লেখক : জয়শ্রী পাল
ব্রেক কষতে বাধ্য হয় শিবি। একেবারে ঘাড়ের ওপরে এসে পড়েছে মেয়েটা। ট্রাফিকলাইট ওদিকে গান শোনাচ্ছে, ‘সে কি আমায় নেবে চিনে-’
‘দেখে চলতে পারো না রাস্তা?’ খিঁচিয়ে ওঠে শিবি। এক্ষুনি কেস খাওয়াচ্ছিল – শালা পাবলিক ক্যালানি দিয়ে ব্রিফকেস বানিয়ে দিত একটু টাচ লাগলে।
স্থির চোখে তাকাল মেয়েটা। লাল আলো বলছে, ‘এই নব ফাল্গুনের দিনে-’
পচা ভ্যাপসা, বৃষ্টি আর গরমের মধ্যে ফাল্গুন কোথায় বাওয়া? পরিবর্তনের আর ছিরিভিরি নেই। যা পারছে বাজিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু মেয়েটা যে সামনে থেকে নড়ার নাম করে না। লাল যে কোন মুহূর্তে সবুজ হয়ে যাবে সে ভ্রূক্ষেপ নেই।
‘অমন হাঁ করে দেখছ কি? পথ ছেড়ে সরে যাও।’ মাথা-ফাতা খারাপ নয়ত?
‘আপনার নিজের মাথা ঠিক আছে? ঠিকঠাক চলছেন তো?’
কথা ক’টা কেটে কেটে উচ্চারণ করেই সরে যায় মেয়েটা রাস্তার কিনারে। আর ঠিক তখনই সবুজ হয়ে ওঠে সিগন্যাল। ‘সে’ কি আমার কুঁড়ির কানে-’
‘আবে চুতিয়া, রাস্তা ছোড়-’ পিছনের ট্যাক্সি ড্রাইভার খিস্তি ছিটোয়। বাধ্য হয়ে বাইকে স্টার্ট দেয় শিবি। গান কী বলছে শোনা হয় না।
ঝিনচ্যাক ঘটনা একেবারে। ও কি করে জানল শিবির হার্ডডিস্কের খবর? ডিসপ্লেতে আহামরি কিছু তো দেখা যাওয়ার কথা নয়। এক পেগ হুইস্কি টেনেছিল পল্লবের পাল্লায় পড়ে, সেও তো ঘণ্টাখানেক আগে। কিচাইন সেখানে কিছু নেই। মনের মধ্যে খচখচ যেটা রয়েছে, সেটা তো বিশ বাঁওয়ের নিচে। তার খবর কিভাবে বোঝা যাবে? নাহ, সে একটু বেশিই সুপারস্টিশাস হয়ে পড়েছে। ওটা একটা ফালতু কথার কথা, বেকার নাটক। এসব বিষয়ে করিশমা তো তার আছে। কথাকে গল্প, আর গল্পকে বহুজনভোগ্যা গসিপে পরিণত করতে পারায় অনন্য মিস্টার শিবি সেনশর্মা। খচ্চর মজুমদারটাও কথাটা স্বীকার করে নেয়, ‘তুমি যে একজন টপক্লাস বক্তা, এ’কথাটা মানতেই হবে শিবি।’
মজুমদারের কথা খুব বেশি পাত্তা দেবার মত নয়। মালটা পিওর হারামি। কিন্তু মেয়েটা কি মরীচিকা ছিল? মাথাটা…? উঁহুঁ, মাথা তো ঠিকই আছে। পায়ের নিচে রাস্তাটা অবশ্য ঘোরতর গোলমেলে ঠেকছে। ‘কর্দমময় পিচ্ছিল প্রতিবন্ধকতা পদে পদে।’ সলিড সংলাপ একটা আচমকা খোপড়িতে গজিয়ে ওঠে। গ্ৰে-স্ট্রিট ক্রসিং-এ অল্পের জন্য বাঁচল শিবি। সবুজ নিভে হলুদ হয়েই ছিল। মাঝ বরাবর যেতেই দপ্ করে লাল আলোটা জ্বললেও সুযোগটা মিস করে না। এক্সিলেটারে পা দিয়ে জোরে চাপ দেয়। রাস্তা প্রায় ফাঁকা। গোঁ-গোঁ করে টপ গিয়ারে চলে যায় হোণ্ডা। খান পাঁচেক প্রাইভেটকে টপকে তরতর এগিয়ে চলে। এগিয়ে আসছে রাজবল্লভপাড়া।
‘সে কি আপন রঙে ফুল রাঙাবে?
