অচেনা মুখ চেনা সম্পর্ক – শেষ পর্ব

লেখক: শর্মিলা ঘোষনাথ

অচেনা মুখ চেনা সম্পর্ক – প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন
অচেনা মুখ চেনা সম্পর্ক – দ্বিতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

(আত্মীয় তো তাঁরাই, যাঁরা আমাদের আত্মার খুব কাছের। হাত বাড়ালেই যাঁদের কাছে পাওয়া যায়। বাধা বিপত্তি এসে যখন চারপাশের জগতকে থমকে দিয়েছে বলে মনে হয়, তখন আবার যাঁরা নতুন করে জীবন পথে চলার ভরসা যোগান- তাঁরাই তো প্রকৃত আত্মীয়। সে সম্পর্ক কি শুধুমাত্র বংশলতিকা বা পারিবারিক যোগসূত্রের ক্ষুদ্র বন্ধনে বেঁধে রাখা যায়? আমার  জীবনের পথ চলার অভিজ্ঞতা কখনই তা মানতে পারে না। চলার পথে রক্তের সম্পর্ক ছাড়াই এমন অনেক মানুষ এসে চোখে- অন্ধকার- দেখা মূহুর্তে আমার সামনে অযাচিতভাবে হাত বাড়িয়ে সামলে দিয়েছেন, ভেঙে পড়তে দেননি। ঈশ্বরকে দেখা যায় না কিন্তু কোন কোন সময়ে মনে হয় তিনি বোধহয় মানুষের রূপেই কাণ্ডারী হয়ে এসে ঝড়- তুফানে টলমল নৌকোটির হাল ধরে পার করিয়ে দেন, নতুন করে আলোর দিশা দেখান, আর মনে করিয়ে দেন “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারিও না”।
সেইসব মানুষদের কারুর মুখ মনে আছে, কারুর বা মুখ মনে নেই, কিন্তু আজ আমার করজোড়ে তাঁদের প্রত্যেককে বলতে ইচ্ছে করে, “তোমরা সবাই আমার পরমাত্মীয়, আমার জীবনে তোমরা না থাকলে হয় আমিই থাকতাম না অথবা জীবনটা এ রকম থাকত না  তোমাদের ভুলি কী করে?” তেমন কিছু মানুষের গল্প নিয়ে আজ আমার  কৃতজ্ঞতা জানানোর এ ক্ষুদ্র প্রয়াস।)

পাহাড়ি  পাকদণ্ডী পথ দিয়ে  চলতে গিয়ে বেশ রোমাঞ্চই  হচ্ছে।  মনে হচ্ছে এরকম কিছু   অভিজ্ঞতা না হলে অফবিট জায়গায় বেড়াতে আসার কোন মানেই হয়  না।  যাত্রাপথের সবটাই যদি পূর্বপরিকল্পনা মত,  ছকে বাঁধা হয়,  তাহলে ফিরে গিয়ে জমিয়ে গল্প করার মত থাকেটাই বা কি?

খুব সরু মাটির পথ, স্কুলের বাচ্ছাদের মত একজনের পেছনে আরেকজন লাইন দিয়ে চলেছি। আমরা কজন ছাড়া আর কোন জনমানব নেই। মুখ তুললেই মাথার ওপর অনন্ত আকাশ, সঙ্গী হিসেবে চারধারে উঁচু উঁচু পাহাড়ের সারি আর সবুজে ঘেরা অপার পৃথিবী।  এ অপার্থিব রূপসুধা আকণ্ঠ পান করেও যেন তৃষ্ণা মেটে না। এ যেন শুধু প্রাণ ভরে বিশুদ্ধ বাতাস বুক ভরে নেওয়ার সময়, প্রকৃতির ভিতর দিয়ে সেই  ত্রিভুবনেশ্বরকে উপলব্ধি করার মূহুর্ত। সামান্য কথা বলার শব্দও যেন এই মৌন, ধ্যানগম্ভীর পরিবেশে ছন্দপতন ঘটাবে। লঘু ছন্দে পা ফেলে মনে মনে গুণগুণ করে গান গাইতে গাইতে পথ চলেছি, “জগতের আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ, ধন্য হল মানবজীবন”। হঠাৎপাশ থেকে সঞ্জয় নামের সেই বাচ্চা গাইড ছেলেটি হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “ম্যাডাম জি, আমার হাতটা শক্ত করে ধরুন, আপনার চলতে সুবিধে হবে।” স্মিত হেসে হাত নেড়ে জানালাম, লাগবে না। ওর নিজের পূর্ব অভিজ্ঞতা মত বোধহয় জানা আছে যে পঞ্চাশোর্ধ বাঙালী মহিলাদের শারীরিক সক্ষমতার দৌড় কতদূর হয়, তাই এই সাহায্যের হাত বাড়ানো। মনে মনে বেশ একটা সূক্ষ্ম আত্মশ্লাঘা বোধ করলাম এই ভেবে যে এই ছেলেটা জানে না যে এই মহিলা শুধু শুয়ে বসে দিন কাটায় না, রীতিমত ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার রোজ হাঁটতে অভ্যস্ত। এইটুকু হাঁটা তার কাছে কোন সমস্যাই নয়। আর সামান্য পথ হাঁটলেই নীচের রাস্তায় নেমে অপেক্ষমান বাস ধরা যাবে, সেই বাসেই হোটেলে ফিরে গিয়ে বিশ্রাম। সারাদিন বেশ ধকল গেছে, তাই কম্বলের তলায় হোটেলের নরম বিছানাটা যেন শরীরকে টানছে। কিন্তু পথ শেষ হতে আর কতদূর? এ তো পার্কের কংক্রিটে বাঁধানো রাস্তায় হাঁটা নয়, উঁচু নীচু, অসমান পথে হাঁটতে গিয়ে বুকে যেন অল্প হাঁপরের টান অনুভব করা যাচ্ছে।

