দ্য নেকলেস

লেখক : কাজী রাহ্‌নুমা নূর

মূল গল্প: দ্য নেকলেস
মূল গল্পের লেখক: গাই দে মঁপাসাঁ


ম্যাতিলদা সেই সুন্দরী এবং আকর্ষণীয়া মেয়েদের মধ্যে একজন ছিল, যে ভাগ্যের ছোট্ট একটা ভুলের কারণে একটি গরীব কেরানি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিল। তার বিয়েতে কোন যৌতুক ছিল না, তেমন কোন প্রত্যাশাও ছিল না। এমনকি বিত্তবান আকর্ষণীয় পুরুষের সাথে পরিচিত হওয়ার, তাদের ভালবাসার বা বিয়ে করার কোন সুযোগও তার ঘটেনি। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন ছোট কর্মকর্তার সাথেই শেষমেশ তার বিয়ে হয়। বিয়েতে সে সাদাসিধে পোশাক পরেছিল, কারণ এর চেয়ে ভাল কিছু কিনে দেওয়ার ক্ষমতা তার পরিবারের ছিল না। সে তার ভাগ্য নিয়ে যে পরিমাণ অসুখী ছিল, যে কেউ ভাববে সে হয়ত কোন ধনী পরিবারে জন্মেছিল, কিন্তু তার গরীব পরিবারে বিয়ে হয়েছে।

নারী কখনও কোন বর্ণ বা শ্রেণিভুক্ত হয় না। তাদের সৌন্দর্য, আচার আচরণ – এসবই সে যে পরিবারে জন্মায় এবং যে পরিবেশে বড় হয়, সেসবকে ঘিরেই গড়ে ওঠে, এবং প্রাকৃতিকভাবেই সে তার কমনীয়তা, বুদ্ধিমত্তা এবং নিজেকে প্রকাশ করবার ক্ষমতা দেখিয়ে সমাজে তার স্থান দখল করে নেয়। এভাবেই একজন সাধারণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা মেয়েও খুব সহজে উঁচু শ্রেণীর মহিলাদের সাথে উপযুক্ত পরিবেশে সহজেই মানিয়ে চলতে পারে।

ম্যাতিলদা মানসিকভাবে সীমাহীন কষ্ট সহ্য করছিল। কিছুতেই তার এই মন্দভাগ্যকে মেনে নিতে পারছিল না। কেন তার বয়সী একটা মেয়ে রূপে-গুণে-মেধায় একই হওয়া সত্ত্বেও বিশাল বাড়িতে থাকবে, আর তার চারপাশ ঘিরে থাকবে ময়লা দালানের ছোট্ট একটা ঘর? অন্য মেয়েদের মত বিলাসিতা পাওয়ার অধিকার কেন তার থেকে কেড়ে নেয়া হ’ল, সেটা সে কিছুতেই বুঝতে পারে না। তার ঘরের নোংরা দেয়াল, জীর্ণ চেয়ার এবং কুৎসিত পর্দার দিকে তাকিয়ে সে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ছোট্ট ব্রেন্টন মেয়েটি, যে তার ঘরের কাজ করত, তার সাথে আমার আর কতটুকুই বা পার্থক্য আছে? মনে মনে ভাবে সে।

কল্পনায় সে দেখতে পায় একটি বিরাট বাড়ি, পাহারাদার দরজায় দাঁড়িয়ে, চারপাশ আলোয় ঝকঝক করছে, চারপাশে দামী সব আসবাবে সাজানো। দু’জন লম্বা ফুটম্যান বিশাল আর্মচেয়ারে ঘুমচ্ছে, ফায়ারপ্লেসের আগুনে চারপাশ গরম হয়ে আছে। তার স্বপ্নের শোবার ঘরে বিশাল একটি খাট এবং সে খাটে খুব সুন্দর দামী সিল্কের চাদর বিছানো, বসার ঘরটা দুষ্প্রাপ্য কিন্তু খুব মার্জিত আসবাবপত্রে সাজানো। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সাথে বিকেলে আড্ডা দেওয়ার জন্য তৈরি রয়েছে একটি আলাদা ঘর, যে ঘরে ঢুকতেই চারপাশের সুগন্ধ মনকে বিভোর করে। সেখানে আসা যাওয়া করছে বিখ্যাত সব নামকরা পুরুষরা, যাদের সাহচর্য পেতে সমাজের সব মহিলারা হুমড়ি খেয়ে পড়ে।

