লেখক : মানব মন্ডল
১৯০৯ সালে আলিপুর বোমা মামলা থেকে খালাস পাওয়ার পর অরবিন্দ ঘোষ সক্রিয় সশস্ত্র রাজনীতি ছেড়ে আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য পণ্ডিচেরি চলে যান। এই রূপান্তর ও পথবদল সেই সময়কার বহু বিপ্লবী ও জাতীয়তাবাদী নেতার মনে গভীর হতাশার জন্ম দেয় এবং তাঁরা এর তীব্র সমালোচনা করেন। কিছু মানুষের লেখায় অরবিন্দ ঘোষের পরিবর্তন নিয়ে সমলোচনাও দেখা যায়। সমসাময়িককালে অনেকে এই ঘটনাকে ‘পলায়ন’ বা ‘সরে দাঁড়ানো’ হিসেবে সমালোচনা করলেও আসলে সেগুলো কিছু হতাশারই প্রকাশ। অরবিন্দের মত একজন প্রখর বুদ্ধিজীবী ও দূরদর্শী নেতার হঠাৎ প্রস্থান সেসময়ের উদীয়মান বিপ্লবী দলগুলোকে অভিভাবকহীন করে তোলে।
অরবিন্দ ঘোষের জীবন দু’টি ভিন্ন কিন্তু গভীরভাবে সংযুক্ত অধ্যায়ে বিভক্ত—প্রাথমিক জীবনের বিপ্লবী অরবিন্দ এবং পরবর্তী জীবনের আধ্যাত্মিক ঋষি বা ধর্মগুরু শ্রী অরবিন্দ। তাঁর এই রূপান্তর কোন আকস্মিক পরিবর্তন ছিল না, বরং রাজনৈতিক স্বাধীনতা থেকে বিশ্বমানবতার আধ্যাত্মিক মুক্তির এক ক্রমবিকাশ। বারীন্দ্রকুমার ঘোষ বা অন্যান্য গোপন সমিতির কর্মীরা, যাঁরা অরবিন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বোমা ও পিস্তল তুলে নিয়েছিলেন, তাঁরা অরবিন্দের এই রাজনৈতিক সন্ন্যাসকে সহজে মেনে নিতে পারেননি।
এবারে একঝলকে দেখে নেওয়া যাক এই নেতার জীবন। ১৮৭২ সালের ১৫ই আগস্ট কলকাতায় জন্মগ্রহণকারী এবং ইংল্যাণ্ডে শিক্ষিত (সেণ্ট পল’স স্কুল ও কেমব্রিজের কিংস কলেজ, যেখানে তিনি ইণ্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও চাকরি এড়ানোর জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে অশ্বারোহণ পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন) অরবিন্দ ঘোষ, বাংলায় দেশভাগ-বিরোধী আন্দোলনের সময় জঙ্গি জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক ও নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। ভারতে ফিরে এসে রাজনীতিতে প্রবেশের আগে তিনি বরোদা রাজ্যে চাকরি করেন। দেশে আসার পরে বরোদার মহারাজের অধীনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিযুক্ত ছিলেন। সেই সময় তিনি ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি বাল গঙ্গাধর তিলক, লালা লাজপত রাই, এবং বিপিনচন্দ্র পালের পাশাপাশি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের চরমপন্থী শাখার সদস্য ছিলেন এবং তাঁর চিন্তাধারা ‘ইন্দু প্রকাশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর ‘পুরনো প্রদীপের বদলে নতুন প্রদীপ’ (১৮৯৩-৯৪) প্রবন্ধগুলিতে মূর্ত হয়ে ওঠে, যেখানে তিনি নরমপন্থীদের ভিক্ষাবৃত্তিমূলক পদ্ধতির সমালোচনা করেছিলেন।
বিপ্লবী চিন্তাধারায় বিশ্বাসী অরবিন্দ ঘোষ তাঁর ভাই বারীন্দ্রকুমার ঘোষ এবং প্রমথনাথ মিত্রর সঙ্গে অনুশীলন সমিতির গঠন এবং প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষ এবং পুলিশের জন্য এই সমিতি ছিল শরীরচর্চার কেন্দ্র। যদিও শরীরচর্চার আড়ালে এই সমিতি ছিল বিপ্লবীদের সশস্ত্র সংগঠন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গর সময় থেকেই অনুশীলন সমিতির ব্রিটিশবিরোধী কার্যকলাপের গতি বেড়ে গিয়েছিল। এই কারণেই এই সংগঠন পুলিশের নজরে এসেছিল।
