অচেনা মুখ চেনা সম্পর্ক – প্রথম পর্ব

লেখক: শর্মিলা ঘোষনাথ

(আত্মীয় তো তাঁরাই, যাঁরা আমাদের আত্মার খুব কাছের। হাত বাড়ালেই যাঁদের কাছে পাওয়া যায়। বাধা বিপত্তি এসে যখন চারপাশের জগতকে থমকে দিয়েছে বলে মনে হয়, তখন আবার যাঁরা নতুন করে জীবন পথে চলার ভরসা যোগান- তাঁরাই তো প্রকৃত আত্মীয়। সে সম্পর্ক কি শুধুমাত্র বংশলতিকা বা পারিবারিক যোগসূত্রের ক্ষুদ্র বন্ধনে বেঁধে রাখা যায়? আমার  জীবনের পথ চলার অভিজ্ঞতা কখনই তা মানতে পারে না। চলার পথে রক্তের সম্পর্ক ছাড়াই এমন অনেক মানুষ এসে চোখে- অন্ধকার- দেখা মূহুর্তে আমার সামনে অযাচিতভাবে হাত বাড়িয়ে সামলে দিয়েছেন, ভেঙে পড়তে দেননি। ঈশ্বরকে দেখা যায় না কিন্তু কোন কোন সময়ে মনে হয় তিনি বোধহয় মানুষের রূপেই কাণ্ডারী হয়ে এসে ঝড়- তুফানে টলমল নৌকোটির হাল ধরে পার করিয়ে দেন, নতুন করে আলোর দিশা দেখান, আর মনে করিয়ে দেন “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারিও না”।
সেইসব মানুষদের কারুর মুখ মনে আছে, কারুর বা মুখ মনে নেই, কিন্তু আজ আমার করজোড়ে তাঁদের প্রত্যেককে বলতে ইচ্ছে করে, “তোমরা সবাই আমার পরমাত্মীয়, আমার জীবনে তোমরা না থাকলে হয় আমিই থাকতাম না অথবা জীবনটা এ রকম থাকত না  তোমাদের ভুলি কী করে?” তেমন কিছু মানুষের গল্প নিয়ে আজ আমার  কৃতজ্ঞতা জানানোর এ ক্ষুদ্র প্রয়াস।)

অপরিসীম ক্লান্তিতে চোখ জড়িয়ে আসছে কিন্তু ছোট্ট ঘরে টিউব লাইটের আলো চোখের ওপর জ্বললে কারও পক্ষে কি নিশ্চিন্তে ঘুমোনো সম্ভব? একে মাত্র তিনদিন আগেই সিজারিয়ান সেকশনের ধকল, তার পরেও এত কষ্টে পৃথিবীতে আনা ঐ ছোট্ট ধুকপুকে প্রাণটা আদৌ টিকে থাকবে কি না – সেই নিয়ে খোদ ডাক্তারদেরই সংশয়। সেই পরিস্থিতিতে কোন মা কি ঘুমোতে পারে? ও জন্মাবার পর থেকে কোন আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধবকে এ ঘরে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয়নি, আয়ামাসিকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে যখন তখন বাচ্চাকে, কাঁদলে, এমন কী বিছানা নষ্ট করে ফেললেও, যেন কোলে নেওয়া না হয়। এতই ক্ষীণ তার গলার স্বর যে এই তিনদিনে, দ্বিতীয় সন্তানের মা পূর্ব অভিজ্ঞতা অনুসারে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ নিজের বিছানা থেকে শুনতে পায়নি। দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ ২৪ ঘন্টার পার করে যখন মার কাছে বাচ্চাকে প্রথম দেওয়া হল, তখন দেখা গেলো তার ছোট ছোট দুহাতের কবজি থেকে আঙুল অবধি মোটা তুলোর আস্তরণের মোড়া, নাকে খাওয়ানোরা জন্যে রাইল’স টিউব পরানো। জ্ঞান আসার পর থেকে বাচ্চার টালমাটাল শারীরিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা শুনতে শুনতে অনুভূতিগুলো বোধহয় বোবা হয়ে গিয়েছে, না হলে মনের মধ্যে যে প্রশ্ন আসছে তা মুখে আনার সাহস হচ্ছে না কেন যে, “ওর কি হাতের তালু তৈরী হয়নি?” 
শিশু বিশেষজ্ঞ, সম্ভবত, মায়ের চোখের প্রশ্নটা বুঝে অভয় দিলেন, “হাতের গঠন ঠিকই আছে। শুধু নাক থেকে নল যাতে টেনে খুলে না ফেলে, তাই এই ব্যবস্থা”