সে কি মর্মে এসে ঘুম ভাঙ্গাবে?’
ওহ্ গড্, ট্রাফিকের লাল আলোয় সেই বসন্তের কোকিলটা এখনও ঘ্যাঁঙাচ্ছে। রিডিকিউলাস! দাঁতে দাঁত চাপতে গিয়েও চমকে ওঠে শিবি। একটা মেয়ে। হ্যাঁ, অবিকল সেই মেয়েটার মত রাস্তার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে এক ভাবে দেখছে তাকে। আরে গেল যা, সে কি শোপিস? মিউজিয়ামের মমি? কথাটা মগজে খেলতেই অজান্তে চোখ চলে যায় ফুটপাতে। একই স্থৈর্যে, একই দৃষ্টিপাত, শত শত যোজন বিস্তারের ওপার থেকে মেয়েটা যেন নির্নিমেষে তাকিয়ে আছে। ডানলপ পেরোতে মোট কতগুলো লালবাতির মোড় আসবে, হিসেবে আসে না শিবির। অথচ এমনটা হবার কথা নয়। এই পথচলা বারোমাস, তিরিশ দিনের। ক্রসিং সব মোটামুটি মুখস্থ। পল্লব শুয়োরটাই সর্বনাশ করে দিয়েছে ওর। হুইস্কির সঙ্গে অন্য কী মিশিয়েছিল, কে জানে। ককটেল বানানোর জটিল কায়দাকেতা আর ছাড়তে পারল না শালা। তবে কি অবশিষ্টাংশ শিবির গ্লাসেই ঢেলেছে বেভুলে?
‘এবারেরটা কিন্তু দারুণ তুলেছিস। পিওর নেফারতিতি লুক। ইজিপ্টের এপিক থেকে তুলে আনিসনি তো?’
গান্ডুটার পশ্চাতে ক্যাঁৎ করে এক দিতে হয়। এঁঃ! পকেটে ব্যাচেলার ডিগ্রিটুকুর খবর নেই, হিস্ট্রি মারাচ্ছে বানচোত্। চালায় তো একটা ছোটমোট সাইবার কাফে। তার আড়ালে বাকি বিজনেস যা চলছে, সে তো কহতব্য নয়। চোদ্দগুষ্টির কাস্টমার আর কণ্ট্যাক্টের ঠেলা সামলেও এত জ্ঞানগর্ভ এগজাম্পল পেটের কোন খোঁদল থেকে ওগরায়, কে জানে?
তনু সেদিন ভীষণ ভাবেই টেনশনে ছিল। ওর সেই উদ্বেগেভরা মুখটা কি কোনদিন ভোলা যাবে?
‘শিবিদা, আমি পারব তো? ভীষণ নার্ভাস লাগছে।’
‘আহ্ তনু! ডোণ্ট গেট আপসেট। ঘাবড়াবার কি আছে? ছোট্ট একটা রোলপ্লে করবি। কেন? তুই তো স্কুলের ড্রামা-শোগুলো রেগুলার অ্যাটেণ্ড করতিস।’
‘কি যে বল না তুমি? কোথায় স্কুল-প্লে আর কোথায় টিভি সিরিয়াল? আমাকে নেবে তো? তুমি ফুল কনফিডেণ্ট?’