তাছাড়া লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের (১৯০৫) পর স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলনের সময়, অরবিন্দ অহিংস প্রতিরোধ ও পূর্ণ স্বরাজ মতবাদের একজন প্রধান প্রবক্তা হয়ে ওঠেন। এই মতবাদ তিনি তাঁর পুস্তিকা ‘দ্য ডকট্রিন অফ প্যাসিভ রেজিস্ট্যান্স’ (১৯০৭) এবং তাঁর সম্পাদিত ইংরেজি দৈনিক ‘বন্দে মাতরম’-এর মাধ্যমে তুলে ধরেন। তিনি জাতীয় শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন এবং বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কংগ্রেসের সুরাট অধিবেশনে (১৯০৭) নরমপন্থীদের সঙ্গে বিভেদের সময় তিনি চরমপন্থীদের পক্ষ নেন। ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকীর মুজাফফরপুর অভিযানের পর আলিপুর বোমা মামলায় (যা মানিকতলা বোমা ষড়যন্ত্র, ১৯০৮-০৯ নামেও পরিচিত) কথিত মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত হলেও, চিত্তরঞ্জন দাস তাঁর পক্ষে মামলা লড়েন এবং ১৯০৯ সালে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন। ১৯০৯ সালের ৩০শে মে জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি উত্তরপাড়ায় একটি ভাষণ দেন। তাঁর ‘উত্তরপাড়া ভাষণ’ (১৯০৯) আধ্যাত্মিকতার দিকে তাঁর ঝোঁকের সূচনার ইঙ্গিত করে। ১৯১০ সালে অরবিন্দ সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে এসে ফরাসি ছিটমহল পণ্ডিচেরিতে স্থায়ী হন।
কিন্তু কেন পণ্ডিচেরিতে যেতে হ’ল তাঁকে? বৃন্দাবন, কাশী, অথবা হরিদ্বার নয়? কেন তিনি আধ্যাত্মিক জগতে গেলেন, এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না কোথাও।
এডিনবরায় প্রশিক্ষিত ও ইংরেজি সংস্কৃতিপ্রেমী, ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে কর্মরত সিভিল সার্জন, এক পিতার এক তৃতীয় পুত্র হিসেবে তাঁকে ইংরেজিতে নিমগ্ন হতে শেখানো হয়েছিল, এবং তিনি তাঁর মাতৃভাষা বাংলায় নয়, বরং শ্বেতাঙ্গদের মতই হিন্দুস্তানি ভাষায় সাধারণ কর্মচারীদের সাথে কথা বলতেন। যখন ইংল্যাণ্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাঁকে, তখন তাঁর বয়স সাত বছর। একটি খ্রিস্টান ইংরেজ পরিবারে তিনি বড় হন, যার ফলে কৈশোরেই তাঁর মধ্যে ধর্মের প্রতি এক ধরণের বিদ্বেষ গড়ে ওঠে।
১৮৯৩ সালে তিনি শীঘ্রই বরোদার গায়কোয়াড়ের অধীনে চাকরি পান এবং তারপর তাঁর “ভারতের প্রকৃত আবিষ্কার” শুরু হয়। বরোদায় তিনি তাঁর প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রেও সক্রিয়ভাবে আগ্রহী হন এবং বরোদা কলেজে (বর্তমানে মহারাজা সায়াজিরাও বিশ্ববিদ্যালয়) শিক্ষকতা শুরু করেন, যেখানে তিনি পরবর্তীকালে উপাধ্যক্ষ হন, এখানে তিনি সংস্কৃত শেখেন। পরবর্তী কালে ১৯০৬ সালে অরবিন্দ ঘোষ রাজা সুবোধ মল্লিক এবং বাংলার কিছু জাতীয়তাবাদী অভিজাত শ্রেণীর অংশের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত নবপ্রতিষ্ঠিত স্বপ্নের কলেজে, যা আজকের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, যোগদান করেন। যেখানে জাতীয় শিক্ষার পাঠ্যক্রম ব্রিটিশদের পক্ষপাতদুষ্টতা এবং জাতিগতভাবে অবমাননাকর ইতিহাস, শিক্ষা ও সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল। অর্থাৎ, এখান থেকে সুস্পষ্ট তিনি ভারতের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির উপর আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। আর এই চেতনা আসে সনাতনী ধর্মীয় ভাবনার প্রতি আনুগত্য থেকে। মনে রাখবেন, অরবিন্দ তাঁর পিতামহ, সাহিত্যিক রাজনারায়ণ বসুকে অনুসরণ করছেন। তাঁর পিতামহ, কলকাতার জাঁকজমক ছেড়ে মেদিনীপুরের একটি মফঃস্বল কলেজে অধ্যাপনা করতে গিয়েছিলেন । এরপর তিনি সেখান থেকে দেওঘরের গ্রাম্য পরিবেশে চলে যান। তাঁকে ‘ ঋষি ‘ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল , যার অর্থ কিন্তু ‘জ্ঞানী’।
