যখন কবীর ডাকল সবারে… (শেষ পর্ব)

লেখক: সম্বিত শুক্লা

গত পর্বের লিঙ্ক এখানে

আমরা সমস্যার অংশ
বাস্ততন্ত্রের অবনতি এবং আমরা

ঊষা রাও

এই নিবন্ধে আমাদের, বিশেষ করে শহুরে মানুষদের জীবনচর্চায় সবুজ পথ বেছে নেওয়া কঠিন কেন সেই বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এটা মেনে নেওয়া এবং বর্তমান জীবনচর্চা থেকে ধীরে ধীরে বিকল্প সবুজ পথের দিকে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন হয়ে উঠেছে।

বর্তমানে আমরা যেমন অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সংঘবদ্ধ তেমনই বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের জন্যেও সংঘবদ্ধ। আমরা এইভাবেই চালিয়ে যাবো আর আশা করব ভবিষ্যৎ পৃথিবী পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য থাকবে সেটা  কোনমতেই হতে পারে না। 

অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে আমরা ব্যক্তি ও পারিবারিক অর্থনৈতিক একক হিসাবে নির্মিত। ব্যক্তি ও পারিবারিক পর্যায়ে এই অর্থনৈতিক পরিচয়গুলি  বাস্তুতান্ত্রিক স্থায়ীত্বের ক্ষেত্রে খুব ক্ষতিকারক। অর্থনীতির নির্দেশ দেয় যে আমরা আমাদের অর্থনৈতিক আয়কে বাড়িয়ে তুলি এবং কার্যত আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তে কেবল অর্থনৈতিক দিকগুলিই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বিবেচিত হয়। 

সামাজিকভাবে আমরা নিউক্লিয়ার পরিবারে বাস করি এবং আমাদের জীবনের বেশিরভাগ অংশ তার দ্বারা নির্ধারিত এবং নিয়ন্ত্রিত হয়। এর ফলে জীবনযাত্রার মান খুব নেমে গেছে। বিভিন্ন বয়সের, বিভিন্ন ক্ষমতা, বিভিন্ন স্বার্থের অনেক লোক থাকলে জীবন আরও সমৃদ্ধ হয় এবং প্রতিটি ব্যক্তির উপর চাপও কম পড়ে।বর্তমানে শুধু কিছু নির্দিষ্ট জিনিস চালিয়ে যাওয়ার জন্যও মানুষ সদা বিব্রত এবং ব্যস্ত। আরও বেশি লোকের কাছে পৌঁছানোর ক্ষমতা যার সাহায্যে কিছু আদান-প্রদান হতে পারে তাও হ্রাস পেয়েছে। ফলে অন্যের উৎপাদিত জিনিস সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবার এবং প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এখনকার চেয়ে বিশ শতাংশ কমে গেলে আমাদের হাতে প্রচুর সময়, শক্তি এবং অবসর থাকবে। প্রতিটি নিউক্লিয়ার পরিবার অতিরিক্ত পাঁচ বা দশ জন লোককে রাখার মত ব্যবস্থা রাখে যা অযৌক্তিক। এত বেশি অতিরিক্ত সরঞ্জাম! এবং এসবই বাস্তুতান্ত্রিক, সামাজিক এবং উন্নত মানের জীবনযাত্রার মূল্যের বিনিময়ে অর্জন করা। 

জীবনযাত্রার এই ধরণ সমস্ত কিছুর যথাযথ বিবেচনা এবং উপযুক্ত গুরুত্ব দিয়ে সামগ্রিক জীবনযাত্রা থেকে বিচ্ছিন্ন করে। আমাদের সমস্ত সিদ্ধান্ত বৃহত্তর সমাজের কল্যাণ মূল্যের বিনিময়ে হয় এবং এটি একটি দুষ্টচক্রের মতো যাতে আমরা নিজেরাই বিপন্ন হই।

