লেখক : প্রযুক্তিকা মিত্র
আমাদের সেই সময়ে পাড়াটার কোনো নামফলক নেই, পৌরসভার খাতায় কী নামে নথিভুক্ত, কেউ জানে না। ডাকপিয়ন শুধু জানে—“ওই বড় কদম গাছটার পরের গলিটা।” আর আমরা জানি, এটা আমাদের পাড়া। এই পাড়ায় সকাল আসে খুব ধীরে। সূর্য উঠলেও সবাই একসাথে জাগে না। কারও বাড়িতে তখনও রাতের স্বপ্ন লেগে থাকে, কারও বাড়িতে আবার গ্যাসে চাপানো পড়ে সকালের ডাল আর সব্জি। চা ফুটতে ফুটতে রাস্তায় প্রথম যে শব্দটা শোনা যায়, তা কোন পাখির ডাক নয়—একটা পুরনো সাইকেলের ঘণ্টা। সেই ঘণ্টা বাজিয়ে আসে হরেন কাকু। বয়স হয়েছে, হাঁটুর জোর কমেছে, কিন্তু সাইকেলটা তিনি ছাড়েননি। সাইকেলটা যেন তাঁর জীবনের শেষ পরিচয়। ওটার সামনের ঝুড়িতে থাকে কখনও সবজি, কখনও খবরের কাগজ, কখনও শুধুই বাতাস। হরেন কাকু কাউকে ডাকেন না, কিন্তু সবাই জানে—ওনার ঘণ্টা মানে সকাল শুরু।
পাড়ার মাঝখানে একটা বটগাছ। এত পুরনো, যে কেউ ঠিক করে বলতে পারে না—ওটা আগে ছিল, না পাড়া আগে ছিল। এই বটগাছের নিচেই সব সিদ্ধান্ত হয়। কোন পুজো হবে, কোন বিয়েতে কে রান্না করবে, কার বাড়িতে ঝামেলা হলে কে আগে যাবে—সব ঠিক হয় এই গাছটার ছায়ায়। বিকেলের দিকে এখানে বসেন ননী কাকিমা। তিনি একসময় স্কুলে পড়াতেন, এখন পড়ান না। কিন্তু পাড়া এখনও ওনার ছাত্র। কার মেয়ে কীভাবে কথা বলছে, কার ছেলে সন্ধ্যায় ফিরছে না, কার বউ খুব চুপচাপ—সব নজরে রাখেন। কেউ কেউ বলে, ননী কাকিমা খুব নাক গলান। কিন্তু যখন সত্যিই বিপদ আসে, সবার আগে তিনিই দাঁড়ান। একবার পাশের বাড়ির ছোট ছেলেটা হারিয়ে গিয়েছিল। মা কান্নায় ভেঙে পড়েছে, বাবা দিশেহারা। পাড়া তখন থমথমে। ননী কাকিমাই বলেছিলেন,“কাঁদলে হবে না। দুই দলে ভাগ হয়ে খুঁজতে হবে।” সেদিন সন্ধ্যায় গোটা পাড়া হাঁটছিল। কেউ রাস্তার ধারে, কেউ স্টেশনের দিকে। শেষে ছেলেটাকে পাওয়া গিয়েছিল—একটা খেলনার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে। সেদিন কিন্তু উনি বলেননি, “দেখলে, আমার কথায় হ’ল।” কিন্তু সেদিনের পর থেকে ননী কাকিমার কথা সবাই শোনে।
আমাদের পাড়ায় কিন্তু হাসিরও অভাব নেই। তার সবচেয়ে বড় কারণ শম্ভু। শম্ভু কোন কাজই ঠিকমত করে না, কিন্তু সব কাজ নিয়ে বেমালুম একটা গল্প বানিয়ে ফেলে, যেটা দিব্বি সত্যি বলে মনে হয়। সে একসময় কলেজে পড়ত, তারপর হঠাৎ পড়াশোনা ছেড়ে দিল, আর পড়েনি। বলেছিল, “নিজেকে খুঁজছি।” পাড়া আজও বুঝতে পারেনি, সে নিজেকে পেয়েছে কি না। শম্ভু সকালে বলে—আজ চাকরির