নিমন্ত্রণ

লেখক : শম্পা সাহা

(প্রথম পর্ব)

আষাঢ়-শ্রাবণ মাস এবার, বৃষ্টি শূন্য ছিল। তখন খর তাপে পুড়েছে পৃথিবী। বর্ষার সেই বৃষ্টি এখন শুরু হয়েছে ভাদ্রের মাঝামাঝি সময়ে। গত দু’দিন আকাশ মেঘে ঢাকা ছিল। মাঝে মাঝেই মুষলধারে বৃষ্টি ঝড়েছে। আজ দুপুরের পর থেকে ভাঙা ভাঙা মেঘের আড়ালে রোদ। সেই মেঘভাঙা রোদ হতে শেষ বিকালের তামাটে হলুদ আলো আড়াই হাজার স্কোয়্যার ফিটের ছয়তলার এক ফ্লাটের জানালা গলিয়ে বিছানায় এসে পড়েছে। আলমারিটা খুলে দাড়িয়েছিল জয়িতা। থরে থরে সাজানো রয়েছে দামী দামী শাড়ী। এটা নয়। অন্য আলমারি খুলে কয়েকটা কমদামী শাড়ী সুটকেসে রাখল সে। শোকেসের কাচের দরজার ভিতরে শোভা পাচ্ছে নামী ব্র্যাণ্ডের মেকআপ-কিট। সকলের সম্মুখে নিজেকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় আর মোহনীয় করে তুলতে এক সময় কতই না মূল্যবান ছিল এই সব প্রসাধন সামগ্রী। অথচ, কত দিন হয়ে গেল, সে ছুঁয়েও দেখেনি সেসব। খাটের পাশে সুটকেসটা রাখতে গিয়ে চোখ পড়ল বেড সাইড টেবিলে রাখা ফটোস্ট্যাণ্ডে। একটাতে অনীশের সাথে তার বিয়ের ছবি, অন্যটাতে অন্তুর ছোটবেলার। অন্তুর ছবিটা বের করে হাত ব্যাগে নিল জয়িতা। মিনতি রাতের রান্না করছে। মাংস কষানোর গন্ধ আসছে রান্নাঘর থেকে। ড্রইংরুমের পেণ্ডুলাম ঘড়িটা ঢং ঢং শব্দে ছয়বার বেজে উঠল। আশেপাশের বাড়ি ঘরে আলো জ্বলে উঠেছে। অন্ধকার হ’লেও, ঘরে আলো জ্বালাল না জয়িতা। ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল। সন্ধ্যা শেষে, অন্ধকার ঘন হচ্ছে ধীরে ধীরে। আর সেই ঘনায়মান অন্ধকারে জয়িতা দেখতে পাচ্ছে তার ফেলে আসা বিশ বছরের দাম্পত্য জীবনের স্মৃতি।

বেসরকারী স্কুলের বাংলার শিক্ষক বাবা, আর মা সংসারের খরচ বাঁচিয়ে মেয়েদের বিয়ের জন্য টাকা জমায়। বি.এ. পাশ করে আর পড়েনি দাদা। বাজারে দোকান নিয়ে সেখানে ফটোকপি করে। দু’বছর আগে দিদির বিয়ে হয়েছে – মেডিকেল প্রমোশন অফিসারের সাথে। আর, জয়িতা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছে। এক পরিচিত জনের মাধ্যমে অনীশের সাথে বিয়ের সমন্ধ এল তার। এম.বি.এ. পাশ করে প্রাইভেট কোম্পানিতে কর্মরত, বয়স ত্রিশ ছুঁই-ছুঁই। শুধু অনীশ নয়, তার পরিবারের সবাই কমবেশি শিক্ষিত এবং অবস্থাসম্পন্ন। অনীশের পরিবারের মত জয়িতার পরিবারের না আছে শিক্ষা, ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স, না পরিচয় দেওয়ার মত কোন বিশেষ আত্মীয়স্বজন। এসব দিক থেকে এক দৃষ্টিতে যেন আকাশ-পাতাল পার্থক্য দুই পরিবারের মধ্যে। ছোটবেলা থেকেই আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সব জায়গাতেই জয়িতার খ্যাতি ছিল সৌন্দর্যের জন্য। অনীশেরও একমাত্র চাওয়া ছিল সুন্দরী স্ত্রী। তাই প্রথম দেখাতেই