কোন্ পথে হাঁটা আর কেনই বা বেড়াতে এসে এই অকারণ ঝামেলায় জড়িয়ে পড়া? এবার একটু পূর্বকথা না বললে যে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। গৌরচন্দ্রিকার অছিলায় তাই এবারের ভ্রমণ বৃত্তান্তের শুরুটা যতটা পারি, সংক্ষেপে পেশ করার চেষ্টা করি।

আমরা দুজন মধ্যবয়সী স্বামী স্ত্রী এসেছিলাম একটি দলের সদস্য হয়ে ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স ভ্রমণ করতে। রাস্তা দুর্গম ও অনিশ্চয়তায় ভরা, সেজন্য এই প্রথম ছেলেমেয়েকে বাড়িতে পরিচারিকার ভরসায় রেখে দুজনে আসা। মনটা একটু খচখচ করছে, ঘোরার শেষ করে বাড়ি ফেরার তাগিদও এবারে বেশী।

দেরাদুন অবধি আকাশপথে এসে গাড়িতে হরিদ্বার, তারপর সেখানে সন্ধ্যায় গঙ্গারতি দেখে পরের দিন সকালে ছোট ভ্যানগাড়িতে চেপে অন্যান্য সহযাত্রীদের সঙ্গে, পরবর্তী গন্তব্য স্থল গোবিন্দঘাট পৌঁছে গেলাম। পথে পড়ল যোশিমঠ ও সেই বিখ্যাত পঞ্চপ্রয়াগ,   প্রতিটিই রূপে অনির্বচনীয়। খরস্রোতা অলকানন্দার ওপারের বিশাল গুরুদোয়ারা ‘শ্রী গোবিন্দধাম’ এর পাশ দিয়ে শুরু হল ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স এর বেসক্যাম্প ঘাংঘারিয়ায় পৌঁছানোর ট্রেকিং। গাড়ির পথ ঐ গোবিন্দঘাট পর্য্যন্তই, তবে পাহাড়ি পথ চলার ধকল এড়াতে আমাদের মত যাত্রীদের জন্যে ঘোড়ার ব্যবস্থাও আছে। ঝর্ণা, সবুজ শ্যামলিমায় ঘেরা পাহাড়ি পথের মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য দু’চোখ ভরে দেখতে দেখতে বিকেলের দিকে ঘাংঘারিয়া পৌঁছালাম। খুবই ছোট জায়গা, থাকা খাওয়া সবই অতি সাধারণ।

পরের দিন সেই বহু প্রতীক্ষিত ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স দেখতে দলপতি তথা মূল গাইডের নেতৃত্বে বেরিয়ে পড়া হল। তখনই জানা গেল যে গত বছর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে মূল উপত্যকায় ধ্বস নেমে চারিদিকে রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। উপত্যকার ভিতরে যাওয়া বিপজ্জনক, তাই সেখানে ঢোকার সরকারী অনুমতি নেই। সংবাদটি, প্রাথমিক ভাবে মনোভঙ্গের কারণ ঘটালেও, দলনেতা তথা গাইড ঐ সময়ে ফোটা বেশ কিছু  প্রজাতির ফুল উপত্যকার মুখে ও আশেপাশের অঞ্চলে নিয়ে গিয়ে দেখালেন। সব ফুলের বোটানিক্যাল নাম মনে না থাকলেও সাধারণের কাছে বজ্রদন্তী নামে পরিচিত ফুল আর হলুদ পাপড়ির ওপর লালের টিপ দেওয়া খুব ছোট এক ধরণের ফুল, যার চাহিদা নাকি রূপচর্চায় ব্যবহৃত সামগ্রী প্রস্তুতিতে খুব বেশী, সেই স্যাক্সিফ্রাগা ব্রুনোনিস, বিশেষ করে নজর কাড়লো। এছাড়া চেনাজানা চেহারার বা পরিচিত নামের অর্কিড, প্রিমুলা, জেরানিয়াম, পিটুনিয়া, ক্যলেনডুলা, জিনিয়া আর অজস্র রডোডেনড্রন তো আছেই। ছবি তুলে মনের দুঃখ কিছুটা হলেও মিটল কিন্তু সেইসঙ্গে যা দেখে গা শিউরে উঠল তা হচ্ছে প্রকৃতির ধ্বংসলীলা। শুনেছিলাম কেদারনাথে আকস্মিক বন্যা (ফ্লাশ ফ্লাড) এসে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছে। এখানে এসে মনে হল গোটা উত্তরাঞ্চলেই যেন কোন দানব তাণ্ডব চালিয়ে গেছে যা একবছর পার করেও সামলে ওঠা যায়নি। রাস্তাঘাট সারাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে কিন্তু পাহাড় থেকে ক্রমাগত পাথর ভেঙ্গে পড়ে নতুন করে ধ্বস নামছে ও বিভিন্ন অঞ্চল তছনছ করে দিচ্ছে। সাধারণ জ্ঞান দিয়েই বুঝতে অসুবিধা হয়  না যে এখানকার মাটির উপরিভাগ, বিগত বছরের বন্যার ফলে, স্থিতিশীলতা পুরোপুরি হারিয়েছে। যাইহোক, পরের দিন আবার দুরন্ত চড়াই ভেঙ্গে হেমকুণ্ড সাহিব দেখতে যাওয়া হল।

তুলনামূলকভাবে এই অঞ্চলটি প্রকৃতির রোষ থেকে রেহাই পেয়েছিল তাই চারপাশে থরে থরে ফুল ফুটে আছে। অপরূপ রূপসী ব্লু পপি ও স্বনামধন্য ব্রহ্মকমল, এখানে এসেই প্রথম দেখতে পেলাম, যা দু’চোখ সার্থক করে দিল। গুরু গোবিন্দ সিং এর স্মৃতিধন্য ৪৬০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত, ঘিরে রাখা সাতটি পর্বতের অতন্দ্র প্রহরায় থাকা গুরুদোয়ার ‘শ্রী হেমকুণ্ড সাহিব জী’ শিখ ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র ধর্মস্থান। এক ধ্যানগম্ভীর পবিত্র পরিবেশ, মন আপনিই শান্ত হয়ে যায়। গুরুদোয়ারার পাশেই একটি সরোবর। বিস্মিত হলাম দেখে যে অনেক তীর্থযাত্রী, গোবিন্দঘাট থেকে ১৯ কিলোমিটার খাড়াই পথ পায়ে হেঁটে এখানে পৌঁছাবার ধকল নেওয়ার পরেও, শুধুমাত্র বিশ্বাসের জোরেই, অপ্রতুল অক্সিজেন ও কনকনে ঠান্ডা হাওয়াকে অগ্রাহ্য করে ঐ সরোবরের হিমশীতল জলে ডুব দিয়ে স্নান করে তারপর গুরুদোয়ারায় প্রবেশ করছেন। লঙ্গর খানায় সকল যাত্রীর জন্য বরাদ্দ গরম সাবুর পায়েস গ্রহণ করে ফিরে এলাম ঘাংঘারিয়া। পরের দিন ফিরতি পথে গোবিন্দঘাটে পৌঁছে গেলাম।

ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স ও হেমকুণ্ড সাহিব দর্শনের পরই যদি এবারের ভ্রমণ সমাপ্ত হত, তাহলে এই যাত্রার ক্লাইম্যাক্স অদেখাই থেকে যেত। আর অসম্পূর্ণ থেকে যেত মানুষের প্রতি নতুন করে বিশ্বাস ফিরে পাওয়ার উপাখ্যান। হয়তো ঈশ্বরের অভিপ্রায় ছিল অন্যরকম তাই আমাদের পূর্বনির্ধারিত যাত্রাসূচী অনুসারে, আরো দু একটি স্থান দেখা তখনও বাকি ছিল, আমাদের বাড়ি ফেরার জন্য প্লেনের টিকিটও কাটা ছিল কয়েকদিন পরের। কদিন ধরে আকাশে মেঘের আনাগোনা লেগেই রয়েছে, সূর্যের মুখ দেখা ভার। আমাদের দলনেতা, তাই প্রথমেই যাত্রাসূচীর অন্তর্গত আউলি উপত্যকা দর্শন, বাতিল করে দিলেন এই বলে যে চারিপাশ মেঘে ঢেকে থাকলে যে মনোরম দৃশ্য দেখার উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রীরা ওখানে যান, তা কিছুই উপলব্ধি করা যাবে না। অতএব দ্রষ্টব্য স্থানগুলির মধ্যে অবশিষ্ট রইলো শুধু বদ্রীনাথধাম ও মানা গ্রাম।

বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রায় প্রতিদিন, ধ্বস নামার ঘটনা কানে আসায় আমাদের দলের পরিচালক এই স্থানগুলিতেও না যাওয়ায় প্রস্তাব দিলেন,পরিবর্তে নিকটবর্তী পাণ্ডুকেশ্বর মন্দিরে, যেখানে বদ্রীনাথজী শীতকালে মন্দির বন্ধ হয়ে গেলে পূজিত হন, দেখিয়ে আনলেন। পায়ে হাঁটা সামান্য সেই পথ চলতে গিয়েও চারদিকের পাহাড় থেকে অনবরত ছোটবড় পাথর গড়িয়ে পড়া প্রত্যক্ষ করলাম। বেশ কিছু জায়গায়, পাথরের আঘাত এড়ানোর জন্যে, প্রায়  দৌড়ে পেরোতে হল। চোখের সামনে এই ঘটনা দেখে বেশ কিছু সহযাত্রী নতুন কোন অভিযানে যাওয়ার সাহস করলেন না, বাকি দিনগুলো হোটেলেই কাটিয়ে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এত কাছে এসে বদ্রীনারায়ণ দর্শন না করে ফিরে যাব- এতে মন সায় দিচ্ছিল না। দলের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে আলোচনায় জানা গেল দলের আরো বেশ কয়েকজন আমার সঙ্গে সহমত পোষণ করেন। দলনেতাকে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে বলায় প্রথমে তিনি স্বীকৃত হলেন না, শেষে অনেক জোরাজুরি করতে এক শর্তে রাজি হলেন যে গোবিন্দঘাট থেকে বদ্রীনাথধামের পথে আনুমানিক তিন কিলোমিটার দূরত্বে এক জায়গায়, যেখানে প্রায়শই ধ্বস নামার খবর পাওয়া যাচ্ছে, তার আগে অবধি গাড়ি করে যাত্রীদের পৌঁছে দেওয়া হবে। ঐ অঞ্চলটি পায়ে হেঁটে পেরিয়ে নিজের দায়িত্বে অন্য গাড়ি ধরে তাঁরা বাকি পথ যাবেন। গাড়ি ওখানেই অপেক্ষা করবে, ওই জায়গায় ফিরে এলে আবার গাড়িতে করে তাঁদের হোটেলে ফিরিয়ে আনা হবে। পথে ধ্বস নেমে রাস্তা বন্ধ হয়ে গাড়ি আটকে পড়ার ঝুঁকি তিনি কোন মতেই নিতে পারবেন না। তাতেই সম্মত হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। ‘যা থাকে কপালে, দেখা যাবে’ ভেবে নিয়ে আমরা কয়েকজন তিনটি ভ্যানগাড়িতে করে বেরিয়ে পড়লাম, আমাদের গাড়ি সবার পেছনে। এ গাড়িতে আমরা সহ দুই মধ্যবয়সী দম্পতি, এক সদ্য বিবাহিত অল্পবয়স্ক স্বামী স্ত্রী ও মাঝবয়সী তিন পুরুষ বন্ধুর দল, আর যাত্রীদের প্রয়োজনে সাহায্য করার জন্যে সঙ্গে, আমার মেয়ের চেয়েও বোধহয় বয়সে ছোট সেই গাইড, সঞ্জয়- মোট আটজন।
বেশ নিরুপদ্রবে তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার পর সামনের দুটি গাড়ির দেখা মিলল, তারা দলনেতার নির্দেশ অনুযায়ী যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তায় কোন ধ্বস নামার লক্ষণ নেই, অবাধে গাড়ি যাতায়াত করছে। কথা বলে আগেই বোঝা গিয়েছিল আমাদের গাড়ির চালকটি বেশ ভালমানুষ। তিনি আমাদের বাকি রাস্তা নিয়ে যেতে অনিচ্ছুক নন কিন্তু তার ওপর অন্যরকম নির্দেশ থাকায় যেতে পারছেন না। দেখা যাচ্ছে সামনের রাস্তা পরিষ্কার। সবাই মিলে অনুরোধ করায় তিনি, সামান্য কিছু অতিরিক্ত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে, এগিয়ে যেতে রাজি হলেন। বেশ নির্বিঘ্নে বদ্রীনাথধাম পৌঁছানো গেল কিন্তু মন্দির, মধ্যাহ্ন বিরতিতে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুনরায় খোলা অবধি আমরা অপেক্ষা করতে বাধ্য হলাম। এটাই কি আসন্ন রোমাঞ্চকর নাটক, যা অভিনীত হতে চলেছে, তার প্রথম ওয়ার্নিং বেল ছিল? আমরা কজন গর্ভগৃহে প্রবেশ করে, যে মন্দিরে সারা বছর ভক্ত সমাগমে তিল ধারণের স্থান থাকে না, সেখানে আমরা কজন ফাঁকা মন্দিরে আশ মিটিয়ে অনেকক্ষণ ধরে প্রার্থনা করলাম। বেরিয়ে আসতেই গাড়ির চালক তাড়া দিলেন ফিরে যাওয়ার জন্যে। আর একটু গেলেই মানা গ্রাম। চিন সীমান্তের আগে ভারতের শেষ বসতি, সরস্বতী নদীর উৎস স্থল, শ্রী গণেশের মুখে শুনে বেদব্যাসের মহাভারত রচনার স্থান- এত কিছু না দেখে ফিরে যাওয়া কি বুদ্ধিমানের কাজ? তাছাড়া এখনো বৃষ্টি নামার লক্ষণ নেই, তাই নতুন করে ধ্বস নামার সম্ভাবনাই বা কোথায়? চালককে আবার অনুরোধ করা হ’ল, তিনিও সামান্য আপত্তির পর অপেক্ষা করতে রাজি হলেন। চালকের কথা অমান্য করাতেই সম্ভবতঃ আসন্ন নাটকের দ্বিতীয় ঘন্টা পড়লো। সব দেখা হ’ল, ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার মত। মানা গ্রাম থেকে হাতে বোনা ভেড়ার লোম থেকে তৈরী পশমের কার্পেট কিনলাম। দর্শনার্থী- ক্রেতা কেউ নেই তাই অন্য বছরের তুলনায়  অনেকটা কম দামেই পাওয়া গেল। তারপর গাড়িতে উঠে পড়লাম। কোথাও কোন বিপদের সঙ্কেত নেই, সহযাত্রীদের সঙ্গে নিশ্চিন্তে গল্প করতে করতে চলেছি। আমাদের দলের বাকি যাদের মাঝপথে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের সঙ্গে আর দেখা হয়নি, তাই তারা আদৌ বদ্রীনাথধামে পৌঁছাতে পারলেন কি না- সেই আলোচনাও চলছে। হঠাৎ গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল, সামনে আরও দু চারটে গাড়ি দাঁড়ানো। তখনও আমাদের গল্পতে ভাঁটা পড়েনি। শুনলাম সামনের রাস্তা ধ্বস নেমে বন্ধ হয়ে গেছে। পাহাড়ি পথে বেড়াতে এলে এ ঘটনা আকছার ঘটতে দেখা যায়। জেসিবি লোডার মেশিন এসে পাথর সরিয়ে রাস্তা গাড়ি চলাচলের উপযুক্ত করে দেয়- এ জানা কথাই, তাই গাড়িতে বসে অপেক্ষা করতে করতেও গল্পে ভাটা পড়ল না।

বেশ কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর দলের পুরুষ সদস্যরা গাড়ি থেকে নামলেন সামনের ঝুপড়ির দোকান থেকে চায়ের জোগাড় করতে, সেইসঙ্গে রাস্তা ঠিক হতে কত সময় লাগবে, তার আন্দাজ করতে। ফিরে এসে যা জানালেন, তা মোটেই আশাব্যঞ্জক মনে হল না। সামনে বেশ বড়সড় ধ্বস নেমেছে। আর্মি পোস্ট থেকে জানা গেছে যে, ইদানীং এই অঞ্চলে ধ্বস নামার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় পরিষ্কার করার মেশিনও, চাহিদামত সর্বত্র সরবরাহ করা যাচ্ছে না। কবে নাগাদ রাস্তা খুলবে, তার কোন নিশ্চয়তা নেই, দু’তিনদিনও লাগতে পারে। আশপাশে কোন থাকবার জায়গাও নেই। তাই তাঁরা পরামর্শ দিয়েছেন যে রাস্তা খোলার ভরসায় বসে না থেকে পাহাড়ি পায়ে চলা পথ ধরে খানিকটা এগিয়ে যাওয়াই শ্রেয়। কিছুটা গেলে আবার গাড়ি চলার উপযুক্ত রাস্তা পাওয়া যাবে। আমার কর্তাটি গাড়ির রাস্তা থেকে কিছুটা উঁচুতে একটি সমান্তরাল পায়ে চলা পথ দেখিয়ে বললেন যে ঐ পথ ধরে খানিকক্ষণ হাঁটলেই আবার রাস্তায় নেমে গাড়ি ধরা যাবে। অন্যরা একটু সন্দিগ্ধ হলেও আমি আসন্ন অ্যাডভেঞ্চারের প্রত্যাশায় বেশ উত্তেজনা অনুভব করলাম।

তারপর শুরু হল পথ চলা, প্রথমে লঘু পায়ে পথের চারপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে, তারপর ধীর পায়ে বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে আর কতটা পথ বাকি আছে তার আন্দাজ করতে করতে, তারও পরে ক্লান্ত টলোমলো পায়ে, প্রতি মূহুর্তে খাদে গড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে। কিন্তু সামান্য পথ পার করতে এত সময় লাগছে কেন? পরে জেনেছিলাম, মিলিটারিদের সঙ্গে কথোপকথনে, কতটা দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে, সে বিষয়ে আমার কর্তার সম্যক ধারণা থাকলেও, আমাদের মনোবল অক্ষুণ্ণ রাখার উদ্দেশ্যে তিনি তা প্রকাশ করেননি।