সে যখন তার স্বামীর উল্টোদিকে তিনদিনের পুরনো টেবিল ক্লথে ঢাকা একটি গোল টেবিলে ডিনার করতে বসে, তার স্বামী স্যুপের ঢাকনা তুলে উত্তেজিতভাবে চিৎকার করে বলে, “আহ! গরুর মাংসের স্টু! এর চেয়ে ভাল আর কী হতে পারে,” ঠিক তখন সে স্বপ্ন দেখে জাঁকজমকপূর্ণ নৈশভোজের, চকচকে রূপার পাত্র, ঝকঝমে চামচ, টেবিলজুড়ে নানা পদের খাওয়াদাওয়া। চারপাশে নানা বীরত্বপূর্ণ গল্প চলছে – রহস্যময় বনে দেয়ালের গায়ে আদিবাসীদের চিত্র খুঁজে পাওয়া, অস্পষ্ট হাসি দিয়ে কবে কে ট্রাউটের গোলাপী মাংস বা কোয়েলের ডানা মজা করে খেয়েছিল তা বলতে থাকা। 

ম্যাতিলদার কোন দামী পোষাক বা দামী গয়না ছিল না। অথচ সে বিশ্বাস করত, পৃথিবীর যা কিছু সুন্দর, তা শুধুই তার জন্য তৈরি হয়েছে। আর কারও ওসব জিনিস পরার অধিকার নেই। সে চাইত পুরুষরা তার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকুক, অন্য নারীরা তার ভাগ্য দেখে ঈর্ষান্বিত হোক। এটা কি খুব বেশি চাওয়া ছিল? সে ভাবে।

তার এক ধনী বন্ধু ছিল, যে একসময় তার প্রাক্তন সহপাঠী ছিল। কিন্তু তার অনেক ধনী ব্যক্তির সাথে বিয়ে হয়েছিল। সেই বান্ধবী একদিন তার বাড়িতে এসেছিল আর বান্ধবী চলে যাওয়ার পর তার সারাটা দিন দুঃখ, অনুশোচনা, হতাশায় ভরে গিয়েছিল। সেদিন সে অনেকক্ষণ ধরে কেঁদেছিল।

একদিন সন্ধ্যায় তার স্বামী একটি বড় খাম হাতে নিয়ে বিজয়ের বেশে বাড়ি ফিরল। “দেখো,” সে বলল, “তোমার জন্য এখানে কি আছে দেখো।”
ম্যাতিলদা খামটা ছিঁড়ে ভেতরে একটা কার্ড পেল, যার উপর লেখা ছিল:
“শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের তরফ থেকে জর্জ রাম্পনিউ জনাব এবং জনাবা লয়জেলকে সোমবার আঠারই জানুয়ারী সন্ধ্যায় ডিনারে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।”
খুশি হওয়ার পরিবর্তে, (তার স্বামী যেমন আশা করেছিল), সে বিরক্তিভরে আমন্ত্রণপত্রটি টেবিলে ছুঁড়ে ফেলল এবং বিড়বিড় করে বলল, “তুমি আমাকে এটা দিয়ে কি বোঝাতে চাইছ? আমি ওটা দিয়ে কি করব?”
“কিন্তু, আমার প্রিয়, আমি ভেবেছিলাম তুমি খুশি হবে। তুমি তো কখনই বাইরে যাওয়ার সুযোগ পাও না। এটা খুবই জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান, সমাজের উঁচুতলার মানুষেরা এই অনুষ্ঠানে আসবে। এমন একটি সুন্দর অনুষ্ঠানে তুমি যেতে চাও না? তুমি জানো, এই দাওয়াতটি পেতে আমাকে কত খাটতে হয়েছে? কতজনকে অনূর্ধ্ব করতে হয়েছে? কেরানিরা এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয় না। কিন্তু আমি শুধু তোমাকে খুশি করতেই এটা জোগাড় করেছি।”
সে অধৈর্য হয়ে তার স্বামীর দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “আচ্ছা ধরো, যদি আমি অনুষ্ঠানটাতে যাই, তবে আমি কোন পোশাকটা পড়তে পারি, বলো তো?”
এটা সে ভাবেনি। ভদ্রলোক ছটফট করে উঠল, “কেন, তুমি যে পোশাক পরে থিয়েটারে যাও। ওটা আমার কাছে খুব সুন্দর লাগে, তোমাকে দারুণ দেখায়।”

