রসিক রবীন্দ্রনাথ

লেখক : অর্হণ জানা

শুধু কবি হিসেবে নয়, রবীন্দ্রনাথ যে আদতেই অত্যন্ত রসিক মানুষ ছিলেন সেটা আমরা হয়তো অনেকেই জানি না। তাঁর রসের পরিচয় কয়েকটি বইতে অল্পবিস্তর পাওয়া যায়। তারই কিছু নমুনা তুলে ধরার চেষ্টা করা এ-লেখায়।

এক

একবার এক ঘরোয়া আসর জমেছে। সবাই হাসি গল্পে মশগুল। রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘এ-ঘরে একটা বাঁদোর আছে।’
সবাই এ-ওর মুখের দিকে চাওয়াচাওয়ি করছেন। গুরুদেব কাকে বাঁদর বললেন!
ঠিক তখনই রবীন্দ্রনাথ বুঝিয়ে দিলেন, ‘এ-ঘরে দুটো দরজা আছে, মানে দোর। একটা ডান দিকে, অন্যটি বাম দিকে। তাই বলছিলাম, এ-ঘরে একটা বাঁদোর আছে।’

দুই

মাঝে মাঝে গুরুদেবের দোসর জুটত তেমনই। তাঁরাও আরও এককাঠি সরেস। এঁদেরই একজন কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুলের মাথাভরা ঝাঁকড়া চুল, এদিকে দাঁড়িগোঁফ কামানো। এক ঘরোয়া আসরে রবিঠাকুর তাই হেসে বললেন, ‘কাজী নজরুল, করিয়াছে ভুল, দাঁড়ি না রাখিয়া রাখিয়াছে চুল।’
কিন্তু নজরুল কি চুপ করে থাকার মানুষ? হাজির জবাবে তিনিও দক্ষ। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন, ‘মুখভরা জঙ্গল, না রাখাই মঙ্গল।’

তিন

একবার শান্তিনিকেতনের অধ্যাপক নেপাল রায়কে রবীন্দ্রনাথ লিখে পাঠালেন, ‘আজকাল আপনি কাজে অত্যন্ত ভুল করছেন। এটা খুবই গর্হিত অপরাধ। এ জন্য কাল বিকেলে আমার এখানে এসে আপনাকে দণ্ড নিতে হবে।’
এ কথা শুনে চিন্তিত নেপালবাবু পরের দিন কবির কাছে উপস্থিত হলেন। আগের রাতে দুশ্চিন্তায় তিনি ঘুমাতেও পারেননি। সারাদিন ছটফট করেছেন। কী ভুল করেছেন তিনি!
বিকেল হওয়ার আগেই তিনি পৌঁছে গেলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে। নেপাল রায় এসেছেন শুনে রবীন্দ্রনাথ একটি মোটা লাঠি হাতে নিয়ে এসে তাঁর সামনে দাঁড়ালেন। নেপালবাবুর তখন ভয়ে অজ্ঞান হওয়ার অবস্থা। তিনি ভাবলেন, এ বার সত্যিই বুঝি তাঁর মাথায় লাঠি পড়বে। কবি তখন সেটি বাড়িয়ে ধরে বললেন, ‘এই নিন আপনার দণ্ড! সে দিন আপনি এই লাঠিটা মানে এই দণ্ডটা আমার এখানে ফেলে গিয়েছিলেন। তা একদম ভুলে গেছেন।’

চার

রবীন্দ্রনাথকে একবার এক ভদ্রলোক লিখেছিলেন, ‘আপনি কি ভূতে বিশ্বাস করেন?’
কবি উত্তরে লেখেন, ‘বিশ্বাস করি বা না-করি, তাদের দৌরাত্ম্য মাঝেমধ্যে টের পাই— সাহিত্যে, রাজনীতিতে সর্বত্রই একেক সময় তুমুল দাপাদাপি জুড়ে দেয় এরা। দেখেছি। দেখতে ঠিক মানুষের মত।’