এবড়োখেবড়ো মাটির পথ, কয়েকদিন আগে বৃষ্টি হওয়ায় নরম, আঠালো হয়ে আছে, কাদা মাটিতে পা পড়লে কোথাও পিছলে যাচ্ছে আবার কোথাও এমন ঢুকে যাচ্ছে যে পা ওঠানোই মুশকিল হয়ে পড়ছে। চারদিকে বড় বড় ঘাস আর পাহাড়, গাড়ির রাস্তার কোনও হদিস নেই, নেই কোন ঘরবাড়িও। প্রত্যেকেই অসমান পথে শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। দাঁড়াতে গেলে পায়ের পাতার সঙ্গে শরীরও হয় সামনের দিকে, নতুবা আরো বিপজ্জনকভাবে পিছনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, ঘুরে দাঁড়িয়ে পেছনের মানুষটিকে দেখার উপায়ও নেই, সাহায্য করা তো দূরস্থান। দলের বাকি দুজন মহিলা সদস্যের মধ্যে একজন তরুণী আর অন্যজন আমার কাছাকাছি বয়সের হলেও মহারাষ্ট্রের গ্রামের মেয়ে, শৈশবে গাছে চড়ে, টিলায় উঠে শরীর অনেক শক্তপোক্ত, ছিপছিপেও, আমার মত কংক্রিটে বাঁধানো ট্র্যাকে হেঁটে সৌখিন শরীরচর্চায় অভ্যস্ত নন। 

দলের বাকি সদস্যদের থেকে বেশ খানিকটা পিছিয়ে পড়েছি। পথ অজানা, মনের জোর ক্রমশ কমে আসছে। চড়াই উৎরাই ভাঙতে গিয়ে, মনে হচ্ছে, দম ফুরিয়ে আসছে, আর হাঁটতে পারছি না। আরও কতদূর চলতে হবে? সেই সময় আবার পাশ থেকে সেই সঞ্জয় নামের গাইড ছেলেটির হাত এগিয়ে এলো, “মা জি, এবার জিদ ছেড়ে আমার হাত ধরুন, নাহলে হাঁটতে পারবেন না, এখনো অনেক পথ চলতে হবে।” ওকে তো আমি ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। সবাই এগিয়ে গেছে, ও কি শুধু আমার জন্যেই অপেক্ষা করছিল? এবার আর ফেরানো গেল না। ওর ডাকটা ম্যাডাম থেকে মা তে বদলে যাওয়ার জন্যে না কি স্বরে এমন কিছু জোর ছিল বলে- জানি না।  ধরলাম হাতটা, যদিও মনে মনে জানি যে পা পিছলে গেলে এই দোহারা চেহারার ছেলেটার পক্ষে আমার ওজন সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। তবুও একটা ভরসার খুব দরকার ছিল।

সরু পথের একপাশে গভীর খাদ। এমন অবস্থায় পাশাপাশি দুজনের চলা অসম্ভব, দুজনেরই খাদে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। পথ এত পিচ্ছিল আর উঁচু নীচু যে একটা পাও সোজা করে রাখা যাচ্ছে না। তবু ছেলেটা বিপজ্জনক ভাবে খাদের একদম ধার ঘেঁষে হাত ধরে পাশে পাশে চলেছে। ওর পায়ের চাপে মাটি নীচে ধ্বসে পড়ছে। কয়েকবার ওর পড়ে যাওয়ার ভয়ে আমি চেঁচিয়ে উঠলাম কিন্তু ও নির্বিকার। বারবার বলে যাচ্ছে, “মা জি, মাটির ওপর শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে পা চেপে ফেলো, আলগা করে রেখো না, পড়ে যাবে। আর দাঁড়িয়ে পড়ো না, চলতে থাকো। আমি আছি না?” পায়ের জোর, নিয়ন্ত্রণ দুটোই হারিয়ে ফেলেছি, যেখানে রাখতে চাইছি, পা সেখানে না পড়ে অন্য কোথাও পড়ছে। দু একবার পিছলে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হল কিন্তু জাদুকরের মত অদৃশ্য শক্তিকে ছেলেটা পড়তে দিল না, ঐ হালকা শরীরে ঠিক সামলে নিল। সেইসঙ্গে সমানে সাহস জুগিয়ে চলেছে, “কিচ্ছু হয় নি মা জি, ভয় পেও না।” সঙ্গে আরো একটি অদ্ভূত প্রস্তাব, “আমি মাটির ওপর পা রাখছি, তুমি আমার জুতোর ওপর পা রাখো, তাহলে পিছলোবে না।” বললাম, “সে আমি পারব না। তার চেয়ে তুমি আমার হাতটাই ভালো করে ধরো।”