স্বামীর কথা শেষ হবার আগেই সে কাঁদতে লাগল। স্ত্রীকে কাঁদতে দেখে ভদ্রলোক থমকে গেলেন, স্তব্ধ হয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। দুটি বড় অশ্রুর ফোটা ধীরে ধীরে তার স্ত্রীর চোখের কোণ থেকে মুখের কিনারা বেয়ে নিচে পড়ল। সে তোতলাল, “কী ব্যাপার? কী হয়েছে? আমি তো কিছুই বুঝছি না।”
অনেক চেষ্টা করে মেয়েটা তার দুঃখ কাটিয়ে উঠল এবং তার ভেজা গাল মুছতে মুছতে শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিল, “কিছুই না। শুধু এই পার্টিতে পরার মত আমার কোন পোশাক নেই। তাই আমি এই পার্টিতে যেতে পারব না। তোমার আমন্ত্রণটা এমন একজন বন্ধুকে দাও, যার স্ত্রীর কাছে আমার থেকে ভাল পোশাক আছে।”
এ কোথায় তার স্বামী একটু বিরক্ত হল। এত ঝামেলা করে এই আমন্ত্রণ জোগাড় করেছে কি আর কাউকে দেবার জন্য? “আচ্ছা ম্যাতিলদা, একটি পোশাকের দাম কত হবে বলে তোমার মনে হয়, যেটা তুমি আর অন্য অনুষ্ঠানেও পড়তে পারবে, কিন্তু খুব সাধারণ কিছু?”
ম্যাতিলদা এক মুহূর্তের জন্য চিন্তা করল। সে বুঝতে পারছিল না ঠিক কত বললে তার স্বামীর জন্য খরচটা বেশি হবে না, আবার সে একটা ভাল পোশাকও কিনতে পারবে। সে ইতস্তত করে উত্তর দিল, “আমি ঠিক জানি না, তবে আমি মনে করি চারশ ফ্রাঙ্ক দিয়ে আমার জন্য একটা মোটামুটি সুন্দর পোশাক কিনতে পারব।”
দাম শুনে তার স্বামীর মুখ কিছুটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল, কারণ সে বেশ কিছুদিন ধরে একটু একটু করে টাকা জমাচ্ছিল একটা বন্দুক কেনার জন্য। তার ইচ্ছা ছিল পরবর্তী গ্রীষ্মের ছুটিতে নান্টেরের কাছে একটি গ্রামে তার কয়েক বন্ধুর সাথে শিকার করতে যাওয়ার। একটু ভেবে সে বলল, “আচ্ছা আমি তোমাকে চারশ ফ্রাঙ্ক দিতে পারি। কিন্তু চেষ্টা করবে খুব সুন্দর একটি জামা কিনতে।”

পার্টির দিন যত ঘনিয়ে আসছিল, ম্যাতিলদাকে তত অস্থির ও উদ্বিগ্ন মনে হচ্ছিল। সে সুন্দর একটা পোশাক কিনেছে, তবে আর কী সমস্যা হল আবার? এক সন্ধ্যায় তার স্বামী তাকে বলল, “গত তিনদিন ধরে তুমি অদ্ভুত আচরণ করছ। কি ব্যাপার?”
ম্যাতিলদা উত্তরে বলল, “আমার মন খারাপ, কারণ আমার কাছে এই সুন্দর পোশাকটার সাথে পরবার জন্য কোন গয়না নেই, এমনকি একট ছোট্ট পাথরও নেই। আমাকে দেখতে সস্তা মনে হবে। আমি এভাবে পার্টিতে যেতে চাই না।”
“তুমি ফুল পরতে পার,” তার স্বামী বলল, “বছরের এই সময়টাতে ফুল খুব ফ্যাশনেবল। দশ ফ্রাঙ্কে তুমি দু’টি বা তিনটি দুর্দান্ত গোলাপ কিনতে পারবে।”
কিন্তু এ কথায় ম্যাতিলদা শান্ত হল না। “নাহ। এত এত ধনী মহিলার মাঝে নিজেকে গরীব দেখানোর চেয়ে অপমানজনক আর কিছু হতে পারে না।”
“তুমি কত বোকা, বলো তো!” তার স্বামী বলল, “যাও, তোমার বন্ধু ম্যাডাম ফরেস্টিয়ারের সাথে দেখা করো এবং তাকে অনুরোধ করো তোমাকে কিছু গহনা ধার দিতে। সে তো তোমার বন্ধু আর এটা তো শুধুই এক রাতের জন্যই। সে নিশ্চয়ই না করবে না।”
ম্যাতিলদা আনন্দে ফুঁপিয়ে উঠল, “আরে তাই তো, আমি তো এটা ভাবিনি।”