‘নেবে রে নেবে। দেখ না তুই।’
তনুকা, সৌরিনের ছোট বোন। তার বাণিজ্যের প্রথম পদক্ষেপ। সৌরিনের মেজর কার অ্যাক্সিডেন্টের পর ওদের পরিবারের ত্রাতা হিসেবে দেখা দিয়েছিল শিবি। শালা, নিজের পরনে ত্যানা জোটে না, হাওয়াই চটিতে পিন ফোটানোর জায়গা নেই, সে করছে ত্রাণ। তবু তখনও স্বপ্নের রংগুলো স্পষ্ট ছিল। নিজেও কি ভেবেছিল, একটা মিথ্যে রূপকথা গড়ছে তনুর চারপাশে? বড়বাজারে বাজোরিয়াদের গদিতে হিসেব মেলানোর ছোটখাটো কাজ করত। বাকিটা ছিল সত্যিই স্বপ্নের। পরাশরদার গ্রুপ থিয়েটারে নিজেকে উজাড় করে ঢেলে দিত। বেশি কিছু কখনও কি চেয়েছিল সত্যি? নাকি বদলটা চলছিল ভিতরে ভিতরে, যেটার আদৌ টের পায়নি। সৌরিন ওর ছোটবেলার বন্ধু। ফ্যামিলিটা আতান্তরে পড়তেই নিরুপায় শিবি অগতির গতি পরাশরদাকে ধরেছিল, ‘পরাশরদা প্লিজ! তোমার তো অনেক জানাশোনা আছে। দেখো না, কোন সিরিয়ালের ছোটখাটো চরিত্রে ঢুকিয়ে দিতে পার যদি মেয়েটাকে।’
চেষ্টা পরাশরদা নিঃসন্দেহে করেছিলেন। ফলস্বরূপ বরবাদ হয়ে গেল তারুণ্যের এক বিকাশ। পরে অবশ্য তার সামনে কপাল চাপড়েছেন, ‘বিশ্বাস কর শিবি। আমি জানতাম না, সন্দীপন এত করাপ্টেড। মেয়েটাকে প্রথম দিনেই ভিড়িয়ে দিয়েছে প্রোডিউসারের ঘরে। ভাবতেই পারছি না, এভাবে ঠকাবে। এমন ভালমানুষ চেহারা, এত আদর্শের বুলি – সব ফেক।’
শিবি সহজসরল ছিল তখন। বুঝতেই পারেনি, পরাশরদার আসল রাগটা কোথায় ছিল। সেসব গল্প অনেক পরে জানতে পেরেছে। আসলে তো তিনি দালালের কাজ করেছিলেন। ভাগের কড়িতে লবডঙ্কা মিলেছে, তাই রাগ ওগরাচ্ছিলেন। কিন্তু যখন এসব জানতে পেরেছে সে, ততদিনে জল অনেক দূর গড়িয়ে গেছে। সেও বদলে গিয়েছে আপাদমস্তক। এরপর যেদিন তনু বড়বাজারের গদিতে দেখা করতে এসেছিল, বিষয় তখন আরও গোলমেলে হয়ে পড়ল। শিবি ভেবেই পাচ্ছিল না কীভাবে কথা শুরু করবে। তনুই শুরু করে ভূমিকা ছাড়াই, ‘শিবিদা আমার আর কোন উপায় নেই। যেভাবে হোক বাঁচাও আমায়। আমি মা হতে চলেছি। কোত্থাও মুখ দেখানোর জায়গা নেই আর আমার।’
ভারতীয় নারীর এই এক বখেরা। সহজেই তারা মুখ না দেখানোর পর্যায়ে চলে যায়। শিবির তখন বলভরসা জলাঞ্জলিতে। আকাশ থেকে পাতাল ঢুঁড়ছে সমাধানের আশায়। পিঠে টোকা পড়ল তখনই। পল্লব ছাড়া আর কে? ‘কি বে, চাকরি ‘নট’ করার বাসনায় আছিস নাকি? হারামির বাচ্চা, বাজোরিয়া কিন্তু তোকে ফলো করছে। প্রবলেম থাকলে আপাতত চেপে যা।’