জয়িতাকে পছন্দ হয়ে গেল তার। তারপর, বসন্তের সেই সন্ধ্যা। আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর কোলাহল, আলোক সজ্জিত ঘর-বাড়ি, সানাই এর সুর, আর সব কিছু ছাপিয়ে জয়িতার বুকের মধ্যে ভয়, উত্তেজনা, উৎকন্ঠা আর অজানা এক সুখের অনুভূতি। ঘটের উপরে হাতে হাত রাখার প্রথম স্পর্শের শিহরণ। শঙ্খ আর উলুধ্বনির মাঝে মালাবদল, শুভদৃষ্টি, সাত পাকে ঘোরা, সিঁদুর দান – সবকিছু আজও অমলিন। গাঁট ছড়া বাঁধার সময় দিদি বলেছিল, “সাত জন্মের বন্ধন বেঁধে দিলাম।” বিদায় দেবার সময় অনীশের হাত ধরে বাবা বলেছিল, “তোমার হাতে ওকে দিলাম, কোনদিন অযত্ন করো না ওর।” কত স্মৃতি! কত কথা! কয়েকদিন বাদে অষ্টমঙ্গলায় সে যখন এল বাড়িতে, সবার মুখেই কমবেশি একই কথা।
“ইস! কি কপাল রে তোর! আমাদের কপালে তো আর তোর মত বর জুটবে না।”
“বড় লোক বর পেয়ে আমাদের কে আবার ভুলে যাসনে যেন!”
“যেমন তোর ঘর আর বর, তেমনই তোর রূপ। এ যেন সোনায় সোহাগা।”
কথাগুলো শুনতে বেশ লাগে জয়িতার। গর্বে, অহংকারে মনটা ভরে উঠে। মনে হয়, ক’দিন আগেও সে ছিল নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের সাধারণ এক মেয়ে; আর ক’টা দিনের ব্যবধানে আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী – সকলের কাছে সে পৌঁছে গিয়েছে অন্য এক উচ্চতায়। অনীশই তাকে পৌঁছে দিয়েছে এখানে। কর্মস্থলে অনীশের সংসারে এসে বিস্ময় জাগে জয়িতার! বিশ্বাসই হতে চায় না, এই দামী আলমারি, খাট, সোফা, টি.ভি, ফ্রিজ – সব তার! সুখের সাগরে ভাসতে লাগল সে। দিন কাটতে লাগল স্বপ্নের মত! দু’বছর বাদে অন্তুর জন্ম, তার চার বছর পর নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি। প্রতিবছর বড় অনুষ্ঠান করে ম্যারেজ ডে আর অন্তুর জন্মদিন পালন, পূজার সময় দেশের বাইরে ঘুরতে যাওয়া – সবই চলতে লাগল নিয়ম মত। একটার পর একটা ক্লাস টপকে অন্তু উঠতে লাগল উপরের ক্লাসে। পুরনো চাকরি ছেড়ে অনীশ জয়েন করল নাম করা বায়িং হাউজে। অফিসের কাজে প্রতি বছরই দু’-একবার করে দেশের বাইরে যেতে হয় তাকে। পুরনো ফ্ল্যাটটা বিক্রি করে উঠে এল আড়াই হাজার স্কোয়্যার ফিটের নতুন ফ্ল্যাটে। নতুন ফ্ল্যাটের ঘরের পর্দা, আসবাব, টি.ভি, ফ্রিজ – সব বদলিয়ে নতুন করে কেনা হ’ল। নতুন অফিসে অনীশের ব্যস্ততা আরও বেশি। জয়িতাও ঘুরছে তার ইচ্ছামত। কোন শাড়ী এখন চলছে? দুবাই থেকে নতুন কোন ডিজাইনের সোনার গহনা এল? শপিং মলের সেলফে কোন নামী ব্র্যাণ্ডের বিদেশী প্রসাধন সামগ্রী শোভা পাচ্ছে – সব খবর তার জানা। বিউটি পার্লারে গিয়ে ফেসিয়াল, পেডিকিউর, মেনিকিউর, ভ্রু প্লাক, চুলের যত্নে মেহেদেী, পিয়াঁজের রস দেওয়া – এসবই নিয়মিত কাজ। তাছাড়া ফ্রেণ্ড সার্কেলের আজ এর বাড়িতে গেট টুগেদার তো কাল তার বাড়িতে অন্য কিছু – চলছেই। এসব ছবি ঘুরছে সোশ্যাল মিডিয়াতে। কমেণ্টে জয়িতার রূপের প্রশংসার ছড়াছড়ি। সবকিছু মিলিয়ে জয়িতার মনে হয় সুখের সময় যেন স্থির হয়ে আছে তার জীবনে।