পরের দিন সে তার বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে তাকে তার কষ্টের কথা জানাল। ম্যাডাম ফরেস্টিয়ার তার ড্রেসিং টেবিলের খোপ থকে, একটা বড় বাক্স বের করল। তারপর বাক্সটা ম্যাতিলদার হাতে তুলে দিল। “দেখো কোনটা পছন্দ হয় আমার প্রিয় বান্ধবী,” বলল সে।
ম্যাতিলদা সেখানে কিছু ব্রেসলেট, একটা মুক্তার মালা, মূল্যবান পাথরের সাথে একটি সোনার ভেনিস ক্রস সেট দেখল। সে একে একে সব গয়না আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পরল। আহা, কি সুন্দর দেখতে। ইচ্ছে করছিল সবগুলো নিয়ে যেতে। কিন্তু এগুলো তার পোশাকের সাথে মানাবে না। সে হালকা কণ্ঠে বলল, “তোমার কাছে আর কোন অলংকার নেই?”
“কেন? হ্যাঁ নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু আমি তো জানি না তুমি ঠিক কেমনটা চাইছ…”

হঠাৎ ম্যাতিলদা ড্রেসিং টেবিলের পাশে দাঁড়ানো আলমারির কাঁচ দিয়ে একটি কালো সাটিনের বাক্সে একটি দুর্দান্ত হীরার হার দেখতে পেল, এবং তার মন এক অনিয়ন্ত্রিত আনন্দে নেচে উঠল। সে তার বান্ধবীর দিকে তাকাতেই তার বান্ধবী হীরের হারটা বের করে তার হাতে তুলে দিল। ওটা নেওয়ার সময় তার হাত কাঁপছিল।ম্যাতিলদা দারুণ দেখতে হারটা তার গলায় পরল, তার উঁচু গলার পোশাকের উপরে হারটা কী সুন্দর বসে গেল। নিজের দিকে সে কিছুক্ষণ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছিল যেন এই হারটা তার গলার মাপেই বানানো হয়েছিল। কিন্তু এত দামী হীরার হার কি তার বান্ধবী তাকে ধার দেবে? সে একটু ইতস্তত করে বলল, “তুমি কি আমাকে এটা ধার দেবে, শুধু এটা?”
“হ্যাঁ, অবশ্যই দেব, তুমি আমার বন্ধু।”
সে তার বন্ধুকে আনন্দে জড়িয়ে ধরল, এত সুখী জীবনে সে কখনও হয় নি। 

পার্টিতে সে উন্মত্তভাবে নেচেছে। তার সৌন্দর্য মোহিত করেছে ছেলে-বুড়ো সবাইকে। ওরা প্রশংসাপূর্ণ চোখে তার দিকে চেয়ে থেকেছে, তা দেখে আবেগে, আনন্দে মাতাল হয়ে গিয়েছিল ম্যাতিলদা। তার সৌন্দর্যের জয়গানে, তার সাফল্যের গৌরবে সে কি করবে ভেবে পাচ্ছিল না। এত সুখও তার কপালে ছিল। তার সব স্বপ্নই যেন আজ পূর্ণ হয়েছে। এত এত প্রশংসা বাক্য,পুরুষরা মাথা নিচু হয়ে তাকে সম্মান জানাচ্ছে – এই সবই তার বহু যুগ ধরে প্রাপ্য ছিল। একমাত্র একজন নারী বলতে পারবে বিজয়ের এই অনুভূতি কত মিষ্টি।