বাচ্চা স্বাভাবিক ভাবে মাতৃদুগ্ধ পান করছে দেখে নাক থেকে নল খুলে দিয়ে আরো আশার বাণী শোনালেন, “এরকম ভাবে ৭২ ঘন্টা কাটলেই ও বিপন্মুক্ত হয়েছে, বলা যাবে। তারপর সব কিছু স্বাভাবিক”। তার মানে মাঝে শুধু আরেকটা দিন কাটার অপেক্ষা, তারপরই শুধু খুশী আর আনন্দ। বেঁচে থাকা নিয়েই এত সংশয় তাই ভয়ে ভয়ে এ’কদিন কারুর কাছে মা জানতেও চায়নি ও মেয়ে না ছেলে? যদিও বিশেষ কোন আকাঙ্ক্ষা ছিল না, কামনা ছিল শুধুই একটি সুস্থ সন্তান যে কিনা ওদের মেয়ের সঙ্গী হবে। কাছে দেওয়ার আগে এক আয়ামাসি মায়ের না জানতে চাওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করে নিজেই হেসে হেসে জানালেন, “ছেলে হয়েছে গো, বড্ড রোগা, তাই একটু কালো লাগে। সে ঠিক আছে, দিনে দিনে কোলেই বেড়ে উঠবে।”
ও নল ছাড়াই স্বাভাবিক বাচ্চাদের মত খাদ্য গ্রহণ করতে পারছে, ওর বিপদ মুক্তি ঘোষণা করার আগে আর মাত্র ২৪ ঘন্টার প্রতীক্ষা- এ খবরে কি তার চেয়েও বেশী পুলক জাগানোর ক্ষমতা আছে? মোটেই না। ওর বাবা অনেক আগেই নিজের পছন্দের সাদা শার্ট কিনে রেখেছে নতুন জামা পরে সন্তানের জন্মকে সেলিব্রেট করব বলে কিন্তু এ ক’দিন আলমারির কোন কোণে তা পড়ে রয়েছে, তার খবর কেউ রাখেনি। সদ্যোজাত সন্তানের ছবি তুলবে বলে আগাম প্রস্তুতি নিয়ে ক্যামেরায় ফিল্ম ভরে রাখা ছিল, তাতে হাতও পড়েনি। এবার সে সবের সদ্ব্যবহার হবে। মেয়েকে বলে রাখা হয়েছে আর তাকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে হবে না, আর দু’একদিনের মধ্যেই সে তার ছোট্ট ভাইকে দেখতে পাবে, মনটা তাই খুশিয়াল।
শুধু আজ সকাল থেকে ছেলেটা আবার খাওয়া বন্ধ করেছে। আয়ামাসির মুখ থেকে জানা গেল যে কাঁদছেও না, নড়াচড়াও করছে না। মা প্রশ্ন করায় সিস্টারদিদি বাচ্চাকে দেখে বলে গেলেন, “আন্ডারওয়েট বাচ্চা তো, দুর্বল, তাই একটু বেশী ঘুমোচ্ছে, চিন্তার কিছু নেই, ও ঠিক হয়ে যাবে”। কিন্তু সন্ধেবেলা অবধি একই অবস্থা দেখে নার্সিংহোম থেকেই শিশু বিশেষজ্ঞকে ডেকে পাঠানো হ’ল। তিনি আবার রাইল’স টিউব দিয়ে খাওয়াবার ব্যবস্থা করে দিলেন। বাচ্চার বাবা দেখতে এসে মাকে অযথা দুশ্চিন্তা করে শরীর খারাপ করতে বারণ করল। ডাক্তার দেখে গেছেন, সেরকম কোন বিপদের সম্ভাবনা থাকলে তিনি কি জানাতেন না? তাছাড়া বাচ্চা যখন একবার স্বাভাবিক নিয়মে মাতৃদুগ্ধ পান করতে পেরেছে, তখন আবারও করবে। এসব শুনে কি মায়ের মন খানিকটা আশ্বস্ত হ’ল, কে জানে? কিন্তু অপারেশনের ধকল সয়ে, তার ওপর টানা দু রাত্রি ওষুধের প্রভাবে আধো ঘুম আধো জাগরণে কাটিয়ে আজ যেন দু চোখ খোলা রাখতে চাইলেও পারা যাচ্ছে না, জড়িয়ে আসছে। তার মধ্যে রাত্রের আয়ামাসি ঘোষণা করে দিলেন যে মায়ের অসুবিধা হলেও ঘরের আলো নেভানো যাবে না। সারা দিন খাটাখাটুনির পর অন্ধকারে তাঁর নিজের চোখ জুড়ে আসার সম্ভাবনা আছে, অসুস্থ বাচ্চার দিকে নজর রাখায় গাফিলতি হতে পারে, তাই তিনি সেটা করতে পারবেন না। রাত্রে সিস্টারদিদিরা বিশেষ টহল দেন না, টেবিলের ওপর পা তুলে ঝিমিয়ে নেন। সব ঘরের আয়ারাও সেই সুযোগে একটু ঘুমিয়ে নেন কিন্তু এই ঘরের আয়ামাসি কোথা থেকে একটা টুল যোগাড় করে এনে এক পা তুলে দেওয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে ঠায় বসে রয়েছেন। কেউ দেখছে না, সারাদিন গরীবের সংসারে হাড় ঘাঙা খাটুনি শেষ করে রাতে ডিউটি করতে আসতে হয়, তবু তিনি তার কর্তব্যে অবিচল। চোখের ওপর আলোটা মায়ের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে, তা হোক, মনে একটা কথাই গুণাগুণ করছে, “শুধু তো আজকের রাতটা কাটার অপেক্ষা”।