ইণ্টারভিউ। বিকেলে বলে—মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছি। রাতে বলে—আসলে আমি ব্যবসা করব। তবু শম্ভুকে সবাই ভালবাসে। কারণ শম্ভু হাসাতে জানে। পাড়ায় ঝগড়া হ’লে, কারও মুখ ভার হলে, সে এমন এক কথা বলে বসে, যে হাসি চেপে রাখা যায় না। একদিন বিদ্যুৎ ছিল না। গরমে সবাই হাঁসফাঁস। শম্ভু বলল,“আরে এটা লোডশেডিং না, বিদ্যুৎও আজ আমাদের মত বিশ্রাম নিচ্ছে।” সেদিন কেউ গালি দেয়নি। সবাই হেসেছিল।
কিন্তু আমাদের পাড়া শুধু হাসির নয়। দুঃখও এখানে থাকে, খুব চুপচাপ।
পাড়ার শেষ বাড়িটায় থাকেন মীরা পিসি। স্বামী অনেক বছর আগে চলে গেছেন। ছেলে বিদেশে। বছরে একবার আসে, কখনও দু’বছরেও আসে না। মীরা পিসির ঘরটা সবসময় পরিষ্কার। জানালায় ধোয়া পর্দা, ফুলের টব যত্নে সাজানো। কিন্তু ঘরটা খুব নিঃশব্দ। বিকেলে তিনি জানালার ধারে বসে থাকেন। কী দেখেন, কেউ জানে না। হয়ত রাস্তা, হয়ত পুরনো সময়। পাড়ার সবাই জানে, দুপুরে যদি ওনার রান্নার গন্ধ না আসে, তাহলে নিশ্চয়ই শরীর ভাল নেই। সেদিন কেউ না কেউ চুপচাপ দরজায় কড়া নাড়ে। কেউ স্যুপ নিয়ে যায়, কেউ শুধু বসে থাকে। কেউ কিছু বলে না, কারণ কিছু বলার দরকার পড়ে না।
আমাদের পাড়ায় হইচই সবচেয়ে বেশি হয় পুজোর সময়। পাড়ার ছেলেমেয়েরা তখন আর ঘুমোয় না। চাঁদা ওঠে, বিতর্ক ওঠে, কে থিম করবে, কে করবে না—সব মিলিয়ে বিশাল কাণ্ড। একবার এমন হ’ল, থিম নিয়ে এত ঝগড়া, যে পুজোই হবে কিনা সন্দেহ। তখন হরেন কাকু বলেছিলেন, “থিম না হলেও চলবে। কিন্তু একসাথে না থাকলে পুজো হয় না।”
সেই বছর খুব সাধারণ পুজো হয়েছিল। কিন্তু মানুষ এসেছিল। কারণ ওখানে সাজ নয়, আত্মীয়তা ছিল।
এই পাড়ায় ঝগড়া হয়, কথা বন্ধও হয়। কিন্তু কেউ কাউকে একা ফেলে না।
একদিন বড় ঝামেলা হয়েছিল। দু’টো পরিবারের মধ্যে। চিৎকার, কান্না, দরজা বন্ধ। সেদিন রাতেও বৃষ্টি হচ্ছিল। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। অন্ধকারে কেউ বুঝতেই পারেনি, কখন দরজাগুলো আবার খুলে গেল। সকালে দেখা গেল, দু’ঘরের লোক একসাথে চা খাচ্ছে। কেউ জানে না, কীভাবে মিটল। কিন্তু পাড়া জানে—এখানে দুঃখ বেশিক্ষণ টেকে না।
আমি মাঝে মাঝে ভাবি, এই পাড়া আমাকে কী শিখিয়েছে? শিখিয়েছে—সব মানুষ ভাল নয়, কিন্তু মানুষের পাশে থাকা দরকার। শিখিয়েছে—হাসি খুব ছোট জিনিস, কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী। শিখিয়েছে—দুঃখ লুকোলে কমে না, ভাগ করলে কমে।