আমরা যে অর্থ উপার্জন করি এবং যে পদ্ধতিতে করি তা একটি সিস্টেমের অংশ। যে সমাজে বৈষম্য বিশাল পরিমাণে বেড়ে চলেছে, সেখানে,  স্পষ্টতই আমরা যা পাচ্ছি তা অন্য কেউ পাচ্ছে না।  যখন বিপুল প্রাচুর্য এবং অত্যধিক চাহিদা সহাবস্থান করে তখন সেই দূষিত সমাজের বিষ বিত্তবান এবং বিত্তহীন সকলের অস্তিত্বকেই কলুষিত করে। এই বিষ কোনও অর্থবহ কর্মের সম্ভাবনা হ্রাস করে। এক অর্থে, বিশ্বের সমস্ত ধন-সম্পদ এর ন্যায্য অংশের চেয়ে বেশি যা কিছু আমাদের আছে তা মানব অস্তিত্বকে কলুষিত করে তুলছে। 

সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে আমরা শারীরিক কাজের প্রতি খুব নেতিবাচক মনোভাব অর্জন করেছি। এগুলি আমাদেরকে স্বাস্থ্যকর রাখত। সুতরাং অন্যান্য কাজগুলি বেছে নেওয়ার নাক উঁচু স্বভাবের ফলে ব্যক্তিগত স্তরে শারীরিক সুস্থতার সুযোগ হারাচ্ছি এবং সামাজিকভাবে কর্ম সংস্কৃতিকে দূষিত করছি।

প্রকৃতপক্ষে একটি সুস্থ সমাজে শারীরিক পরিশ্রমকে যুক্তিপূর্ণ এবং তৃপ্তিদায়ক হিসাবে দেখা উচিত এবং সকলের জন্য সেটা মঙ্গলজনকও হবে। এর ফলে ভাল কিছু করার আনন্দও যোগ হবে। এছাড়াও একসাথে কিছু করা হবে, অর্থাৎ; সম্মিলিত কাজ। এইজন্য, কোন একজনের উপর কোন চাপ নেই এবং আমাদের প্রয়োজন সকলের সম্মিলিত কর্ম দ্বারা পূরণ করা হবে। বিপরীতে আমাদের বর্তমান চাকরিগুলিেত প্রতিটি ব্যক্তি বিচ্ছিন্ন; এই সম্মিলিত কাজের অনুসিদ্ধান্ত হিসেবে সম্মিলিত অবকাশ এর ধারণা করা যায়।ঐতিহাসিকভাবে লোককাহিনী, লোক নৃত্যগুলিতে যে কাহিনী দেখা গেছে, তা হয় আমাদের বর্তমান পরিস্থিতিতে হয় না বা খুব কৃত্রিমভাবে ঘটে যা সহজভাবে প্রবাহিত হয় না।

আমরা যেসব কাজ করছি তা যদি বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণকারী না হয় তাহলে তা অবশ্যই বাস্তুতন্ত্রের পক্ষে ধ্বংসাত্মক। সেই অর্থে, আমরা যে সকল কাজ করছি, যা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যার সাহায্যে আমরা নিজেদের পরিচয় দিই, আমাদের পুরো জীবন চালিয়ে নিয়ে যাই এবং প্রচুর অর্থ উপার্জন করি; সেগুলি যদি বাস্তুতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায় তবে সেগুলি গুরুতর ভুল এবং সম্ভবত, কিছু কাজ গুরুতর অপরাধও। আমাদের প্রতিটি কাজের দ্বারা বর্তমানে উদ্ভূত বিপজ্জনক পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলছি।

অর্থনীতিতে একটা বড়সড় ভুল কিছু রয়েছে, কারণ যে পদ্ধতিতে দ্রব্যাদির মূল্যায়ণ করা হয় তা আমাদের কল্যাণের প্রত্যক্ষ অনুপাতে হয় না। পরিষ্কার বায়ু এবং বিশুদ্ধ জল আমাদের সকলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তবুও ব্যক্তিগতভাবে বা সম্মিলিতভাবে, সমাজের কেউই এগুলির জন্য কোনও বিনিয়োগ করি না। 