ম্যাতিলদার স্বামী মধ্যরাত থেকে একটা নির্জন রুমে আরও তিনজন ভদ্রলোকের সাথে সময় কাটাচ্ছিল, যখন সেই ভদ্রলোকদের স্ত্রীরা হলঘরে ভাল সময় কাটাচ্ছিল। অবশেষে ক্লান্ত হয়ে ভোর চারটার দিকে সে তার স্বামীকে নিয়ে পার্টি হল থেকে বেরোনোর পথে কোট রাখার ঘর থেকে তাদের পুরনো কোটগুলো হাতে নিল। ম্যাতিলদার উজ্জ্বল পার্টি ফ্রকের সাথে তার কোটটা যে কত বেমানান সে তা জানে। পার্টিতে যারা এসেছে, তারা সবাই দামী কোট পরে বের হবে। কথাটা মনে পড়তেই সে তার স্বামীকে তাড়াতাড়ি হাঁটতে বলল।
“ব্যাপারটা কী?” তার স্বামী তখন চেষ্টা করছে তার কোটটা পরে নিতে। সে অবাক হয়ে জানতে চাইল, “কী ব্যাপার বলো তো? এত দৌড়োচ্ছ কেন? কোট পরে নাও, না হ’লে বাইরে বেরোলেই ঠাণ্ডা লাগবে। দেখি আমি একটা ট্যাক্সি পাই কি না।”
কিন্ত সে শুনল না। খুব দ্রুত সিড়ি টপকে নীচে নামল। কিন্তু রাস্তায় নেমে ওরা আর কোন ট্যাক্সি পেল না। অনেক রাত হয়েছে। 

কী আর করা। তারা ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে হাঁটতে লাগল। একটা ট্যাক্সিকে দূর থেকে যেতে দেখে ওরা চেঁচিয়ে ডাকল, কিন্তু ট্যাক্সিটা দাঁড়াল না। অনেকটা হাঁটার পর তারা একটা পুরনো ট্যাক্সি পেল। এ ধরণের ট্যাক্সি রাতের অন্ধকারে প্যারিসের রাস্তায় দেখা যায়। ট্যাক্সিটা এতই পুরনো, যে মনে হচ্ছে লজ্জা ঢাকতে ট্যাক্সিওয়ালা এত রাতে বেরিয়েছে। ট্যাক্সি ওদের পুরনো রংচটা ঘরের দরজায় নামিয়ে দিয়ে গেল। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে ম্যাতিলদা হতাশ হয়ে ভাবল, “আহা, সব শেষ।” এটুকু সুখই তার প্রাপ্য। এমন রাত হয়ত আর তার জীবনে কখনও আসবে না। ঠিক তখন তার স্বামী ভাবছিল সকাল দশটার ভিতরে কাজে পৌঁছতে হবে, পারবে তো?

ম্যাতিলদা কাপড় খুলতে গিয়ে কী মনে করে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার অসম্ভব সুন্দর সাজটা শেষবারের মত দেখবে বলে হয়ত। হয়ত বা তার দিকে সবার প্রশংসা ভরা চাহনি কতটা মধুর ছিল, সেটা শেষবারের মত উপভোগ করতে। তার সুন্দর মুখটার দিকে তাকিয়ে সে একটু হাসল এবং ঠিক তারপরই সে টের পেল। সে কী? গলায় হীরার হারটা কোথায় গেল? সে আতঙ্কিত হয়ে তার স্বামীর দিকে ঘুরে তাকাল।
“আমার কাছে… আমার কাছে… আমার কাছে ম্যাডাম ফরেস্টিয়ারের হীরার হারটা আর নেই।”
ভদ্রলোক বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। “কী! কী যে বলো না! এটা কীভাবে সম্ভব?”
দুজন মিলে পোশাকের ভাঁজে, চাদরের ভাঁজে, তার পকেটে, মেঝেতে, সিঁড়ির রাস্তায় সব জায়গায় বারে বারে খুঁজল। কিন্তু হীরার হারটা পাওয়াই গেল না।

