শরীর নয় – মনই সাধু

লেখক : সৈকত প্রসাদ রায়

মন্দিরে, মসজিদে, গির্জায়, গুহায় বা হিমালয়ের চূড়ায়, সাধনার জায়গা হিসেবে আমরা সাধারণত বাইরের কোন ঠিকানার কথাই ভাবি। গেরুয়া বসন, রুদ্রাক্ষের মালা, তীর্থযাত্রা বা কঠোর উপবাসকে অনেকেই ধর্মজীবনের চিহ্ন বলে মনে করেন। অথচ ভারতীয় অধ্যাত্মচিন্তার সবচেয়ে গভীর ধারাগুলো বারবার একটি সহজ কথায় ফিরে এসেছে, সাধনার আসল প্রাঙ্গণ মানুষের নিজের ভিতরের জগৎ।

শ্রীরামকৃষ্ণ এই সত্যটি অতি সহজ ভাষায় বলেছিলেন। শরীর কখনও সাধু হয় না, সাধু হয় মন। কথাটা শুনতে সরল, কিন্তু এর ভিতরে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন লুকিয়ে আছে। আমাদের সব সুখ-দুঃখ, বন্ধন-মুক্তি, শান্তি-অশান্তির চাবি শরীরের হাতে নেই, আছে মনের হাতে। শরীর জন্মায়, বাড়ে, রোগে ভোগে, বুড়ো হয় এবং একদিন থেমে যায়। সেই পরিবর্তনের মধ্যে দাঁড়িয়েও যদি মন স্থির, স্বচ্ছ ও আনন্দময় থাকতে শেখে, তবে সেটিই প্রকৃত অধ্যাত্মজীবন। জন্ম, বৃদ্ধি, ক্ষয়, রোগ ও মৃত্যু হ’ল শরীরের স্বাভাবিক ধর্ম। এই সত্যকে কোন সাধক অস্বীকার করেননি। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন, দেহধারী আত্মার এই দেহে যেমন কৌমার, যৌবন ও জরা আসে, তেমনি দেহান্তরপ্রাপ্তিও আসে। ধীর ব্যক্তি এতে মোহগ্রস্ত হন না। একই অধ্যায়ে তিনি শীত-গ্রীষ্ম, সুখ-দুঃখের অনুভূতিগুলোকে “আসা-যাওয়া করা”, অনিত্য বলে বর্ণনা করেছেন এবং সেগুলো সহ্য করতে বলেছেন। শরীর ও ইন্দ্রিয়ের অভিজ্ঞতা স্রোতের মত বয়ে যায়। প্রশ্ন হ’ল, আমরা সেই স্রোতে ভেসে যাব, নাকি তীরে দাঁড়িয়ে স্থির থাকব? শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনই এর সবচেয়ে জীবন্ত দৃষ্টান্ত। জীবনের শেষ পর্বে তিনি গলার কষ্টদায়ক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। শরীর ক্রমশ শীর্ণ হচ্ছিল, খাওয়া-দাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছিল। অথচ কথামৃত ও লীলাপ্রসঙ্গের বিবরণ অনুযায়ী, সেই অবস্থাতেও তিনি ভক্তদের কাছে ঈশ্বরপ্রসঙ্গ করতেন, হাসতেন, সান্ত্বনা দিতেন। শরীর রোগে ভুগছে, কিন্তু মন যেন সে রোগের ওপারে আলাদা এক আকাশে বাস করছে। এখানে একটি সূক্ষ্ম কথা মনে রাখা দরকার। “মনই সাধু” বলার অর্থ শরীরকে অবহেলা করা নয়। শরীর সুস্থ রাখা, ওষুধ-পথ্য মানা, যত্ন নেওয়া, সবই স্বাভাবিক কর্তব্য। কথাটির মূল বক্তব্য হ’ল, শরীরের পরিবর্তন ও কষ্ট যেন আমাদের ভিতরের শান্তির মালিক না হয়ে ওঠে। শরীর আমার বাহন, আমি বাহন নই।