মাঝে মাঝে অন্তুর দিকে তাকিয়ে নিজেই অবাক হয়ে জয়িতা। এই তো সেদিন এতটুকু ছিল, ছোট ছোট পায়ে হাঁটত, এত তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গেল! সামনের বছর “ও” লেভেল পরীক্ষায় বসবে। লম্বায় অনীশকেও ছাড়িয়ে গেছে। দাঁড়িগোঁফ উঠেছে। হাত, পা, বুকের লোম বড় হয়েছে। অন্তুর মুখে নতুন নতুন বন্ধু-বান্ধবীর নাম শুনছে জয়িতা। ডানা শক্ত হচ্ছে, এখন আর আগের মত তার কাছে আসেও না অন্তু। অনীশের ইচ্ছা, “এ” লেভেল পরীক্ষা দিয়েই দেশের বাইরে চলে যাবে অন্তু। জয়িতার অবশ্য ইচ্ছা তা নয়। একটাই ছেলে, দেশে থাকলেই বা ক্ষতি কি? কিন্তু তার ইচ্ছার মূল্য কে দেবে? তাছাড়া অন্তু তো সবসময়ই বলছে, পড়া শেষ করে দেশের বাইরেই সে সেটল করবে। অফিসের রায় বাবু এইচ ওয়ান ভিসা পেয়েছে, তাই সেদিন পার্টি দিল অফিসে। দু’-তিন পেগ ভদকা খেল অনীশ। বাড়িতে অবশ্য খায় না সে। প্রমোশন হয়েছে সম্প্রতি। প্রমোশনের সাথে সাথে কাজের চাপ আরও বেড়েছে। “এ” লেভেলে উঠে অন্তুর ব্যস্ততাও বেশি। ক্লাস শেষে কলেজ থেকেই চলে যায় কোচিংয়ে। প্রতিদিনই তিনটে অথবা চারটে সাবজেক্টের কোচিং থাকে। কোচিং করে বাড়িতে ফেরে রাত দশটায়। অনীশকে অফিসে নামিয়ে দিয়ে সারাদিনই গাড়ি ঘুরছে অন্তুকে নিয়ে। ইদানিং ওরা দুজন সকালে বের হয়ে গেলে ভীষণ একা লাগে জয়িতার। দুপুরের নৈঃশব্দ এক বিষণ্ণতা জাগায় তার মনে। মেঘলা আকাশের দিনে কিংবা বিকালের দক্ষিণের বাতাসে মনের ভিতরটা তার হু-হু করে উঠে। অকারণে মন খারাপের কারণ খুঁজে পেতে চেষ্টা করে জয়িতা। কিন্তু খুঁজে পায় না । কথায় কথায় একদিন সে বলেছিল অনীশকে। অনীশ উত্তর দিয়েছিল, “ঘরে বসে খাচ্ছ। সিনেমা, মার্কেটিং, পার্টি – সবই তো চলছে। এরপরও মন খারাপ লাগলে ভগবানেরও সাধ্যি নেই তোমার মন ভাল করার।”
কথাটা শুনে চুপ করে গিয়েছিল জয়িতা। আর কিছু বলেনি।

আগামী পরশু রবিবার, জয়িতার দাদার মেয়ের অন্নপ্রাশন। অনীশ যাবে না জয়িতা জানত। ছুটির দিন। রিল্যাক্সড মুডে অন্তু ভিডিও গেম খেলছে। সেও যেতে রাজী না। বাধ্য হয়ে একাই গেল জয়িতা। অনেকদিন পর দেখা হল সবার সাথে। ‍উপহার হিসাবে নিয়ে আসা সোনার হারটা পড়িয়ে দিল মেয়ের গলায়। অন্য ঘরে কথা বলছিল দিদি-জামাইবাবু। আড়াল থেকে ওদের কথা কানে এল।
“দাদার মেয়েকে দেওয়া কানের দুল দু’টো একেবারেই পাতলা হয়ে গিয়েছে। আরও একটু ওজনের হ’লে ভাল হত।”
“সোনার যা দাম, এটুকু দিতেই হিমশিম খাচ্ছি। আমি তো আর অনীশের মত বড়লোক নই। তা, এল না কেন তোমার ভগ্নিপতি? গরীবের বাড়িতে কি আর হাতির পা পড়ে?”
