স্কুল

লেখক : দীপঙ্কর বেরা

বহু আশা নিয়ে শিশুরা স্কুলে যায়, সকাল সকাল ঘুম চোখে দৌড়াদৌড়ি করে স্কুলে যায়, বাবা-মার বকাঝকার ভয় নিয়ে স্কুলে যায়, কেউ বাস ধরে, কেউ সাইকেলে, আবার কেউ হেঁটে স্কুলে যায়।
প্লিজ, ওদের পড়া দেওয়া পড়া নেওয়া যেন হয়।
প্লিজ, ওদের হোমওয়ার্কের খাতা যেন চেক হয়।
প্লিজ, ওদের আর একটু ভাল করে যেন পড়া বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
প্লিজ, ওদের এক-দু’ পিরিয়ড ক্লাস নিয়ে বাদবাকি সময় যেন বসিয়ে রাখা না হয়।
প্লিজ, পুরো সিলেবাস রুটিনমাফিক যেন পড়ানো হয়।
প্লিজ, ওদের যেন আবার টিউশনে গিয়ে ডবল পরিশ্রম করতে না হয়।
প্লিজ। প্লিজ। প্লিজ।
প্লিজ, স্কুলে গিয়েই যেন শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়, চারিত্রিক দৃঢ়তা যেন তৈরি হয়, দেখে শেখার সম্পূর্ণ ব্যবস্থা যেন হয়। অমুক স্যারের কাছে অনেক কিছু শিখেছি – এই অমুক স্যার যেন কোন টিউশন শিক্ষক না হয়।

ওরা বড় হয়ে কী হবে আমরা জানি না। শুধু চাকরি পাওয়ার আশা নিয়ে কেউ যেন স্কুলে না যায়। যেন কিছু শিখতে পারে, সেই নিশ্চিত ব্যবস্থা যেন স্কুলে পায়। যেন আজকের ক্লাস মিস হ’ল বলে ওরা আফসোস করে। যেন শিক্ষকের মুখের কিছু কথা শোনার জন্য আগ্রহ বাড়ে। সেই পাঠশালা থেকে আজকের স্কুল – শিক্ষার মসৃণ অববাহিকা, ছাত্রছাত্রীদের জ্ঞান অবগাহনের স্বচ্ছতোয়া। তা যেন কোনভাবে নষ্ট না হয়ে যায়, তা দেখার দায়িত্ব হোক শিক্ষক-শিক্ষিকার এবং স্কুলের।

পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ হ’ল পড়াশুনা করা। শিশুরা সবচেয়ে কঠিন যে কাজটি করছে, তাকে সহজে পরিণত করার একমাত্র তীর্থক্ষেত্র হল স্কুল। সেখানে যত খুশি, যত আনন্দ, যত অভিজ্ঞতা, যত পারস্পরিক মেলামেশা, যত জ্ঞান, যত মর্যাদা তৈরি হবে, ততই প্রতিটি শিশু নিজেকে চিনবে। তার এবং দেশের-দশের আগামী মজবুত হয়ে গড়ে উঠবে। পরবর্তীতে পড়াশুনার মত কঠিন বিষয়বস্তু তাদের কাছে যেন সহজরূপে ধরা দেয়। কেন না পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া অত সহজ না। আমরা ক’জন আর পড়াশুনা করি? অনেকেই কর্মক্ষেত্রে ঢুকে নতুন কিছু পড়া ভুলেও পড়ি না। বর্তমানে মোবাইল-ট্যাব-ল্যাপটপ ইত্যাদির সৌজন্যে বইয়ের সঙ্গে অনেকের আর তেমন সম্পর্ক নেই। স্কুলের যতটুকু অর্জন করেছি তাই দিয়েই বাকি সারাটা জীবন চলতে থাকে।

কিন্তু যাদের কাছে স্কুল পড়াশুনার তীর্থক্ষেত্র হিসেবে পরিগণিত হয়েছে, তারা কখনও বই ছাড়ে নি। ক্লাসের পড়ার সাথে সাথে পড়াশুনার অন্যান্য দিক তাদের কাছে উদ্ভাসিত হয়েছে। তারা সারাজীবন বই বা বইসংক্রান্ত কোন না কোন বিষয়ে জড়িয়ে আছে। তা তার সেই স্কুল জীবনের ভাল অভিজ্ঞতা ফসল। তাই স্কুল যেন শিশুর কাছে বিমুখ না হয়। পড়াশুনা চর্চার যে কিশলয় দিগন্ত, তা যেন কোনভাবে মেঘে না ঢেকে যায়। স্কুলের মত, স্কুলজীবনের মত, স্কুলজীবনের বন্ধুর মত আর কোন জীবন নাই।

তাই এই ভগ্ন সময়ে (যদিও আমি মনে করি সব সময় সুসময় অথবা দুঃসময় যে যার দৃষ্টিতে) শিক্ষকদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। স্কুলে সিস্টেমের অবস্থানের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। কারণ স্কুল মানে বিল্ডিং-প্রার্থনা-চক-ডাস্টারের সাথে সাথে শিক্ষক-শিক্ষিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেন না শিক্ষার্থীর যাবতীয় বিমুখ ভাবনাকে শিক্ষামুখী করে তোলার দায়িত্ব শিক্ষক-শিক্ষিকার, স্কুলের। প্লিজ, প্লিজ, আপনারা ছাত্রছাত্রীদের বিমুখ করবেন না। যতটুকু পারেন, যতটা পারেন, পড়ান, শেখান। শিক্ষার অঙ্গন গড়ে তুলুন। শিক্ষার ও শিক্ষকের কোন বিকল্প নেই। প্লিজ, স্কুলকে সবার জীবনের সেরা সময় হিসেবে তুলে ধরুন।

সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছু আমাদের চলে যাচ্ছে। তবু যেটুকু, যতটুকু আছে, তাকে ধরে রাখার পূর্ণ দায়িত্ব স্কুলের। বাড়িতে ফিরে তারা স্কুলের সুখময় স্মৃতিতে পড়াশুনায় চালিয়ে নিয়ে যেতে পারে। ছাত্রছাত্রীদের সারাজীবন যেন স্কুলের পড়াশুনার মত পড়ায় মন থেকে যায়।


লেখক পরিচিতি : দীপঙ্কর বেরা
আমার লেখা আমার পরিচয়

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up