কথামৃতে শ্রীরামকৃষ্ণ আরও একটি কথা বারবার বলেছেন, মনেই বন্ধন, মনেই মুক্তি। ধোপার ঘরের কাপড়ের উদাহরণ দিয়ে তিনি বুঝিয়েছেন, মনকে যে রঙে ছোপানো যায়, সে সেই রঙই ধারণ করে। মন কুসংসর্গ ও কুচিন্তায় রঙিন হলে বন্ধন গাঢ় হয়, আর ঈশ্বরচিন্তা ও সদ্ভাবে রঙিন হলে মুক্তির পথ খোলে। অর্থাৎ পরিস্থিতি একই থাকলেও, মনের রং বদলালে অভিজ্ঞতা বদলে যায়। সাধুত্ব তাই বেশভূষায় নয়, মনের রঙে। মনকে যদি আয়না ভাবা যায়, তবে সাধনার কাজ হ’ল সেই আয়নার ধুলো সরানো। আয়না যতক্ষণ ময়লায় ঢাকা, ততক্ষণ তাতে কোন ছবি স্পষ্ট ফোটে না। রাগ, লোভ, ঈর্ষা, ভয়, অহংকার – এগুলোই সেই ধুলো। ধুলো সরলে আয়না নিজের স্বভাবেই ঝলমল করে ওঠে। ঈশ্বর বা সত্যের আলো তখন বাইরে থেকে “আনতে” হয় না, সে আগে থেকেই ছিল, শুধু প্রতিফলনের পথ পরিষ্কার হয়।

বিবেকানন্দ তাঁর রাজযোগ-বক্তৃতায় মনকে বারবার একটি হ্রদের সঙ্গে তুলনা করেছেন। হ্রদের জল ঘোলা হলে তলদেশ দেখা যায় না, আর জল স্থির ও নির্মল হ’লে তলার সবকিছু স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হ্রদের এই ছবি একই ভাবের দুটি রূপ। মন অশান্ত থাকলে আমরা নিজেকে বা জগৎকে যথার্থভাবে দেখতে পারি না। পতঞ্জলির যোগসূত্রের সূচনাতেই এই একই সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়। তিনি যোগের সংজ্ঞা দিয়েছেন “চিত্তবৃত্তি-নিরোধ” বলে, অর্থাৎ মনের অবিরাম তরঙ্গকে থামানো। সেজন্য তিনি একটি খুব ব্যবহারিক পথও বলেছেন। সুখী মানুষের প্রতি মৈত্রী, দুঃখীর প্রতি করুণা, পুণ্যবানের প্রতি মুদিতা এবং অপুণ্যের প্রতি উপেক্ষা – এই চার মনোভাব অভ্যাস করলে চিত্ত প্রসন্ন বা নির্মল হয়। লক্ষ্য করার বিষয়, মন পরিষ্কার করার এই কৌশলের শুরুই হয়েছে অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক দিয়ে। নির্জনে বসে ধ্যান যেমন জরুরি, অন্যের প্রতি আমাদের ব্যবহারও তেমনই চিত্তশুদ্ধির অংশ। এই কারণেই চিত্তশুদ্ধিকে সাধনার “একমাত্র উদ্দেশ্য” বলা কোন অতিরঞ্জন নয়। জপ, ধ্যান, পূজা, সেবা, পাঠ – সব পথের গন্তব্য একই জায়গায় গিয়ে মেলে, মনটা যেন একটু স্বচ্ছ, একটু হালকা, একটু বিনম্র হয়।

