সাজু

লেখক : ইয়াসেফ মোহাঃ রিয়ান

গ্রামের একপ্রান্তে জীর্ণ এক সরকারি প্রাইমারি স্কুল। দেয়ালের প্লাস্টার খসা ক্লাসঘরে বাচ্চাদের মন পড়ার চেয়ে বেশি মাঠে-ঘাটে। দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র ইসু প্রতিদিন শেষ ঘণ্টার অপেক্ষায় চাতকের মত ওত পেতে থাকে। ঘণ্টা বাজতেই ছাত্ররা মৌচাকে ঢিল ছোঁড়া মৌমাছির মত এলোপাথাড়ি ছুটে যায় যে যার নিজেদের বাড়ি—কেউ দল বেঁধে, কেউ বা একা। 

কিন্তু ইসুর টান অন্যদিকে। ওর লোভ সাজু। দৌড়ে বাড়ি ফিরেই বইয়ের ব্যাগটা বৃদ্ধ চৌকির ওপর ছুঁড়েই সে দেয় ছুট আঙিনায় বাঁধা সাজুর দিকে। সাজুরও যেন ইসুর ফেরার সময়টা মুখস্থ। ইসুকে দেখেই সে দড়ি ছিঁড়ে ছুটে আসতে চায়। ইসু বাঁধন খুলে দিতেই দু’জন ছুট দেয় বাড়ির পিছনের খামারে। বোঝা যায় না—কে ছাগল, আর কে বালক।

এক বছর আগে সাজুর জন্ম হয়েছিল ইসুদের বাড়িতে। সেই থেকেই প্রায় একসাথেই বড় হওয়া। ইসুর তেমন কোন বন্ধু নেই। স্কুল শেষে, বিকেলের খেলায়, এমনকি রাতের পড়ার সময়ও সাজুই ওর সঙ্গী।

রাতে খড়ের রান্নাঘরে মাটির উনুনের পাশে বসে ইসু পড়াশোনা করে। মা রুটি সেঁকে, বাল্বের আলো টিমটিম কাঁপতে থাকে, আর সাজু চুপটি করে ইসুর গা-ঘেঁষে বসে থাকে। কখনও ইসুর বই আলতো কামড়ে ধরে, কখনও মাথা দিয়ে ধাক্কা দেয়। ইসু রাগ দেখায়, আবার একটু পরেই জড়িয়ে ধরে।

কয়েক সপ্তাহ আগে একদিন দড়ি খোলা সাজু স্কুল ফেরা ইসুকে দেখে হঠাৎ পাকা রাস্তার ওপারে ছুটে গিয়েছিল। একটি মোটরসাইকেল ধাক্কা মারে তাকে। তেমন কিছু না হলেও সামান্য আঘাত পেয়েছিল। সেই থেকে ইসুর স্কুল ফেরার সময়টাতে সাজুকে বেঁধে রাখা হয়।

শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর দুই ভদ্রলোক আসেন ইসুদের বাড়িতে। সাধারণত জুম্মার দিন ইসু স্কুলে যায় না। বাবার সাথে মসজিদে যায় – নামাজ শেষে পাওয়া বাতাসা জিভে চেটে চেটে খাওয়ার লোভ, যাতে স্বাদটা বেশিক্ষণ থাকে।

ভদ্রলোক দুজন অচেনা, মধ্যবয়স্ক। ইসুর বাবার সাথে আঙিনায় রোদে চটে যাওয়া প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে কথা বলছিল আর মাঝে মাঝে দড়ি-বাঁধা সাজুর দিকে তাকাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর সাজুর কাছে এগিয়ে একটু হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল দু’জনেই।
ইসু মাকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “ও মা, ওরা কে ?”
“ওই পাড়ার ওটা স্কুলের মাস্টর আর সাথে কিজানি কে ওটা।”
“আমাদের বাড়িতে কেন ? দেখলে তো, সাজুকে আদর করল! ভালো লোকগুলো, না মা ? সাজুকে কি সুন্দর আদর করল!”

লোক দু’জন চলে যেতেই ইসু সাজুর দড়ি খুলে দিয়ে দে খামারে ছুট। আবার শুরু খুনসুটি, গড়াগড়ি – দুই ডানপিটের নিজস্ব এক পৃথিবীতে।

পরের সপ্তাহে খুব ভোরে সাজুর অস্থির ডাক শুনে ইসুর ঘুম ভেঙে যায়। এত ভোরে সাজু সাধারণত ডাকাডাকি করে না। আধ-ঘুম চোখে ইসু ঘর থেকে বেরিয়ে দেখে, আগের সপ্তাহে স্কুলমাস্টারের সাথে আসা সেই লোকটা আঙিনায় দাঁড়িয়ে আছে। এত সকালে?
কিছু বুঝে ওঠার আগেই ইসু দেখল, ওর বাবা সাজুর গলায় দড়ি পরিয়ে লোকটার হাতে তুলে দিচ্ছে। সাজু এদিক-ওদিক ছটফট করছে, আর আধ-ঘুম ইসুর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছে। বের হয়ে থাকা জিভ আর ভীত চোখে হাঁপাচ্ছে সাজু, কত কী যেন বলতে চায়।

