লেখক : রিঙ্কু চট্টোপাধ্যায়
১
কলকাতা নয়, মফস্বলের একটি সদ্য গড়ে ওঠা ইউনিভার্সিটিতে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা প্রেরণা তিনবছর ধরে ডক্টর মণিময় ঘোষালের আণ্ডারে পিএইচডি করছিল। যদিও ডক্টর ঘোষাল ওর গাইড, কিন্তু সেভাবে সাহায্য করা তো দূরস্ত, একটা পেপার অবধি ফরওয়ার্ড করে দেন নি। মেধাবী প্রেরণার নিজের চেষ্টায়, সিনিয়রদের সাহায্যে কোনরকমে একটা পেপার ন্যাশনাল জার্নালে এক্সেপ্ট হয়েছে। এদিকে তিনবছর পার হয়ে গেল।
ফাল্গুনের বাতাসে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। পশ্চিমের এই মফঃস্বল শহরের এক প্রান্তে নতুন গড়ে ওঠা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ অধ্যাপকই মহানগরীর আশপাশ থেকেই এসেছেন। সরল, নিরীহ ছেলেমেয়েগুলো, যাদের বাইরে পড়তে যাবার ক্ষমতা নেই, তাদের কাছে উচ্চশিক্ষা আজ হাতের মুঠোয়। প্রেরণার মত কল্পা, সূচিতা, বিনায়ক, অম্লান ও আরও কত ছেলেমেয়ে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে, এমনকি পাশের রাজ্যের ছেলেমেয়েরাও নানা বিষয়ে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা করছে এই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওদের কাছে গঙ্গাতীরের উচ্চশিক্ষিত, কলকাতার ভাষায় কথা বলা অধ্যাপকেরা ভগবানের সমান।
মণিময় ঘোষাল ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের কোয়ার্টারে একাই থাকেন। ওনার স্ত্রী পূর্বা কলকাতার একটি নামী কলেজে আছেন; একই কলেজের সহপাঠী ছিলেন দু’জন। বড় ছুটি পড়লেই স্যার বাড়ি যান, আর সাধারণ ছুটির দিনগুলোতে ছাত্রছাত্রীদের কোয়ার্টারে ডেকে নেন। তেমনই এক রবিবারে প্রেরণা গিয়েছিল।
“স্যার তিনবছর হয়ে গেল, স্টাইপেণ্ড তো আর পাব না। আমার মোটামুটি থিসিস রেডি। শুধু আপনি অ্যাপ্রুভ করে দিলেই…”
মণিময় স্যার মিষ্টি করে প্রেরণাকে কাছে ডেকে নেন, “আরে, এত ভাবছিস কেন? আয় আয় বোস, দেখি কী করেছিস।”
ল্যাপটপ খুলে দেখাতে যেতেই প্রেরণা কুঁকড়ে ওঠে, “স্যার, কি করছেন? প্লিজ স্যার, ছেড়ে দিন।”
“আরে, এত লজ্জা কিসের? তোর সিনিয়র দিদিদের কাছে জেনে নিস নি, কীভাবে থিসিস কমপ্লিট করে ওরা ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছে? মনামী যে জার্মানি গিয়েছে, কার রেফারেন্সে? তুইও যেতে পারবি, অনেক দূর। কিন্তু মামণি, তার আগে যে এইটুকু গুরুদক্ষিণা দিতেই হবে। হাঃ হাঃ হাঃ!”