চোখ লেগেই এসেছিল, হঠাৎ মনে হ’ল আয়ামাসি ধনুকের ছিলার মত  ছিটকে উঠে বাচ্চার খাটের কাছে গেলেন, এক লহমা দেখে নিয়েই দুহাতে ওকে তুলে নিয়ে উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়ে সিড়িঁ দিয়ে নীচে নেমে গেলেন, ওখানেই রাতে সব সিস্টারদিদিরা থাকেন। একে খাটে শুয়ে থাকলে বাচ্চাকে দেখা যায় না, তারপর ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে যাওয়া মা দুর্বল শরীরে সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে নীচে সিস্টারদের ছোটাছুটি, উত্তেজিত স্বরে কথা বলাবলির শব্দই শুধু শুনতে পেল। নীচে নামার ক্ষমতা নেই, নেই অনুমতিও। চারদিকের ঘরে অন্য পেশেন্টরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, নাইট ল্যাম্প ছাড়া অন্য আলোগুলোও নেভানো। বড্ড যে অসহায় লাগছে, কেউ কি তাকে বলবে, “কী হয়েছে?” শেষে আর থাকতে না পেরে মা ঠিক করল যে তার যা হয় হোক, সে বসে বসেই নীচে নামবে। যার সন্তান বিপদের মুখে, তার কি নিজের শরীরের কথা ভাবলে চলে? নামতেই যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময়  এক সিস্টার দিদি নীচ থেকে উঠে এসে ধমক দিলেন, “আপনি কোথায় যাচ্ছেন? বাচ্চা একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছে, আমরা সুস্থ করার চেষ্টা করছি, শিশু বিশেষজ্ঞকেও খবর দেওয়া হয়েছে। আমি ইঞ্জেকশন দিয়ে যাচ্ছি, যান আপনি শুয়ে পড়ুন।” আচ্ছা, সে রাতে কি মাথা ঠিক করে কাজ করছিল না? না হলে মা বাধ্য মেয়ের মত কীভাবে শুয়ে পড়তে পারে?

