শেষ ট্রেনের যাত্রী

লেখক : সোহানি পারবিন

রাত তখন পৌনে এগারোটা। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এক অদ্ভুত নীরবতা ঝুলে আছে। দূর থেকে মাঝেমধ্যে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ ভেসে আসছে, আর হলুদ ল্যাম্পপোস্টগুলোর নিচে জমে উঠছে কুয়াশার পাতলা চাদর। শহরের হট্টগোল পেরিয়ে এই প্ল্যাটফর্মটা যেন হঠাৎ কোন অচেনা জগতের প্রবেশদ্বার মনে হয়।

অনীক বেঞ্চের এক কোণায় চুপচাপ বসে ছিল। কাঁধে ঝুলনো পুরনো চামড়ার ব্যাগটায় চেপে রাখা কতগুলো অসমাপ্ত ফাইল আর হৃদয়ে জমা একরাশ ক্লান্তি। একটা বেসরকারি ব্যাংকে দশ বছর ধরে একই কাজ করতে করতে জীবনটা তার কাছে বেশ একঘেয়ে আর পানসে ঠেকছে। প্রতিদিন সকাল আটটায় এই স্টেশনে আসা, শহরের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া, আর রাতে একলা এই প্ল্যাটফর্মে বসে শেষ ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করা—এই ছিল তার জীবন।

হঠাৎ করেই বেঞ্চের অন্য প্রান্তে একটা খসখস শব্দ হ’ল। অনীক তাকিয়ে দেখল, একজন বৃদ্ধ এসে বসেছেন। লোকটার পরনে সাদা পাঞ্জাবি, চুলে বেশ কিছু পাক ধরেছে, আর চোখে আলো-আঁধারির মাঝে এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা। বৃদ্ধের হাতে একটা ছোট ডায়েরি আর কলম।
অনীক কৌতুহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, “কাকাবাবু, এই রাতের ট্রেনে কোথাও যাচ্ছেন?”
বৃদ্ধ অনীকের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। বললেন, “না হে, যাওয়া তো আমার অনেক আগেই হয়ে গিয়েছে। আমি তো কেবল দেখতে আসি, শেষ ট্রেনে কারা বাড়ি ফেরে।”
কথাটা শুনে অনীক একটু অবাক হ’ল। বুড়ো লোকটা বোধহয় কিছুটা খামখেয়ালী বা পাগল টাইপের—মনে মনে ভাবল সে। বৃদ্ধ আবার বললেন, “তুমি তো বেশ কয়েক বছর ধরে এই সময়টায় একই জায়গায় বসে থাক, তাই না? কিন্তু প্রতিদিন তোমার চোখের ছায়াটা একটু একটু করে যেন ভারী হয়ে উঠছে। কিছু কি হারিয়ে ফেলেছ?”
অনীক চমকে উঠল। এই লোকটা তাকে কীভাবে চেনে? সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “হারিয়ে ফেলেছি নিজের ভিতরটাকে। ছোটবেলায় ছবি আঁকার দারুণ শখ ছিল। ভেবেছিলাম বড় হয়ে শিল্পী হব। কিন্তু জীবনের টানে, টাকার পিছনে ছুটতে গিয়ে তুলিগুলো কখন যে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল, বুঝতেই পারলাম না। এখন খালি ট্রেনের চাকার আওয়াজ আর ফাইলের পাতার হিসেব ছাড়া আর কিছুই বাকি নেই।”
বৃদ্ধ মৃদু হেসে ডায়েরির একটা পাতা উল্টে বললেন, “জানিস তো, মানুষ যতক্ষণ নিঃশ্বাস নেয়, ততক্ষণ কোন স্বপ্নই মরে যায় না। আমরাই কেবল সময় আর বয়সের অজুহাত দিয়ে ওগুলোকে কবর দিই। জীবনটা ট্রেনের সেই কামরার মত—তুমি যদি জানলা দিয়ে বাইরের সৌন্দর্য না দেখে শুধু টিকিটের মূল্য হিসেব করো, তবে পুরো সফরটাই বৃথা।”

কথাগুলো যেন অনীকের হৃদয়ের গভীরে গিয়ে আঘাত করল। সে বৃদ্ধের দিকে আরেকবার তাকাল। স্টেশন মাস্টারের বাঁশির শব্দ দূর থেকে ভেসে এল। সিগন্যালের লাল আলোটা সবুজ হয়ে গেল। লাইনের ওপর দিয়ে কেঁপে উঠল মাটি—শেষ ট্রেনটা ঢুকছে। অনীক নিজের ব্যাগটা কাঁধে তুলে দাঁড়াল। ট্রেনের কামরায় ওঠার আগে একবার পিছন ফিরে বৃদ্ধকে ধন্যবাদ জানাতে চাইল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, পুরো বেঞ্চটা ফাঁকা! কুয়াশাঘেরা স্টেশনে বৃদ্ধ লোকটা কোথাও নেই। শুধুই বেঞ্চের ওপর খোলা পড়ে আছে একটা ডায়েরির পাতা। অনীক কৌতুহলী হয়ে এগিয়ে গেল। কুড়িয়ে নেওয়া পাতার কোণে পেনসিল দিয়ে আঁকা একটি ছোট্ট ছেলের ছবি, যে ক্যানভাসে ছবি আঁকছে। আর নিচে ছোট করে লেখা—”স্বপ্ন দেখার কোন শেষ সময় হয় না।”

ট্রেনটি প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলতে শুরু করল। অনীক কামরায় গিয়ে বসল। ট্রেনের জানলা দিয়ে ঠাণ্ডা হাওয়া তার মুখে ঝাপটা মারল। কিন্তু আজ তার চোখদু’টো আর ক্লান্ত নয়। ব্যাগ থেকে নোটপ্যাডের সাদা পাতা বের করে পকেট থেকে একটা কলম টেনে নিল সে। আজ অনেক দিন পর অনীকের হাত আবার আঁকতে শুরু করল।


লেখক পরিচিতি : সোহানি পারবিন
নীল প্রজাপতি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up