বড় বড় চোখে স্যারের দিকে চেয়ে থাকে প্রেরণা, তার সমস্ত শ্রদ্ধা ঘৃণায় পরিণত হয়। চোখে ভেসে ওঠে সিনিয়র দিদিগুলোর মুখ, যারা আজ স্ব-স্ব ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। তাহলে মেধা নয়, নিজের সর্বস্ব দিয়েই আজ ওরা প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু প্রেরণা তা পারবে না, কিছুতেই না, ও ঠিক করে নেয় ফিরে যাবে তার গ্রামে। বন্ধ দরজার ভিতরে তথাকথিত শিক্ষিত অধ্যাপকের আদিম লালসার শিকার হতে পারবে না বলেই, মাথার ক্লিপ খুলে মণিময়ের চোখে ফুঁড়ে দিতে যায় প্রেরণা। কিন্তু মণিময়ের তাৎক্ষণিক তৎপরতায় চোখ বাঁচলেও গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে রক্ত, যন্ত্রণায় দু’হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়েন বিকৃতকাম অধ্যাপক মণিময় ঘোষাল। প্রেরণা ল্যাপটপ তুলে, দরজা খুলে বেরিয়ে যাবার আগে অগ্নিঝরা চোখে অভিশাপ দিয়ে যায়, “আজ যেভাবে কন্যাসমা মেয়েগুলোকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে নিজের কামনা চরিতার্থ করছেন, একদিন আপনার কন্যাসন্তানও এই রকমই কারও কাছে প্রতারিত হবে, কর্মফল আপনি পাবেন স্যার। মনে রাখবেন, সব হিসাব উপরে লেখা থাকবে।”
সেদিন প্রেরণা সেই যে বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দি ত্যাগ করেছিল, আর ফেরেনি। ও জানত, ও যদি প্রতিবাদ করে, অভিযোগও জানায়, কেউ ওর পাশে থাকবে না। কলেজে পড়ার সময়, টিউশন পড়তে গিয়ে বেশ কিছু অধ্যাপকদের বিরুদ্ধে এমন কানাঘুষো শোনা গেলেও আজও কোন ছাত্রীকে তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে দেখেনি প্রেরণা। থানা-পুলিশ করেও কয়েকজন বিচার পায়নি, উলটে দেখেছে দোষী অধ্যাপকেরা প্রমাণের অভাবে বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। চোখের সামনে ঘটতে দেখেছে এ রাজ্যে জবা, মাম্পি, হাঁসখালি, আর জি করের ঘটনা। যেখানে শাসকই ভক্ষক সেখানে শাসক পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের তো সাতখুন মাফ।
তাই প্রেরণা ফিরে এসে, আরও মেয়েদের প্রেরণা হতে চেয়েছে। নিজের গ্রামে একটা কোচিং সেণ্টার খুলেছে, সেখানে বিষয়ের বাইরেও মেয়েদের সে আপন তেজে জ্বলে ওঠার শিক্ষা দেয়। আশেপাশের গ্রাম থেকেও মেয়েরা আসে তার কাছে স্বনির্ভরতা,আত্মসম্মানের সঙ্গে বাঁচার আর সমঝোতা না করার পাঠ নিতে।
২
মণিময় ঘোষাল আজও ভুলতে পারে না প্রেরণার সেই অগ্নিঝরা চোখ আর তার বলা শেষ কথাগুলো।
আজ মণিময়ের স্ত্রী পূর্বা কলকাতার একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে ভর্তি। একটু পরেই তিনি বাবা হবেন। কিন্তু যেদিন থেকে শুনেছেন পূর্বা প্রেগন্যাণ্ট, সেদিন থেকে প্রায় প্রতিদিনই আয়নায় নিজের গালের কাটা দাগটা নজরে পড়লেই প্রেরণাকে দেখতে পান মণিময়। সেই জ্বলন্ত চোখ, আর অভিশাপের কথাগুলো দৈববাণীর মত তাঁর অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দেয়।