পল্লবের বয়স তার সমান হলেও, বাজোরিয়ার গদিতে সে অনেকদিন থেকেই খেপ খাটছে। বাপ-মা বিহীন অনাথ আশ্রমের পোড়খাওয়া মাল। অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। সাতটায় কুসুমচাঁদের কেবিনে, মাটন কষার সঙ্গে দিশি পাঁইটের অর্ডার মেরে, পল্লব ওর দিকে ফেরে, ‘এবার তোর কিসসা বল্।’
তনু! তনুকা তাদের প্রথম ট্রেড। তার আর পল্লবের। একটি সফল গর্ভপাতের পর, তনুকে তারা অন্ধকারের প্রগতিশীল পথ দেখাতে পেরেছিল। কারণ এছাড়া উপায়ও ছিল না। প্রয়োজনটা তাদের থেকে বেশি ছিল সৌরিনের পরিবারের। অতএব পল্লবের পরিচয়ের হাত ধরে বড়বাজারের মজুমদার ভরসা। পরবর্তীতে ব্যবসাটা তাদেরকেও পেয়ে বসেছে। মজুমদার তাদের পুরোপুরি কিছুই শেখায়নি। তবু পরবর্তীতে ফলো-আপ করতে অসুবিধে হয়নি। বাজোরিয়ার রাজপাট সামলে পল্লব তৈরিই ছিল। শিবিকেও ও ছাড়েনি। ভালো রকমের ব্রেনওয়াশ দিয়েছে, ‘দেখছিস তো এটা ট্রেডের যুগ। কে প্রফিট করার সুযোগ ছাড়ছে, বল? অমন যে তোর নাট্যকার দাদা, সেও কত বড় জাতখচ্চর ছিল, বুঝতে পেরেছিস তো? আর আমরা তো কারুকে ফুঁসলিয়ে আনব না। যারা রাজি থাকবে শুধু তাদেরই…’
পরাশরদার উদাহরণ টেনে এনে ঘায়েল করে দিল পল্লব তাকে। বাড়িতে রোগা-ভোগা মা আর ছোট ভাইটা। প্যালেটের সব রং একসঙ্গে মিশিয়ে নিয়েছিল শিবি। অন্ধকার তাকে ঠকায়নি অ্যাটলিস্ট। পকেটে পয়সা এলে যে কোন মহল্লায় ঠাঁটসে বিরাজ করা যায়, সেও করে। ট্রেডের স্বার্থে করতেই হয়। কালচারের উঁচু চূড়াগুলো না ছুঁতে পারলে চলবে কেন? শিবি এখনও থিয়েটার মহলে আনাগোনা বজায় রেখেছে। মজুমদার তো প্রথম দিনেই তার বেদবাক্য শুনিয়েছে, ‘প্রদীপের নিচেই যথার্থ লক্ষ্মীমন্তের বসবাস। যেমন ঘোমটার নিচে খ্যামটা নাচ।’
মজুমদার-শুয়োর অনেক নিঘিন্নে বচন ঝেড়ে থাকে। বহুত্দিন ইচ্ছে করেছে, মালটাকে উদোম ক্যালায়। কিন্তু যত দিন গড়াচ্ছে, সেও আরেক মজুমদার হয়ে উঠছে বোধহয়। লক্ষ্মীলাভের বাসনা এত নিচ করেছে তাকে, যে সে বিজনেস পলিসি বদলাতে পারল? এ কী ব্যাপার? সে কি এখন অনুশোচনায় ভুগছে?
যেমনটা তনুর ক্ষেত্রে হয়েছিল?
