জ্বর

লেখক : অর্পিতা সাহা

জানালার দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে বসেছিল পলাশ। বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে। তিনদিন হ’ল ওর ভীষণ জ্বর। আজ সকাল থেকে জ্বরটা ছেড়েছে, কিন্তু মুখটা ভীষণ তেতো – সব কিছু বিস্বাদ লাগছে। গোটা পাড়া জলমগ্ন, কাজের মেয়েটা এ’বেলা আসবে না। চাকরী সূত্রে বাড়ি ছেড়ে দূরে থাকা… একটু আগে আদা দিয়ে গরম চা খেয়ে শরীরটা একটু ফ্রেশ লাগছে। Antibiotic এর স্ট্রিপটা শেষ করতে আরও কিছুদিন লাগবে। মাথাটা ধরে আছে এখনও, একটা প্যারাসিটামল জল দিয়ে গিলে নেয় ও। ওষুধ খেতে বড় বিরক্ত লাগে ওর চিরকালই, কিন্তু উপায় নেই। পলাশ অকৃতদার, পিছুটানহীন। দাদা-বৌদির সংসারে ও চিরকালই ব্রাত্য ছিল…

রান্নাঘরে গিয়ে এক মুঠো ভরে সমান সমান চাল-ডাল মেপে সবজি দিয়ে খিচুড়ি চাপায়। আজ রাতটা খিচুড়ি আর ডিম ভাজা দিয়েই চালিয়ে দেবে। গ্যাসের আঁচটা লাল হয়ে জ্বলছে, কে জানে গ্যাসটা শেষ হয়ে আসছে কি না। অ্যাপে চোখ বুলিয়ে নিতে হবে লাস্ট কবে ডেলিভারী হয়েছে। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর সংসারের খুঁটিনাটির খেয়াল রাখা সত্যিই বড় কঠিন কাজ। মায়েরা-মেয়েরা এই কঠিন কাজটা দশভূজা হয়ে নিত্য সামলায়। বন্ধুরা প্রায়ই বলে, “পলাশ, একটা বিয়ে কর।” কিন্তু ওর কেন জানি না সংসারের মায়ার বাঁধনে নিজেকে বড় একটা বাঁধতে ইচ্ছে করে না।

শরীরটা বেশ দুর্বল। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেই মাথা ঘুরছে। কিন্তু মা বলত, শরীর খারাপ হ’লে ওষুধের সাথে পথ্যিও খেতে হয়, তবেই তো দ্রুত সুস্থ হওয়া যায়। হাত পুড়িয়ে নিজে রান্না শিখে নিয়েছে ও। আসলে জীবন আর সময় যে মানুষকে কত কিছু শিখিয়ে দেয়। মায়ের সেই বাবু আজ কত্ত পরিণত, মা যদি দেখত। হয়ত দেখছেন বাবাও…

একটু আদা-কাঁচা লঙ্কা গ্রেট করে নেয়, তারপর শুকনো খোলায় জিরে ভাজা গুঁড়ো করে রাখে। বড্ড খুঁতখুঁতে ও রান্নার ক্ষেত্রে। তাই অসুস্থ শরীর নিয়েও না মেপে কাজ করতে পারে না। বাইরে বোধহয় বৃষ্টিটা আবার জোরে এল। পাশের বাড়ির টিনের চালে চড়বড় আওয়াজটা মনে একটা মিঠে অনুভূতি ছড়িয়ে দিচ্ছে। মোবাইলে সানডে সাসপেন্স চালিয়ে দেয়। মীরের কন্ঠে একটা ভূতের গল্প, হেমেন্দ্রনাথ রায়ের – বড় প্রিয় গল্প, বহুবার পড়েছে আগে। পলাশ ভূতে ভয় পায় না, মানুষকে ভয় পায়। কত মানুষের কত রূপ জীবনের নানা সময়ে সে দেখেছে, কত পরিচিত বিপদে অপরিচিত হয়ে গিয়েছে, কত অচেনা ভাল মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছে অসময়ে।

আজ ওকে চিন্তায় পেয়েছে। এমন অখণ্ড অবসর তো অসুস্থ হ’লেই মেলে। মায়ের হাতের ছোঁয়া, গাওয়া ঘি আর ভাজা মশলা দেওয়া সেই ভোগ খিচুড়ির কথা মনে পড়ে। গোবিন্দভোগ চাল আর সোনামুগ ডালের গন্ধে বাড়ি ম-ম করত। সঙ্গে পাঁপড় ভাজা, বেগুনি কিংবা ইলিশ ভাজা। চোখে জল এসে যায়, মা-মা গন্ধটা সারা ঘরে। মায়ের ছবিতে মায়ের মুখটা খুব উজ্জ্বল লাগছে আজ। খেতে বসে দেখে খিচুড়িটা সত্যিই ঠিক তেমন হয়েছে, মায়ের মত। সত্যিই কি মা আছে এখন সাথে? সানডে সাসপেন্সে মীর বলে চলেছে, “আমাদের আশপাশে প্রায়ই এমন কিছু ঘটনা ঘটে, বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলে না।” জ্বরটা এসে এক প্রকার ভালই হয়েছে, কত পুরনো স্মৃতি ছুঁয়ে গেল মন।

হঠাৎ যেন মায়ের গলা। “বাবু, খেয়েদেয়ে উঠে এক বার বাষ্প নিস তো। তোর গলাটা বড্ড বসে গেছে, বুকে কফ জমেছে…” মা steam inhalation কে বাষ্প নেওয়া বলত। হঠাৎ খেয়াল হয় ওর পড়ার টেবিলের পাশে steam inhaler-টা রাখা। একটুও ধুলো জমে নি ওর গায়ে, অথচ শেষ কবে ও ব্যবহার করেছে মনে করতে পারছে না। তবে কি মা এসেছে? জ্বর আসছে নাকি ওর তাই ভুলভাল ভাবছে। হঠাৎ একটা দমকা বাতাস এল ঘরের ভিতর। পলাশ ডেকে উঠল, “মা…”


লেখক পরিচিতি : অর্পিতা সাহা
আমি অর্পিতা সাহা। প্রাণীবিদ্যা নিয়ে স্নাতকোত্তর করে বর্তমানে একটি সরকার পোষিত স্কুলের শিক্ষিকা।বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লিখি ...লেখা আমার খুব ভালোলাগার জায়গা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up