“আজ যেভাবে কন্যাসমা মেয়েগুলোকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে নিজের কামনা চরিতার্থ করছেন, একদিন আপনার কন্যাসন্তানও এই রকম কারও কাছে প্রতারিত হবে, কর্মফল আপনাকে পেতেই হবে।”
“সত্যিই যদি মেয়ে হয়?” মণিময় ভেতরে ভেতরে আতঙ্কিত হন।
“হ্যালো, মিস্টার ঘোষাল, সুখবর,আপনার ছেলে হয়েছে, মিসেস ও বাচ্চা দুজনেই ভালো আছে। মিষ্টি খাব কিন্তু।”
হঠাৎই নার্সের এই কথায় উজ্জীবিত হন মণিময়। মনে মনে বলেন, “হুঃ! অভিশাপ দিচ্ছে, আমি আবার এত ভয় পাচ্ছিলাম। মেয়ে তো নয়, আমার ছেলে হয়েছে। বলে কিনা কর্মফল। এত টাকা খরচ করে প্রফেসরের চাকরিটা জুটিয়েছি। কয়েকটা মেয়েকে যদি উপরে ওঠার পথ দেখাতে গিয়ে একটু ইণ্টুমিণ্টু করেইছি, তাতে কী এমন দোষ, এ তো পুরুষের ধর্ম।”
তাড়াতাড়ি করে ছেলে হওয়ার সুখবরটা টাইপ করে সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়ে একটা তৃপ্তির হাসি হাসলেন মণিময়।
৩
পাঁচ বছর পর…
মণিময় ঘোষাল শাসকদলের আস্থাভাজন হয়ে আজ শিক্ষাদপ্তরের সচিব, মহানগরীতেই বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, দামী গাড়ি, বাড়িতে অধ্যাপিকা স্ত্রী, ফুটফুটে ছেলে সাম্যকে নিয়ে সুখের সংসার, গালের দাগটাও হালকা হয়ে গেছে সময়ের সাথে সাথে। ভুলেই গেছেন সেই প্রেরণাকে, তার দেওয়া অভিশাপ যে মিথ্যে হয়েছে।
কিন্তু…
একদিন জরুরি মিটিংয়ে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে দেখেন, ফাইলটা ফেলে এসেছেন। কাউকে দিয়ে যে আনাবেন,তারও উপায় নেই। বাড়িতে পূর্বা নেই, কাজের মেয়েটা পারবে না। তাই নিজেই আবার লিফটে উঠে বেল বাজালেন। দরজা খুলল ছোট্ট সাম্য।
কিন্তু এ কী! সাম্য কী সেজেছে? মায়ের লাল ওড়না দিয়ে শাড়ি পরে মাথায় ঘোমটা, চোখে কাজল, ঠোঁটে লাল লিপস্টিক।
“এ কী সাম্য, এ কী করেছ? নবনী,নবনী… সাম্য কী সেজেছে? দেখো নি? এখনই সব মুছিয়ে ওকে শার্ট প্যাণ্ট পরাও।” ফাইল হাতে নিয়ে গর্জে ওঠেন শিক্ষাসচিব মণিময় ঘোষাল।
নবনী ছুটে এসে সাম্যকে জড়িয়ে ধরে বলে, “স্যার, আপনি আর ম্যাডাম বাইরে গেলেই সাম্য আমার কাছে মেয়ে সাজতে চায়। ওর নাকি মেয়ে হতে ইচ্ছে করে।”
“কী? যতসব মেয়েলি ইচ্ছে। আর যদি কোনদিন শুনেছি, চাবকে তোমার পিঠের ছাল তুলে নেব। আর নবনী। কান খুলে শুনে নাও। এ বাড়িতে টিকে থাকতে গেলে আমার কথা মানতে হবে। ওর কোন অন্যায় আবদার প্রশ্রয় দেবে না। মনে থাকে যেন।” ফাইল হাতে বেরিয়ে যান মণিময়।
আর বন্ধ দরজার ভেতরে সেই দিন থেকে ছোট্ট সৌম্য নিজেকে বন্দী করে ফেলে গোপনীয়তার অন্ধকারে।
৪