মেঘলা আকাশে আলো কমে আসছে। পা থরথর করে কাঁপছে, আর উঠছে না। মনে হচ্ছে এই শেষ, এবার বুঝি আর বাড়ি ফেরা হল না। ছেলেমেয়ের মুখগুলো একবার মনে পড়ল। কেঁদে ফেলে বললাম, “আমাকে ছেড়ে দাও, এখানেই বসে পড়ি। তারপর ঠাণ্ডায়ই হোক বা বন্য জন্তুর আক্রমণেই হোক, মরি, মরব। আমার আর এক পা চলারও ক্ষমতা নেই।” ছেলেটা ওই পরিস্থিতিতেও হেসে উঠে বলল, “তুমি পাগল না কি? তোমাকে মা জি বলে ডেকেছি না? তোমাকে একা ছেড়ে আমি কি যেতে পারি? তুমি বসে পড়লে যে আমাকেও বসে পড়তে হবে। রাতের বেলা এই খোলা আকাশের নীচে বসে থাকলে আমরা দুজনেই ঠাণ্ডায় জমে যাব। তুমি তোমার বাড়িতে, ছেলেমেয়ের কাছে ফিরতে চাও না? তাছাড়া এই বয়সে আমিও এই পাহাড়ে চিরদিনের মত থেকে যাই, তুমি কি তাই চাও?”
কী উত্তর দেব, বুঝে উঠতে পারলাম না। শুধু ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে চোখের জলে ভিজিয়ে দিতে ইচ্ছে হল। ও আবার বলে উঠল, “মা জি, তার চেয়ে এক কাজ কর। আমি তোমাকে পিঠে তুলে নিচ্ছি, তুমি পেছন থেকে আমার গলা শক্ত করে ধরে থাকো, বাকি পথটা এভাবেই পার করে ফেলি।” ঐ অবস্থায় আমি কাঁদবো না হাসবো- ভেবে পেলাম না। কী বলে ছেলেটা? আমার ওজন সম্বন্ধে ওর কোন ধারণা আছে? সে কথা বলতে ও জানালো যে আগের বছর বন্যার সময় ও নাকি আটকে পড়া আমার চেয়েও বেশী ওজনের অনেক মানুষকে পিঠে তুলে উদ্ধার করেছে। আরো বলল যে ওদের মত বেশ কিছু স্থানীয় ছেলেকে, উদ্ধারের কাজে সাহায্য করতে, আর্মি থেকে হাতেকলমে ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে, কাজেই আমার চিন্তার কোন কারণ নেই। এতেও আমি ওর কথায় সম্মতি জানাতে পারলাম না। দ্রুত আলো কমে আসছে, আর কিছুক্ষণ পরেই অন্ধকার গ্রাস করে নেবে পাহাড়টাকে আর শুরু হবে হাড় হিম করা শৈত্যপ্রবাহ। ছেলেটা বলল, “আর দেরী করলে চলবে না। চলো মা জি, একটা বড় করে শ্বাস নাও, আমরা দৌড়ে বাকি রাস্তাটা পেরিয়ে যাই।”

মৃত্যু অনিবার্য বলে মেনে নিলে, বোধকরি, মন চিন্তাশূণ্য হয়ে যায়, আমারও মনের অবস্থাও তখন সেইরকম। ছেলেটা আমাকে প্রায় টানতে টানতে নিয়ে চলল, আর আমি মন্ত্রাবিষ্টের মত ওর কথায় যতটা দ্রুত পদক্ষেপে চলা সম্ভব, চলতে লাগলাম। একদমে বেশ খানিকটা চড়াই ভেঙে একটা পাহাড়ের মাথায়  উঠে এসে বললাম, “একটু দাঁড়াও, দম নিয়ে  নিই।” ও বলল, “মা জি, এখানে এক মূহুর্ত্তও দাঁড়ানো নিরাপদ নয়।” কারণ জানতে চাইলে পাহাড়ের মাথা থেকে ঝুঁকে দেখালো যে আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, তার নীচে আড়াআড়ি করে এক বিশাল ফাটল ধরেছে। বলল, “যে কোন সময়ে আমাদের নিয়ে পাহাড়টা ধ্বসে পড়বে, তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, এই জায়গাটা পেরিয়ে যেতে হবে।” আবার দৌড়।

এরকম ভাবে কতক্ষণ পথ চলেছি, মনে নেই। হঠাৎ ছেলেটার কথায় আচ্ছন্ন ভাব কাটল, “ওই দেখ মা জি, নীচে রাস্তা দেখা যাচ্ছে। আমরা পৌঁছে গেছি।” দেখলাম দলের বাকিরা অনেকটা আগে পৌঁছে গেছে। খবর পেয়ে আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে হোটেল থেকে বাসও এসে গেছে। আমার গৃহকর্তাটি উদ্বিগ্ন মুখে ওপরের পাহাড়ি পথের দিকে চেয়ে আছেন। জল ভরা চোখে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে  বললাম, “আজ তুমি আমায় নতুন জীবন দিলে। তুমি না থাকলে আমি কোন ভাবেই এই রাস্তাটা পার হতে পারতাম না। আজ থেকে জানবো তুমিও আমার একটা ছেলে।” উত্তরে ও একটু হেসে বলল, “এটা তো আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। যখন তুমি বাড়িতে তোমার নিজের ছেলেমেয়ের কাছে ফিরে যাবে, তখন আমার কথা হয়তো তোমার মনেই পড়বে না।” এবারে ওর হাসিটা কেমন যেন করুণ লাগলো। সবাই বাসে উঠে ডাকাডাকি করছে, এতবড় বিপদ পেরিয়ে এসে আমিও বড্ড অবসন্ন, তাছাড়া এখানেও পাহাড় থেকে ক্রমাগত পাথর পড়ছে তাই বাস ড্রাইভার বেশীক্ষণ দাঁড়াতে নারাজ, আর কথা হল না। পরে জেনেছিলাম,পাকদণ্ডী পথে আমরা দু’দুটো পাহাড় ডিঙিয়েছি।

