লেখক : অলভ্য ঘোষ
সম্প্রতি এক দিন আগে রাহুল গান্ধীর ইন্ডিয়া জোট (INDIA Alliance)-এর উদ্দেশে দেওয়া একটি বক্তব্য সর্বসমক্ষে এসেছে। একজন রাজনীতির ছাত্র হিসেবে আমি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে তাঁর বক্তব্য শুনলাম। আমার মনে হয়েছে, ভারতবর্ষের প্রতিটি মানুষেরই এই বক্তব্য শোনা উচিত। তাই তাঁর ৯ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডের দীর্ঘ ইংরেজি ভাষণটি বাংলায় অনুবাদ করার একটি চেষ্টা করলাম।
”আজ আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাতে চাই। এখানে আসার জন্য আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।
বহু বছর আগে আমার এক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে আমার তর্ক হয়েছিল। আমি তাকে বলেছিলাম, “তুমি যা করছ, তা সম্পূর্ণ অন্যায়।” সে আমাকে উত্তর দিয়েছিল, “পৃথিবীটাই অন্যায়। এতে অভ্যস্ত হয়ে যাও।” আজ আমি কংগ্রেস পার্টি সম্পর্কে যা বলছি, তা সেই ধরণের উত্তর নয়। আমার কাছে নীলকণ্ঠ শিবের ঐতিহ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—সেই শিব, যিনি সমস্ত বিষ পান করেছিলেন। আপনারা আমার সম্পর্কে যা খুশি বলুন, যত সমালোচনাই করুন না কেন—আমার সম্পর্কে, কংগ্রেস পার্টি সম্পর্কে—আমরা সবই গ্রহণ করব। আমরা হাসিমুখেই তা গ্রহণ করব। আমরা চেষ্টা করব আপনাদের খুশি করতে। কারণ আমাদের ভূমিকা মৌলিকভাবে ভিন্ন। আমি অহংকারবশত এই কথা বলছি না। আমাদের ভূমিকা হ’ল মানুষকে ভালবাসা ও স্নেহের বন্ধনে বেঁধে রাখা।
আমি ২০০৪ সাল থেকে কংগ্রেস পার্টির সাংসদ, যখন আমি প্রথম নির্বাচন লড়েছিলাম। আমাদের দল মৌলিকভাবে ভারতের অন্যান্য সব রাজনৈতিক দলের থেকে আলাদা এবং আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে এই কথা বলছি।
কেন?
কারণ আধুনিক ভারতের অস্তিত্ব গড়ে ওঠার আগেই এই দল একটি প্রতিরোধ আন্দোলন হিসেবে জন্ম নিয়েছিল। অন্য সব দলের মতো এটি ভারতীয় রাষ্ট্রের অবকাঠামো ও সুরক্ষার ওপর ভর করে তৈরি হয়নি। কংগ্রেস পার্টি হ’ল একটি প্রতিরোধ আন্দোলন, যা এই ধারণাকে রক্ষা করে যে ভারতের সব মানুষ সমান। আমরা আরএসএস-এর দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক বিরোধী। বিজেপি বা আরএসএস-এর সঙ্গে আপস করার আগে আমরা কংগ্রেসে থেকেই মৃত্যুবরণ করব। এমনটা ঘটাতে হলে আমাদের মাথা কেটে ফেলতে হবে। আমি এই দেশের লক্ষ লক্ষ কংগ্রেস কর্মীকে চিনি, যারা বলবে—“আমাদের মাথা কেটে ফেলুন, তবুও আমরা আরএসএস-এর সামনে মাথা নত করব না।”