পাঁচ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে প্রচুর লোক তাঁদের লেখা বই উপহার দিতে আসতেন। একবার এক শিক্ষক এসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে তাঁর লেখা একটি বাংলা ব্যাকরণ বই দিয়ে বললেন, ‘গুরুদেব, সময় পেলে একটু দেখবেন বইটি কেমন হয়েছে।’
রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘ঠিক আছে দু’চার দিন পরে আসুন, আমি দেখে রাখব।’
ঠিক তিন দিনের মাথায় লোকটি রবীন্দ্রনাথের কাছে গিয়ে হাজির। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘গুরুদেব, আমার ব্যাকরণ বইটি দেখেছিলেন?’
রবীন্দ্রনাথ তাঁর দিকে এক ঝলক তাকিয়ে বললেন, ‘দেখেছি, খুব ভাল করে দেখেছি। বাংলা ভাষা যে এত কঠিন এই প্রথম জানলাম।’

ছয়

শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কথাশিল্পী প্রমথনাথ বিশী। তো, একবার প্রমথনাথ বিশী কবিগুরুর সঙ্গে শান্তিনিকেতনের আশ্রমের একটি ইঁদারার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ওখানে একটি গাবগাছ ছিল। কবিগুরু হঠাৎ তাঁকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘জানিস, একসময় এই গাছের চারাটিকে আমি খুব যত্ন করে লাগিয়েছিলাম। আমার ধারণা ছিল, এটা অশোকগাছ, কিন্তু যখন গাছটি বড় হল, তখন দেখি ওটা অশোক নয়, গাবগাছ।’
তার পর তিনি প্রমথনাথের দিকে সরাসরি তাকিয়ে স্মিতহাস্যে যোগ করলেন, ‘তোকেও অশোকগাছ বলে লাগিয়েছি, বোধ করি তুইও একদিন গাবগাছ হবি।’

সাত

একবার রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজি একসঙ্গে বসে সকালের আহার খাচ্ছেন। গান্ধীজি লুচি পছন্দ করতেন না, তাই তাঁকে ওটসের পরিজ খেতে দেওয়া হয়েছিল। আর কবিগুরু খাচ্ছিলেন গরম গরম লুচি।
গান্ধীজি তাই দেখে বললেন, ‘গুরুদেব, তুমি জানো না যে তুমি বিষ খাচ্ছ।’
উত্তরে কবিগুরু বললেন, ‘বিষই হবে। তবে এর অ্যাকশন খুব ধীরে। কারণ, আমি বিগত ষাট বছর যাবৎ এই বিষ খাচ্ছি।’

আট

রবীন্দ্রনাথের একটা অভ্যাস ছিল, যখনই তিনি কোনও নাটক বা উপন্যাস লিখতেন, তা প্রথমে শান্তিনিকেতনে গুণীজনদের সামনে পড়ে শোনাতেন। কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সেই গুণীজনদের মধ্যে ছিলেন একজন। একবার বাইরে জুতো রেখে আসায় সেটা চুরি হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে তিনি জুতোজোড়া কাগজে মুড়ে বগলদাবা করে আসরে ঢুকতেন।
রবীন্দ্রনাথ সেটা টের পেয়ে একদিন তাঁকে এভাবে ঢুকতে ‌দেখে বলেলেন, ‘শরৎ, তোমার বগলে ওটা কি পাদুকা-পুরাণ?’