আর তাঁর সমলোচকরা আসলে ছিলেন কিছুটা হতাশাগ্রস্ত। তাই সুভাষচন্দ্র বসুর মত নেতারা তাঁর রহস্যবাদকে ‘পলায়নবাদ’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। তখন অরবিন্দ দিলীপ রায়ের মাধ্যমে জবাব দিলেন, “বিশ্বাসকে ছোট করে কী লাভ, যা কিনা এই রহস্যময় অস্তিত্বের দ্বন্দ্বের মাঝে আঁকড়ে ধরার মত কিছু একটা জোগান দেয়… যুক্তি হ’ল মনের এক পরিমিত নৃত্য, আর কিছু নয়।”
এদিকে বারীন ঘোষকে দেখুন। একসময় উৎসাহে মন্তব্য করেছিলেন, “আমাদের মত প্রাণদানে প্রস্তুত বেপরোয়া তিনশত ছেলে জোগাড় হ’লেই ইংরেজ তাড়িয়ে দেশ স্বাধীন করা যাবে।” কিন্তু মুরারীপুকুর বোমার মামলায় ধরা পড়ার পর তাঁর ভেঙে পড়লেন কারণ বারীন ঘোষের পরিকল্পনার মধ্যে আবেগ ছিল বেশি, বাস্তবতা ছিল না। ফলে প্রথম আঘাত আসার পর কোন বিকল্প রাস্তা তাঁর একবারের জন্যও চোখে পড়েনি। ঠিক সেই আভাসই তাঁর বন্ধু উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় মধ্যে দেখা যায়, তীব্র হতাশা থেকে বলেন, “মিশন ইস ওভার।” আসলে এই সময় সমস্ত সহিংস আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়েছে। এসেছে গান্ধী। বিভিন্ন গুপ্তসমিতির সদস্যদের নামগুলি উঠে আসে। ধরা পরল নরেন গোঁসাইও। কিন্তু পরবর্তীকালে এই নরেন গোঁসাই ইংরেজদের হয়ে রাজসাক্ষী হতে রাজি হলে তাঁর বিশ্বাসঘাতকতা হতাশ করে অনেককেই।
আসলে অরবিন্দের সমালোচকরা কখনই নিজেদের মতের ওপর আত্মবিশ্বাসী ছিলেন না। তার প্রমাণ দেখুন। যতীন্দ্রমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় বা নিরালম্ব স্বামী এবং সভাপতি প্রমথ মিত্র দলের কর্মপ্রণালীগত মতবিরোধের কারণে ধীরে ধীরে বিভাজনের কারণে যুগান্তর সমিতির সৃষ্টি। কংগ্রেসের মধ্যেও বেশ কিছু টানাপোড়েনের ফলে নতুন শাখা হিসেবে চরমপন্থী দল গড়ে উঠল সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে। কিন্তু এক্সট্রিমিস্ট সেই শাখা লাল-বাল-পালের যোগ্য নেতৃত্বের ছোঁয়া আর অরবিন্দ ঘোষের যোগ্য অভিভাবকত্ব পেয়েছিল।
স্বামী বিবেকানন্দের এই সময় তরুণ প্রজন্মের প্রেরণা। ভাল করে লক্ষ্য করুন, ১৯০২ সালে স্বামী বিবেকানন্দের প্রয়াণ। এর পাশাপাশি বাংলায় তখন অনুশীলন সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাল গঙ্গাধর তিলক মহারাষ্ট্রে শিবাজি উৎসব শুরু করলেন। আর কলকাতায় শখারাম গণেশ দেউস্কর এই উৎসব শুরু করে দেন। ১৯০৩ সালে প্রতাপাদিত্য উৎসব শুরু হ’ল। অরবিন্দ ঘোষ কোন দিন হিন্দু ধর্ম ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকে অসম্মান করেন নি। হঠাৎ করে তিনি আধ্যাত্মিক জগতে গেলেন, এটা কখনও ঠিক দাবি নয়। তিনি যে পালিয়ে গিয়েছেন, এটাও ঠিক কথা নয়।
অরবিন্দ ঘোষের জীবনী লেখার জন্য একজন লেখক সাহায্য চেয়ে তাঁর এক শিষ্যের কাছে সম্মতি চাইলে, তিনি সেই লেখকের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন, “আমি ঠাণ্ডা মাথায় ছাপার অক্ষরে আমার নিজের শিষ্যদের হাতে খুন হতে চাই না।”
কীভাবে কেউ এমন এক অন্তর্জ অনুসন্ধান করতে পারে, তিনি তাঁর উদাহরণ। আসলে কেবল বৌদ্ধিক, আবেগিক ও ইচ্ছাশক্তির উপাদানেই অসীমভাবে সমৃদ্ধ নয়। আমাদের চেতনাকে অতিক্রমকারী বহুবিধ আধ্য অভিজ্ঞতা। তাঁর ক্ষেত্রে থেকে অতিমনে, মানবিক থেকে ঐ সত্তায় চেতনার এই আরোহণের সাথে সেই আলো ও শক্তির সঙ্গে মানবীয় উপকরণ-মন, জীবন ও দেহে-অবতরণ ঘটেছিল। একজন যোগীর প্রকৃত জীবন হ’ল তাঁর অন্তর্জীবন-বস্তুত, সেটাই তাঁর একমাত্র প্রকৃত জীবন।
লেখক পরিচিতি : মানব মন্ডল
সাংবাদিক ও ভাষাকর্মী