উদাহরণস্বরূপ, আমাদের বিদ্যালয়গুলি আমাদেরকে চারপাশের জলাশয় সম্পর্কে সচেতন করে না, জলের স্তর বজায় রাখতে শেখায় না, এমন কোনও কিছু করা থেকে বিরত রাখতে প্রশিক্ষণ দেয় না যা পরিবেশের ক্ষতিসাধন, ধ্বংস এবং দূষণ করবে। বিদ্যালয়গুলি আমাদেরকে মাটি, জল, বায়ু দূষণ পরিমাপ করতে শেখায় না অথচ এগুলি নিজেদেরকে সুস্থ রাখতে আবশ্যক হওয়া উচিত। 

যদি আমরা বাস্তুতন্ত্রের অন্তর্গত বাস্তুতান্ত্রিক নাগরিক হিসাবে বাঁচতে চাই তাহলে এগুলি সম্ভবত প্রাথমিক বিষয় যা আমাদেরকে শিখতে হবে; আমাদের বাস্তুতন্ত্রকে ভালভাবে বোঝার জন্য আমাদের প্রতিটি কাজকে জানতে হবে।

সময়ের সাথে সাথে জমি পণ্যে পরিণত হয়েছে এবং  ধনীদের হাতে বেশি অর্থ আছে বলে জমির মালিকও তারাই হচ্ছে। বর্তমান অর্থনীতি কিছু কাজের জন্য অত্যধিক ভাবে উচ্চ মজুরি এবং অন্য কোনও কাজের জন্য অতি কম মজুরি ধার্য করছে। যাঁরা জমি কিনছেন তাঁরা শারীরিক ভাবে দক্ষ নন এবং জমির খুঁটিনাটি জানেন না আবার যাঁরা শারীরিক ক্ষমতা রাখেন এবং জমি খুঁটিনাটি জানেন তাঁরা ভোগবাদী জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন ফলে দ্রুত অর্থ উপার্জন করে ধনী হওয়ার লক্ষ্যে  জমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক ও কীটনাশক দিয়ে জমিকে দূষিত করে ফেলছেন। সংক্ষেপে, আমরা এমন একটা ব্যবস্থা তৈরি করেছি যাতে জমির উর্বরতা ও স্বাস্থ্যের দিকে কেউ নজর দিই না।

জমি ব্যক্তি এবং পরিবারের সম্পত্তি হওয়ায় জমির তত্বাবধন সেই ব্যক্তি বা পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয় অথচ প্রকৃত সত্য হল জমি, মাটি, জল, জীববৈচিত্র্য ইত্যাদি সাধারণের এবং কেবল সকলের সম্পত্তি হিসাবে তত্ত্বাবধান করলেই এগুলির  সব থেকে ভালো করে তত্ত্বাবধান করা সম্ভব হবে। যখন আমরা একে অপরকে মূল্যবান মানব সম্পদ হিসেবে ভাবতে শিখব শুধু তখনই সকলের কল্যাণের জন্য এই সব সম্মিলিত সম্পত্তির সঠিক দেখভাল করতে পারব।

এখনও আমরা জাতপাত, শ্রেণী, লিঙ্গ, ধর্ম, সমাজ ইত্যাদিতে বিভক্ত। এই সমস্ত কিছুই আমাদেরকে সম্মিলিত ভাবে কাজ করতে দেয় না। একথা তর্কাতীতভাবে সত্য যে, আমরা তখনই বাস্ততান্ত্রিক জীবনযাপন করতে পারব যখন আমরা স্বতস্ফুর্তভাবে যৌথতার অংশ হতে পারব এবং শুধু সেই কাজগুলি করব যেগুলি সকলের মঙ্গলের জন্য এবং সেই কাজগুলি করব না যেগুলি করলে সকলের কল্যাণ ব্যাহত হয়। এই কাজগুলি স্বাধীনভাবে করার জন্য ‘স্বাধীনতার’ অর্থের দিকে নজর দেওয়া দরকার। 