দিন, মাস, বছর কেটে গিয়ে সৌম্য বড় হয়ে কলেজে ভর্তি হয়। কিন্তু ওর হাবভাবের মেয়েলিপনা দূর হয় না। বিখ্যাত বাবার সন্তান, তাই সামনে কেউ না বললেও পিছনে অনেকেই ওকে নিয়ে হাসাহাসি করে। আবার এই কলেজেই ও খুঁজে পায় কলতানকে; যে ওর অন্তরের নারীত্বকে সম্মান করে। দু’জনে দু’জনের প্রতি নিবিড় আকর্ষণ অনুভব করে। কলেজ পাশ করে দুজনে মিলে একটা সফটওয়্যার কোম্পানি খোলে। বেশিরভাগ সময় কলতানের সাথেই কাটায় আজকাল সাম্য।
বাবা মণিময় ঘোষাল প্রবীণ হয়েছেন, আর কিছুদিন পর অবসর নেবেন। তার আগে ছেলের বিয়ে দেবার জন্য পাত্রীর সন্ধান করছেন। এক সন্ধ্যায় সাম্যকে ডেকে বেশ কয়েকটি মেয়ের ছবি দেখিয়ে বলেন, “এদের মধ্যে কাকে পছন্দ? তার সাথেই বিয়েটা ফাইন্যাল করব।”
সাম্য কোন ছবির দিকে না তাকিয়ে বলে, “তোমরা আমার ভেতরের সত্ত্বা কী চায়ম কোনদিন তো জানতে চাওনি বাবা? ছোটবেলা থেকে মনে প্রাণে আমি নারী। আমার এই শরীরটা পুরুষের হলেও মনে মনে আমি কলতানকে ভালবাসি বাবা। ও আমাকে বহুবার অনেক অপমান থেকে বাঁচিয়েছে, সহপাঠীদের বিদ্রূপের জবাব দিয়েছে। তাই ওকে তো আমি ঠকাতে পারব না। ঠিক করেছি আমরা দুজন সারাজীবন একসাথে থাকব।”
“কী? মণিময় ঘোষালের ছেলে হয়ে তুই আমার নাম ডোবাবি? আজ এই মুহূর্তে তুই দূর হয়ে যা। আজ থেকে এই ঘরের দরজা তোর জন্য বন্ধ।” উত্তেজনায় কাঁপতে থাকেন মণিময়।
কোন কথা না বলে গতবছর জন্মদিনে বাবার উপহার দেওয়া ফোর্ড এণ্ডাভরের চাবিটা টেবিলে নামিয়ে রেখে দরজা খুলে বেরিয়ে যায় সাম্য।
পরদিন খবরের শিরোনামে উঠে আসে দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী ক্ষমতার শীর্ষে থাকা মণিময় ঘোষালের ছেলের গৃহত্যাগের কারণ। ড্রইংরুমের বড় স্ক্রীনে ফুটে উঠেছে খবরটা, ফ্ল্যাটের নীচে সমস্ত খবরের কাগজ, টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকদের ভিড়। সেদিকে তাকিয়ে মণিময় ঘোষাল ফিরে যান ত্রিশ বছর আগের সেই অতীতে।
যৌবনের তাড়নায় কত মেয়ের সর্বনাশ করেছিলেন। ভেসে ওঠে তাদের মুখগুলো, বিশেষ করে মনে পড়ে যায় সেই চোখদু’টো। আয়নায় প্রকট হয় গালের সেই ক্ষতটা। এভাবেই কি সত্যি হল প্রেরণার বলা কথাগুলো? কর্মফল তাহলে ভবিতব্য? শিক্ষার আলোয় আলোকিত হতে আসা মেয়েগুলোকে স্বপ্ন দেখিয়ে যেভাবে তাদের শরীর নিয়ে দিনের পর দিন খেলা করেছেন, ডিগ্রি আটকে দেবার ভয় দেখিয়ে যেভাবে তাদের মুখ বন্ধ করেছেন, তার প্রতিফল কি তবে এই? ভেবেছিলেন, কন্যা নয়, পুত্রের বাবা তিনি, তাই কর্মফল-টল বোগাস, তাঁর জন্য নয়। কিন্তু উপরে যে লেখা হয়ে যায় সব দুষ্টকর্মের হিসাব, যার ফল এ’জন্মেই ভোগ করতে হয়, সে যেভাবেই হোক।
মণিময়ের মাথায় ঘুরপাক খায় তিরিশ বছর আগের সদ্য কৈশোর ছাড়িয়ে আসা সরল মেয়েটির বলা সেই কথাগুলো,
“স্যার, কর্মফল আপনাকে পেতেই হবে, পেতেই হবে স্যার।”
লেখক পরিচিতি : রিঙ্কু চট্টোপাধ্যায়
রিঙ্কু চট্টোপাধ্যায় পুরুলিয়ার এক সাধারণ পরিবারে জন্ম।