নয়

একবার এক দোলপূর্ণিমার দিনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কবি ও নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সাক্ষাৎ ঘটে। পরস্পর নমস্কার বিনিময়ের পর হঠাৎ দ্বিজেন্দ্রলাল তাঁর জামার পকেট থেকে আবির বের করে রবীন্দ্রনাথকে বেশ ভাল করে মাখিয়ে দিলেন।
আবিরে রঞ্জিত রবীন্দ্রনাথ রাগ না করে বরং সহাস্যে বলে উঠলেন, ‘এত দিন জানতাম দ্বিজেনবাবু হাসির গান ও নাটক লিখে সকলের মনোরঞ্জন করে থাকেন। আজ দেখছি শুধু মনোরঞ্জন নয়, দেহরঞ্জনেও তিনি একজন ওস্তাদ।’

দশ

মরিস সাহেব শান্তিনিকেতনে ইংরাজী ও ফরাসি পড়াতেন। তিনি একবার তাঁর ছাত্র প্রমথনাথ বিশীকে বললেন, ‘গুরুদেব সুগার অর্থাৎ চিনি নিয়ে একটা গান লিখেছেন। যেটা খুবই মিষ্টি হয়েছে।’
প্রমথনাথ বিশী সে কথা শুনে বললেন, ‘চিনি নিয়ে লিখলে সেটা তো মিষ্টি হবেই। তা গানটা কী?’
মরিস সাহেব গাইলেন, ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে, ওগো বিদেশিনী।’
শুনে প্রমথনাথ বিশী বললেন, ‘গানটাতে বেশ কয়েক চামচ চিনি মিশিয়েছেন গুরুদেব। তাই এত মিষ্টি। কিন্তু এই চিনিই যে সুগার সেটা আপনাকে কে বলল?’
মরিস সাহেব জানালেন, ‘কে আবার, স্বয়ং গুরুদেব নিজেই তাঁকে এ কথা জানিয়েছেন।’

এগারো

কবিগুরুর পঞ্চাশ বছর বয়সে পদার্পণ উপলক্ষে শান্তিনিকেতনের একটি কক্ষে সভা বসেছিল। যেখানে তিনি স্বকণ্ঠে গান গেয়েছিলেন। তিনি সে দিন গাইলেন, ‘এখনো তারে চোখে দেখিনি, শুধু কাশি শুনেছি।’ কবিগুরু এটি গেয়েছিলেন আচার্য যতীন্দ্রমোহন বাগচি ওই কক্ষে ঢোকার আগ মুহূর্তে, তাই বাগচি মহাশয় কক্ষে প্রবেশ করে বিস্মিত নয়নে সকলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
‘সিঁড়িতে তোমার কাশির শব্দ শুনেই গুরুদেব তোমাকে চিনেছেন’, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তখন বাগচি মহাশয়কে বুঝিয়ে দিলেন, ‘তাই তো তাঁর গানের কলিতে বাঁশির স্থলে কাশি বসিয়ে তিনি গানটি গেয়েছেন।’

বারো

সাহিত্যিক ‘বনফুল’ তথা শ্রী বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের এক ছোট ভাই বিশ্বভারতীতে পড়ার জন্য শান্তিনিকেতনে পৌঁছেই কার কাছ থেকে যেন জেনেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ কানে একটু কম শোনেন। ফলে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তিনি যখন দেখা করতে গেলেন রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘কী হে, তুমি কি বলাইয়ের ভাই কানাই নাকি?’, তখন বলাইবাবুর ভাই চেঁচিয়ে জবাব দিলেন, ‘আজ্ঞে না, আমি অরবিন্দ।’
রবীন্দ্রনাথ তখন হেসে উঠে বললেন, ‘না কানাই নয়, এ যে দেখছি একেবারে সানাই!’

তেরো

একবার কালিদাস নাগ ও তাঁর স্ত্রী জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে বেড়াতে এসেছেন। রবীন্দ্রনাথ মৃদুহাস্যে নাগ-দম্পতিকে প্রশ্ন করলেন, ‘শিশু নাগদের কোথায় রেখে এলে?’
আরেকবার রবীন্দ্রনাথ তাঁর চাকর বনমালীকে তাড়াতাড়ি চা করে আনতে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তার আসতে দেরি হচ্ছে দেখে কপট বিরক্তির ভাব দেখিয়ে রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘চা-কর বটে, কিন্তু সু-কর নয়।’
আরও একবার কবিগুরুর দুই নাতনি এসেছেন শান্তিনিকেতনে, কলকাতা থেকে। একদিন সেই দুই নাতনি কবিগুরুর পা টিপছিলেন, অমনি তিনি বলে উঠলেন, ‘পাণিপীড়ন, না পা-নিপীড়ন?’ প্রথমটায় তাঁরা কিছুই বুঝতে না পারলেও পরে কথাটার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পেরে খুবই মজা পেয়েছিলেন।