(ঊষা রাও IRMA – এর প্রাক্তনী এবং জৈবচাষী)

পিছুটান

এই নিবন্ধটি মূলত তরুণদের বিশেষ করে যারা রাজনৈতিক দল/ এনজিওতে যোগদান করে বা ব্যক্তিগতভাবে সামাজিক কাজ এবং জৈব কৃষিকাজ করে বা এই জাতীয় কাজের মাধ্যমে সমাজের জন্য কিছু ভাল করতে চায় তাদের উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। সাধারণত দেখা যায় যে তারা মূলধারার কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করার জন্য পরিবার এবং বন্ধুবান্ধবদের থেকে নানান বাধা বা চাপের মুখোমুখি হয়। এমনকি এই প্রাথমিক চাপগুলি কাটিয়ে ওঠার পরেও তারা আবার নতুন করে আরও চাপে পড়ে যখন তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় কারণ তখন আবার নতুন আত্মীয়স্বজন এবং প্রত্যাশার মুখোমুখি হয়। 

মূলত, তারা যা করতে চায় তা করতে পারে না। তারা সর্বদা একটা ‘পিছুটান’ অনুভব করে। অনেক প্রবীণ সমাজকর্মীও এই চাপ অনুভব করেছেন যখন তাঁদের বাচ্চারা বড় হচ্ছিল এবং তাঁদেরকে পূর্ববর্তী সাধারণ জীবনযাত্রার পরিবর্তন করতে হয়েছিল। পরিবর্তে, এটি অল্প বয়সীদের উপর চাপ হিসাবে কাজ করে।

স্বাধীনতা কি?

অভিধান অনুযায়ী  ১। নিজের ইচ্ছানুযায়ী কথা বলা, ভাবা এবং কাজ করার অধিকার ২। বন্দী বা দাস হিসাবে না থাকা

সাধারণত যখন আমরা বাহ্যিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হই তখন আমরা প্রথম অর্থটি চিন্তা করি। সুতরাং মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা ইত্যাদির জন্য রাজনৈতিক লড়াই হয়। এই জাতীয় স্বাধীনতা বাহ্যিক কারণগুলির উপর নির্ভত করে এবং অবশ্যই লড়াই করার জন্য অর্থবহ।

তবে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি আরও একটি ধারণার ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারি। এটি হল ‘না’ বলার ক্ষমতা। এই বিষয়টি পুরোপুরি আমাদের ব্যক্তিগত ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে এবং আমি মনে করি যে এর মাধ্যমেই নিজেরা যা করতে চাই তার জন্য প্রয়োজনীয় সময় বের করা যায়।

তাহলে আমরা কিসে ‘না’ বলতে পারি?

প্রথমেই যেটা বলেছি, এটা শুরু হয় পারিবারিক বা বন্ধু মহলে চাপ থেকে। কিন্তু আমরা চাপ অনুভব করি কেন? এর কারণ আমরা আমাদের ‘মূল্যবোধ’ – প্রবীণদের মান্য করা/ শ্রদ্ধা করা, বড় হয়ে বাবা-মা, ছোট ভাইবোনকে দেখা ইত্যাদি এবং উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি দ্বারা আবদ্ধ। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন এবং সমবয়সী বন্ধুরা এই নিয়মগুলি মেনে চলার জন্য আমাদের উপর চাপ সৃষ্টি করে। 

উত্তরাধিকার সম্পত্তিকে আমরা “না” বলে শুরু করতে পারি। আমরা বলতে পারি ‘আমার শিক্ষার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। তবে এখন আমি বড় হয়েছি। আমি একজন প্রাপ্তবয়স্ক এবং আমি পরিবার থেকে আর কিছুই চাই না। এটি অন্যের জন্য থাকুক (ছোট ভাইবোন, বাবা-মায়ের বার্ধক্যের সঞ্চয় ইত্যাদি) ’।