আরও কথা হচ্ছিল ওদের মধ্যে, আর শুনতে ইচ্ছা হ’ল না জয়িতার। বাবার কাছে গিয়ে বসল সে। ছোটপিসি ঐ ঘরেই ছিল। কথার ফাঁকে একসময় বলল, “বুলা তো এবার মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছে। অনার্সে খুব ভাল রেজাল্ট করেছে। অনীশকে বলিস না একবার, ওর খোঁজে যদি কোন ভাল ছেলে থাকে।”
মাথার উপরে যদিও ফুলস্পীডে পাখা ঘুরছিল, তবুও গরমটা অসহ্য বোধ হচ্ছিল জয়িতার কাছে। মা বার বার করে বলতে লাগল, অন্তুর সাথে কতদিন দেখা নেই, কেন সে নিয়ে এল না। বড় মামার ছেলে, রনিত বলল, “ভেবেছিলাম অনীশদার সাথে আজ দেখা হবে। দেখা যখন হ’ল না, আমার বায়োডাটাটা তুমি একটু দিয়ে দিও। আমি কাল বা পরশু কথা বলে নেব অনীশদার সাথে।”

চলে আসার সময় অন্তু আর অনীশের জন্য হট পটে খাবার দিয়ে দিল বৌদি। ঘরের ভিতরে বোঝা যায়নি। বাইরে বের হতেই জয়িতা দেখল, আকাশে মেঘ জমেছে। গুমোট হয়ে আছে। মনে হয় ঝড় উঠবে। গাড়িতে উঠে সিটে বসে স্বস্তি বোধ করল সে। এ.সি. চলছে। রঙিন কাচের মধ্যে দিয়ে বাইরে আরও বেশি অন্ধকার লাগছে। সিটে মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করতেই দাদার মেয়ের মুখটা মনে এল। ফোলা ফোলা দুটি গাল, উচ্চারিত আধো আধো শব্দ। কখনও সে তার ছোট ছোট আঙুল দিয়ে জয়িতার গলার হার, তো আবার কখনও কানের দুল ধরছে। কিছুতেই সে নামবে না জয়িতার কোল থেকে। অন্তু হওয়ার সময় আরও একটা নাম সে ঠিক করে রেখে ছিল – “অরণী”। হঠাৎ-ই মনে হল,
“অরণী যদি আসে তার শরীরে ,ক্ষতি কী?”