বুদ্ধ দুঃখের গঠন বোঝাতে একটি অসাধারণ উপমা ব্যবহার করেছিলেন, যা পালি সাহিত্যের সংযুত্ত নিকায়ের “সল্লত্থ সুত্ত”-এ পাওয়া যায়। তিনি বলছেন, অশিক্ষিত বা অসচেতন মানুষকে যখন কোন শারীরিক বেদনা স্পর্শ করে, সে শোক করে, বিলাপ করে, বুক চাপড়ে কাঁদে, বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এ’ভাবে সে দু’টি বেদনা অনুভব করে, একটি শারীরিক, আরেকটি মানসিক। এ যেন কাউকে একটি তীর দিয়ে বিদ্ধ করার পর আরেকটি তীর দিয়ে একই স্থানে আঘাত করা। আর সচেতন, শিক্ষিত সাধক শারীরিক বেদনা পেলেও শোকে ডুবে যান না, তাই তিনি অনুভব করেন কেবল একটি বেদনা। এই উপমাকে আমরা রোজকার জীবনে সহজে চিনতে পারি। প্রথম তীর হ’ল ঘটনা নিজে: অসুখ, চাকরি হারানো, প্রিয়জনের বিয়োগ, অপমান, আর্থিক টানাটানি। এর অনেকটাই আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। দ্বিতীয় তীর হ’ল সেই ঘটনার প্রতি আমাদের মনের প্রতিক্রিয়া: “কেন আমার সঙ্গেই এমন হ’ল”, “সবাই কী ভাববে”, “ভবিষ্যতে যদি আরও খারাপ হয়”, রাগ, আত্মধিক্কার, দুশ্চিন্তার অন্তহীন আবর্তন। লক্ষণীয়, বেশিরভাগ সময় দ্বিতীয় তীরটিই প্রথমটির চেয়ে বেশি যন্ত্রণা দেয়, কারণ ঘটনাটি একবারই ঘটে, কিন্তু মনের আবর্তন ঘুরতেই থাকে। রাতে ঘুম না আসা, খাবারে অরুচি, সম্পর্কে তিক্ততা, এসব অনেক সময় মূল আঘাত নয়, তার প্রতিক্রিয়ার ফল।

এই অন্তর্দৃষ্টি শুধু বৌদ্ধ চিন্তায় সীমাবদ্ধ নয়। স্টোয়িক দার্শনিক এপিক্টেটাস তাঁর এনকিরিডিয়ন-এর সূচনাতেই বলেছেন, কিছু জিনিস আমাদের হাতে, কিছু নয়। ঘটনা আমাদের হাতে নেই, কিন্তু ঘটনা সম্পর্কে আমাদের মূল্যায়ন ও প্রতিক্রিয়া আমাদের হাতে। আধুনিক মনস্তত্ত্বেও অ্যালবার্ট এলিসের “ABC মডেল” প্রায় একই কথা বলে। ঘটনা (A) সরাসরি আমাদের আবেগগত ফল (C) তৈরি করে না, মাঝখানে থাকে আমাদের বিশ্বাস ও ব্যাখ্যা (B)। নাৎসি বন্দিশিবিরের অভিজ্ঞতা থেকে ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কল লিখেছেন, উদ্দীপনা ও প্রতিক্রিয়ার মাঝখানে একটি ফাঁক আছে, সেই ফাঁকেই মানুষের স্বাধীনতা ও বেড়ে ওঠার শক্তি। এই তিন ভিন্ন যুগ ও ভিন্ন ভূমির চিন্তা একই বিন্দুতে মিলেছে – দুঃখের সিংহভাগ আসে বাইরের ঘটনা থেকে নয়, ভিতরের প্রতিক্রিয়া থেকে।

এখানে একটি সততার কথা বলা দরকার। “দ্বিতীয় তীর এড়াও” কথাটি শুনতে সহজ, করা কঠিন। এর অর্থ অনুভূতি চেপে রাখা বা ভান করা নয়। কষ্ট হলে কষ্ট হয়, দুঃখ হ’লে কাঁদাও স্বাভাবিক। সাধনার কাজ হ’ল সেই অনুভূতির ওপর অতিরিক্ত গল্প, ভয় আর আত্মধিক্কারের বোঝা চাপানো বন্ধ করা। ব্যথাকে ব্যথা হিসেবে দেখা, আর তার সঙ্গে “আমি হেরে গেছি” গোছের কাহিনী না জুড়ে দেওয়া। ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ের আরম্ভেই শ্রীকৃষ্ণ শরীরকে “ক্ষেত্র” বা ক্ষেত্র নামে অভিহিত করেন, আর যিনি এই ক্ষেত্রকে জানেন তাঁকে বলেন “ক্ষেত্রজ্ঞ”। জ্ঞানীরা এই দুইয়ের ভেদ জানেন। পরবর্তী শ্লোকগুলোতে ক্ষেত্রের তালিকায় শুধু পঞ্চভূত ও ইন্দ্রিয়ই নয়, ইচ্ছা, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ, সংঘাত ও ধৃতির মত মানসিক উপাদানও ধরা হয়েছে, অর্থাৎ শরীর, ইন্দ্রিয়, চিন্তা, আবেগ, এমন কী সুখ-দুঃখের অনুভূতি, সবই “দৃশ্য” বা দেখার বিষয়। আর এই সবকিছুর যে সাক্ষী, সেই চৈতন্যই দ্রষ্টা।