দ্বিতীয়ত, ‘স্বেচ্ছা সরলতা’। এটি বোঝার সহজতম উপায় হ’ল সম্পত্তির মালিক না হওয়ার শপথ গ্রহণ করা, কোনও জীবাশ্ম জ্বালানী চালিত যানবাহনের জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স না রাখা, সাধারণত কম অর্থে জীবনধারণ করা এবং ‘চাকরি’ ছাড়া বাঁচার চেষ্টা করা। এগুলি করলে আপনি প্রচুর স্বাধীনতা পাবেন এবং ‘সাধারণ’ বিবাহ বাজারে আপনাকে অযোগ্য করে তুলবে। আমি মনে করি একমাত্র প্রয়োজনীয় সম্পত্তি হ’ল একটি সাধারণ ‘রোডস্টার’ সাইকেল, যার দাম প্রায় ৫,০০০ টাকা। আপনি এটা সর্বাধিক বার্ষিক ৫০০ টাকা সারাই খরচা করে  বছরের পর বছর ব্যবহার করতে পারবেন।এর ফলে আপনার পরিবহন খাতে ব্যয় প্রচুর কমে যাবে এবং আপনার স্বাধীনতা অনেক বাড়বে। ইদানিংকালে একটি সাধারণ মোবাইল ফোন (১০০০/ – টাকা) আরেকটি প্রয়োজনীয় বস্তু হতে পারে। 

এরপর কি?

এরপর নিজের ইচ্ছানুযায়ী কাজ করা যাবে।  নিজের শহর বা শহরের কাছাকাছি বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা যেতে পারে। বিকল্প জীবিকাক্ষেত্রে কর্মরত বিভিন্ন ব্যক্তির সাথে দেখা করা যেতে পারে। নিজের সময় এবং স্বেচ্ছাশ্রমের বিনিময়ে অনেক ক্ষেত্রেই অন্ন এবং বাসস্থান বিনামূল্যে পাওয়া যাবে। এই একবছর ধরে ঘুরতে ঘুরতে এবং  শিখতে শিখতে কী করা যেতে পারে তার পরিকল্পনা করে নেওয়া যায়। কেবল সাইকেল চালিয়ে ভ্রমণ করলে এগুলি করা খুব একটা ব্যয়বহুলও নয়। দৈনিক ৫০ কিমি সাইকেল চালানো খুব সহজেই সম্ভব এবং রাস্তায় অনেক কিছু শেখাও যাবে। তাঁবু খাটানোর সরঞ্জাম নিয়ে ভাবার কিছু নেই তবে একটি টর্চ, ওডোমসের টিউব, এবং একটি হালকা মশারি রাখা দরকার। এছাড়াও, কোথাও জলের গুণমান সম্পর্কে সন্দেহ হলে জল ফুটিয়ে খাওয়ার ব্যবস্থা করে নেওয়া ভাল। এভাবে এক বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ স্বাধীন ব্যক্তি হওয়া যাবে।

একজনের লক্ষ্য কি হতে পারে সেই নিয়ে কিছু আলোকপাতঃ

এখানে কিছু সাধারণ বিষয়ে আলোকপাত করা হল যা প্রায় আমাদের সকলের জন্য প্রযোজ্য।তবে এগুলির সঙ্গে ব্যক্তিবিশেষের নিজস্ব লক্ষ্য ও পরিকল্পনাগুলিকে পরিপূরক হতে হবে।

বর্তমান সামাজিক/রাজনৈতিক/অর্থনৈতিক অবস্থা সাধারণ মানুষ ও প্রকৃতিকে শোষণ করে এক তীব্র অসাম্যের সৃষ্টি করেছে। এরসঙ্গে এরা পৃথিবীকে নষ্ট করছে, মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক ও অর্থলোভী করে তুলছে।  সুতরাং, বর্তমানে সাধারণ লক্ষ্য বা প্রয়োজন হ’ল সাম্য এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের জন্য জনগণের সংগ্রামের পাশাপাশি সম্প্রদায়কে পুনর্গঠনের মাধ্যমে ভেঙে পড়া বাস্তুতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করা। আমাদের ব্যক্তিগত লক্ষ্য এবং কার্যকলাপ এই ধরণের দৃষ্টিভঙ্গির অংশ হওয়া উচিত। ব্যক্তিগত স্তরে সাধারণ নীতিগুলি এরকম হওয়া উচিত –

