নক্ষত্রের জীবন

লেখক : ইন্দ্রনীল মজুমদার

আমরা আজ এই প্রবন্ধে নক্ষত্রের জীবন নিয়ে আলোচনা করব। এইসব ‛নক্ষত্র’ বা ‛তারকা’রা কিন্তু টিভি বা সিনেমার স্টার নয়, বরং আকাশের নক্ষত্র। এরাও ‛stars (তারা)’। এদেরও প্রতি আমরা কৌতুহলভরে তাকিয়ে থাকি। কেবলমাত্র কয়েক দিন বা বছরের জন্য নয়, বরং কয়েক হাজার এমনকি লক্ষাধিক বছর ধরে সেই মানব সভ্যতার উন্মেষলগ্ন থেকেই এরা আমাদের কৌতূহলের বিষয় বটে! তাদের জীবনী আমরা জানব না, তা কি কখনো হয়? জানা যায় যে, বেশিরভাগ তারার আয়ু ১০০ কোটি থেকে ১০০০ কোটি বছরের মধ্যে। এমনও কিছু কিছু তারকাদের দর্শন পাওয়া যায় যাদের বয়স প্রায় ১৪০০ কোটি বছর অর্থাৎ এই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের বয়সের কাছাকাছি ! তাহলে বলাই যায় যে, একটা তারার গড় আয়ু হতে পারে সাড়ে পাঁচশো কোটি বছর। এই যেমন আমাদের সূর্যেরই তো ৫০০ কোটি বছর বয়স, ইনি এখন একজন মধ্যবয়স্ক তারকা, আরও ৫০০ কোটি বছর বাঁচবেন আর কি! যাইহোক, এবার তারকাদের জীবন সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করি। তারাদের আয়ুর কাছে মানুষের আয়ু তুচ্ছ হলেও এদের জীবনের মানুষের জীবনেরও মিল পাওয়া যায়। প্রথমেই বলে রাখি যে একটা তারা কতদিন বাঁচবে ও তার মৃত‍্যু কিরকম হবে তা তার আয়তন দেখে বোঝা যায়। খুব বৃহৎ তারার জ্বালানি তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায় তাই সেগুলো কয়েক লক্ষ বছর বাঁচে। আয়তনে ছোট তারাগুলোর জ্বালানি শেষ হতে অনেক বছর লাগে তাই তাদের আয়ুও কয়েক কোটি বছর। আসলে, ভর অনুযায়ী তারার মৃত্যু ভিন্ন হতে পারে।

তারার জন্মস্থান হল নেবুলা (nebula) বা নীহারিকায়। একটা নেবুলা তৈরি হয় গ‍্যাসের মেঘ ও ধূলিকণা দিয়ে। এই নেবুলার মধ্যে যখন ধূলিকণা এবং গ্যাসের মেঘ সংকুচিত হতে হতে একটি বলের আকার ধারণ করে তখন তার মধ্যে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া (nuclear reaction) শুরু হয়। আর এই নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার ফলেই তারার জন্ম হয়। এই যেমন আমাদের মধ্যে জন্মলগ্ন কি তার আগে গর্ভবস্থা থেকেই জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়ে যায় সেইরকমই তারাদের মধ্যে শুরু হয় নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া। আমাদের জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়া যেমন আমাদের শক্তি দিয়ে সতেজ রাখে তেমনি তারার কেন্দ্রে বা কোরে চলা নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া তাকে বহু বছর জ্বলতে সাহায্য করে। এরপর, এই বলটির তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং এটি তারা হিসেবে জ্বলজ্বল করা শুরু করে। মনে রাখতে হবে যে, তারার হাইড্রোজেন জ্বালানি যার ফলে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া চলে তা শেষ হওয়ার সাথে সাথে তারার আয়ুও কমতে থাকে। যাইহোক, যখন এই তারা তার মধ্যবয়সে উপনীত হয় তখন তা আরও প্রসারণ লাভ করে এবং ‛লাল দৈত্য(red-giant)’ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, মধ্যবয়সে আমরা যেমন পরিণত হয়ে উঠি তারারাও সেইরকম পরিণত হয়ে ওঠে। এই লাল দৈত‍্যের এরপর নিজের মহাকর্ষীয় টানের ফলে সংকোচন ঘটে এবং এটি আরও গরম ও ছোট ‛সাদা-বামন(white-dwarf)’-এ পরিণত হয়। ঠিক যেমন আমরাও বয়স হলেও নুইয়ে পড়ি ও কারুর কারুর মেজাজ গরম হয়ে যায়, অনেকটা সেরকম। এরপর এই সাদা-বামন ঠান্ডা হয়ে ‛কালো-বামন (black dwarf)’-এ পরিণত হয়। আমাদের সূর্যের মতো ছোটখাটো তারারা এইভাবে শান্তিতে মৃত‍্যুবরণ করে। কিন্তু যে সমস্ত তারার আয়তন বৃহৎ, তারা ঠান্ডা হয়ে কালো-বামনে পরিণত হওয়ার পরিবর্তে সমস্ত জ্বালানি নিঃশেষ হয়ে গিয়ে ‛সুপারনোভা (supernova)’ হিসেবে বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণের আগে অল্প সময়ের জন্য এসমস্ত তারাগুলোর ঔজ্জ্বল্য বেড়ে যায়। ঠিক যেমন মৃত্যুর আগে আমাদের কারও কারও একটা ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধি পায়, আমাদের মধ্যে অনেকে যেমন হঠাৎ করে সতেজতা লাভ করি। তারাদের দেহের অংশ বিস্ফোরণের ফলে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। এই সুপারনোভার ফলে অতিবৃহৎ নয়, যে সব তারাগুলো আছে তাদের ধ্বংসাবশেষ আরও সংকুচিত হতে হতে বেশি ঘনত্বের ‛নিউট্রন তারা (neutron star)’-এ পরিণত হয়‌। কোনো কোনো নিউট্রন তারাকে খুব দ্রুত ঘূর্ণন হতে দেখা যায়, এদের বলা হয় ‛পালসার (pulsars)’। এবার যদি সুপারনোভায় বিস্ফারিত তারাটি যদি অতি বৃহৎ হয় তবে সেটি দুমড়ে মুচড়ে ক্ষুদ্র হতে গিয়ে ‛কৃষ্ণগহ্বর (black hole)’-এ পরিণত হবে। এই কৃষ্ণগহ্বরের অভিকর্ষ (gravity) এতোই বেশি যে তা আলোও শুষে নেয়।


লেখক পরিচিতি : ইন্দ্রনীল মজুমদার
বিজ্ঞানে স্নাতকত্তোর, বিজ্ঞান লেখক ও শিক্ষক।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন
  •  
  •  
  •  
  •  

6 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।