ভাঙা মঞ্চের মঞ্চিনী (পর্ব – ৩)

লেখক: দামিনী সেন

গত পর্বের লিঙ্ক এখানে

পরিচ্ছদ – ৪

ড্রয়িং বোর্ডটার উপর বিছিয়ে রাখা অর্ধসমাপ্ত বিল্ডিং প্ল্যানটার উপর চোখদু’টোকে স্থির রেখেই হাত বাড়িয়ে পাশের টেবিলটায় রাখা ফোনদানিটা থেকে মুঠোফোনটা তুলে নেয় সুজয়। রিডিং গ্লাসটা একটু ঠেলে সে কপালে তুলে দেয় প্রথমে। তারপর উজ্জ্বল পর্দায় আঙুল রেখে এদিক-ওদিক করতে শুরু করে। একটা নাম খুঁজছে সে। কিন্তু এইসব স্পর্শপর্দা ফোনের ব্যবহারে সে মোটেও খুব সচ্ছন্দ নয়। তার পুরোনো ফোনটায় বরং সে ঝট করে এইসব কাজের সময় প্রয়োজনীয় নামটা খুঁজে পেতে পারত। একটু বিরক্তির ভাঁজ পড়ে তার পাতলা হয়ে আসা ভুরুতে। কিন্তু কী আর করা। মেয়ের কাছে এই ফোনটাও পুরোনো হয়ে গেছে। অতএব সেই পুরোনোকে সে বাবার ঘাড়ে চালান করে অতি সম্প্রতি আবার একটি আরও নতুনকে বরণ করে নিয়েছে। সুজয় একটু আপত্তি জানিয়েছিল। তুই নতুন কিনছিস, কেন না বাবা। তোর পুরোনোটা আবার আমার ঘাড়ে চালান করা কেন? কিন্তু মা-মেয়ের সম্মিলিত আক্রমণের সামনে মাঝেমাঝেই সুজয়কে বেশ অসহায়ই হয়ে পড়তে হয়। তার নিজের অতি পরিচিত, অভ্যস্ত ফোনটি নাকি স্রেফ একটি বাটখারা। অতএব অতি পুরাতন জ্ঞানে তা এখনই পরিত্যাজ্য। তখনও প্রাণপণে শেষ চেষ্টা চালিয়েছিল সুজয়, “দেখ মা, আমার এই ফোনে কত দরকারি নাম্বার আছে। এগুলো না পেলে তো মুশকিল হবে রে!”

“ধুস! এটা আবার একটা প্রবলেম নাকি! আমি সব তোমায় আমার এই ফোনটায় তুলে দেব।” তুড়ি মারার ভঙ্গিতেই উড়িয়ে দিয়েছিল তার আপত্তি মেয়ে। আর পেছন থেকে অনুযোগ যোগ করেছিল মা, “সত্যি, সবার সামনে ঐ পুরোনো বাটখারাটা বের করতে লজ্জাও করে না তোমার!”

অতএব সুজয় এখন নতুন ফোনের মালিক। মেয়ের কাছে পুরোনো হয়ে বাতিল হয়ে গেলেও, সুজয়ের কাছে সেটা এতটাই নতুন ঠেকে যে দরকারি নাম্বারটা কিছুতেই বের করতে পারে না সে। বিরক্তিতে ইন্টারকমটা তুলে একটু গলা চড়িয়েই ডাক দেয় সে, “কাকলি একটু এস তো।”

অনতিবিলম্বেই কাচের সুইংডোর ঠেলে সুজয়ের চেম্বারে দেখা দেয় ত্রিশ ছুঁই ছুঁই সুন্দরী অ্যাসিসটেন্ট, কাকলি তরফদার। ছিমছাম মাপা গলায় প্রশ্ন ভেসে আসে, “কী স্যর?”