এই বিচার আমাদের রোজকার অভিজ্ঞতা দিয়েই বোঝা সম্ভব। আপনি বলেন, “আমার মাথাব্যথা করছে।” এখানে “আমার” শব্দটিতে কি একটি ফাঁক নেই? মাথাব্যথা যেন একটি জিনিস, যা আপনার সঙ্গে সম্পর্কিত কিন্তু আপনি নিজে নন। আবার আমরা বলি, “আমি রেগে গেছি”, “আমি ভীত”, “আমি হতাশ”, সেখানে নিজেকে আবেগের সঙ্গে এক করে ফেলি। সাধনার একটি বড় ধাপ হ’ল এই একাত্মতা আলগা করা। “আমি রাগী” থেকে “আমার মনে রাগ উঠেছে, আমি তা দেখছি”, এই সামান্য বাক্যবদল মনের ভিতরে বিরাট ব্যবধান তৈরি করে। গীতা নিজেই এর একটি সুন্দর উপমা দিয়েছে। যেমন একটিমাত্র সূর্য সমগ্র জগৎকে আলোকিত করে, তেমনই ক্ষেত্রী বা ক্ষেত্রজ্ঞ সমগ্র ক্ষেত্রকে আলোকিত করেন। সূর্য যেমন যা আলোকিত করছে তার দ্বারা কলুষিত হয় না, তেমনই চৈতন্যও শরীর-মনের ওঠানামায় অক্ষুণ্ণ থাকে। এই বোধ থেকেই আসে গীতার সেই বিখ্যাত ঘোষণা, আত্মা কখনও জন্মায় না, মরেও না। সে অজ, নিত্য, শাশ্বত, শরীর নষ্ট হ’লেও সে নষ্ট হয় না। জরা, ব্যাধির “ধর্ম” শরীরের, ক্ষেত্রের, ক্ষেত্রজ্ঞের নয়। মূল ভাষায়, আমি সেই অজর, অমর, নিত্যমুক্ত চৈতন্য।

তবে এখানেও একটি সাবধানতা দরকার। এই উপলব্ধিকে কেবল বুদ্ধির খেলা বানিয়ে ফেলা সহজ। “আমি তো আত্মা, আমার কিছু হয় না”, মুখে এই কথা বলা এক জিনিস, বাস্তব দুর্যোগে সেই বোধ ধরে রাখা আরেক। ঠিক এখান থেকেই আমরা পরের ধাপে আসি, যেখানে তত্ত্বকে জীবনে ফলবান করতে চিত্তভূমির চাষ অপরিহার্য হয়ে ওঠে। সাধক রামপ্রসাদ সেন তাঁর বিখ্যাত শ্যামাসংগীতে মনকে এক অবহেলিত চাষির কাছে প্রশ্ন করেছেন: এমন সুন্দর মানব-জমিন পতিত পড়ে আছে, একটু যত্নে চাষ করলে যে সোনা ফলত, সেই কৃষিকাজ তুমি জানলে না? (“মন রে কৃষিকাজ জান না” শিরোনামে গানটি বহুল প্রচলিত।) এই রূপকের সৌন্দর্য হ’ল, জীবনকে এখানে এমন এক জমি বলা হয়েছে, যাতে ফসল ফলে কেবল পরিচর্যার ফলে। বীজ, জল, সার, বেড়া, নিড়ানি, সবই দরকার। আর সেই চাষের প্রথম কাজ হ’ল আগাছা তোলা, মানে দোষ ও দুর্বলতা চিনে সরানো। গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ই সেই চাষের একটি তালিকা দিয়েছে। ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞের তত্ত্ব বলার ঠিক পরেই শ্রীকৃষ্ণ কয়েকটি গুণের কথা বলেছেন, যেগুলোকে তিনি “জ্ঞান” বলে অভিহিত করেন – অমানিত্ব, অদম্ভিত্ব, অহিংসা, ক্ষান্তি বা ক্ষমা, আর্জব বা সরলতা, গুরুসেবা, শৌচ, স্থৈর্য ও আত্মসংযম। লক্ষ্য করার মত, জ্ঞান বলতে এখানে কোন তথ্যের সংগ্রহ বোঝানো হয়নি। তালিকাটি পুরোপুরি চরিত্রগঠনের, অর্থাৎ পরম সত্য বোঝার প্রস্তুতি মাথায় নয়, স্বভাবে।