চোদ্দ

একদিন সকালবেলায় রবীন্দ্রনাথ জলখাবার খেতে বসেছেন। প্রমথনাথ এসে তার পাশে বসলেন। উদ্দেশ্য, গুরুদেবের খাবারে ভাগ বসানো। ফল, লুচি, মিষ্টি সবকিছুরই ভাগ পেলেন তিনি। কিন্তু তার নজর গেল একগ্লাস সোনালি রংয়ের শরবতের দিকে, যেটা তাকে দেওয়া হয়নি। গুরুদেব তার ভাব লক্ষ করে বললেন, ‘কী হে, এই শরবত চলবে নাকি?’ প্রমথনাথ খুব খুশি। অমনি গুরুদেব বড় এক গ্লাসে সেই সরবত প্রমথনাথকে দেওয়ার আদেশ দিলেন। বড় গ্লাস ভর্তি হয়ে সেই সোনালি শরবত এল। প্রমথনাথ এক চুমুক খেয়েই বুঝলেন, সেটা চিরতার শরবত!

পনেরো

শান্তিনিকেতনের ছেলেদের সঙ্গে অন্য প্রতিষ্ঠানের ছেলেরা ফুটবল খেলছে। শান্তিনিকেতনের ছেলেরা আট-শূন্য গোলে জিতেছে। সবাই দারুণ খুশি। শুধু রবীন্দ্রনাথ মন্তব্য করলেন, ‘জিতেছে ভাল, তা বলে আট গোল দিতে হবে? ভদ্রতা বলেও তো একটা কথা আছে, নাকি।’

ষোল

শান্তিনিকেতনে নতুন একটি ছেলে ভর্তি হয়েছে, তার নাম ভাণ্ডারে। ছেলেটির সঙ্গে তখনও রবীন্দ্রনাথের পরিচয় হয়নি। তা, রবীন্দ্রনাথ একদিন শান্তিনিকেতনের পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, তার পরনে দীর্ঘ আলখাল্লা, মাথায় টুপি। ভাণ্ডারে তাকে দেখে ছুটে গিয়ে হাতে আধুলি মানে আট আনা পয়সা দিয়ে এল। অন্য ছেলেরা জিজ্ঞাসা করল, ‘গুরুদেবকে তুই কী দিলি?’
‘গুরুদেব কোথায়? ও তো একজন ফকির। মা বলেছে ফকিরকে দান করলে পুণ্যি হয়।’ ভাণ্ডারের সাফ জবাব।
যাই হোক, অল্পদিনেই বোঝা গেল ভাণ্ডারে ভীষণ দুরন্ত ছেলে। তার দৌরাত্ম্যে ছাত্র-শিক্ষক সবাই অস্থির। নালিশ গেল গুরুদেবের কাছে। গুরুদেব তাকে ডেকে বললেন, ‘ভাণ্ডারে, তুই কত ভাল ছেলে। তুই একবার আমাকে একটা আধুলি দিয়েছিলি। কেউ তো আমাকে একটা পয়সাও কখনও দেয় না। তুই যদি দুরন্তপনা করিস, তা হলে কি চলে?’
গুরুদেবের কথায় ভাণ্ডারের দুষ্টুমি কিছুটা কমেছিল।

সতের

রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের ছাত্রদের বকাঝকার পক্ষপাতী ছিলেন না। তিনি কাউকে কখনও আঘাত দিতে চাইতেন না। একবার প্রমথনাথ বিশী সম্পর্কে একটা নালিশ এল। এমন অবস্থা যে, তাকে না বকলেই নয়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও গুরুদেব প্রমথনাথকে অনেকক্ষণ ধরে বকলেন। তিনি একটু থামলে প্রমথনাথ বললেন, ‘কিন্তু ঘটনা হ’ল আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না।’
রবীন্দ্রনাথ হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। বললেন, ‘বাঁচালি। তোকে বকাও হ’ল আবার তুই কষ্টও পেলি না।’