“এই, আমার এই ফোনটা নিয়ে একটা নাম্বার বের করে দাও তো। অচিন্ত্য, অচিন্ত্য হাজরা। আমি কিছুতেই বের করতে পারছি না।”

স্যরের অসহায় মুখটা দেখে একচিলতে হাসি খেলে যায় কাকলির ঠোঁটেও, “দিন”।

একটু ঘাঁটাঘাঁটি করেই বাড়িয়ে দেয় সে ফোনটা, “এই তো স্যর। এই নিন।” তারপর হেসে যোগ করে, “আপনার মেয়ে বাংলায় লিখে রেখেছে। তাই বোধহয় খুঁজে পাচ্ছিলেন না।” মুখে হাসিটা মাখিয়ে রেখেই ঘুরে দরজাটা ঠেলে আবার বেড়িয়ে যায় সে। খুট করে একটা শব্দ তুলে দরজাটা আবার বন্ধ হয়ে যায়।

সুজয় ফোনটা অন করে, আবার মনোনিবেশ করে অর্ধসমাপ্ত ড্রয়িংটায়। ওপাশ থেকে ভেসে আসে তার বাল্যবন্ধুর গলা, “হ্যাঁ রে সুজয়, বল।”

“আচ্ছা, তোর দোকানঘরটা বাঁদিকটায় না করে, একটু ডানদিক ঘেঁষে করলে খুব অসুবিধে হবে? ওই ডোবাটার দিকটায়। নাহলে বাড়িতে ঢোকার জন্য আলাদা এন্ট্রান্স রাখাটা একটু অসুবিধেই হয়ে যাচ্ছে রে।”

“তুই যা বুঝবি। আমি তো এসব কিছু বুঝি না রে। তুই প্ল্যানটুকু করে দেওয়ায় আমার যে কী উপকারই না হচ্ছে।”

“এই তো, আবার বাজে বকতে শুরু করলি।” স্তুতি শুরুর আগেই তাড়াতাড়ি তাকে থামায় সুজয়। “তাহলে ঐ কথাই রইলো বুঝলি। দোকানের সামনেটা নাহয় বাঁধিয়ে নেওয়া যাবে। আসলে তোর জমিটা দুই কাঠা হলেও চওড়া তো মাত্র ২৩ ফিট। তারউপর ডানদিকে ডোবার দিকটায় রাস্তার দিক থেকে এসে পড়া নর্দমাটাকেও জায়গা দিতে হবে। তারমধ্যে নিয়ম অনুযায়ী ছাড় দিয়ে, অন্য কোনোভাবে ম্যানেজ করা যাচ্ছে না।”

“তুই যা ভালো বুঝবি। আমি কী বলবো? এমনিতেই তো আমি তোর কাছে ঋণী …”

“আচ্ছা আচ্ছা, রাখ এখন।” নিজের অস্বস্তিটা চাপা দিতেই তাড়াতাড়ি ফোনটা নামিয়ে রাখে সুজয়। কথাটা অবশ্য মিথ্যে নয়। নিজের নামের সাথে সাজুয্য রেখে ক্রমাগত বাড়তে থাকা এ’ শহরে তাদের মতো বড় ইঞ্জিনিয়ারিং কনসারনের কাজের চাপ এতটাই বেশি যে এ’ সব ছোটখাটো কাজে হাত দেওয়ার কোনও দরকারই নেই তাদের। তবু সুজয় খানিকটা ইচ্ছে করেই দু’ একটা এ’রকম কাজ সবসময় হাতে রাখে। নাহলে এই সব গরীব মধ্যবিত্ত মানুষগুলো যাবে কোথায়? এদেরকে তো শহরের বাইরে চলে যেতে হবে। এ’ সব ছোটখাটো কাজে হাত দেওয়া নিয়ে রীতিমতো আপত্তি আছে তার অন্য পার্টনার অমিতেশের। বাড়িতে অপর্ণাও যে তার এইসব ব্যাপার এতটুকুও পছন্দ করে না, তাও সে জানে। তবু সে এটা করে। আর অচিন্ত্য তো তার সেই কোন ছোটবেলার স্কুলের বন্ধু। তাকে সে ফেরায় কীভাবে? সামান্য মুদিখানার দোকান চালানো বন্ধুটার এই প্ল্যানটুকু করে দেওয়ার বিনিময়ে পয়সার অফারও তাই ফিরিয়ে দিয়েছে সে।

দরজার বাইরে একটা মৃদু টোকার শব্দ শুনে ড্রইং বোর্ডটা থেকে আবার চোখ তোলে সুজয়। “কাম ইন।” দরজাটা একটু ফাঁক হয়ে উঁকি দেয় কাকলির বিব্রত মুখ। “স্যর, একটা মেয়ে আর দু’টো ছেলে। অনেকবার বলেছি স্যর, এখন দেখা করা যাবে না। স্যর খুবই ব্যস্ত। কিন্তু একদম নাছোড়বান্দা। বলছে আপনার মেয়ের বন্ধু। কী করবো স্যর?”