পরের দিন ভোরবেলা ঘুম জড়ানো চোখে জীবন সঙ্গীর থমথমে মুখ থেকে জানা গেলো যে আগের রাত্রে তড়কা আক্রমণে ছেলের শারীরিক অবস্থা খুবই বিপজ্জনক পর্যায়ে চলে গেছে তাই ডাক্তারের পরামর্শে ওকে বড় হাসপাতালের ইনকিউবেটরে, অর্থাৎ শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যবস্থা সহ কৃত্রিম মাতৃজঠরের উষ্ণ পরিবেশে স্থানান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেখানে নিয়ে  যাওয়ার জন্যেই বাবাকে ফোন করে বাড়ি থেকে ভোরবেলা ডাকা হয়েছে। কথাগুলো, ওষুধের প্রভাবে বোধশূণ্য মস্তিষ্কের কোষগুলোতে, কি কোন তাৎপর্য বহন করছিল? বোধহয় না। নাহলে কোন প্রশ্ন না করে মা শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো কেন?

একটু বেলায় আবার তন্দ্রার ঘোরে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, যাঁর হাতে বাচ্চার জন্ম, দেখা গেল। স্বভাবগত ভাবে ঈষৎ রূঢ়ভাষী ডাক্তার, মায়ের বিছানা একদম কাছ ঘেঁষে মাথায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে, গম্ভীর মুখে অথচ কোমল আশ্বাসের স্বরে বললেন যে তার বাচ্চাকে সুস্থ করে তোলার জন্যে অনেকজন ডাক্তার মিলে অবিরাম লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, ওর চিকিৎসার কোন ত্রুটি হতে দেওয়া হবে না। কবে ও সুস্থ হয়ে ফিরে আসবে – মায়ের এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে গুরুজনসুলভ উপদেশ দিলেন, “ঈশ্বরকে ডাকো, মানুষের প্রচেষ্টা যেখানে পৌঁছাতে পারে না, সেখানে সেই সর্ব শক্তিমানের ওপরই ভরসা করতে হয়। সন্তানের এইরকম বিপদের সময় মাকে ভেঙে পড়তে নেই, কাঁদতে নেই, তাতে সন্তানের অমঙ্গল হয়”। স্বল্পভাষী,  প্রয়োজন ছাড়া কথা না বলা বিলেতফেরৎ ডাক্তারের মুখে এই ধরণের কথা ও কোমল আচরণ মায়ের মস্তিষ্কে কি প্রথম আসন্ন চরম বিপদের সঙ্কেত দিল? না হলে আগের রাত্রি থেকে বাচ্চাকে দেখতে না পাওয়া সত্বেও এতক্ষণ পর মায়ের চোখ থেকে জল গড়িয়ে আসবে কেন?

তারপর চলল, পরবর্তীকালে হাসপাতালের এক জুনিয়র রেসিডেন্ট ডাক্তারের মুখ থেকে শোনা কথা অনুযায়ী, সেই সন্তানকে নিয়ে যম আর ডাক্তারের মধ্যে  টানাটানি। নার্সিংহোম থেকে শ্বাসপ্রশ্বাস ক্ষীণ অবস্থায় নিয়ে আসা বাচ্চাকে হাসপাতালে ভর্তি করার সময়ই ডাক্তাররা বলে দিয়েছিলেন যে তাঁরা তাকে বাঁচাবার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করবেন কিন্তু বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কোন আশার বাণী শোনাতে পারছেন না।
শুরু হল নার্সিংহোম থেকে শূণ্য কোলে বাড়ি ফিরে যাওয়া মায়ের সদ্যোজাত সন্তানকে কোলে ফিরে পাওয়ার প্রতীক্ষা। মেয়ের অবুঝ প্রশ্নের উত্তরে স্তোকবাক্য শোনানো যে খুব শীঘ্রই ভাই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসবে আর তখন তাকে কোলে নেওয়া যাবে। কিন্তু সত্যিই নিজের মন মানে কি? জিজ্ঞাসা করবার সাহস নেই, তাই প্রতিদিন ছেলের বাবা হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলে উদগ্রীব হয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা যদি কোন ব্যতিক্রমী  সুখবর থাকে, কিন্তু সে প্রত্যাশা পূরণ হয় কই?