মনের মধ্যে চিন্তাটা আসার সাথে সাথে একটা গভীর আবেশে জড়িয়ে গেল শরীর, কিছুটা সময় যেন হারিয়ে গেল। তারপর, মনের অতল গহবর থেকে কে যেন উত্তর দিল,
“ক্ষতি আছে। কারণ – অনীশ আর সন্তান চায় না।”
চোখ খুলে জয়িতা দেখল, ঝড় উঠেছে বাইরে। প্রবল ঝড়। ধুলো উড়ছে বাতাসে। সাথে শুকনো পাতা, ছেঁড়া কাগজ। রাস্তার দু’পাশের গাছ বাতাসের তোড়ে দুলছে এলাপাথাড়ি। ভেঙে পড়ছে শুকনো ডাল। ছিঁড়ছে পাতা। ভীত সন্ত্রস্ত পাখিরা উড়ছে। আর থেকে থেকে তীব্র আলোর ঝলকানির সাথে বিদ্যুৎ চমকের রেখা আকাশের গায়ে।

গত বছরের চাইতে এবার শীত বেশিই মনে হচ্ছে। ডিসেম্বরের শেষের দিক। গত কয়েকদিন হ’ল সূর্যের দেখা নেই। কুয়াশায় ঢাকা সবকিছু। এরই মধ্যে বন্ধুদের নিয়ে ৪/৫ দিনের প্যাকেজ ট্যুরে ঘুরতে বের হয়েছে অন্তু। স্কুলের পরীক্ষা শেষ। আগামী বছরের জুনে এ-টু পরীক্ষা। ILTES পরীক্ষায় খুব ভাল না হ’লেও ভাল স্কোর করেছে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া মিলিয়ে আট-দশটা ইউনিভার্সিটিতে আবেদন করেছে। কোন ইউনিভার্সিটি সিলেক্ট করলে ফেব্রুয়ারিতে অফার লেটার আসার কথা। খুব টেনশন করছে ছেলেটা। অফিসের কাজে প্রায় একমাস মত সুইজারল্যাণ্ড, নেদারল্যাণ্ড ঘুরে আজ দুপুরের ফ্লাইটে অনীশ ফিরেছে। রাতে খাওয়া শেষ করে ড্রইংরুমে বসে ইউটিউব দেখছে এখন । কোন ভিডিওই দু’-তিন মিনিটের বেশি আটকে রাখতে পারছে না তাকে। অনীশ দেশের বাইরে যাবার এক মাসেরও আগে থেকেই জয়িতা জানত। জানত, অসীম শূন্য থেকে প্রাণের এক বিন্দু এসে স্থিতু হয়েছে তার গর্ভের অন্ধকার প্রকৌষ্ঠে। আর সেই থেকেই একটা আনন্দ, একটা নিরবিচ্ছিন্ন সুখানুভূতি আচ্ছন্ন করে রেখেছে তাকে। তার শরীরে ঘটছে পরিবর্তন। মনের গভীরে সংগোপনে জন্ম নিচ্ছে কত চিন্তা। সব সময় মাথা ঘোরে, খেতে বসলে বমি পায় – এসব কষ্টের মাঝেও কত সুখ, কত আনন্দ! আবার নতুন করে পাওয়া এই মাতৃত্বকে সবটুকু দিয়ে অনুভব করতে চায় সে। তার চেতনার মধ্যে সার্বক্ষনিক চিন্তার সঙ্গী অরণী। ছোট ছোট পায়ে তার পিছনে পিছনে অরণী হাঁটে – এ ঘর থেকে ও ঘরে। পায়ে নুপুর। নুপুরের মিষ্টি শব্দ – ঝুম-ঝুম, ঝুম-ঝুম। দু’পাশে ঝুঁটি বাঁধা কোঁকড়ানো চুল। দু’হাত বাড়িয়ে কোলে উঠার জন্য বায়না – এমনই আরও কত কী। কিন্তু এত কিছুর মাঝেও থেকে থেকে বুকের মধ্যে ভয় উঁকি দেয়। কথাটা শোনার পর অনীশ কি খুব রাগ করবে? এখনও জানানো হয়নি কথাটা। আজ জানাবে জয়িতা। ঢিপঢিপ করছে বুকের ভিতরটা।

ঘরে এল অনীশ। সোফায় বসে সিগারেট ধরাল। তারপর একমুখ ভর্তি ধোঁয়া ছাড়ল। রাতের পোশাকে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে প্রসাধন করছিল জয়িতা। অনীশের পাশে এসে বসল সে। এরপর, আবেগ ভরা কন্ঠে বলল, “এখন থেকে আর ঘরে সিগারেট খাওয়া চলবে না তোমার।”
অবাক হল অনীশ, “চলবে না মানে কী?”
