মুহূর্তের খনি

লেখক : মোঃ মাসুম মুসাফিক

‎আরিয়ান স্কুল জীবনকে হালকাভাবে নিত। সে ক্লাসে বসলেও মনোযোগ তার বইতে নয়, বরং কল্পনার জগতে। কখনও কখনও সে নিজের বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে দৌড়ঝাঁপ, ফুটবল বা ক্রিকেটের দিকেই মনোযোগ দিত। ‎স্কুলে শিক্ষিকার পড়ানো কোন বিষয় আরিয়ানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। সে ভাবত, “পরীক্ষায় পাস করব, কিন্তু খেলাধুলা না হলে কি আর জীবন আনন্দময় হবে?” তাই সে নিয়মিত ক্লাস ফাঁকি দিত। কখনও লাইব্রেরিতে যাওয়া তার পছন্দ ছিল না, বইয়ের পাতা উল্টানো তার কাছে সময় নষ্ট মনে হত। ‎আরিয়ানের বাবা-মা তাকে অনেক বার সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু আরিয়ানের মন তখনও ব্যস্ত ছিল বন্ধুদের সঙ্গে মজা করা এবং প্রতিদিনের খেলাধুলায়। সে ভাবত, “আজ পড়াশোনা বাদ দিলেও কিছু হবে না। কাল থেকে পড়া শুরু করব।”

‎কিন্তু আরিয়ানের এই অলসতা তার জীবনে প্রথম বড় ধাক্কা আনার অপেক্ষা করছিল। ‎পরীক্ষার ফলাফল দেখে আরিয়ানের পুরো জীবন যেন থমকে গেল। সে যতটা ভেবেছিল, ফলাফল ততটা ভাল নয়। তার নামের পাশে লাল মার্কের সংখ্যাগুলো তাকে ধাক্কা দিল। ফলাফলের কাগজ হাতে ধরে সে হতবাক।
‎“আমি তো ঠিকই পড়েছিলাম… কিন্তু কেন এত খারাপ?” আরিয়ান নিজেকে প্রশ্ন করল।
‎বন্ধু রিফাত, যে সবসময় মনোযোগ দিয়ে পড়ে এবং সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহার করে, তার পাশে এসে দাঁড়াল। “আরিয়ান, তুমি জানো না সময় কত মূল্যবান। তুমি যদি সময়ের সদ্ব্যবহার কর, তাহলে দেখবে ফলাফল একেবারে ভিন্ন হবে।”
‎তারপর মিসেস তাসনিম, আরিয়ানের শ্রদ্ধেয় শিক্ষিকা, তাকে কড়া কিন্তু ভালবাসার সঙ্গে সতর্ক করলেন। “আরিয়ান, এই ফলাফল শুধু একটা সংখ্যা নয়। এটা তোমার পরিশ্রম ও সময়ের প্রতিফলন। তুমি যদি এখনই সচেতন না হও, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় ক্ষতি হবে।”
‎আরিয়ান কিছু বলল না। তবে ভেতরে তার মনে এক অজানা অনুভূতি জন্মলাভ করল—লজ্জা, হতাশা, কিন্তু সঙ্গে একটি ক্ষুদ্র আশাও। সে বুঝল যে তার সময় সত্যিই অপচয় হয়েছে এবং এখনই কিছু করা দরকার।

‎পরের দিন থেকে আরিয়ান ছোট ছোট পরিকল্পনা শুরু করল। সকালে ঠিক সময়ে উঠে পড়তে বসার চেষ্টা করল, ক্লাসে মনোযোগ দেওয়া শুরু করল। ফাঁকা সময়ে শুধু বন্ধুর সঙ্গে খেলাধুলাই নয়, বরং বই পড়া ও নোট তৈরি করাও অন্তর্ভুক্ত করল। ‎সে রিফাতের কাছ থেকে পড়ার কৌশল শিখল। যেমন, ছোট ছোট সময় ভাগ করে পড়া, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর বেশি মনোযোগ দেওয়া, এবং রাতে যথেষ্ট ঘুম নিশ্চিত করা। প্রতিদিনের ছোট লক্ষ্যগুলো পূরণ করা আরিয়ানের জন্য নতুন অভ্যাসে পরিণত হল।
‎প্রথম প্রথম দিনগুলো কঠিন লাগলেও, আরিয়ান বুঝল, যখন সময়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তখন ছোট ছোট কাজও বড় ফল নিয়ে আসে। তার মনেও একটা নতুন আশা জন্মলাভ করল, “যদি আজ আমি সচেতন থাকি, তবে আগামীকাল ফলাফল স্বপ্নের মত ভাল হবে।”