“তুমি কি নিশ্চিত যে পার্টি থেকে বেরনোর সময় ওটা তোমার গলায় ছিল?” ম্যাতিলদার স্বামী জিজ্ঞাসা করল।
“হ্যাঁ। আমি সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় ওটা হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখেছি।”
“কিন্তু ওটা যদি রাস্তায় পড়ে, তবে তো আমরা শুনতে পেতাম, তাই না? আমার ধারণা, ওটা ট্যাক্সিতেই পড়ে গিয়েছে।”
“হ্যাঁ। সম্ভবত তাই। তুমি কি ট্যাক্সির নম্বর নিয়েছিলে?”
“না। তুমি? খেয়াল করো নি?”
“না।”
ম্যাতিলদার স্বামী হ্যাংগার থেকে কোটটা নিয়ে গায়ে চাপাল। “আমি ফিরে যাচ্ছি,” সে বলল, “পুরো পথ ধরে হেঁটে আসি, দেখি খুঁজে পাই কী না।”

সে চলে গেল। বাকি রাত ম্যাতিলদা তার পার্টি ড্রেসেই রয়ে গেল, কাপড় খুলে ঘরের কাপড় পরে বিছানায় যাওয়ার শক্তি নেই, চেয়ারে বসে ফায়ারপ্লেসের নিভু নিভু আগুন দেখল সারা রাত, তার মন ফাঁকা। সকাল সাতটার দিকে লয়জেল ফিরে আসল। সে কিছুই খুঁজে পায়নি। সে পুলিশের কাছে গেল, খবরের কাগজে পুরস্কার দিয়ে বিজ্ঞাপন দিল, ক্যাব কোম্পানির কাছেও গেল। কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারল না। ম্যাতিলদা সারাটা দিন তার স্বামীর অপেক্ষায় ছিল। সে এত হতাশা কখনও অনুভব করেনি। লয়জেল সন্ধ্যায় ফিরে এল, একটি ফাঁপা, ফ্যাকাশে মানুষ যেন। দুশ্চিন্তায় তার মুখ শুকিয়ে গেছে।
“তোমাকে তোমার বন্ধুর কাছে চিঠি লিখতে হবে,” লয়জেল বলল, “তাকে বলো, তুমি তার গলার হারটা ভেঙে ফেলেছ এবং সেটা দোকানে ঠিক করতে পাঠিয়েছ। এটা আমাদের খোঁজার জন্য আরও কিছু সময় দেবে।”
ম্যাতিলদা তার স্বামীর কথামত চিঠি লিখেছিল।

এক সপ্তাহ শেষে তারা সব আশা হারিয়ে ফেলল। লয়জেলকে দেখে মনে হচ্ছিল এই এক সপ্তাহে তার বয়েস, পাঁচ বছর বেড়ে গিয়েছে। 
“আমাদের হাতে আর কোন সমাধান নেই। হুবহু ওই হার কিনে তোমার বান্ধবীকে ফেরত দিতে হবে।”
পরের দিন তারা যে বাক্সটিতে হীরার হারটা ছিল, তা নিয়ে সেই গহনার দোকানে গেল, যার নাম তারা বাক্সের ভিতরে খুঁজে পেয়েছিল। 
“এটা নেকলেসটি আমরা বিক্রি করিনি, ম্যাডাম। শুধু ওই গয়নার বাক্সটা আমাদের।”
অগত্যা তারা সে শহরে যত বড় বড় দোকান আছে, সবক’টায় ঢুঁ মারল, এবং অবশেষে প্যালেস রয়্যালের একটা দোকানের আলমারিতে একই রকম একটি হার সাজানো আছে দেখতে পেল। ভিতরে ঢুকে দাম জিজ্ঞেস করায় জানতে পারল ওটার দাম চল্লিশ হাজার ফ্রাঙ্ক, তবে তাদের জন্য ছত্রিশ হাজারে দেওয়া যাবে। তাই তারা জুয়েলার্সকে গয়নাটা তিন দিন বিক্রি না করার জন্য অনুরোধ করল। এবং ঠিক হল যে ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহের মধ্যে যদি হারিয়ে যাওয়া নেকলেসটি খুঁজে পাওয়া যায়, তবে দোকানদার সেটি চৌত্রিশ হাজার ফ্রাঙ্কে ফিরিয়ে নেবে।