বিরক্তিতে ভুরুটা একটু কুঁচকেই জবাব দেয় সুজয়, “কী আর করবে? পাঠিয়ে দাও।” কাকলির ছিমছাম মুখটা আবার অদৃশ্য হয়ে যায় বন্ধ দরজার ওপারে। “খালি দায়িত্ব অন্যর ঘাড়ে চালান করার ধান্দা। বাইরে থেকেই তো খেদিয়ে দিতে পারতিস। তা নয় আমার মুখ দিয়ে বলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। এখন আমি ‘না’ বললে আমাকেই খারাপ হতে হয়।” – চরম বিরক্তিতে বিড়বিড় করে সুজয়।

দরজাটা সব এটিকেট ভেঙে প্রায় হাট করেই খুলে যায়। হুড়মুড় করে ঢুকে আসে ওরা তিনজন। সঙ্গে একটা দরাজ হাসি। নরম কৃত্রিম আলোয় আলোকিত ঘরটা হঠাৎ ভরে ওঠে একঝলক রোদে।

সুজয়েরও সমস্ত বিরক্তি হঠাৎ উবে যায় কোথায় যেন। একগাল হাসিতে ভরে ওঠে তারও মুখ। “এসো এসো, বসো। তারপর? বলো। কী মনে করে এই অধমের কাছে? একটু ঠান্ডা চলবে তো!”

“উফফ!! এমনিতেই ঘরটা এসি চালিয়ে চালিয়ে যা ঠান্ডা করে রেখেছেন কাকু, এরউপর আবার ঠান্ডা হলে আর দেখতে হবে না। কী রে কুণাল, ঠিক বলছি?” অনির চোখের পরিচ্ছন্ন নির্মল হাসিটা যেন ছড়িয়ে পড়ে সারা ঘরেই।

“হ্যাঁ কাকু, আমাদের মঞ্চশিল্পীদের ঐ গলাটাই আবার সম্পদ কিনা।” সদ্য গজানো দাড়িতে ঢাকা রোগা রোগা পুরুষালি হয়ে উঠতে চাওয়া কুণালের মুখেও খেলে যায় হাসি।

“বুঝলাম। তা আমার মতো কাঠখোট্টা মিস্ত্রি মানুষ তবে আপনাদের কী সেবায় লাগতে পারি ?”
এসি ঘরের বন্ধ দরজা পেরিয়েও বাইরের ঘরে সেক্রেটারির ডেস্কে বসা কাকলির কাছে পৌঁছে যায় হাসির ঐ হররাটুকু। সামনে বসা সহকর্মী মিতুনের দিকে তাকিয়ে মুখ বেঁকায় সে, “বুড়োর রস দেখেছো! এদিকে ভাব দেখায়, যেন কাজ ছাড়া কিছুই বোঝে না।”

আগামী পর্বের লিঙ্ক এখানে

অলংকরণ – শর্মিষ্ঠা দেবযানী


লেখক পরিচিতি: দামিনী সেন

গত শতাব্দীর শেষ পাদে জন্ম। ছেলেবেলা কেটেছে মফস্‌সলে। সেখানেই পড়াশুনো — স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন। ঘুরতে ভালোবাসেন, আর ভালোবাসেন পড়তে। জানেন একাধিক বিদেশি ভাষা। আগ্রহ বহুমুখী, কলমের অভিমুখও। কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস — সাবলীল তাঁর কলমের গতি। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ইতিমধ্যেই প্রকাশিত বেশ কিছু কবিতা, প্রবন্ধ, ছোটগল্প। কাব্যগ্রন্থ “ভাঙা সে সাম্পান” প্রকাশের পথে। ধারাবাহিক প্রকাশিতব্য উপন্যাস “ভাঙা মঞ্চের মঞ্চিনী”-র মধ্য দিয়েই ঔপন্যাসিক হিসেবে তাঁর প্রথম আত্মপ্রকাশ।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।