আঠার

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভক্ত ও ছাত্রছাত্রীদের সামনে গান গাইছেন, ‘হে মাধবী, দ্বিধা কেন?’
তখন ভৃত্য বনমালী আইসক্রিমের প্লেট নিয়ে তাঁর ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বনমালী ভাবছে ঘরে ঢুকবে কি ঢুকবে না। কারণ রবীন্দ্রনাথ গান গাইছেন, এ সময় ঢুকলে উনি বিরক্ত হবেন কি না কে জানে! গুরুদেব বনমালীর দিকে তাকিয়ে গাইলেন, ‘হে মাধবী, দ্বিধা কেন?’
বনমালী আইসক্রিমের প্লেট গুরুদেবের সামনে রেখে লজ্জায় ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘বনমালীকে যদিও মাধবী বলা চলে না। তবে তার দ্বিধা মাধবীর মতই ছিল। আর আইসক্রিমের প্লেট নিয়ে দ্বিধা করা মোটেই ভাল নয়।’

উনিশ

একবার রবীন্দ্রনাথ ঘুমোচ্ছেন। ঘরের জানালা খোলা। জানালা দিয়ে চাঁদের আলো আসছে। ফুটফুটে জ্যোৎস্না। আলোতে ঘুমের ব্যাঘাত হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ ভৃত্য মহাদেবকে ডেকে বললেন, ‘ওরে মহাদেব, চাঁদটাকে একটু ঢাকা দে বাবা।’
মহাদেব তো হতভম্ব। চাঁদ সে কী ভাবে ঢাকা দেবে?
গুরুদেব হেসে বললেন, ‘জানালাটা বন্ধ করে দে, তা হলেই চাঁদটা ঢাকা পড়বে।’

কুড়ি

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বানান সংস্কারের জন্য একটা কমিটি গঠন করে দিলে সেই কমিটি বাংলা বানানের পুরনো রীতি পালটে নতুন বানানরীতি চালু করে। এই কমিটি এই কাজ করতে গিয়ে ‘গরু’ বানান নিয়ে সমস্যায় পড়ে। কমিটি ঠিক করে যে ‘গরু’ বানানটি গরু না লিখে ‘গোরু’ লেখা উচিত। কারণ শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃতের ‘গো’ শব্দ থেকে এসেছে। আদিতে ‘ও’ কার, সে জন্য এখানেও ‘ও’ কার থাকা উচিত। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, প্রায় সব বাংলা ভাষাভাষী লেখক, ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক সবাই ‘ও’ কার ছাড়া গরু বানান লেখেন। কিন্তু কী করা যায়! কমিটির সিদ্ধান্ত হল, এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের মত নেওয়া দরকার। দেখা যাক, উনি কী বলেন। কমিটির প্রধান ছিলেন ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। তাঁর নেতৃত্বে কমিটির লোকজন চলল শান্তিনিকেতনে, কবির বাড়ি। সেখানে গিয়ে তাঁরা সাক্ষাৎপ্রার্থী হলেন কবির।
কবি তাঁদের আগমনের হেতু জানতে চাইলে তাঁকে বিষয়টি বোঝানো হল। বলা হল, ‘আমরা আপনার মত জানতে এসেছি।’
রবীন্দ্রনাথ কথাটা শুনে মৃদু হেসে বললেন, ‘তা তোমাদের ও-কার দিয়ে গরু লেখার ব্যাপারে অন্তত একটা সুবিধেই হবে যে, আমাদের দেশের জীর্ণকায় হাড় জিরজিরে গরুগুলোকে অন্তত একটু মোটা ও তাজা দেখাবে!’