তনু তার আরেক ঘেরাটোপ। প্রথম পাপ এবং অনন্ত অনুশোচনা। মজুমদারের খপ্পর থেকে ওকে আর উদ্ধার করতে পারেনি ওরা। ‘সি ইজ্ মাই লাকিয়েস্ট ট্রাম্পকার্ড। কিমৎ চুকোতে পারলে নিয়ে যাও।’
হারামিটা ঠোঁট মুচড়ে হেসেছে। তনুও রাজি হয়নি। ‘আমার জন্য বেকার সময় নষ্ট করো না পল্লবদা। আর তো কিছু হবার ছিল না, হবার নেইও। এখন আমি দিব্যি আছি। তোমরা অহেতুক ভেব না আমায় নিয়ে।’
তনু কি তার ওপর অভিমানে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে? শিবি কী করতে পারত এছাড়া? তনুর সামনে যাওয়া তার পক্ষে আর সম্ভব হয়নি। ভেতরের আগুন অহরহ জ্বালিয়েছে তাকে। আর ততই ডুবে গেছে শিবি কালো, আরো ঘনতর কালোতে। আদর্শ, বিবেকবোধ, নির্মম নিষ্ঠুরতায় মুছে দিয়েছে। বেওসা করেছে, বেওসা। বাণিজ্যে বসতেঃ লক্ষ্মী। আর তার কারবার তো সরাসরি লেনদেন। শুধু এবারেই যা…
কিন্তু কাজটা কি ঠিক করলো ও? এত কনফিউজড লাগছে কেন? মাথার মধ্যে পল্লবের পাঞ্চ কেবলই ঘুরপাক খাচ্ছে। তার ওপরে ক্রসিংয়ে দাঁড়ানো মেয়েটা, ওর কথা ক’টা…। আজকেই কেন এমন হচ্ছে? ধুর, বেকার এসব। তার চেয়ে বরং ভাবা দরকার, কতগুলো পাত্তি পকেটে আসবে। কাল মাকে একটা ভাল হার্ট স্পেশালিস্টের কাছে নিয়ে যেতে হবে।
‘আপনার মাথার ঠিক আছে? ঠিকঠাক চলছেন তো?’
ঘুরেফিরে ভুতুড়ে শব্দগুলো কেন বাজছে মাথার পিছনে? মগজের এক কোণে পড়ে থাকা প্রায় বিলীয়মান ‘শিবি’র অশরীরী অস্তিত্ব খতিয়ে দেখতে চায়? ‘রূপান্তর’ গ্ৰুপ থিয়েটার দলের শাওনী মেয়েটার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল মজুমদার, ‘শিবি মেরে জিগরি দোস্ত! একটু চক্কর চালাও না বাপধন। ছোকরিটাকে ওঠানোর ব্যবস্থা করো। কানোরিয়ার ছোট বেটা ওর জন্য দিওয়ানা বনে গেছে। ভাল মুনাফা হবে।’
আহাঃ, কথার ছিরি দেখো না? ঘি-খোরদের মহল্লায় ওঠবোস করতে করতে, মজুমদারটা জাহান্নামে গেছে। ভাষাটাও বলে আজকাল ওদেরই কায়দাতে। আর এই হারামির বাচ্চাগুলোও কম যায় না। এদিকে মাছমাংসের নামে কানে হাত দিয়ে জিভ কাটে, অথচ অন্য ম-কারান্তের নামে লালে ঝোলে একসা। অভাবী পরিবারের মেয়ে হলেও শাওনীর জাত আলাদা। শিবি সেটা প্রথম থেকেই বুঝেছিল। নিজেকেও সংযত রেখেছিল সেই কারণেই। যাই করুক, নারী পাচারের ব্যবসা তো আর ধরেনি। নিজেকে তারা ইমপোর্ট-এক্সপোর্টের বিজনেসম্যান মনে করে। খামোকা লাফড়ায় যাবে কেন? সে তো মজুমদার নয়। আরেকটা তনুকা কেন বানাবে?