অমানিত্ব (বিনম্রতা): নিজেকে বড় বলে প্রতিষ্ঠা করার তাগিদ ছেড়ে দেওয়া। অহংকার হ’ল আয়নার সবচেয়ে ঘন ধুলো, কারণ সে নিজের অস্তিত্বই টের পেতে দেয় না।
অদম্ভিত্ব (অকপটতা): যা নই, তা হওয়ার ভান না করা। আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এই গুণটির প্রাসঙ্গিকতা বিশেষভাবে চোখে পড়ে। আমরা জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলো সাজিয়ে দেখাই, ভিতরের অস্থিরতা লুকিয়ে রাখি। এতে দর্শকের প্রশংসা মেলে, কিন্তু নিজের সঙ্গে সম্পর্কে একটি ফাঁক তৈরি হয়। দম্ভ মানুষকে নিজের কাছ থেকেই সরিয়ে দেয়।
অহিংসা ও শৌচ: কায়, মন ও বাক্যে কাউকে আঘাত না করা এবং দেহ-মনের ভিতরকার পরিচ্ছন্নতা রাখা। অহিংসার পরিসর এখানে বিস্তৃত। কারও প্রতি ঘৃণাপূর্ণ চিন্তাও মনের একটি ক্ষুদ্র হিংসা, এবং সেই হিংসায় প্রথম ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিজের মন।

এই প্রস্তুতির প্রয়োজন একটি চিকিৎসাবিদ্যার উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যায়। রক্তচাপ বা সুগার নিয়ন্ত্রণে না এনে বড় অস্ত্রোপচারে যাওয়া নিরাপদ নয়, কারণ শরীর সেই ধকল সামলানোর জন্য প্রস্তুত থাকে না। তেমনই চিত্তশুদ্ধি না ঘটিয়ে কেবল উঁচু তত্ত্বকথা আওড়ালে জীবনের সামান্য ধাক্কাতেই সব ভেঙে পড়ে। যিনি সারা দিন “সবই মায়া, আমি নির্লিপ্ত” বলেন, অথচ সামান্য অপমানে জ্বলে ওঠেন, তাঁর জ্ঞান এখনও বীজ অবস্থাতেই আছে, চারা হয়নি। শ্রীরামকৃষ্ণ এই ভিত্তির গুরুত্ব বারবার বলেছেন। কাঁচা মনে জ্ঞানের কথা ঢুকলে তা টেকে না। আগে সাধনা, সংযম ও সৎসঙ্গে মনকে গড়তে হয়। এই কারণে ভারতীয় ঐতিহ্যে নৈতিক শৃঙ্খলা যোগসাধনার ভিত্তি হিসেবে গণ্য। পতঞ্জলির অষ্টাঙ্গিক পথেও আসন-প্রাণায়াম-ধ্যানের আগেই আসে অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য ও অপরিগ্রহ।