‎আরিয়ান এখন সত্যিই পরিবর্তিত। সে বুঝেছে, শুধু সচেতন হওয়া যথেষ্ট নয়—পরিশ্রম করতে হবে, কঠোর পরিশ্রম। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে উঠে ক্লাসে মনোযোগসহকারে অংশগ্রহণ করল। ‎স্কুলের লাইব্রেরিতে আরিয়ান আরও বেশি সময় কাটাতে শুরু করল। নতুন নতুন বই পড়ল, নোট তৈরি করল, এবং আগের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিল। সে দেখল, যে বিষয়গুলো আগে বেমালুম মনে হত, এখন সেই বিষয়গুলো বোঝা সহজ হচ্ছে। ‎বন্ধুদের সঙ্গে খেলার সময়ও এখন পরিকল্পিত। সময় ভাগ করে খেলাধুলা আর পড়াশোনা—দুইয়েরই ভারসাম্য রক্ষা করছে। রিফাতও তার পাশে আছে, প্রেরণা দিচ্ছে এবং দু’জন একে অপরকে সাহায্য করছে। ‎আরিয়ান ধীরে ধীরে উপলব্ধি করল, পরিশ্রমের মধুর ফল কখনও বিফল হয় না। তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান, আর সে আর কখনই সময়কে অপচয় করতে চায় না। ‎ধীরে ধীরে তার আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল। সে জানল, পরিশ্রম করলে ফলাফল নিশ্চিত, আর সেই বিশ্বাস তাকে আরও শক্তি দিচ্ছে। ‎পরবর্তী পরীক্ষার ফলাফল এল। আরিয়ানের হৃদয় দ্রুত ধড়ফড় করছিল। সে জানত, এবার তার পরিশ্রমের সঠিক ফলাফল পাওয়া উচিত।

‎ফলাফল খোলার পর আরিয়ান নিজেই অবাক। তার নামের পাশে এবার সবুজ মার্কের সংখ্যা—আগের লাল মার্কগুলো পুরোপুরি পাল্টে গেছে। ক্লাসের অনেক বন্ধু, শিক্ষিকা এবং বাবা-মা সবাইকে আনন্দিত করে, আরিয়ানের চোখে আনন্দের ঝিলিক দেখা গেল। ‎বাবা-মা গর্বিত হয়ে বললেন, “আরিয়ান, আমরা জানতাম তুমি চেষ্টা করলে সফল হতে পারবে। তোমার পরিশ্রম সত্যিই ফলপ্রসূ হয়েছে।”
‎আরিয়ান নিজের ভেতর থেকে একটা শান্তি অনুভব করল। সে বুঝল, যে সময়কে সে আগে অবহেলা করত, সেই সময়ের সদ্ব্যবহার করলেই জীবনে সাফল্য আসে। ‎তার বন্ধু রিফাতও আনন্দিত। “দেখেছ, আরিয়ান? সময়ের মূল্য বোঝা আর নিয়মিত পরিশ্রম—দুইটি মিললেই এই ফলাফল আসে।”
‎আরিয়ান হাসল। তার মনে আত্মবিশ্বাস জন্মাল। সে জানল, ছাত্রজীবনে সময়ের সঠিক ব্যবহারই জীবনের সাফল্যের চাবিকাঠি।

‎আরিয়ান নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝল, ছাত্রজীবনের সময়ই সবচেয়ে মূল্যবান। ছোটবেলায় যতটা সময় সে অবহেলা করেছিল, তার জন্য সে শিক্ষা পেয়েছে। আর এখন সে নিজের জীবনকে সঠিক পথে ব্যবহার করতে পারছে। ‎সে শুধু নিজেকে বদলায়নি, অন্যদেরকেও প্রেরণা দিচ্ছে। বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করল, তাদের শেখাল কীভাবে সময়কে পরিকল্পনা করে ব্যবহার করা যায়। ক্লাসের ছোটদের জন্য সে নোট তৈরি করল, পড়াশোনার টিপস দিল। ‎আরিয়ান জানতে পারল, সাফল্য আসে পরিশ্রম, ধৈর্য এবং সময়ের সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে। আর যেই মূল্যবান সময়কে নষ্ট করা হয়, তা আর ফিরে আসে না। ‎শেষের দিকে আরিয়ান নিজেকে প্রতিজ্ঞা করল, “আমি আমার সময়কে কখনই অপচয় করব না। প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে নিজের জীবনকে সুন্দর ও সফল করব।”

‎এভাবেই আরিয়ান শিখল, ছাত্রজীবন শুধু বইয়ের জ্ঞান নয়, সময়, দায়িত্ব এবং পরিকল্পনার শিক্ষাও দেয়।


লেখক পরিচিতি : মোঃ মাসুম মুসাফিক
MD.Masum Musafik

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up