লেখক : অর্ণব চৌধুরী
এক রূপকথার বনে ঘন এক রহস্যময় বাতাবরণের মধ্যে গল্পটির শুরু। এক গাঁয়ে বাস করত উড়ো নামের এক চঞ্চল ছেলে। তার কাজই ছিল যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ানো। একদিন ভরদুপুরে বিশাল এক বটগাছের তলায় সে এক পুরোনো খোদাই করা কাঠের তোরঙ্গ খুঁজে পেল। উড়ো হাত বাড়াতেই তোরঙ্গের ভিতর থেকে এক গম্ভীর প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের গলার আওয়াজ ভেসে এল, “খবরদার! এখন খুলবে না। আগে বলো, আমার জন্য কী এনেছ?”
উড়ো তো অবাক! সে পকেট থেকে কয়েকটা লাল-কালো পাকা জাম চাবির ফুটোর সামনে ধরে শুধাল, “তুমি কে? আর এই বাক্সে কী করছ?”
ভেতর থেকে নীলকান্ত নামের লোকটি বলল, “আমি ৫০ বছর ধরে এক জাদুকরের অভিশাপে এই বাক্সে বন্দি। কিন্তু শুধু খাওয়ালেই হবে না, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই তোরঙ্গের ভিতরের সব ভয়ানক বাধা পার করে আমাকে মুক্ত করতে হবে।”
নীলকান্তর অনুরোধে উড়ো তোরঙ্গের ভেতরে ঝাঁপ দিল।
প্রথম পরীক্ষা: সাহসের সত্য
ভিতরে ঢুকতেই চারপাশ কালচে মেঘে ঢেকে গেল। সামনে ভেসে উঠল তিন মাথার এক ভয়ংকর কালো ছায়া। সে গর্জে উঠে বলল, “বল, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি কী?”
উড়ো প্রথমে ভুল করে বলল, “অস্ত্রশস্ত্র।”
অমনি তার পা পাথরে জমে যেতে শুরু করল! কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিজের ভুল বুঝতে পেরে উড়ো বুক চিতিয়ে চিৎকার করে উঠল, “না, অস্ত্র নয়! মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হ’ল তার সাহস আর ভালবাসা!”
সোনালি আলোয় চারপাশ ঝলমল করে উঠল, পাথর গুঁড়ো হয়ে গেল আর প্রথম বাধা পার হ’ল।
দ্বিতীয় পরীক্ষা: বুদ্ধির জয়
এরপর সামনে এল এক স্ফটিকের তৈরি হ্রদ, যার জল পা দিলেই বরফ হয়ে যায়। হ্রদের মাঝখানে জ্বলছিল এক নীল আগুনের শিখা।
উড়ো একটুও ঘাবড়াল না। সে চারপাশের ছোট গাছ কেটে কাঁচা কাঠ আর লতা দিয়ে একটা শক্ত ভেলা বানিয়ে ফেলল। সেই ভেলা ভেসে চলল বরফ না জমিয়েই, আর উড়ো পৌঁছে গেল নীল শিখার কাছে।
শেষ পরীক্ষা: নিঃস্বার্থ ত্যাগ
হ্রদ পার হতেই সামনে ফুটে উঠল এক বিশাল আয়না। তাতে লেখা ভেসে উঠল—”এই শিখা দিয়ে শুধু একজনই মুক্ত হতে পারবে। তুমি নিজেকে মুক্ত করলে নীলকান্ত চিরকাল বন্দি থাকবে, আর নীলকান্তকে মুক্ত করলে তুমি বন্দি হবে। বলো, কাকে বাঁচাবে?”
উড়ো এক মুহূর্ত ভাবল। সে মনে মনে বলল, “নিজের প্রাণ বাঁচাতে আমি একজন মানুষকে চিরকাল বন্দি রাখতে পারি না।” সে স্পষ্ট গলায় ঘোষণা করল, “নীলকান্ত মুক্ত হোক!”
কথাটা শেষ হতেই আয়না ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ভেসে এল আকাশবাণী—”যে অন্যকে বাঁচাতে নিজের স্বাধীনতা বলি দিতে পারে, তাকে কোন জাদু বন্দি করতে পারে না!”
এক ঝটকায় উড়ো ফিরে এল বটগাছের তলায়। তার সামনে দাঁড়িয়ে রক্তমাংসের নীলকান্ত, আর কাঠের তোরঙ্গটা মাটিতে মিশে গেছে। হাত ধরাধরি করে দুজনে হেঁটে চলল নতুন এক ভোরের দিকে।
লেখক পরিচিতি : অর্ণব চৌধুরী
জন্ম মানবাজার পুরুলিয়া

