আন্তর্জাতিক নারী দিবস

লেখক : শিবাশিস মুখার্জী

আন্তর্জাতিক নারী দিবস প্রতি বছর ৮ই মার্চ বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হয়। এই দিনটি কেবল নারীদের সম্মান জানানোর দিন নয়, বরং নারী-পুরুষ সমতা, অধিকার ও মর্যাদার দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসকে স্মরণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। সমাজ, রাষ্ট্র, শিক্ষা, বিজ্ঞান, সাহিত্য, রাজনীতি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীদের অবদান অসামান্য; তবুও ইতিহাস জুড়ে তাদের সেই অবদান বহু সময় অবমূল্যায়িত হয়েছে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস সেই অবদানের স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।

এই দিবসের সূচনা বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় শ্রমজীবী নারীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। কর্মক্ষেত্রে ন্যায্য মজুরি, মানবিক কাজের পরিবেশ এবং ভোটাধিকারের দাবিতে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন স্থানে নারীরা আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯১০ সালে জার্মান সমাজতান্ত্রিক চিন্তাবিদ Clara Zetkin আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের প্রস্তাব দেন। পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে ৮ই মার্চ দিনটি বিশ্বব্যাপী নারী অধিকার ও নারী সংহতির প্রতীক হয়ে ওঠে।

নারী দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে নারীর ক্ষমতায়ন কেবল আইনি সমতার প্রশ্ন নয়, এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের বিষয়ও। শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং সামাজিক মর্যাদা—এই সব ক্ষেত্রেই নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। ইতিহাসে বহু নারী তাঁদের প্রতিভা ও সংগ্রামের মাধ্যমে মানবসভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছেন। যেমন বিজ্ঞানী Marie Curie বিজ্ঞানের জগতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন, আবার মানবাধিকার আন্দোলনে Rosa Parks বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

তবে আজও পৃথিবীর বহু সমাজে নারীরা বৈষম্য, সহিংসতা ও সামাজিক বাধার মুখোমুখি হন। তাই আন্তর্জাতিক নারী দিবস কেবল উদযাপনের দিন নয়, বরং আত্মসমালোচনা ও নতুন অঙ্গীকারের দিন। একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে নারী-পুরুষ উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। তাই বলা যায়, একটি সমাজের অগ্রগতি নির্ভর করে সেই সমাজে নারীর অবস্থানের উপর। নারী যদি স্বাধীন, শিক্ষিত ও সম্মানিত হন, তবে সমাজও সমৃদ্ধ হয়। তাই আন্তর্জাতিক নারী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নারীর মর্যাদা রক্ষা মানেই মানবতার মর্যাদা রক্ষা করা। “নারীর মুক্তিই মানবসমাজের মুক্তির পথ।”

আধুনিক সমাজে নারীর অবস্থান বোঝার জন্য ক্ষমতার প্রকৃতি সম্পর্কে নতুন করে যদি আমরা ভাবি, দেখব, ফরাসি দার্শনিক Michel Foucault দেখিয়েছিলেন যে ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্র বা শাসকের হাতে কেন্দ্রীভূত নয়, বরং সমাজের প্রতিটি স্তরে – ভাষা, প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা, পরিবার ও জ্ঞানের কাঠামোর মধ্যেও ক্ষমতার সূক্ষ্ম সম্পর্ক কাজ করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বোঝা যায়, নারীর উপর আধিপত্য কেবল আইনি বা রাজনৈতিক নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যেও নিহিত। তাই নারী মুক্তির প্রশ্নটি কেবল অধিকার অর্জনের প্রশ্ন নয়। এটি সেই জ্ঞান ও ক্ষমতার কাঠামোকে পুনর্বিবেচনার প্রশ্ন, যা দীর্ঘদিন ধরে নারীকে “অন্য” বা “দ্বিতীয়” সত্তা হিসেবে নির্মাণ করেছে।

অন্যদিকে রাজনৈতিক দার্শনিক Hannah Arendt মানব স্বাধীনতার ধারণাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা প্রকাশ পায় যখন মানুষ জনপরিসরে কথা বলে, কাজ করে এবং নিজেকে প্রকাশ করতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে নারীর ইতিহাসকে দেখা যায় দীর্ঘদিনের নীরবতার ইতিহাস হিসেবে—যেখানে নারীকে ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে এবং জনপরিসরের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। নারী দিবস সেই নীরবতা ভাঙার প্রতীক; এটি নারীর কণ্ঠস্বরকে ইতিহাসের কেন্দ্রে নিয়ে আসার আহ্বান।

নারী প্রশ্নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হ’ল পরিচয় ও অস্তিত্বের প্রশ্ন। ফরাসি দার্শনিক Simone de Beauvoir তাঁর বিখ্যাত উক্তিতে বলেছিলেন, “One is not born, but rather becomes, a woman,” অর্থাৎ সমাজ ও সংস্কৃতির নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্য দিয়ে নারীপরিচয় নির্মিত হয়। এই বক্তব্য আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে লিঙ্গ কেবল জৈবিক বাস্তবতা নয়, এটি সামাজিক নির্মাণের ফল। তাই নারীর স্বাধীনতা মানে কেবল সমান অধিকার পাওয়া নয়, বরং সেই সামাজিক নির্মাণের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার সাহস।

এই সমস্ত দার্শনিক ভাবনার আলোকে আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে নতুনভাবে দেখা যায়। এটি কেবল উদযাপন নয়, বরং একটি সমালোচনামূলক চেতনার দিন। এটি আমাদের জিজ্ঞাসা করতে শেখায় সমাজে ক্ষমতার বণ্টন কেমন, কারা কথা বলার অধিকার পায়, এবং কারা নীরবতায় আবদ্ধ থাকে।

পরিশেষে বলা যায়, নারী দিবস মানব স্বাধীনতার বৃহত্তর প্রকল্পের একটি অংশ। নারীর মুক্তি কেবল নারীর জন্য নয়; এটি সমগ্র মানবতার মুক্তির পথ। কারণ যেখানে নারীর কণ্ঠস্বর স্বাধীন, সেখানে সমাজও অধিক মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক এবং সৃজনশীল হয়ে ওঠে। নারী দিবস তাই কেবল একটি তারিখ নয়, এটি স্বাধীনতার এক চলমান দর্শন।


লেখক পরিচিতি : শিবাশিস মুখার্জী
অধ্যাপক, কলকাতা ও সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up