অনীশের বুকে মাথা রেখে জয়িতা বলল, “চলবে না, মানে চলবে না। আমি আবার মা হতে চলেছি।”
কথাটা বুঝতে সময় নিল অনীশ। এরপর মূহূর্তেই জয়িতার অলিঙ্গন থেকে নিজেকে মুক্ত করে উত্তেজিত হয়ে রাগত স্বরে চিৎকার করে উঠল, “হোয়াট? তুমি নিশ্চিত?”
নীচু গলায় জয়িতা উত্তর দিল, “হ্যাঁ, ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম আমি। দু’মাস পেরিয়ে গিয়েছে।”
চোয়াল শক্ত করে অনীশ বলল, “তার মনে আমি দেশের বাইরে যাবার আগেই – তা এতদিন বলনি কেন?”
“যাবার আগে তোমাকে তখন বিরক্ত করতে চাইনি।”
আবারও চিৎকার করে উঠল অনীশ, “আই ডোন্ট ওয়ান্ট দিস্ আনওয়ানটেড বেবী। তুমি কালই ওকে-“
চমকে উঠল জয়িতা। একটা শিহরণ বয়ে গেল শরীরে। কাতর কন্ঠে প্রশ্ন করল, “কেন এসব বলছ? ও আমাদেরই সন্তান।”
“বলছি, কারণ এই বয়সে আমি আর লোক হাসাতে চাই না। আমার একটা মানসম্মান আছে। লোকে কী বলবে? দু’দিন পরে, অন্তু ভর্তি হবে ইউনিভার্সিটিতে। লজ্জা করল না তোমার এত বড় ছেলের সম্মুখে নতুন করে মা হতে? কোনভাবে একটা বাচ্চা যদি এসেই যায়, অ্যাবরশন করা যায় না?”
অবাক হয়ে জয়িতা তাকাল অনীশের দিকে, “অ্যাবরশন কেন করব? আমি ত ওকে ইচ্ছা করেই এনেছি।”
আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করল অনীশ, “ইচ্ছা করে এনেছ? আমার কাছে শুনেছিলে একবার ও? তুমি জানতে আমি সেকেণ্ড ইস্যু চাই না। তবে কেন?”
“সারাদিন আমার কিছুই ভাল লাগে না, ভীষণ একাকী, নিসঙ্গ লাগে। তাছাড়া কয়েক মাস বাদেই অন্তুও তো চলে যাবে।”
“তোমার ভাল লাগে না তো বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ঘোর, বেড়াও, এনজয় কর। কান খুলে শুনে নাও, পরশু অন্তু আসবে। অন্তু আসার আগেই…। কাল সকালে আমার মিটিং আছে। লাঞ্চের পরে এসে তোমাকে নার্সিংহোমে নিয়ে যাব। আর কোন ঝামেলা চাই না আমি।”
নিজের হৃদপিণ্ডের চলাচলের গতিটা যেন নিজেই বুঝতে পারছে জয়িতা। অনীশ সহজেই ব্যপারটা মেনে নেবে না সে জানত। কিন্তু অ্যাবরশনের কথা সে তো চিন্তাও করেনি। কাতর হয়ে অনীশের ডান হাতটা ধরে অনুনয় করে বল, “প্লিজ, একটা জীবন এভাবে শেষ করে দিও না। এ অন্যায়, ভগবান অসন্তুষ্ট হবেন।”
এক ঝটকায় জয়িতার হাতটা সরিয়ে দিল অনীশ। তারপর তাচ্ছিল্য করে বলল, “কী বললে? অন্যায়? সারা পৃথিবীতে প্রতিদিন এরকম কত অবাঞ্চিত ভ্রূণ হত্যা হচ্ছে, তার হিসাব জান তুমি? বিবাহিত, অবিবাহিত – লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে অ্যাবরশন করার জন্য। আর ভগবান? আগে আমি সন্তুষ্ট হই, তারপর না হয় ভগবানের কথা ভাবব। এই তো সেদিন মিঃ মিত্র বলছিল, তার স্ত্রী নাকি একাই নার্সিং হোমে গিয়ে চার মাসের বাচ্চা টারমিনেট করে এসেছে।”
অসহিষ্ণু হয়ে জয়িতা এবার বলল, “তারাই করে, যেখানে মায়ের সম্মতি থাকে। কিন্তু আমি তো চাই না।”
উত্তেজিত অনীশ এবার বলল, “আসলে আমারই ভুল! যত্তসব অশিক্ষিত ন্যারো মাইণ্ডেড, থার্ড ক্লাস সেণ্টিমেণ্ট। বোঝা উচিত ছিল, তেলে-জলে কখনও মিশ খায় না। আর এরপরও যদি তুমি সিদ্ধান্ত নাও যে তুমি এই বাচ্চার জন্ম দেবে, তাহলে তার দায়ভার আমার নয়। দেখি, কোন শর্মা তোমার এই বাচ্চার দ্বায়িত্ব নেয়?”
