লেখক : বিজুরিকা চক্রবর্তী
ছাদের কোণে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা রঙিন কাটা ঘুড়িটায় চোখ পড়তেই থমকে যায় অনিকেত। মনে পড়ে যায় ছোটবেলার দিনগুলো। বিশ্বকর্মা পুজোর আগে পাড়ার বন্ধুরা মিলে ছাদে ঘুড়ি ওড়ানো—কি আনন্দটাই না হত! মাঞ্জা দেওয়া সুতোয় হালকা ঢিল দিয়ে ঘুড়ি আকাশে উঠলেই কার ঘুড়ি কতদূর ওড়ে, কার ঘুড়ি ‘ভোকাট্টা’ হয়—এই নিয়েই হইচই লেগে যেত। বিকেলবেলা ছাদে-ছাদে লাটাই হাতে হাজির হত ছেলেরা। সেইসব দিনের আকাশে ছিল শতরঙা ঘুড়ির মেলা। অনিকেত ছিল সবার চোখে ‘কাইট মাস্টার’—তার ঘুড়ির সুতোয় একের পর এক কাটা পড়ত অন্যদের ঘুড়ি। বন্ধুরা যখন উল্লাসে চিৎকার করে উঠত “ভোকাট্টা!” বলে, সেই শব্দে মিশে থাকত অনিকেতের বিজয়ের গর্ব।
আজ হঠাৎই অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়ি চলে এসেছে অনিকেত। আসলে মন বসাতে পারছিল না কোন কাজেই। গত কয়েক মাস ধরে চলা টানাপোড়েনের পর গতকাল তাকে মেনে নিতে হয়েছে সেই অনভিপ্রেত চরম সত্যিটা—বিয়েটা ভেঙে গেছে তার। শ্রীজা, তার ছোটবেলার বন্ধু ও প্রেমিকা, সবকিছুর ইতি টেনে দিয়েছে। প্রথমে তাদের সম্পর্ক ছিল স্বপ্নের মত, দু’পক্ষই খুব খুশি ছিল। শ্রীজার বাড়ি থেকেই প্রথম বিয়ের প্রস্তাবটা আসে। অনিকেতের মনে তখন একটাই ছবি—তাদের ছোট্ট একটা গোছানো সংসার।
ভাগ্যের পরিহাসে ছন্দপতন ঘটে মাসখানেক আগে, যখন অনিকেতের এক মাসতুতো ভাই ফ্লোরিডা থেকে ফিরে কয়েকদিনের জন্য তাদের বাড়িতে ওঠে। শ্রীজা ও তার বাবা-মা সেদিন দেখা করতে এলে ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেয় অনিকেত। সেদিনই অনিকেত বুঝতে পেরেছিল, কিছু একটা বদলে যাচ্ছে। শ্রীজা আর তার মা-বাবার আচরণে সেটা স্পষ্ট ছিল। এরপরই শুরু হয় অনিকেতের প্রাইভেট ফার্মের চাকরি নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা, শুনতে হয় বিদেশে না যাওয়া নিয়ে খোঁটা। অনিকেত কিন্তু চেষ্টা করেছিল পরিস্থিতি সামাল দিতে, তার কষ্টে অর্জিত চাকরি আর মনের মত সহকর্মীদের উপেক্ষা করে বিদেশে চাকরির আবেদন শুরুও করেছিল সে, কিন্তু তেমন সাড়া পাচ্ছিল না।
এরই মাঝে একদিন শ্রীজা স্পষ্ট জানিয়ে দিল, আর এক মাসের মধ্যে বিদেশে চাকরি না হলে সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে হবে। কথাগুলো অনিকেতকে সম্পূর্ণ ভেঙে দেয়। অবশেষে গতকাল সব শেষ হয়। পড়ে থাকে কিছু ছাপানো কার্ড আর ভেঙে যাওয়া একগুচ্ছ স্বপ্ন। মাথার ভেতর ছুড়ির ফলার মতো স্মৃতির টুকরোগুলো যখন ঘুরপাক খাচ্ছিল, ঠিক তখনই ঘুড়িটা সেই চিন্তার স্রোত কেটে দেয়।
অনিকেত ঘুড়িটা হাতে তুলে নিয়ে চলে যায় চিলেকোঠায়। ধুলো পড়া পুরনো লাটাইটা কুড়িয়ে সুতো বেঁধে ছাদের দিকে এগিয়ে যায়। মাঝ বরাবর এসে ঘুড়িটা হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়েই সুতোয় ঢিল দেয় আর সঙ্গে সঙ্গে কোথায় যেন মিলিয়ে যায় মনের সব যন্ত্রণা।
এই মুহূর্তে আকাশে বেশ কিছু ঘুড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে স্বতন্ত্রভাবে উড়ছে কিছুক্ষণ আগের সেই মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা ঘুড়িটা। আবারও একটা বিজয়ীর আত্মবিশ্বাসে মনটা ধীরে ধীরে ভরে যাচ্ছে অনিকেতের। না, আজ আর কোন ঘুড়ি কাটবে না সে, আজ সবাই নিজের-নিজের আকাশে উড়ুক মাথা উঁচু করে।
লেখক পরিচিতি : বিজুরিকা চক্রবর্তী
বিজুরিকা চক্রবর্তী, কলকাতা দমদমের, বাসিন্দা। সেন্ট জেভিয়ার'স কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি.এইচ.ডি ডিগ্ৰী পাওয়ার পর বর্তমানে এন.আর.এস মেডিক্যাল কলেজের এম.আর.ইউ ডিপার্টমেন্টে রিসার্চ-সায়েন্টিস্ট হিসেবে কর্মরত। কবিতা লেখা হঠাৎ করে খুঁজে পাওয়া এক জেদী, একরোখা, অবিচ্ছেদ্য বন্ধু। এখনও যেই বন্ধু বেইমানি করেনি। 🙏