আমি দুঃখের সঙ্গে বলছি, এই জোটের মধ্যে একটি বিভ্রান্তি রয়েছে। সেই বিভ্রান্তি হ’ল—আপনারা, সমাজবাদী পার্টি, তৃণমূল কংগ্রেস, রাষ্ট্রীয় জনতা দল মনে করছেন যে এতদিন যেসব রাজনৈতিক পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন, সেগুলো এখনও কার্যকর থাকবে। কিন্তু সেগুলো তখনই কার্যকর ছিল, যখন ভারতীয় রাষ্ট্র একটি ন্যায্য রাজনৈতিক ক্ষেত্র প্রদান করত। সেই ক্ষেত্রর এখন আর কোন অস্তিত্ব নেই। বিজেপি রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করে। বিজেপি বিচারব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে। বিজেপি আমলাতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করে। তারা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও নিয়ন্ত্রণ করে। এমনকি নির্বাচন কমিশনকেও নিয়ন্ত্রণ করে।
তৃণমূল কংগ্রেসে আমার অনেক বন্ধু আছেন। তাঁরা নিশ্চিত ছিলেন যে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তাঁরা বিপুল জয় লাভ করবেন। আমি তাঁদের বলেছিলাম, “আপনারা স্বপ্নের জগতে বাস করছেন।” আমি জানি কী ঘটে। আমি তা গুজরাটে দেখেছি। আমি তা মধ্যপ্রদেশে দেখেছি। আমি তা ছত্তীসগঢ়ে দেখেছি। আমি তা হরিয়ানায় দেখেছি। তবুও আপনাদের অনেকেই এখনও তা বিশ্বাস করতে রাজি নন।
কংগ্রেস পার্টি একটি প্রতিরোধের দল। টিকে থাকার জন্য বা কাজ করার জন্য ভারতীয় রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার ওপর কংগ্রেস নির্ভর করে না। বরং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো যত বেশি দখল করা হবে, কংগ্রেস তত বেশি আক্রমণাত্মকভাবে ভারতের সংবিধানকে রক্ষা করার জন্য লড়াই করবে। আমরা সবাই কংগ্রেসের কিছু মৌলিক আদর্শ ভাগ করে নিই। সেই আদর্শগুলো কী?
সত্য, অহিংসা এবং সহমর্মিতা।
আমি আপনাদের সঙ্গে লড়াই করতে চাই না। আমি যদি হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলি, “আমি আপনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করব”, তাহলে আমাকে পাগল হতে হবে। কারণ আপনারা আমাদের মিত্র, আপনারা আমাদের বন্ধু, আপনারাই সেই মানুষ যাদের আমরা ভালবাসি। অনুগ্রহ করে বুঝুন, ২০২৪ সালের নির্বাচনে আমরা হারিনি। আপনারা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, নীতীশজি কেন চলে গেলেন। সেটা আমার কারণে নয়, কংগ্রেসের কারণেও নয়। আমি আপনাদের বলছি, অদূর ভবিষ্যতে যেসব অল্প কিছু রাজনৈতিক হাতিয়ার এখনও কাজ করছে, সেগুলোও কাজ করা বন্ধ করে দেবে। কারণ বিজেপি এবং আরএসএস ভারতীয় রাষ্ট্রের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করে চলেছে। কংগ্রেস পার্টি একশো বছরেরও বেশি আগে একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। ১৯২৭ সালের আগে আমরা একটি রাজনৈতিক সংগঠন ছিলাম। তারপর যেদিন মহাত্মা গান্ধী বললেন, “আমরা স্বাধীনতা চাই”, সেদিন আমরা একটি প্রতিরোধ আন্দোলনে পরিণত হলাম। যদি রাজনৈতিক দলগুলো স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে না পারে, তাহলে কী কাজ করতে পারে?