সঞ্জয়ের সঙ্গে চেষ্টা করেও আর দেখা হয়নি। ওর কথা জানতে চেয়েছিলাম, প্রাণ ভরে আরো একবার ধন্যবাদ জানাতে চেয়েছিলাম, সামান্য দৈনিক মজুরীতে অস্থায়ীভাবে নিযুক্ত ছেলেটাকে, কিছু অর্থ কৃতজ্ঞতাস্বরূপ দিতে চেয়েছিলাম কিন্তু পারিনি। জানলাম, এবারের ভ্রমণ শেষ হয়ে  যাওয়ায় দল পরিচালক আর একদিনের জন্যেও বাড়তি খরচ করতে নারাজ, তাই ওকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্ত হওয়ার আগে দল পরিচালকের কাছ থেকে সঞ্জয়ের প্রচুর তিরস্কার জুটেছে – প্রধানত তাঁর বারণ সত্বেও ওর উপস্থিতিতে, গাড়ি বদ্রীনাথধাম অবধি নিয়ে যেতে, পর্যটকদের বাধা না দেওয়ার জন্যে। দ্বিতীয় অভিযোগটি আরো গুরুতর- কর্তব্যে অবহেলার। ওর দায়িত্ব ছিল সব যাত্রীদের দেখভাল করা কিন্তু একজন যাত্রীকে সাহায্য করতে গিয়ে ও অন্যদের দিকে নজর দেয়নি। সেই সদ্যবিবাহিত দম্পতি দলপতির কাছে অভিযোগ করেছেন যে তাঁরা পাহাড়ি পথে অন্যদের তুলনায় দ্রুত চলার ফলে দল থেকে খানিকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। অপেক্ষা করেও পথনির্দেশে সাহায্য করতে কারুকে পাওয়া যায় নি, তাই তাঁরা দিকভ্রষ্ট হয়ে বহুক্ষণ ভুল পথে চলে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন। শেষে ভাগ্যক্রমে এক স্থানীয় মানুষের দেখা পেয়ে সঠিক পথের সন্ধান পান। এই ঘটনার জন্যে তাঁদের আঙুল কর্তব্যরত গাইড সঞ্জয়ের কাজে গাফিলতির দিকেই উঠেছিল। সম্ভবত নিজস্ব সময় একান্তে উপভোগ করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃত ভাবে দলের থেকে অনেকটা এগিয়ে গিয়ে তাঁরা যে দলছুট হয়েছিলেন, সে ব্যাপারে কিছুই বলেননি। শুনলাম সঞ্জয় না কি বিনা প্রতিবাদ মাথা নীচু করে সব অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েছে। এর শাস্তিস্বরূপ ওর আর্থিক প্রাপ্য থেকেও কিছু কাটা গেছে কি না জানা নেই। গরীব ঘরের ছেলে, আর্থিক সংস্থান নেই, প্রথাগত শিক্ষা অর্থাৎ ডিগ্রীর জোর আছে বলেও মনে হয় না। এইসব ভ্রমণ সংস্থাগুলির পক্ষ থেকে, পর্যটক নিয়ে এলে, অস্থায়ী সহযোগী গাইড হিসেবে, দৈনিক মজুরীর ভিত্তিতে ওকে কাজে লাগানো হয়, তাদের কথার প্রতিবাদ করবে- এমন সাহস ওর কোথায়? ওর মত ছেলের অভাব তো এ অঞ্চলে নেই। সামনের ট্যুরে যদি ওর জায়গায় অন্য কারুকে নিয়োগ করা হয়? ওর কাজ যদি না জোটে? সেই ঝুঁকি নেওয়ার সাহস ওর নেই।

সেই তিরস্কারের সাক্ষী ছিলাম না, তাই আপত্তি জানাতেও পারিনি। দল পরিচালককে বলতে পারিনি, “ও আমাকে হাত ধরে নিয়ে না এলে হয় তো পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়ে সেদিনই আমি শেষ হয়ে যেতাম অথবা অচেতন অবস্থায় রাস্তার ওপর পড়ে থাকা আমাকে খুঁজে পেতে আবার লোক পাঠাতে হত- এতে আপনার হয়রানি বাড়তো বই কমতো না।”

পরিশেষে জানাই, এত কিছুর পরেও সেবারে আমাদের অগ্নিপরীক্ষা শেষ হয়নি। আরো অনেক কঠিন পরিস্থিতি পেরিয়ে তবে বাড়ি ফিরতে পেরেছিলাম। দেরাদুনে এসে প্লেন ধরতে গোবিন্দঘাট থেকে ফেরার দিন, হোটেলের কাছাকাছির একটি পাহাড় থেকে রাস্তার ওপর অনবরত কাদামাটি ও পাথর ধ্বসতে শুরু করেছিল। সারা দিন অপেক্ষা করে বিকেলের দিকে আর্মির প্রহরায়, নিজেদের মালপত্র পিঠে, মাথায় বয়ে আমরা, একজন একজন করে জায়গাটা দৌড়ে পার হয়ে তবে গাড়িতে উঠতে পেরেছিলাম। চারদিকে ধ্বস নামার কারণে বারবার যাত্রার গতিপথ বদল করতে হয়েছিল। তারপর প্লেন ধরতে না পারার আশঙ্কায়, চালকের আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে ভয়ঙ্কর বিপদের ঝুঁকি নিয়ে, কোথাও পাথর পড়ে ভেঙ্গে যাওয়া, কোথাও প্রচণ্ড জলের তোড়ে ভেসে যাওয়া রাস্তা দিয়ে, মেঘে ঢাকা আকাশের অন্ধকারে মাঝরাত অবধি তাকে গাড়ি চালাতে আমরা বাধ্য করেছিলাম। শেষে সব হোটেল বন্ধ থাকায় নিরুপায় হয়ে ট্রাক ড্রাইভারদের থাকার উপযুক্ত এক সরাইখানায়, সারাদিন না খাওয়ার পর অখাদ্য ডাল রুটি দিয়ে কোনক্রমে ক্ষুণ্ণিবৃত্তি করে, অবসন্ন শরীর তক্তাপোষে এলিয়ে দিয়ে রাতটুকু কাটিয়েছিলাম। পরের দিন ভোর থাকতে থাকতেই আবার যাত্রা শুরু করে একেবারে শেষ মূহুর্তে প্লেন ধরতে পেরেছিলাম।

ভারতবর্ষের অনেক জায়গায় ঘুরেছি। পাহাড়ি পথে নান রকম অজানা বাধার সম্মুখীনও হয়েছি কিন্তু এইরকম শিহরণ জাগানো, রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা আর কখনই হয়নি। যখনই আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবদের কাছে ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স ভ্রমণের গল্প করি, শুনে তাঁরা শিউরে ওঠেন আর আমাদের বিপদের ঝুঁকি নেওয়ার সাহসকে বাহবা দেন। তখন মুখে না বললেও, সবার অলক্ষ্যে আমার সেই খনিকের জন্যে খুঁজে পাওয়া ছেলের জন্যে মনটা আজও সজল হয়ে ওঠে।