সব দোষ পল্লবের। মাল খেয়ে ও-ই তো বাওয়াল দিয়েছিল, ‘যা না শিবি। মজুমদার এত করে বলছে যখন, পটা না মালটাকে। মারোয়ারির বাচ্চা যখন প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে, দোষ কি আছে? আর তোদের গ্ৰেট পোয়েট তো বলেইছে, ‘প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে’। মাওড়া বলে কি প্রেম চাওয়ার অধিকার নেই?’
কথা শেষ করেই গান ধরেছে থিয়েটারের ঢং-এ, ‘আমি প্রেম বিলোনো নদের নিমাই, প্রেম বিলোতে এসেছি…’
আরে, একি? সে তো রাজবল্লভ পাড়া পেরিয়ে, গিরীশ ঘোষের বাড়িটাকে ডজ করে গিয়েছিল। তাহলে এখন কেন উল্টোমুখো চলেছে? বিডন স্ট্রিট পেরিয়ে গিরীশ পার্ক টপকাচ্ছে? কোন ভূত ভর করলো কাঁধে? তাহলে কি ফিরেই যাচ্ছে ও? কেন ফিরে যাচ্ছে? বিবেকবোধ? এখনও বিবেক বেঁচে আছে শিবি সেনশর্মার?
পল্লবের নাটকেও কি গলত শিবি? রিস্ক নিতে চাইত? একটুও না। গোলমাল বাধাল ঐ শাওনীই। পুরো গ্ৰুপটা হৈচৈ করে সেদিন রাস্তা পেরোচ্ছিল। মেয়েটা একটু বেশিই হড়বড় করছিল। আরেকটু হলেই ব্যাক করতে থাকা বোলেরোটার সঙ্গে ধাক্কা খেত। হাত ধরে টেনে এনেছে শিবি। নেশায় থাকার দরুণই হয়ত একটু বেশি টেনে ফেলেছিল। গায়ের মধ্যে হুমড়ি খেল মেয়েটা। মালের গন্ধটাও নাকে গিয়েছিল বোধহয়। ঝাঁঝিয়ে উঠে মাথা ঝাঁকিয়েছে, ‘অত সস্তা ভাববেন না আমায় শিবিদা। আমি বর্ণিতাদি নই।’
গ্রুপের অন্যান্য ছেলেমেয়েগুলো মিচকি মিচকি হাসছিল বোধহয়, শিবির বেইজ্জতিতে। বর্ণিতার নাইটক্লাবে যোগদানের ইতিহাসটা সকলের জানা কি তবে? সেরকমই তো মনে হয়েছিল। সেদিন থেকে জেদ চাপল শিবির, এ’ মেয়েকে ফাঁসাতে হবে। সুযোগও এসে গেল। আজকের ময়দানে জমায়েত, দীর্ঘক্ষণ মেট্রো বন্ধ থাকার সুযোগকে দিব্যি কাজে লাগানো গেল। সাড়ে ছটা নাগাদ পৌলমী এসে ওকে ধরেছিল, ‘শিবিদা, একটু পৌঁছে দেবে শাওনীকে? মেট্রো চলছে না। ওদিকে ব্রিগেডেও জমায়েত ছিল। কীভাবে যে ফিরবে, বুঝতে পারছে না।’
‘তোর বন্ধু কি যেতে চাইবে? আমার সম্পর্কে যা ধারণা…’
‘কেমন ধারণা? শাওনী কনজারভেটিভ ফ্যামিলির মেয়ে। তুমিও তো বাবা ড্রাঙ্ক ছিল সেদিন। আর বর্ণিতাদিকে কে না চেনে বলো? যাকে পায় তার কোলেই চড়ে বসে। আমরা তো সেদিন শাওনীকে বকাই লাগিয়েছি, ওভাররিয়্যাক্ট করার জন্য। শ্রীমন্তদা জানতে পারলে হয়েছিল ওর।’
তখনও সুযোগ ছিল। পৌলমীর সুরে সুর মেলাতে পারত শাওনী। কিন্তু মেয়েটা ইচ্ছে করে একেবারে বোবা বনে রইল। তাতেই তো জেদ বেড়েছে ওর। সে জানত পৌলমীর অসুবিধে নেই। বাবুঘাট থেকে, লঞ্চ ধরে নেবে। কিন্তু শাওনীর বাড়ি বেলগাছিয়া-পাতিপুকুরের দিকে। সুতরাং ওর বাড়ি ফেরা যথেষ্ট চাপের। সুযোগ এসে গেলো অতএব। ওদের থেকে একটু সরে গিয়ে, পল্লবের সঙ্গে প্ল্যান সেট করতে অসুবিধে হয়নি। পল্লব প্রথমটায় বিশ্বাস করতে চায়নি, ‘কি যা তা বলছিস, শিবি? মাথা খারাপ হয়নি তো তোর?’