অবশেষে সেই আলো ঝলমলে দিনটা এলো, যেদিন ইনকিউবেটর থেকে বাচ্চাকে সাধারণ বেডে স্থানান্তরিত করে মাকে হাসপাতালে তার দেখভালের জন্যে যেতে বলা হল। জন্মের পর সেই প্রথম বাচ্চাকে কোলে পাওয়া। তারপর আরো কিছুদিন চিকিৎসাধীন থেকে ছেলেকে নিয়ে সবার মাঝখানে মায়ের বাড়ি ফিরে আসা।

অনেক বছর কেটে গেছে। বাচ্চার সুস্থ হয়ে ওঠার পেছনে ডাক্তারদের ভূমিকা অনস্বীকার্য   তবুও সেদিনের কথা মনে পড়লে আজও মায়ের মনে হয় সেদিন রাত্রে যদি আয়ামাসি শারীরিক ক্লান্তির বশবর্তী হয়ে বাচ্চার ওপর বিরামহীন নজর রাখার দায়িত্বে, এতটুকু গাফিলতি করতেন, শুধুমাত্র চোখ বুজে বিশ্রামই নিতেন যা তার পক্ষে স্বাভাবিক ছিল, তাহলে কি পরের দিন ঐ বাচ্চাকে চিকিৎসা করার সুযোগ পাওয়া যেত? আজকাল প্রায়ই  কর্মরত আয়াদের কাজে ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা, অসুস্থ, অপারগ রোগীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের কাহিনী এখানে ওখানে শোনা যায় কিন্তু  এই মায়ের অভিজতা তো সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বলে। নার্সিংহোম থেকে ছুটি পাওয়ার দিন মাকে চোখের জলে বিদায় দিতে গিয়ে সেই অহরহ অসুস্থ মানুষ দেখে চোখ অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া সামান্য বেতনের আয়ামাসি বলেছিলেন, “দিদি তোমার ছেলেটা দুর্বল ছিল তো, বিরক্ত করত না, শুধু বড় বড় চোখ মেলে তাকিয়ে থাকত। ওর ওপর এ কদিনে বড্ড মায়া পড়ে গিয়েছিল গো। আমি লোকনাথ বাবার কাছে মানত করেছি, দেখো ছেলে ঠিক সুস্থ হয়ে তোমার কোলে ফিরে আসবে।” এসবে মায়ের বিশেষ আস্থা না থাকলেও তার শুভকামনা, বিশ্বাসকে অমর্যাদা করতে সেদিন মন সরেনি।

বাচ্চা বাড়ি আসায় আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী সবাই  চিকিৎসার উৎকর্ষের জন্যে ডাক্তারদের ধন্য ধন্য করেছেন, তাঁর কথা কেউ বলেনি, তাঁকে কেউ বাহবা দেয়নি, তিনি নেপথ্যেই থেকে গেছেন। যিনি পৃথিবীর আলো দেখান, তাঁকেই তো মা বলে। আর যিনি চোখ থেকে আলো নিভতে দেন না, তার সমস্ত শক্তি দিয়ে ঢাল হয়ে আগলে দাঁড়ান, তাঁকে কী নামে ডাকা যায়?