ইসুর বুকটা ধক করে উঠল। মায়ের আঁচল ধরে জিজ্ঞেস করল, “মা, সাজুকে ওই লোকটা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে এত সকালে? সাজুর কি কিছু হয়েছে? ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছে? বলো না, মা! তুমিও চলো, আমিও যাব। সাজু একা ভয় পাবে ডাক্তারের কাছে – জানোই তো !”

এই দুই নিষ্পাপ প্রাণের ছোট্ট জগতে ইসুর কোন ধারণাই নেই যে আজ কুরবানির দিন। বকরি ঈদের নতুন জামা আর ঈদগাহের মেলার প্রতীক্ষায় গ্রামের কচিকাঁচারা যেখানে আনন্দে সারারাত ঠিকমত ঘুমোতেই পারেনি, ভোর হতেই কেউ পুকুরে, কেউ গ্রামের পাশের ঢাবে প্রাতঃস্নানে ভিড় করেছে, সেখানে ইসুর সকালটা একেবারেই অন্যরকম।

সাজুকে ওভাবে টেনে নিয়ে যেতে দেখে ইসুর বুকের ভেতরটা কেমন যেন হু হু করছিল । ওই লোকটার শক্ত টানে ভেজা-চোখে ইসুর দিকে তাকিয়ে থাকা সাজুর সেই অসহায় আকুতি বারবার ভেসে উঠছিল ইসুর সামনে।

নির্বোধ কচি প্রাণ ইসু বুঝতেই পারল না, সাজুকে ডাক্তারের কাছে নয়, নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মাস্টারের বাড়িতে। আজ বকরি ঈদ। 

ঈদগাহ ঘিরে বসেছে মেলা —পাঁপড়, ফুচকা, মোমো, ঘুগনি, মিষ্টি, বেলুন আর খেলনার দোকানে উপচে পড়া ভিড়। কচিকাঁচারা প্রজাপতির মত আনন্দে মেলা ঘিরে ছোটাছুটি করছে। অথচ ইসু সকাল থেকেই মনমরা। সকালে চা-মুড়ি খেয়ে সে ঘরের এক কোণে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে, সাজুর অপেক্ষায়। এই প্রথম বাবার সাথে ঈদের নামাজ পড়তে যায়নি ইসু। 

কিছুক্ষণ পর ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখল ঈদের নামাজ থেকে ফিরে এসে ওর বাবা সাজুর খোঁয়াড়টা পরিষ্কার করে দিচ্ছে। দড়ি বাঁধার বাঁশের খুঁটিটা আজ বন্ধুহীন, নিস্তব্ধ।
রান্নাঘরে ইসুর মা চুপচাপ দাঁড়িয়ে। মন চাইছে সবজি বানাবে আজ। কিন্তু আজ তো বকরি ঈদ — মাংস রান্না না করলে পড়শিরা কী বলবে?

ওই পাড়ায় মাস্টারমশাই সকালের বকরি ঈদের নামাজ শেষে দুপুরে একটু জিরিয়ে বিকেলের চায়ের দোকানের ঈদ-আড্ডায়, “মাংস খাঁটি পেয়েছি। ছাগলের দাম একটু বেশি পড়েছে ঠিকই, তবে প্রায় চোদ্দ কেজি মাংস হয়েছে। চর্বিও ছিল পরিমাণমত।”

সাজু আজ ‘চোদ্দ কেজি মাংস’ !

প্রায় সব ধর্মের প্রথা-প্রয়োজনেই—মুসলিম হোক কিংবা হিন্দু—যে কোন আনন্দ-উৎসবে, খাদ্যশৃঙ্খলের নির্মম নিয়মে, স্বাদসুখের রুচিলোভে, হেঁসেল শৈলীর কারুকার্যে, পুষ্টিগত বৈজ্ঞানিক যুক্তির তাগিদে, আবার কখনও কোন কারণ ছাড়াই সাজুরা প্রতিনিয়ত কেজি দরে মাংস হয়ে যায়।

আর ইসু, ওরফে ইসমাইল মোমিন, সাজুর অপেক্ষায় থেকে যায় নীরবে, বিচ্ছেদে, বিচ্ছেদ-বেদনায়  – আজীবন !


লেখক পরিচিতি : ইয়াসেফ মোহাঃ রিয়ান
ইয়াসেফ মোঃ রিয়ান একজন সাহিত্যনুরাগী। পেশাগতভাবে তিনি একজন স্থপতি এবং চীনের Xi’an Jiaotong–Liverpool University-এর স্থাপত্য বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up