১। সরল সাধারণ বা কম কার্বন ফুটপ্রিন্ট এর জীবন যপন করা। যেহেতু মহানগর বা বড় শহরগুলির পতন প্রথমে হবে তাই ছোট শহর বা গ্রামে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা।
২। ব্যক্তিগত দক্ষতার ভিত্তিতে সম্প্রদায়ের কাছে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে হবে। এই দক্ষতাগুলো খুব সাধারণ বিষয়েও হতে পারে যেমন, বাচ্চাদের দেখাশোনা, টিউশন পড়ানো, গ্রন্থাগার বা পাঠচক্র চালানো ইত্যাদি। অন্যান্য দক্ষতা যেমন জিনিসপত্র সারাই করা, স্বাস্থ্যক্ষেত্রে দক্ষতা ইত্যাদিও কাজে লাগতে পারে। কোন সংগঠন থাকলে তার সদস্য হওয়া যেতে পারে তবে সবসময় সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংযোগ রাখতে হবে।
৩। বৌদ্ধিক ও শারীরিক শ্রমের মধ্যে ব্যবধান কমানোর জন্য শারীরিক পরিশ্রম করা জরুরি। এছাড়াও, কোনো একটি শারীরিক শ্রমে দক্ষ হলে আত্মতৃপ্ত এবং আত্মবিশ্বাসী হওয়া যায়, আর তা যদি প্রকৃতির সাথে সম্পর্কিত দক্ষতা হয় তাহলে তো কথাই নেই।

এগুলি অবশ্যই ব্যক্তিগত মতামত এবং অন্য ভাবেও এই কাজগুলি করা যেতে পারে। 

পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক

‘মুক্ত মানুষদের নিয়ে মুক্ত সংগঠন’  এই নীতি নিয়ে একটি বিকল্প পরিবার গড়াই লক্ষ্য। এখানেই সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক স্থায়ী ঠিকানা বানাতে হবে তবে এটি সহজলভ্য নয় এবং কার্যকর হতে সময় লাগবে। এর মধ্যে নিজের পরিবারের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখা যেতে পারে তবে তা মূলত পারিবারিক বন্ধনের ভিত্তিতে এবং বস্তু বা অর্থের প্রয়োজনে নয়। এছাড়াও, আশা করা যায়, সাম্য এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে, পারিবারিক চাপ প্রতিরোধ করা সম্ভব এবং তারপরেও সুন্দর সম্পর্ক বজায় থাকবে। একবার চেষ্টা করে দেখাই যায়!

ভালবাসা এবং সম্পর্ক

প্রশ্ন উঠতে পারে ভালবাসার সম্পর্কের ব্যাপারে। ‘মুক্ত মানুষদের নিয়ে মুক্ত সংগঠন’ নীতিতে গড়ে ওঠা আমাদের বিকল্প পরিবারে ভালবাসার স্থান কোথায়। প্রথমত,  আমাদের কাছে এরকম কোনও বিকল্প পরিবার নেই, ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়  সারা পৃথিবী জুড়েই এই ধরণের সম্পর্কের বিবর্তন হয়েছে, হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, এসবই পারস্পরিক ভালবাসা, বিশ্বাস, মূল্যবোধের উপর নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে, এই মূল্যবোধ হতে পারে – “সম্প্রদায়ের পুনর্গঠন এবং সাম্য ও স্থায়ীত্বের মাধ্যমে বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার করা”। 