এই সবকিছু শুনে কেউ মনে করতে পারেন, তবে বুঝি সংসার ছেড়ে বনে যেতে হবে। শ্রীরামকৃষ্ণের উত্তর ঠিক উল্টো। তিনি গৃহস্থ ভক্তদের বলতেন, সংসারে থেকেই ঈশ্বরকে ডাকা সম্ভব, এবং তা কঠিনও নয়। কাঁঠাল ভাঙার আগে হাতে তেল মেখে নিলে আঠা লাগে না, তেমনই আগে ঈশ্বরকে লাভ করে সংসারে থাকলে সংসারের কালিমা মনে লাগে না। আবার সংসারের কাজে ব্যস্ত থেকেও যেমন কোন কোন নারীর মন ভালবাসার মানুষটির দিকে পড়ে থাকে, সাধকেরও তেমনই সব কাজের ফাঁকে মন থাকবে ঈশ্বরের দিকে। “এক হাতে কাজ, আরেক হাতে ঈশ্বরকে ধরে থাকা”, এই সারকথা প্রচলিত আকারে লোকমুখে ঘোরে, যদিও সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে উপমাগুলো কথামৃতের বিভিন্ন স্থানে ছড়ানো। গীতাও একই কথা বলে। কর্ম না করে কেউ একদণ্ডও থাকতে পারে না, আর কর্মফলে আসক্তি ছেড়ে কর্তব্য পালন করাই কর্মযোগ। সংসার এখানে বাধা নয়, সাধনার ক্ষেত্র। কর্মস্থলের চাপ, পরিবারের দায়িত্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন, এসবই আয়না মাজার সাবান-জল। সংসার যত কঠিন পরীক্ষা নেয়, চিত্তশুদ্ধির সুযোগও তত বাড়ে। আজকের দিনে “মনরূপ স্টিয়ারিং” রূপকটিও মন্দ নয়। গাড়ির চালকের আসনে যে বসে, গন্তব্য ঠিক করার দায়িত্ব তার। জীবনের ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে স্টিয়ারিং যদি অশান্ত, লোভী বা ভীত মনের হাতে থাকে, তবে দুর্ঘটনা প্রায় নিশ্চিত। আর সেটি যদি ঈশ্বর বা উচ্চতর আদর্শের হাতে সঁপে দেওয়া যায়, অর্থাৎ ব্যক্তিগত অহং-এর পরিবর্তে বৃহত্তর কল্যাণকে চালক করা যায়, তবে যাত্রা নিরাপদ ও অর্থবহ হয়।

তত্ত্ব যত সুন্দরই হোক, তা কাজে না লাগলে কেবল আলোচনা হয়ে থাকে। তাই কয়েকটি ছোট অনুশীলনের কথা ভাবা যেতে পারে, যেগুলোর কোনটিই কঠিন বা নাটকীয় নয়:
১. দ্বিতীয় তীরকে চিনে নেওয়া: কোন কষ্টের মুহূর্তে নিজেকে প্রশ্ন করুন, “এর কতটুকু ঘটনা, আর কতটুকু আমার মনের গল্প?” শুধু এই প্রশ্নটিই দ্বিতীয় তীরের ধার কমিয়ে দিতে পারে।
২. সাক্ষীভাব: দিনে অন্তত একবার পাঁচ মিনিট চুপ করে বসে নিজের চিন্তাগুলোকে দেখুন, যেন আকাশে মেঘ ভেসে যাচ্ছে। “চিন্তাটা এসেছে”, এর বেশি কিছু করার দরকার নেই। এটাই ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ ভেদের সরল অনুশীলন।
৩. দাম্ভিকতার হিসাব: সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু দেওয়ার আগে ভেবে নেওয়া যায়, এটি কি সত্যকে প্রকাশ করছে, না প্রতিমূর্তি গড়ছে? এ কোন নিষেধাজ্ঞা নয়, শুধু সচেতনতা।
৪. একটি করে ছোট অহিংসা: দিনের শেষে ভাবুন, আজ কি বিরক্তি, ব্যঙ্গ বা অবহেলায় কাউকে কষ্ট দিয়েছি? স্বীকার করা ও পরদিন সামান্য শুধরে নেওয়া, এতেই চাষ এগোয়।
৫. শরীরের যত্ন, কিন্তু আসক্তি ছাড়া: সময়মত খাওয়া, ঘুম ও চিকিৎসা মানা, তবে শরীরের সুখ-অসুখ দিয়ে নিজের মূল্য বা শান্তি মাপতে না যাওয়া।
৬. নিজের প্রতি কোমলতা: সাধনা মানেই নিজের ওপর নির্দয় হওয়া নয়। মন দুর্বল হলে নিজেকে ধিক্কার না দিয়ে আবার শুরু করাই সঠিক পথ। আয়না একদিনে পরিষ্কার হয় না, রোজ একটু করে পরিষ্কার করতে হয়।