সেদিনটা শুরু হয়েছিল একদম অন্যরকমভাবে। আকাশটা সকাল থেকেই ভারী ছিল। রোদ উঠেছিল ঠিকই, কিন্তু আলোয় একটা অস্বস্তি ছিল—যেন কিছু একটা ঘটবে, কিন্তু কী, কেউ জানে না। দুপুরের দিকে হঠাৎ খবর এল—পাড়ার পাশের পুরনো বাড়িটার ছাদ থেকে একটা বড় অংশ ভেঙে পড়েছে। ওই বাড়িটা বহুদিন ধরেই খালি। একসময় সেখানে থাকত এক বিরাট পরিবার। ছেলে-মেয়ে, আত্মীয়, অতিথি—বাড়িটা কখনও চুপ থাকত না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবাই চলে গিয়েছে। শেষে থেকে গিয়েছিল শুধু দেয়াল আর স্মৃতি। ভাগ্য ভাল, ছাদ ভাঙার সময় বাড়ির ভিতরে কেউ ছিল না। কিন্তু ধুলো, ইট, শব্দ—সব মিলিয়ে পাড়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল।
মীরা পিসি প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। উনি দরজার ভিতর থেকে চেঁচিয়ে বলছিলেন, “কিছু হ’ল নাকি? আগুন লাগেনি তো?” ননী কাকিমা তখন ইতিমধ্যেই রাস্তায়। তিনি কাউকে ডাকছেন, কাউকে থামাচ্ছেন, কাউকে বলছেন—“ওখানে যেও না, এখনও বিপদ আছে।” হরেন কাকু তাঁর সাইকেলটা ফেলে রেখেই ছুটে এসেছিলেন। সাইকেলটা পড়ে ছিল রাস্তার ধারে, একটা চাকা তখনও ঘুরছিল। শম্ভু সেদিন আশ্চর্যভাবে চুপ। ওর মুখের হাসিটা নেই। সে শুধু ইটের ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে ছিল, যেন ওখানে নিজের ভবিষ্যৎটা দেখতে পাচ্ছে।
পাড়ার লোকেরা জড়ো হতে বেশি সময় লাগেনি। কেউ পুলিশে ফোন করল, কেউ পুরসভায়। কেউ আবার শুধু দাঁড়িয়ে রইল—কারণ সব সমস্যার সমাধান যে ফোনে হয় না, এটা সবাই জানে। বিকেলের দিকে বৃষ্টি নামল। প্রথমে হালকা, তারপর জোরে। ধুলো কাদা হয়ে গেল, ভাঙা ছাদের ভিতর থেকে জল চুঁইয়ে পড়তে লাগল। তখনই হঠাৎ শোনা গেল—কেউ ভিতরে আছে। একজন পুরনো মানুষ। পাড়ারই লোক, কিন্তু অনেকদিন ধরে ওই খালি বাড়ির একটা ঘরে থাকছিলেন।কেউ খেয়াল করেনি। কারণ পাড়ায় থেকেও মানুষ যে কখনও কখনও অদৃশ্য হয়ে যায়, সেটা আমরা বুঝতেই চাই না। ভিতর থেকে খুব দুর্বল গলায় আওয়াজ আসছিল। সেই মুহূর্তে আর কেউ বড় কথা বলেনি। কেউ নেতা হ’ল না, কেউ বক্তৃতা দিল না। সবাই একসাথে নেমে পড়ল। ছেলেরা ইঁট সরাতে শুরু করল। বয়স্করা বাইরে দাঁড়িয়ে দিকনির্দেশ দিচ্ছিল। কেউ গামছা দিয়ে জল মুছছে, কেউ চিৎকার করে ডাকছে। মীরা পিসি নিজের ঘর থেকে পুরনো ছাতা নিয়ে এসেছিলেন। হাত কাঁপছিল, তবু তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন। ননী কাকিমা কারও কান্না থামাচ্ছিলেন, কারও মাথায় হাত রাখছিলেন। ওনার গলা শক্ত, কিন্তু চোখ ভেজা। শেষে লোকটাকে বের করা গেল। বেঁচে আছেন, কিন্তু খুব দুর্বল। সেদিন কেউ জিজ্ঞেস করেনি—“উনি এখানে কী করছিলেন?” কারণ তখন প্রশ্নের সময় নয়। অ্যাম্বুলেন্স এল, লোকটাকে নিয়ে গেল। বৃষ্টি তখনও পড়ছে।