লয়জেল তার বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে আঠার হাজার ফ্রাঙ্ক পেয়েছিল, যেটি ভবিষ্যতের জন্য তুলে রাখা ছিল। বাকি টাকাটা সে ধার করবে ঠিক করল। একজনের কাছ থেকে এক হাজার ফ্রাঙ্ক, আরেকজনের কাছ থেকে পাঁচশ, তিনশ – এভাবে অনেক মানুষের কাছ থেকে সে টাকা ধার করে সব কাগজে লিখে রাখল। অনেকের কাছ থেকে সে সুদে ধার নিয়েছে, এটা না জেনেই যে সেগুলো শোধ করতে কত বছর লাগবে।  

ম্যাতিলদা যখন নেকলেসটি ফিরিয়ে নিল, ম্যাডাম ফরেস্টিয়ার ঠাণ্ডা গলায় বলল, “তোমার আরও তাড়াতাড়ি ফেরত দেওয়া উচিত ছিল, আমারও তো প্রয়োজন হতে পারত, তাই না?”

ভাগ্য ভাল, তার বান্ধবী তার সামনে বাক্সটা খোলেনি। যদি সে খুলে নতুন হারটা দেখতে পেত, যেটা তার হারের চেয়ে অনেক উজ্জ্বল, তবে যদি সে কি বুঝে যেত? যদি সে তাকে চোর মনে করে পুলিশে ধরিয়ে দিত? তারপর থেকে মিসেস লয়জেল ভয়ঙ্কর দরিদ্র জীবনযাপন করতে লাগল। ম্যাতিলদা বুঝল প্রকৃত দারিদ্র কাকে বলে। তারা বাড়ি ছেড়ে কম টাকায় একটা ছাদের নিচের অসম্পূর্ণ ঘর ভাড়া নিল। তাদের এত টাকার ঋণ শোধ করতে হবে। কাজের লোককে ছাড়িয়ে দিল। ম্যাতিলদা ঘরের সব কাজ করত, রান্নাঘরের সব থালা-বাসন ধুয়ে তার গোলাপী নখে দাগ পড়ল। সে নোংরা লিনেন শার্ট ধুয়ে সেগুলো শুকোত, প্রতিদিন সকালে রাস্তার শেষ মাথায় গিয়ে আবর্জনা ফেলে আসত, এবং দূরের কল থেকে ব্যবহারের জন্য পানি টেনে আনত, প্রতিটি সিঁড়ি বেয়ে সে লম্বা শ্বাস টানত। সে খুবই সাধারণ কাপড় পরত এবং বাজারে গিয়ে সব কিছু নিয়ে দামাদামি করত, অপমানিত হত। কিন্তু কিছুই সে গায়ে মাখত না। প্রতিমাসে কিছু টাকা তারা ফেরত দিত আর যে ঋণ তারা সময় মত পরিশোধ করতে পারত না সেটা আর চড়া সুদে নবায়ন করত। তার স্বামী লয়জেল আগের কাজের শেষ করে প্রতিদিন সন্ধ্যায় একজন ব্যবসায়ীর হিসেব নিকেশ দেখে গভীর রাতে বাড়ি ফিরত। তারপর কিছু খেয়ে সে আবারও কাজে বসত। সে মানুষের নানা নোট লিখে দিত, এক পাতা লিখে দিলে মাত্র পাঁচ পয়সা পেত। তাদের এই জীবন দশ বছর স্থায়ী হয়েছিল। দশ বছর পর তারা সুদসহ সব ঋণ পরিশোধ করেছিল।

ম্যাতিলদাকে এখন দেখলে বয়স্ক মনে হয়। সে দরিদ্র পরিবারের সমস্ত মহিলাদের মত রুক্ষ হয়ে গিয়েছিল। অর্ধেক চুল আঁচড়ানো, বিশ্রী স্কার্ট পরা এবং হাত নাড়িয়ে জোরে জোরে কথা বলত। সারাটা দিন সে হাজারটা কাজ করে। কিন্তু মাঝে মাঝে কাজের ফাঁকে, যখন তার স্বামী অফিসে থাকত, তখন সে জানালার কাছে বসে সেই সন্ধ্যার কথা মনে করত, সে রাতে তাকে দেখতে কি অপূর্ব লাগছিল। একটা দীর্ঘশ্বাস জানলায় ধারে বোনা মাকড়শার জালটাকে নাড়িয়ে দেয়। সে দিন সেই হীরার হারটা যদি না হারাত? কে জানে, তার জীবনটা হয়ত অন্য রকম হত? জীবন কত বিচিত্র, একটা সামান্য ঘটনা একজন মানুষকে যেমন ধ্বংস করতে পারে, তেমনই নতুন জীবনও দিতে পারে।