স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছে জয়িতা! উত্তেজনায় শরীর কাঁপছে তার। এই তার স্বামী অনীশ! অন্তুর জন্মদাতা! অসহনীয় ক্রোধে তার ভিতর থেকে বের হয়ে এল, “একজন খুনী তুমি !”
জয়িতার চোখে চোখ রেখে অনীশ এগোতে লাগল তারদিকে। পিছনে যেতে যেতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকল জয়িতার। কী করবে? অনীশ হাত তুলবে তার গায়ে? কিন্তু না। সামান্যতম হাতও অনীশ উঠাল না জয়িতার দিকে। শুধু চোখে চোখ রেখে বলল, “বাচ্চাটা নিজে আসেনি তোমার কাছে। তোমার ইচ্ছাতেই ও এসেছে তোমার শরীরে। দোষী তাহলে কে? আমি – না তুমি?”
কথাটার সত্যতার ক্ষুরধার তীক্ষ্ণতায় নির্বাক হয়ে গেল জয়িতা। অনীশের সাথে আর কোন তর্কে জড়াল না সে। সরে এল অনীশ। বিছানায় গিয়ে বাতি নিভিয়ে রাত বাতি জ্বালিয়ে শুয়ে পড়ল সে। এই শীতেও ঘামছিল জয়িতা। বুকের ভিতরটা দুমড়ে, মুচড়ে যাচ্ছে তার। রাত বাতির আবছা আলোটুকুও মুছে গিয়ে যেন অন্ধকার হয়ে গেল। দেওয়াল ঘড়ির টিক্ টিক্ শব্দও যেন শব্দহীন। দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছিল তার। দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে পড়ল সে। তারপর, দুই হাঁটুতে মুখ গুঁজে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল।

নিমন্ত্রণ – অন্তিম পর্ব


লেখক পরিচিতি : শম্পা সাহা
শম্পা সাহা। শিল্পাঙ্গনে যার পথচলা শুরু হয়েছিল ছবি আঁকা দিয়ে। হৃদয় দিয়ে মানুষকে অনুভব করতে পারার ক্ষমতা তাকে পরিনত করেছে লেখিকা হিসাবে। মানুষের দুঃখ তাকে পীড়া দেয়। তাই দারিদ্র, মাদক সমস্যা, অন্ধগলির ওপারের মেয়েদের কষ্ট, একাত্তরের বীরাঙ্গনাদের জীবনচিত্র ফুটে ওঠে তার গল্পে। বাংলাদেশ, ভারত ও কানাডার বিভিন্ন পত্রিকায়, অনলাইন পোর্টালে, ইউটিউব স্টোরি চ্যানেলে এখনও তিনি লিখে চলেছেন। ইতিপূর্বে "বিবর্ণ স্বাধীনতা" নামে লেখিকার গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে। গল্পের পাশাপাশি সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কলামও লিখে থাকেন। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী তাকে "আলোকিত নারী" সন্মানে ভূষিত করে। কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর ও লালন শাহের আবাসভুমি ঐতিহাসিক কুষ্টিয়া জেলায় ১৯৭৫ সালে লেখিকার জন্ম।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up