‘তুই-ই না বলেছিলে সেদিন। এখন পাল্টি খাচ্ছিস?’
‘আমাকে চিনিস না তুই এখনও? মালের ঘোরে কত কি ভাট বকি। কিন্তু তুই তো এমন নোস। তুই কেন-’
‘আমি কেমন তুই তা শেখাবি শালা? ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট বিজনেস? মাই ফুট! করি তো রেণ্ডিদের দালালি। তুই মজুমদারকে খবর দে। আর জব্বর একটা পাঞ্চ বানা। মালটাকে সেট্ করতে হবে।’
প্ল্যানমাফিক সবকিছুই হয়েছে। কিছুদূর যাবার পর শিবি বলেছিল, ‘আমার একটা ছোট্ট কাজ আছে পার্টনারের সঙ্গে। তুমি একটু ওয়েট করতে পারবে?’
ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিল শাওনী। তারপর পল্লবের সঙ্গে ব্যবসাপত্র, অ্যাকাউণ্ট, শেয়ারমার্কেট, নিয়ে ভ্যানতারা করা, আর এমন কি কঠিন কাজ? যতক্ষণ না হাতের গ্লাসে ধরা কোল্ডড্রিঙ্কসটুকু শেষ করে মেয়েটা লুটিয়ে পড়েছে। কিন্তু তখনও সে মেয়ের তেজ কি, ‘কি খা-খাওয়ালেন আপনারা আমাকে? আমি-ই, আ-আমার অন্ধকার লাগছে স-অব। আ-আপনি একটা আ-সতো শ-শয়তান-’
চেয়ার ছেড়ে উঠতে গিয়ে টলে, লুটিয়ে পড়তে যাচ্ছিল মেঝেতে, পল্লব ধরে ফেলল সময়মত। আর তখনি ওর ঐ নেফারতিতিওয়ালা ডায়ালগ। পড়াশোনা না করলে কি হবে, মালটা পুরো নেটের পোকা। সময় পেলেই নেট ঘেঁটে আজব-আজব জিনিস বার করে। নেফারতিতিটা ওর কারেণ্ট অ্যাডিশান হয়ত।
‘মজুমদার কি বলল? কখন আসবে?’
‘ন’টা তো বাজবেই। কানোরিয়ার গদি বন্ধ না হলে, আসে কী করে?’
‘ততক্ষণ কোন বিপদ নেই তো?’