একুশ

একবার এক ভদ্রলোক কবিতার দু’টি লাইন নেওয়ার জন্য রবীন্দ্রনাথের কাছে কলম ধার চাইলেন। তিনি কলম চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি এই কবিতার দ্বিতীয় লাইনটা জানেন? প্রথম লাইনটা হচ্ছে ‘সকল পক্ষী মৎস্য ভক্ষী, মৎস্যরাঙ্গী কলঙ্কিনী’।’
রবীন্দ্রনাথ তাঁকে কলমটা দিয়ে বললেন, ‘নিশ্চয়ই জানি। লাইন দু’টো দাঁড়াল এ’রকম –

সকল পক্ষী মৎস্য ভক্ষী, মৎস্যরাঙ্গী কলঙ্কিনী।
সবাই কলম ধার চেয়ে নেয়, আমিই শুধু কলম কিনি!’

বাইশ

কবিগুরু একবার কিছু বন্ধুবান্ধব নিয়ে বাংলা মুলুকের বাইরে পাত্রী দেখতে গেলেন। পাত্রী খুব ধনী, সাত লাখ টাকার উত্তরাধিকারী। সে যুগে সাত লাখ টাকা যৌতুক, ভাবা যায়! তিনি যে ঘরে বসে আছেন, সে ঘরে দু’জন অল্প বয়সী মেয়ে এসে বসল। এক জন চুপচাপ, সাধাসিধে, জড়ভরতের মতো এক কোণায় বসে রইল। অন্য মেয়েটি যেমন সুন্দরী, তেমনি চটপটে, স্মার্ট। একটুও জড়তা নেই, সুন্দর ইংরেজি উচ্চারণ। পিয়ানো বাজাল দারুণ। সংগীত নিয়ে জ্ঞানগর্ভ টুকটাক আলোচনাও করল। রবীন্দ্রনাথের খুব পছন্দ হল মেয়েটিকে। এমন সময় বাড়ির কর্তা ঘরে ঢুকে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর মেয়ে দুটির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সুন্দরী মেয়েটিকে দেখিয়ে বললেন, ‘হিয়ার ইজ মাই ওয়াইফ।’ আর জড়ভরতকে দেখিয়ে বললেন, ‘হিয়ার ইজ মাই ডটার।’ পাত্রী দেখার দল বিস্ময়ে হতবাক!

তেইশ

জীবনের শেষ দিকে এসে রবীন্দ্রনাথ একটু সামনের দিকে ঝুঁকে উবু হয়ে লিখতেন। একদিন তাঁকে ও’ভাবে উবু হয়ে লিখতে দেখে তাঁর এক শুভাকাঙ্ক্ষী বলল, ‘আপনার নিশ্চয় ও ভাবে উপুড় হয়ে লিখতে কষ্ট হচ্ছে। বাজারে এখন এ রকম অনেক চেয়ার আছে, যেগুলোতে আপনি হেলান দিয়ে বেশ আয়েশের সঙ্গে লিখতে পারবেন। ও রকম একটা আনিয়ে নিলেই তো পারেন।’
লোকটার দিকে খানিকক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রবীন্দ্রনাথ জবাব দিলেন, ‘তা তো পারি। তবে কি জানো, এখন উপুড় হয়ে না লিখলে কি আর লেখা বেরোয়! পাত্রের জল কমে তলায় ঠেকলে একটু উপুড় তো করতেই হয়।’


লেখক পরিচিতি : অর্হণ জানা
অর্হণ জানা। জন্ম ৩১ ডিসেম্বর, ২০০৬। বর্তমান নিবাস বড়জাগুলি, নদিয়া। ছোট থেকেই লিখতে ভালবাসি--- গান, গল্প, কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ। সুকুমার রায় আমার গুরু। আমার পথপ্রদর্শক। এ যাবৎ কয়েকটি পত্রপত্রিকা ও সংকলন গ্রন্থে আমার লেখা কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প ও ছড়া প্রকাশিত হয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up