সঞ্জয় সেদিন ওখানে উপস্থিত না থাকলে আজ গল্প বলার জন্য আমিও থাকতাম কি? এত বড় উপকারের বিনিময়ে ওর জন্যে কিছুই করতে পারিনি কিন্তু ওর কথামত ওকে ভুলতেও পারিনি। ওর কোন ছবি আমার কাছে নেই তাই মুখখানা স্মৃতিতে অস্পষ্ট হয়ে গেছে কিন্তু ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্সে ভ্রমণের প্রসঙ্গ উঠলে বা বাড়িতে আসা কোন অতিথিকে ওখানকার ছবি দেখাতে বসলেই মনের মধ্যে সঞ্জয়ের কথাগুলো অনুরণন শুনতে পাই, “ভয় পেও না মা জি, আমি আছি না। আমার হাতটা শক্ত করে ধরো, আমরা ঠিক এই পথটা পেরিয়ে যাব।” লোকে যতই বাড়াবাড়ি বলুক, মনে মনে আমি জানি, ও যে আমার পথে খুঁজে পাওয়া পরমাত্মীয়।

(পথে ঘাটে চলতে অপ্রত্যাশিত ভাবে এমন অনেক মানুষের দেখা পেয়েছি যাঁরা সেই সময় না থাকলে পৃথিবীটা বোধহয় আজও এত সুন্দর মনে হত না। হিমাচল প্রদেশের চন্দ্রতাল থেকে কেলং আসার পথে আমাদের গাড়ির গীয়ার বক্স থেকে উপড়ে চালকের হাতে চলে এসেছিল। যাঁরা ঐ পথে গেছেন, তাঁরা জানেন সম্পূর্ণ কাঁচা, অনবরত বরফ গলা জলের স্রোত বয়ে যাওয়া, একটি মাত্র গাড়ি যাওয়ার মত প্রস্থের কি দুর্গম সেই পথটি। সারাদিনে একটি করে বাস আপ ও ডাউনে চলে, গাড়িও চলে হাতে গোনা। মাঝখানে নেই কোন থাকার, খাওয়ার জায়গা, গ্যারাজ তো দুরস্থান। আমাদের সঙ্গে না ছিল খাবার, না পর্যাপ্ত জল। ঐ অবস্থায় একটি সরকারী গাড়ি ঈশ্বরপ্রেরিতের মত এসে আমাদের উদ্ধার করে কেলং এর হোটেলেই শুধু পৌঁছে দেয়নি, দমকলের ব্যবস্থা করে আমাদের অচল গাড়িকে মোটর মেকানিকের দোকান অবধি টেনে নিয়ে যেতেও সাহায্য করেছিল। এজন্য ওই গাড়ির আরোহীদের সারাদিন খাওয়া জোটেনি। ধন্যবাদ দিতে গেলে সেই সরকারী কর্মচারীরা বিনয়ের সঙ্গে জানিয়েছিলেন যে তাঁরা ধন্যবাদের যোগ্য এমন কিছুই করেননি। পাহাড়ি পথে একে অপরকে সাহায্য করা তো কর্তব্য, না হলে জীবন চলবে কী করে? অবাক হয়ে গিয়েছিলাম সহজ, সরল ভাষায় বলা তাঁদের সেই মহান জীবনবোধের পরিচয় পেয়ে।

আরো একবার বালি বেড়াতে গিয়ে, পুত্রসহ আমরা পরিবারের তিন সদস্য জঙ্গলের গভীরে নেমে জলপ্রপাত দেখতে গিয়ে পথ হারিয়ে কন্যার থেকে, যে স্বইচ্ছায় উপরেই ছিল, অনেকক্ষণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম। কন্যা, পরিবারের সদস্যদের বিপদের আশঙ্কায় জ্ঞানশূণ্য হয়ে সন্ধ্যা নামার মুখে একাই সেই অচেনা, অজানা জঙ্গলের পথে আমাদের খুঁজতে যাওয়ার উপক্রম করেছিল। ভাষার কারণে মত আদানপ্রদানের সমস্যা থাকা সত্বেও, মাত্র দুদিনের পরিচিত অল্পবয়স্ক গাড়ির চালক, তাকে একা যেতে দেননি, নিজে সঙ্গে করে খুঁজতে নিয়ে গিয়েছিলেন। তারওপরে ক্রন্দনরত কন্যাকে, পরিচিত একটি ছেলের সঙ্গে মোটরবাইকে ওপরের নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠিয়ে নিজেই পায়ে হেঁটে আমাদের খুঁজতে বেরিয়েছিলেন। সেদিন দেখেছিলাম কিভাবে সেই বিদেশ বিভুঁইয়ে স্থানীয় একাধিক ছেলেরা আমাদের উৎকন্ঠা বুঝতে পেরে, না চাইতেই নিজেদের উদ্যোগে মোটরবাইক নিয়ে ও মোবাইলের সহায়তায় চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে পুনরায় আমাদের আবার মিলিত হতে সাহায্য করেছিল। সামান্য অর্থের বিনিময়ে কি এই উপকারের প্রতিদান দেওয়া সম্ভব ছিল? এরকম কাহিনী বলে শেষ করার নয়। এঁদের প্রত্যেকের অবদান, আমাদের জীবনে অপরিসীম। নাই বা হল তাঁদের সঙ্গে আর কোনদিন দেখা, তাঁরা সবাই আমাদের পরমাত্মীয়।)


ছবি: প্রণবশ্রী হাজরা


লেখকের কথা: শর্মিলা ঘোষনাথ
একসময়ে সরকারী দপ্তরে কর্মরত, ভালোবাসা বলতে নতুন offbeat জায়গা, বিশেষত পাহাড়ে বেড়ানো, সেখানকার মানুষজন, তাদের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখা আর গান শোনা। দুটো সংস্থায় ইকনমিস্ট হিসেবে কনট্র্যাক্টে কিছুদিন কাজ করার সূত্রে কিছু developmental project এর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, কয়েকটা গবেষণামূলক লেখা সংস্থার ম্যাগাজিনে published হয়েছে।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন
  •  
  •  
  •  
  •  

One Comment

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।