‘নিশ্চিন্ত থাক্। পাঞ্চ যা ঝেড়েছি, সারা রাতে হুঁশে ফিরে কিনা দেখ।’
ঘ্যানঘ্যানে বৃষ্টিকে পাত্তা না দিয়ে, তখনই সে বাইক ছুটিয়েছিল, পল্লবের নেফারতিতিকে তার জিম্মায় রেখে। মজুমদার না আসা অবধি খোয়াব দেখুক। তারপর দিব্যি তো অনেকটা চলে গিয়েছিল। এখন তা’লে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ধরে উল্টো রথযাত্রা কেন তার? জানে না, সে জানে না। শুধু মাথার মধ্যে কি এক গুঞ্জন… ‘রাস্তা ঠিক নেই। ঠিক রাস্তায় চলছেন না।’ এক নয়, একাধিক অজানা চোখের অধিকারিণী যেন দাঁড়িয়ে আছে, প্রতিটা লালবাতির মোড়ে। বসন্তের দিনে, কে কাকে চিনে নেয়? শিবি তাও জানে না। কখন তার দু-চাকা অভিমুখ বদলালো, সে মোটেই টের পায়নি। শাওনী তো জাগবে না। কিন্তু তার মধ্যে কে যেন জেগে গেছে। সে বলছে, ‘ঠিক হ’ল না। কোন কিছু ঠিক হ’ল না। এখনও সময় আছে। ফেরানো যায়। তাকে ফেরানো যায়।’
শিবির হোণ্ডা সপাটে ঢুকে পড়ল লিণ্ডসে স্ট্রিটে। ডাইনে মোচড় খেয়ে সাদার স্ট্রিট পেরোয়। হুড়মুড়িয়ে চৌরঙ্গী লেনের ঠেকে গাড়ি ভেড়ায়। মোবাইলের ঘড়ি বলছে ন’টা বাজতে কুড়ি মিনিট বাকি। মজুমদারের এখনও আসার সময় হয়নি। ওকে ঝড়ের বেগে ঢুকতে দেখে পল্লব বমকে যায়, ‘কী রে, ফিরে এলি?’
‘মজুমদার কল করেছে তোকে?’
‘কল করবে কেন? এখুনি তো নিয়ে গেল নেফারতিতিকে। কানোরিয়ার বেটা খবর শুনে আগেভাগেই ওকে পাঠিয়ে দিয়েছে। এই তো তোর ভাগের ক্যাশও রেখে গেছে। এখন নিবি? নাকি…’
কপালে হাত রেখে বসে পড়ে শিবি। ‘ঠিক কোথায় নিয়ে গেছে জানিস?’
ওর হাবভাবে পল্লবের ভুরু কুঁচকে যায়, ‘ব্যাপার কী তোর? তুই কি ওকে উদ্ধার করতে চাইছিলিস? আর কোন উপায় নেই। মজুমদারকে চিনিস না? তনুর কথা ভুলে গেলি?’ পল্লব ওর পুরনো ক্ষতকে উস্কে দেয় আবার।
‘আরেকটা পাঞ্চ বানা তা’লে। সব কিছুকে মুছে ফেলি। গলা টিপে মেরে দিই একেবারে।’
‘অনেক হয়ে গেছে। বাড়ি যা। কাল কথা হবে।’
পল্লব ওকে ঠেলে নিয়ে গিয়ে বাইকে বসিয়ে দিয়েছে। পরের রাস্তা ঘোরে কাটে, যতক্ষণ না বিডন স্ট্রিট ক্রসিং আসে। আবারও লাল আলো থামিয়ে দিল ওকে। এখন আর গান নেই, তবু ভয় ঢুকে পড়ে শিবির মধ্যে। সামনেই দর্জিপাড়া। রাস্তার ধার ঘেঁষে, ফুটপাতে সার দিয়ে, সেই তারা তো দাঁড়িয়ে থাকবেই। ভরা বর্ষাতেও, যাদের উপস্থিতির রঙমাখা বসন্ত ডাক দেয় নিষিদ্ধ প্রহরে। চড়া নকল রঙের ঐ বসন্ত-পাহারা পেরিয়ে কিভাবে যাবে সে? সেখানে যদি তনু থাকে কিংবা নেফারতিতি? ওরা যদি সকলে মিলে খুবলে নেয় তার নষ্ট হৃদপিণ্ড? হঠাৎ যেন শীত করে ওর। একরাশ জ্বর যেন ঝেঁপে নেমে আসে। অচল জড়ে পরিণত করে।
লেখক পরিচিতি : জয়শ্রী পাল
জয়শ্রী পাল