আরেকজন এমন পরমাত্মীয়কে মা খুঁজে পেয়েছিল ঐ হাসপাতালের রেসিডেন্ট জুনিয়র মহিলা ডাক্তারের ভেতরে। মাতৃদুগ্ধে খিদে মিটছে না মনে করে মা, হাসপাতালের রাউন্ডে আসা সিনিয়ার ডাক্তারের কাছ থেকে, বোতলে দুধ খাওয়ানোর অনুমতি চেয়ে নিয়েছিল। সেই জুনিয়ার ডাক্তার, সেই মূহুর্তে সিনিয়ারের সামনে কিছু না বলতে পারলেও পিছন থেকে চোখের ভাষায় অনুনয় করেছিলেন ডাক্তারের নির্দেশ মেনে কিছু না করতে। তারপর সিনিয়ার ডাক্তার চলে যেতে না যেতেই দৌড়ে এসে, উত্তেজিত স্বরে, মাকে স্তম্ভিত করে দিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, “আপনি কি চান বলুন তো, বাচ্চাটাকে মেরে ফেলতে?” এমন অদ্ভুত অভিযোগে হতভম্ব মায়ের বিস্ময়ের ঘোর কাটার কোন সুযোগ না দিয়েই অসহিষ্ণু ভাবে এক নিঃশ্বাসে  আবার বলে উঠেছিলেন, “ও প্রায় ওপারে চলেই গিয়েছিল, আমরা টেনে রেখে ওকে যেতে দিইনি, ফিরিয়ে এনেছি। চিকিৎসা কোন পথে হবে,  সিনিয়ার ডাক্তার তার বিধান দিতে পারেন, কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে থেকে নির্জীব হয়ে আসা বাচ্চাটার  শরীরে প্রাণ ফিরিয়ে আনার লড়াইটা আমরাই করেছি। তিনদিন ওর পাশ থেকে আমি এক পাও নড়িনি, কোন ক্রমে নাকে মুখে গুঁজে খাবার খেয়ে আবার ফিরে এসেছি। না থাকার ঐটুকু সময়েও উৎকন্ঠায় মনে হত ফিরে গিয়ে ওকে দেখতে পাবো তো? আপনি মা হতে পারেন, ওর জীবনের ওপর আমার অধিকার আপনার চেয়ে কোন অংশে কম নয়। খিদেয় কাঁদে কাঁদুক, বাইরের খাবার খেয়ে এই দুর্বল বাচ্চার শরীরে যদি ইনফেকশন হয়, তাহলে ওকে আর বাঁচানো যাবে না। এত কষ্টে ফিরিয়ে আনা প্রাণের সঙ্গে এমন অন্যায় আমি কিছুতেই হতে দেব না।” সেই জ্বলন্ত দৃষ্টির সামনে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে মা আন্দাজ করতে চেষ্টা করছিলেন যে অদৃষ্টের সঙ্গে পাঞ্জা কষে বাচ্চাটিকে ছিনিয়ে আনার সেই হার না মানা লড়াইয়ে, শিক্ষাগত দক্ষতা বা পেশাগত দায়িত্বের সঙ্গে, কতখানি নিঃশর্ত আন্তরিকতা যুক্ত হলে এমন অধিকারবোধ জন্মায়। আজকাল প্রায়ই  ডাক্তারদের অমানবিক আচরণ বা পেশাদারী মনোভাবের অভাব নিয়ে অনেক হতাশাব্যঞ্জক কথা কানে আসে। সেদিন কিন্তু সেই মায়ের মনে হয়েছিল, এই তো আসল মায়ের রূপ যে সন্তানের বিপদে দিন রাত এক করে দিতে পারেন আবার তার মঙ্গলের জন্যে প্রয়োজনে রুদ্রমূর্তি ধরে সারা পৃথিবীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে দ্বিধা করেন না।

এ কোন গল্প কথা নয়, কারুর মুখ থেকে শোনা উপাখ্যানও নয়, নিজের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার কাহিনী। সেই মা আর কেউ নয়, এই লেখিকা স্বয়ং আর সেই ছেলে এখন ২২ বছরের তরুণ। সেই আয়ামাসি বা রেসিডেন্ট ডাক্তারের মুখগুলো এখন আর ভালো করে মনে পড়ে না কিন্তু ছেলের চোখের দিকে তাকালে প্রায়শই তাঁদের কথা স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে ওঠে। তাঁরা ছিলেন বলেই ও এখনও পৃথিবীর আলো বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে। ওর জীবনে তাঁরা, মনে হয়, যেন ঈশ্বর প্রেরিত হয়ে এসেছিলেন। তাঁরা এতদিনে হয়তো কাজের ব্যস্ততায় সেসব দিনের কথা ভুলে গেছেন কিন্তু সেই মা মনে করে যে এই ছেলে শুধু এই মায়ের সন্তান নয়, তাঁদেরও মানসপুত্র, তাই তাঁরা তার পরমাত্মীয়।


ছবি: প্রণবশ্রী হাজরা


লেখকের কথা: শর্মিলা ঘোষনাথ
একসময়ে সরকারী দপ্তরে কর্মরত, ভালোবাসা বলতে নতুন offbeat জায়গা, বিশেষত পাহাড়ে বেড়ানো, সেখানকার মানুষজন, তাদের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখা আর গান শোনা। দুটো সংস্থায় ইকনমিস্ট হিসেবে কনট্র্যাক্টে কিছুদিন কাজ করার সূত্রে কিছু developmental project এর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, কয়েকটা গবেষণামূলক লেখা সংস্থার ম্যাগাজিনে published হয়েছে।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন
  •  
  •  
  •  
  •  

One Comment

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।