সেদিন সন্ধ্যায় পাড়া অদ্ভুতভাবে নীরব ছিল। চায়ের দোকান খোলা ছিল, কিন্তু আড্ডা জমেনি। কেউ জোরে হাসেনি। সবাই যেন একটু বদলে গিয়েছিল।
মীরা পিসি রাতে প্রথমবার ছেলের নাম ধরে ডেকেছিলেন। ফোনটা নিজের থেকেই তুলে নিয়েছিলেন। ছেলে ধরেছিল। ওদিকে শুধু বলেছিলেন, “আমি ভাল আছি। তুই কেমন আছিস?” এইটুকুই। ননী কাকিমা সেদিন কারও ব্যাপারে কিছু বলেননি। শুধু বটগাছের নিচে বসে ছিলেন অনেকক্ষণ।
শম্ভু রাতে এসে বলেছিল, “কাল থেকে আমি কিছু একটা করব। ঠিক কী জানি না… কিন্তু আর শুধু কথা না।” কেউ হাসেনি। কেউ ঠাট্টাও করেনি।
কয়েকদিন পর পাড়ায় আবার স্বাভাবিকতা ফিরতে লাগল। কিন্তু আগের মত নয়। একটু আলাদা।
ভাঙা বাড়িটা ঘিরে ফেলা হ’ল। শোনা গেল, সেখানে একটা কমিউনিটি স্পেস হবে। ছোট লাইব্রেরি, বাচ্চাদের পড়ার জায়গা। এই প্রস্তাবটা কে দিয়েছিল, ঠিক কেউ জানে না। হয়ত পাড়া নিজেই ঠিক করে নিয়েছিল।
মীরা পিসি এখনও বিকেলে জানালার বাইরে তাকান, কিন্তু আগের মত ফাঁকা চোখে নয়। কখনও বাচ্চাদের ডাকেন, কখনও নিচে নামেন।
শম্ভু সত্যিই একটা কাজ শুরু করেছে। খুব বড় কিছু না। কিন্তু নিজের।
হরেন কাকু এখনও সাইকেল চালান। ঘণ্টা বাজে। পাড়া জাগে।
ননী কাকিমা আগের মতই আছেন। শুধু এখন ওনার কথা শোনার সময় কেউ বিরক্ত হয় না।
আমি মাঝে মাঝে রাতে ছাদে উঠে দাঁড়াই। চারপাশে তাকাই। এই পাড়া নিখুঁত নয়। এখানে ভুল আছে, রাগ আছে, অভিমান আছে। কিন্তু আছে এমন কিছু, যা শহরের অনেক বড় বড় জায়গায় নেই। এখানে মানুষ মানুষকে চেনে। নাম দিয়ে ডাকে। ভাল না থাকলে বুঝে যায়। এই পাড়ায় কেউ একা পড়ে না—যদিও সবাই সবসময় পাশে দাঁড়াতে পারে না, তবু চেষ্টা করে।
একদিন সকালে আবার সেই সাইকেলের ঘণ্টা বাজে। আমি জানালা খুলে তাকাই। সব আগের মতই। কিন্তু আসলে কিছুই আগের মত নয়। কারণ আমরা সবাই একটু বেশিই মানুষ হয়ে গিয়েছি। এই পাড়াটা আমাকে শিখিয়েছে—জীবন মানে শুধু নিজের গল্প নয়, পাশের মানুষের গল্পও। আর গল্পগুলো মিলেমিশে গেলে একটা পাড়া তৈরি হয়। এই আমাদের পাড়া। হাসি-দুঃখ-হইচই-নীরবতা—সব মিলিয়ে।
লেখক পরিচিতি : প্রযুক্তিকা মিত্র
প্রযুক্তিকা মিত্র উত্তরপাড়ার বাসিন্দা ।লেখালেখির অভ্যাস বহুদিনের ,মাঝে বিরতির পর আবার নতুন করে শুরু করা।

