বড় ইচ্ছে করে…

লেখক : অর্দ্ধেন্দু গায়েন

এবার একটু নিশ্চিন্ত হ’ল অরিন্দম। বৃদ্ধ বাবা-মা’কে নিয়ে অনেক ধকল গিয়েছে তার উপর দিয়ে। এই বয়সে সংসারের কোন কাজই করতে পারেন না তাঁরা। তাই বয়সের ভারে ন্যুব্জ বাবা-মা ছাড়াও সংসারের দায়িত্ব পুরোপুরিভাবে তার উপর এসে পড়েছে। বাজার করা, রান্না করা ছাড়াও সংসারের যাবতীয় কাজ এক হাতে করে ছেলেটা। ইতিমধ্যে ত্রিশটি বসন্ত পার করে ফেলেছে সে। কাকা-জ্যাঠাদের হাতে করে দেওয়া যতটুকু সম্পত্তি সে পেয়েছে, সেগুলো সে আগলে রেখেছে বুক দিয়ে।

বাবা-মা অরিন্দমের কাছে শুধুমাত্র দু’টো শব্দ নয়, তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। আর তাই সে বাবা-মা’কে সেবা করে যায় নিজের মনের মত করে। একদিন ছিল, যেদিন অরিন্দম সমস্ত রাগ দেখিয়েছে তার মা’কে। আবার ঠিক তার পরে মা’কে জড়িয়ে ধরেছে, প্রাণভরে মায়ের স্নেহের পরশ মেখেছে সমস্ত শরীরে।

এইভাবে পেরিয়ে যায় বেশ কয়েকটি বছর। ওর বাবা-মা আজ আর পৃথিবীতে নেই। বাবা-মা হীন শূন্য ঘরে বড্ড একাকীত্ব বোধ করেছিল সেদিন অরিন্দম। আজ ওর পাশে ওর সহধর্মিণী আছে বটে, কিন্তু বাবার বালিশের পাশে একলা চশমাটা ওকে বড় কষ্ট দেয়। ছেলেবেলায় আঙুল ধরে হাঁটতে শিখিয়েছিলেন যে বাবা, যাঁর সহায়তায় অরিন্দম একটু একটু করে উঠে দাঁড়িয়েছিল, আজ সে হারিয়ে গেছে সময়ের গভীর ঢেউয়ে।

আজ হাজারও মানুষ অরিন্দমের পাশে আছে। কিন্তু মায়ের সেই ছায়া শীতল আঁচলের নিচে বসে থাকার মত সময় সে হারিয়েছে। এখন সে সংসারী হয়েছে, কাজ বেড়েছে অনেক। সময়ের সাথে সাথে সে বাবা-মায়ের ভালবাসা, স্নেহের বন্ধন ছিন্ন করে ধীরে ধীরে বাস্তবের পথে নামে।

আজকাল আর ভাল করে ঘুমোতে পারে না অরিন্দম। ওর মাঝে মাঝে মনে হয়, “ভোরবেলা হঠাৎ করে যদি বাবা একটি বার ফিরে আসত, দুজনে মিলে সংসারের জটিল অঙ্কগুলো সমাধান করে নিতাম।” আবার কখনও কখনও তার মনে হয়েছে, “যদি মা একটি বার ফিরে আসত, হাঁটতাম তার আঙুল ধরে আমি।” আজ এতগুলো বছর পরে যখন কষ্ট, যন্ত্রণা ওকে ছুঁয়ে দিয়েছে, মনে মনে সে বলে উঠেছে, “বড় ইচ্ছে করে তোমার আদরে আরও একবার ঘুমিয়ে পড়তে।”


লেখক পরিচিতি : অর্দ্ধেন্দু গায়েন
জন্ম উত্তর চব্বিশ পরগনার যোগেশগঞ্জের মাধবকাটী গ্রামে।পেশায় সরকারী চাকুরী হলেও নেশা পড়াশোনা , ইচ্ছে হলেই লেখা-সে কবিতা, ছোটগল্প, অণুগল্প, প্রবন্ধ যা কিছু হতে পারে, অবসরে বাগান করা,ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাদের সঙ্গে খেলা ইত্যাদি।তবে সব পরিচয়ের সমাপ্তি ঘটে সৃষ্টিতে --পাঠক যেভাবে চিনবেন আমি সেভাবেই থেকে যাবো।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up