শরীর নয়, মনই সাধু – এই কথাটির ভিতরে একটি বিরাট আশ্বাস আছে। আমাদের বাইরের পরিস্থিতি সবসময় নিজের হাতে থাকে না। রোগ, বার্ধক্য, ক্ষতি, বিচ্ছেদ – এগুলো আসবেই। কিন্তু সেই সবের মাঝখানে আমরা কীভাবে দাঁড়াব, তার একটি বড় অংশ আমাদের নিজের হাতে। প্রথম তীর এড়ানো না গেলেও দ্বিতীয় তীরের আঘাত থেকে বাঁচার পথ আছে। শরীর ও মনের প্রতিটি ওঠানামাকে “ক্ষেত্র” জেনে তাকে সাক্ষীর মত দেখার শিক্ষা আছে। আর নম্রতা, সরলতা, অহিংসা ও সংযমের দৈনন্দিন চাষে মনের আয়না ক্রমে স্বচ্ছ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে। এটি কোন দূরবর্তী ধার্মিকের কাজ নয়, সংসারী, চাকুরিজীবী, ছাত্র, গৃহিণী, প্রবীণ – সবার জন্যই খোলা পথ। এক হাতে জীবনের কাজ, আরেক হাতে সেই গভীর আশ্রয়ের সন্ধান – এই দ্বৈত অভ্যাসই সংসারকে সাধনক্ষেত্রে পরিণত করে। যেদিন আমরা মনের স্টিয়ারিং-এর ওপর নিজের ক্ষুদ্র অহংয়ের দাবি ছেড়ে দেব, নিজের দ্রষ্টা-স্বরূপকে একটু একটু করে চিনতে শিখব, সেদিন রামপ্রসাদের সেই স্বপ্নই সত্য হবে – মানবজমিনে সোনা ফলবে। তখন দুঃখ আসবে, কিন্তু তা আর আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না।


তথ্যসূত্র:

[১] শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা
[২] শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত – শ্রীম-কথিত
[৩] শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলাপ্রসঙ্গ – স্বামী সারদানন্দ
[৪] The Complete Works of Swami Vivekananda – Vol. 1( Advaita Ashrama )
[৫] পতঞ্জলি – যোগসূত্র
[৬] Reason and Emotion in Psychotherapy – Albert Ellis
[৭] Man’s Search for Meaning – Viktor E. Frankl
[৮] Epictetus – Enchiridion ( Chapter – 1 )


লেখক পরিচিতি : সৈকত প্রসাদ রায়
সৈকত প্রসাদ রায় ১৯৮৯ সালের ২৭ শে জুলাই কৃষ্ণনগরে জন্মগ্রহণ করেন, নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় রানাঘাট পালচৌধুরী উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সার্ধ - শতবর্ষের ম্যাগাজিনে সর্বপ্রথম ছোট গল্প লেখা দিয়ে লেখালিখির শুরু , রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করে বর্তমানে তিনি কলকাতা বড়বাজারে অবস্থিত মহালক্ষী এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার, তিনি আধ্যাত্মিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে লেখেন। তিনি সারদা মা-কে নিয়ে লিখেছেন বই “Teachings of The Holy Mother”, ও " মমতাময়ী মা " যেখানে সারদা মার জীবন, আদর্শ ও শিক্ষা নিয়ে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এছাড়া তিনি মাদার টেরেসা-কে নিয়ে লিখেছেন বই “The Universal Love of Mother Teresa”, যেখানে মানবতার প্রতি মাদার টেরেসার অমোঘ প্রেম এবং দয়ালু কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়েছে।এছাড়া তিনি বিভিন্ন জনপ্রিয় সাহিত্যিক গল্পগ্রন্থ রচনা করেছেন, যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো " The First Reader" " Give Me Form " “সাতরঙা প্রেম”, যা পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এছাড়া " নিয়তির খেলা " , " মাতৃরূপেণ " তার লেখা বইগুলোর মধ্যে অন্যতম। আনন্দবাজার পত্রিকা ও বর্তমান পত্রিকা সহ বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইনে নিয়মিত তিনি লেখালিখি করেন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up