এক রবিবার, যখন ম্যাতিলদা সপ্তাহের কাজ শেষে মন ভাল করার জন্য চ্যাম্পস এলিসিসের পথ ধরে হাঁটছিল, হঠাৎ সে একজন মহিলাকে একটা বাচ্চার সাথে হাঁটতে দেখল। সে ছিল তার বহুদিন আগে হারিয়ে যাওয়া বান্ধবী ম্যাডাম ফরেস্টিয়ার। সে দেখতে এখনও তরুণী, কি সুন্দর, কি কমনীয় একটা মুখ। ম্যাতিলদা আবেগপ্রবণ হয়ে গেল। তার কি এগিয়ে গিয়ে কথা বলা উচিত? হ্যাঁ অবশ্যই। এখন তো সে টাকা শোধ করেছে, এখন তার বান্ধবীকে সব বলা যায়। সে তার কাছে গেল।
“শুভ সকাল, জিন (ম্যাডাম ফরেস্টিয়ারের ডাক নাম)।
একজন সাধারণ মহিলা তাকে এভাবে সম্বোধন করায় সে বিস্মিত হল। ম্যাতিলদা বুঝল জিন তাকে চিনতে পারেনি।
“কিন্তু… ম্যাডাম… আমি তো আপনাকে চিনি না। আপনি নিশ্চয়ই কোথাও ভুল করেছেন,” ম্যাডাম ফরেস্টিয়ার বলল।
“আমি ম্যাতিলদা লয়জেল।”
তার বন্ধু চিৎকার করে উঠল। “ওহ! আমার বন্ধু ম্যাতিলদা, তোমার এ অবস্থা কেন? কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে তুমি?”
“তোমার সাথে শেষ যেবার দেখা হল, তারপর থেকে আমাদের খুব কঠিন সময় গিয়েছে। ফলফল তো দেখতেই পাচ্ছ …”
“কী হয়েছে? আমাকে বলো।”
“তোমার মনে আছে সেই হীরার নেকলেস যেটা তুমি আমাকে মন্ত্রিসভায় পরতে দিয়েছিলে?”
“হ্যাঁ, মনে আছে।”
“সেটা আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম।”
“মানে কী? তুমি তো আমাকে সেটা ফিরিয়ে দিয়েছিলে।”
“আমি তোমাকে একই রকম দেখতে আরেকটা কিনে দিয়েছিলাম। এবং সেই হারের দাম শোধ করতে আমাদের দশ বছর লেগেছে। এত টাকার ঋণ শোধ করা আমাদের জন্য সহজ ছিল না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের ঋণ শেষ হয়েছে, এবং আমি এখন খুব ভাল আছি।”
ম্যাডাম ফরেস্টিয়ার হতবাক হয়ে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। “তুমি আমার হারটার মত দেখতে আরেকটা হীরার হার আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলে?”
“হ্যাঁ, তুমি বুঝতে পারো নি? অবশ্য ওটা দেখতে হুবহু তোমারটার মত দেখতে ছিল।”

ম্যাডাম ফরেস্টিয়ার হঠাৎ করে ম্যাতিলদার হাত দু’টো জড়িয়ে ধরল। 
“ওহ, আমার প্রিয় ম্যাতিলদা! আমার হারটা হীরার হার ছিল না! ওটা হীরার হারের মত দেখতে একটা নকল পাথরের হার ছিল এবং ওটার দাম ছিল মাত্র পাঁচশ ফ্রাঙ্ক!”


লেখক পরিচিতি : কাজী রাহ্‌নুমা নূর
অনুবাদক , আবৃত্তিকার ও গল্পকার

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up