লেখক : বিজুরিকা চক্রবর্তী
বিদ্রোহীরা তৈরি করে ফেলল এক তুখোড় অস্ত্র, যার নাম ‘শব্দভেদী এ.ডি.’। বহুবার ব্যর্থ হয়ে তারা বুঝে গিয়েছে, সাধারণ বোমাগুলির শক্তি এই নিষ্ঠুর শাসকদলের উপর কোন প্রভাব ফেলবে না। শাসকদের কাছে আছে বায়ো-শিল্ডওয়ালা অদ্ভুত সিকিউরিটি প্রটোকল, যেন মানুষ নয়, প্রাণঘাতী কোনও লৌহদুর্গ। সেই কারণেই বিপ্লবীদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে উঠল এই নতুন এ.আই. পরিচালিত ড্রোন – Acoustic Destroyer, সংক্ষেপে এ.ডি.।
ড্রোনটি কণ্ঠস্বর, বায়োমেট্রিক আইডেন্টিটি, নির্দিষ্ট লোকেশন ম্যাপিং এবং হৃদস্পন্দনের থ্রিডি টাইম-রিজলভড ফিঙ্গারপ্রিন্ট – এই চারটি ডেটা ক্রস-ম্যাচ করে। কারও কণ্ঠে একটি বিশেষ ফ্রিকোয়েন্সি ওঠার সাথে সাথে অ্যালগরিদম তার স্মৃতিব্যাঙ্কে থাকা টেম্পোরাল কোডগুলোর সাথে মিলিয়ে নেয়। কোড মিললেই ড্রোন মিসাইল লক করে। লক্ষ্য নির্ধারিত হলে আর ফেরার পথ নেই – শব্দভেদী এ.ডি. বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ছাই করে দেয় তার নির্দিষ্ট মানব টার্গেটকে!
কিন্তু শাসকদলও কম যায় না। তারা বিপ্লবীদের প্রতিরোধে তৈরি করে ফেলল ‘ডিকয়’- মানুষের মত দেখতে প্রতিরূপ যন্ত্রমানব, যাতে প্রতিস্থাপিত থাকে আসল টার্গেটের কণ্ঠস্বরের নিখুঁত হলোগ্রাফিক রেপ্লিকা, এমনকি তার শরীরের সামঞ্জস্যপূর্ণ অ্যানাটমিক গঠন পর্যন্ত। প্রতিটি ডিকয়ের বুকের ভিতর বসানো থাকে টার্গেট ব্যক্তির হৃদস্পন্দনের কোয়ান্টাম ফিঙ্গারপ্রিন্ট – যা নকল করা সাধারণভাবে প্রায় অসম্ভব। উপরন্তু জিপিএস ট্র্যাকার ডিকয়কে সঠিক স্থানে উপস্থিত হতে বাধ্য করে।
ফলস্বরূপ এবার ড্রোন এসে ভুল টার্গেট, অর্থাৎ আসল মানুষটির বদলে সেই রোবটিক ডিকয়কে উড়িয়ে দিতে থাকে প্রতিবার। এই ব্যর্থতায় ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়ে বিদ্রোহীরা; আর শাসকদল থাকে নিশ্চিন্ত।
এক রাতে শাসক প্রধান নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে দেখলেন, কীভাবে তাঁরই এক প্রতিরূপ ডিকয় আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ধ্বংস হয়ে গেল। বিজয়ীর হাসি হাসলেন তিনি।
কথায় আছে প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, একটি ক্ষুদ্র ভুলই যথেষ্ট সবকিছু বদলে দিতে! নতুন মডেলের একটি ডিকয় তৈরির সময় ফার্মওয়্যার আপডেটে ঘটে গেল প্রায় অদৃশ্য একটি অ্যালগরিদমিক ত্রুটি – ফ্রেম শিফট এরর। এবার আর ডিকয়ের হৃদস্পন্দনের সিগন্যাল মিলল না সেই পরিচিত টেম্পোরাল কোডিংয়ের সাথে। ড্রোন কাছে আসতেই ট্রানজিস্টরে লাল লেজার আলো ঝলসে উঠল “CODES MISMATCHED!!” আর ঝট করে পথ বদলে ফেলল এ.ডি.! তারপর অন্ধকার ভেদ করে এক তীব্র আলোর ঝলকানি! পরবর্তী সেকেণ্ডে বিস্ফোরণের শব্দ রাতের নিস্তব্ধতাকে করে দিল খানখান। শাসক প্রধান বুঝে উঠতেই পারলেন না, কোথা থেকে?! কখন?? বাতাসে ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়ল তার দেহাংশ! পুনরায় শহর নিস্তব্ধ। ড্রোনের কানে ধরা পড়ল কেবল মানুষের আতঙ্কিত শ্বাস।
কিন্তু পরদিন বিদ্রোহীদের সদর দপ্তরে কেউ স্বীকার করতে রাজি হল না যে অ্যালগরিদমের ভুল তারা করেছে। অন্যদিকে শাসকদলের সাইবার সিকিউরিটি লগে ধরা পড়ল এক অদ্ভুত তথ্য – ডিকয় তৈরির সফটওয়্যারে শেষ অ্যাকসেস ঘটে তাদেরই এক অতিপরিচিত লোকেশন থেকে, অন্তত জিপিএস ডেটা তাই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তাহলে কি সত্যিই ত্রুটি? নাকি বিদ্রোহ জন্মেছে শাসকদলের ভিড়েই? প্রশ্নটি ছড়িয়ে পরে বাতাসে।
এদিকে কোথাও আবারও অন্ধকারের মধ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠে এ.ডি. – তার পরবর্তী টার্গেটের লক্ষ্যে…
লেখক পরিচিতি : বিজুরিকা চক্রবর্তী
বিজুরিকা চক্রবর্তী, কলকাতা দমদমের, বাসিন্দা। সেন্ট জেভিয়ার'স কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি.এইচ.ডি ডিগ্ৰী পাওয়ার পর বর্তমানে এন.আর.এস মেডিক্যাল কলেজের এম.আর.ইউ ডিপার্টমেন্টে রিসার্চ-সায়েন্টিস্ট হিসেবে কর্মরত। কবিতা লেখা হঠাৎ করে খুঁজে পাওয়া এক জেদী, একরোখা, অবিচ্ছেদ্য বন্ধু। এখনও যেই বন্ধু বেইমানি করেনি। 🙏