ভালবাসার অনেক রকম অর্থ হতে পারে – বাচ্চাদের ভালবাসা, প্রকৃতিকে ভালবাসা ইত্যাদি। এক্ষেত্রে, যৌনতা ও প্রজননের জন্য উদ্ভূত ভালবাসাকেই ধরব। বিষয়টিকে সহজ রাখার জন্য নারী-পুরুষের ভালবাসাতেই সীমাবদ্ধ রাখব,  LGBT ইত্যাদি সম্পর্ককে ধরব না।

এই সম্পর্কটিও এখনও বিবর্তিত হচ্ছে এবং বর্তমানে সম্বন্ধ করে বিবাহ, প্রেম করে বিবাহ, লিভ ইন, ক্যাসুয়াল রিলেশন ইত্যাদি বিদ্যমান। বিকল্প পরিবারেও এই ধরণের সমস্ত সম্পর্ক আশা করা যায়। তবে বর্তমান সময়ের এই সকল সম্পর্ক   ‘মুক্ত মানুষদের নিয়ে মুক্ত সংগঠন’ এর ‘যৌথ’ পরিবারে থাকলেও জৈবিক পিতা-মাতা ইত্যাদি নাও থাকতে পারে। পুরানো যৌথ পরিবারগুলির মতো বাচ্চাদেরও সম্মিলিতভাবে বড় করা হবে। দ্বিতীয়ত, আমরা আশা করি যে বর্তমানের মূল ধারার সমাজের চিন্তাধারা, পারিবারিক ইতিহাস, বন্ধুবৃত্ত, বই বা সিনেমার থেকে উদ্ভূত ধারণা অনুযায়ী তৈরি হওয়া সম্পর্ক ক্রমশই দূর্বল হয়ে পড়বে এবং ভবিষ্যতে এগুলি ‘সমস্যার অংশ’ হবে না। এবং শেষ পর্যন্ত অগ্রাধিকারের তালিকায় স্বাস্থ্য, অর্থবহ কাজ, জ্ঞানচর্চা ইত্যাদির পরে আসবে সম্পর্ক।


লেখক পরিচিতি: সম্বিত শুক্লা
সববাংলায় এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সম্বিত শুক্লা গল্প, কবিতা ইত্যাদি লেখেন ‘ইচ্ছেমৃত্যু’ ছদ্মনামে। প্রবন্ধ, নিবন্ধ ইত্যাদি লেখা সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে যেখানে গল্প, কবিতার রূপকের বাইরে বেরিয়ে যুক্তি ও তথ্যের দায় বেশি। জীবিকার পাশাপাশি সববাংলায় এর কাজেই দিনের বেশিটা সময় অতিবাহিত হয় বাকিটা কাটে বইপত্র ও লেখালিখি নিয়ে।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন
  •  
  •  
  •  
  •  

2 Comments

  1. অজ্ঞাতনামা কেউ একজন

    বস্তুত আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে । বোধহয় আপানাদের মতো কিছু শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী বাদে সবাই স্বেচ্ছায় স্বেচ্ছাচারী হতে চায় । স্বাধীনতার অর্থ

    তাদের কাছে অন্যের পথে বাধা সৃষ্টি করা । সারা পৃথিবী জুড়েই চলছে মানুষের লোভে বাস্তুতন্ত্রের উধাও হয়ে যাওয়া । আর মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি সেই

    উৎপাতকে ত্বরান্বিত করবে । ভালো কিছু অপেক্ষা করছে, এই বিশ্বাসে আমি বিশ্বাসী নই ।

    • পরিস্থিতি আমাদের আশাহতই করছে। তবুও আশা করতে ভাল লাগে – বিশেষ করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অনেকেই কাজ করছে এবং ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছি্টিয়ে অনেকেই কাজে হাত দিয়েছেন। কেউ কেউ ব্যক্তিগত স্তরেও যতটা সম্ভব চেষ্টা করছেন। দেখা যাক, সেই বিশ্বব্যাপী বিশৃঙ্খলা আমরা এড়িয়ে যেতে পারি কিনা!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।