকে ফোন করছি”।
“কিন্তু…” ঋদ্ধিমান কিছু বলবার আগেই ট্রাম থেকে নেমে গেল অনীক।
ঋদ্ধিমানও নামতে যাচ্ছিল, অনীক তাকে বাধা দিল। ট্রাম থেকে নেমে গেল অনীক।
“তোকে আমি ফোন করে নেবো” হাত তুলে চেঁচিয়ে ঋদ্ধিমানকে বলল সে কথাটা। ট্রাম আস্তে আস্তে চলে যায়। অনীক অপেক্ষা করে খানিকটা। তারপর রাস্তা পার হয়ে আসে, চলে আসে সে কফি হাউসের নীচে।

কফি হাউসে উঠে এসে একটা নির্দিষ্ট টেবিলের দিকে এগিয়ে যায় সে। সেই টেবিলে একটাই চেয়ার। সেখানে একটা মেয়ে অনীকের দিকে পিছন করে বসে আছে।
“নীলা!” অনীকের গলার ডাকে মেয়েটা পিছন ফিরে চায়। যেন তারই অপেক্ষায় বসে ছিল সে। আসলে অনীক আর নীলা দিনের এই বিশেষ সময়টায় এখানে এসে আড্ডা দিত একসময়। নীলা আজও এখানে একা একা বসে থাকে কাজের শেষে। জানে অনীক আসবে না, সে নিজেই এ পথটা বন্ধ করে দিয়েছে, কিন্তু তার ভালবাসা তো আর কমেনি। তাই সে অপেক্ষা করে আজও। আসলে সে অনীককে আরও শক্ত করে তুলতেই ঐ পদক্ষেপটা নিয়েছিল। কিন্তু আজ অনীককে দেখে তার সব সাজানো যুক্তি ভেঙে গেল, চোখে জল চলে এল তার।
“কেমন আছ তুমি?” জিজ্ঞেস করল অনীক।
নীলা কিছু বলবার জন্য ঠোঁট খুলল, কিন্তু কথা ফুটল না তার দুই ঠোঁটে, কারণ সেই ঠোঁট যে আজ কাঁপছে।
“সেদিন যদি তুমি ওভাবে চলে না যেতে…” অনীক পুরো কথাটা শেষ করার আগে নীলা ক্ষমা চাইবার জন্য মুখ খোলে এবার, “সেদিনের জন্য আমি…” কিন্তু তাকে কথা শেষ করতে দেয় না অনীক, মাঝপথে তাকে থামিয়ে বলে, “তাহলে হয়ত এটা সম্ভব হত না।”
তারপর কাঁধের ঝোলাব্যাগ থেকে  একটা বই বার করে নীলার হাতে তুলে দেয় সে। নীলার মাথাটাকে দুহাতে চেপে ধরে অনীক বলে, “তোমায় আমি ভালবাসি নীলা। কিন্তু কবিতা আমার জীবন। ওর থেকে বেশি আমি কাউকে ভালবাসি না। ওকে ছাড়া আমি বাঁচব না। আর তুমি সঙ্গে থাকলে হয়ত আসল কবিতা আমি লিখতে পারব না। আমি আসি। আমায় ক্ষমা করে দিও নীলা।”

অনীক চলে যায়। নীলা তাকে বাধা দিতে গিয়েও পারে না। অনীকের কথা বুঝতে প্রথমে নীলার সময় লাগে কিছুটা। বোঝার পর তাকে ডাকতে যায় নীলা, “অনি!!” কিন্তু নীলার ডাক পেরিয়ে অনীক তখন সিঁড়িতে পা রেখেছে। নীলা উঠে তাকে ডাকতে গিয়েও তাকে ধরতে পারে না। ততক্ষণে সে এগিয়ে গেছে অনেকটা। নীলা ফিরে আসে টেবিলে। অনীকের দেওয়া বইটাকে তুলে নেয় হাতে। সুন্দর প্রচ্ছদে বড় করে লেখা “তোমার অভাবে”, নীচে কবির নাম “অনীক ভট্টাচার্য”।


লেখকের কথা: রুবাই শুভজিৎ ঘোষ
লেখকের জন্ম পশ্চিমবাংলায়। পেশায় একটি বহুজাতিক সংস্থার তথ্যপ্রযুক্তিবিদ। নেশায় লেখক এবং পরিচালক। বাঙালির জনপ্রিয় ওয়েবসাইট সববাংলায় এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। কবিতা থেকে শুরু করে গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, চিত্রনাট্য সবকিছুই লিখতে ভালবাসেন। লিটিল ম্যাগাজিন থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক বিভিন্ন ম্যাগাজিনে নিয়মিত লিখেছেন। স্রোত থেকে প্রকাশিত তাঁর কবিতার সংকলন দৃষ্টি এবং বালিঘড়ি। এছাড়া তথ্যচিত্র, শর্ট ফিল্ম বা অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের ভিডিও পরিচালনা করেন। ধর্ম এবং বিজ্ঞান তাঁর প্রিয় বিষয়। ভ্রমণ তাঁর অন্যতম শখ। অন্যান্য শখের মধ্যে রয়েছে স্কেচ, ফটোগ্রাফি, ছবি ডিজাইন করা।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।