প্রতিরোধ।
প্রতিরোধ কাজ করে। আমি তা নিজের চোখে দেখেছি। আমি এই দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত চার হাজার কিলোমিটারেরও বেশি হেঁটেছি। আমি দেখেছি, প্রতিরোধ কাজ করে। এর জন্য রাজনৈতিক কাঠামোর প্রয়োজন নেই। এর জন্য আমলাতন্ত্রের প্রয়োজন নেই। এর জন্য গোয়েন্দা সংস্থার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু প্রতিরোধের মনোভাব। অর্থাৎ “আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াব। আমি অন্যায় মেনে নেব না।” প্রতিরোধ একটি মানসিকতা। এটি কোন সংগঠন নয়। এটি চিন্তা করার একটি পদ্ধতি। আমরা তা পছন্দ করি বা না করি, শেষ পর্যন্ত আমাদের সেই পথেই যেতে হবে। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। আপনারা ভাবছেন, চ্যালেঞ্জ হ’ল পরবর্তী নির্বাচন জেতা। কিন্তু চ্যালেঞ্জ তা নয়। প্রকৃত সমস্যা হ’ল আরএসএস-এর দ্বারা ভারতীয় রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেওয়া। আপনারা হয়ত জেতার জন্য একটি সত্যিকারের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই পাবেন না। তাই আমাদের প্রতিরোধের পথে যেতে হবে।
সিবিএসই-এর প্রশ্নে প্রতিরোধ।
নিট-এর প্রশ্নে প্রতিরোধ।
গ্রেট নিকোবরের প্রশ্নে প্রতিরোধ।
ভারত জোড়ো যাত্রাও এক ধরনের প্রতিরোধ।
সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন—“আমি কীভাবে প্রতিরোধ করতে পারি?” তারপর প্রতিরোধ করুন। আমি আপনাদের নিশ্চয়তা দিচ্ছি, এটা কাজ করবে। আর সেই কারণেই আমি আপনাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, এই জোটকে একসঙ্গে ধরে রাখতে এবং সফল করতে যত অপমানই আমাকে সহ্য করতে হোক না কেন, আমি তা সহ্য করব।
মমতাদি হয়ত ১০০ শতাংশ নিশ্চিত নন, কিন্তু তিনি প্রায় ৯৯ শতাংশ নিশ্চিত যে তাঁর নির্বাচন চুরি করা হয়েছে। উদ্ধবজি প্রায় ৪০ শতাংশ নিশ্চিত। আমার ভাই তেজস্বীজি প্রায় ৪০ শতাংশ নিশ্চিত। কিন্তু আমি বলছি—নির্বাচন ১০০ শতাংশ চুরি করা হচ্ছে। আপনাদের মন থেকে সব ধরণের সন্দেহ দূর করুন। এটাও বুঝুন যে সামাজিক মাধ্যমে একটি শক্তিশালী উপস্থিতি গড়ে তুলতে বহু বছর সময় লাগে। এটি এক সপ্তাহে স্বাভাবিকভাবে তৈরি হয় না। আমার ইউটিউবে এক কোটিরও বেশি অনুসারী আছে, কিন্তু আমার অ্যাকাউন্ট সম্পূর্ণভাবে দমন করা হচ্ছে। তাই যদি আপনারা মনে করেন সামাজিক মাধ্যম নিরপেক্ষ এবং বিরোধীদের সমানভাবে সুযোগ দিচ্ছে, তাহলে আপনারা অন্য এক বাস্তবতায় বাস করছেন। পুরো কাঠামো—গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম, বিচারব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র, গোয়েন্দা সংস্থাগুলি—সবকিছুই এই সরকারকে ক্ষমতায় ধরে রাখার জন্য সাজানো হয়েছে।
কিন্তু এই সরকার টিকবে না। টিকবে না, কারণ এটি আমাদের গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এটি ভারতের ভবিষ্যৎকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এখন যে অবস্থায় পৌঁছচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং সেটি আমাদের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।
আর একটি বিষয়—এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসুন যে আমরা পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় করি না বা একসঙ্গে কাজ করি না। এগুলো সবই বিজেপি এবং তাদের ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমের প্রচারিত ধারণা। এগুলো সত্য নয়। যখন ভারতের মূল আদর্শ ও ধারণাকে রক্ষা করার প্রশ্ন আসে, তখন আমরা একসঙ্গে দাঁড়াতে পারি। এই কক্ষে উপস্থিত প্রত্যেকের সঙ্গেই আমাদের কোন না কোন রাজনৈতিক মতভেদ রয়েছে। কিন্তু তাই বলে আমরা বৃহত্তর লড়াইকে ভুলে যেতে পারি না। আমাদের নমনীয় হতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে যে আমাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আক্রমণ চলছে। আমাদের দুর্বল, বিশৃঙ্খল এবং অসংগঠিত বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আরেকটি বিষয় আমি লক্ষ্য করি—আমাদের মধ্যে প্রায়ই এক ধরনের হতাশা কাজ করে। মানুষ ভাবে, “আমরা কীভাবে কখন বিজেপিকে পরাজিত করব?” আমি আপনাদের বলছি, বিজেপিকে পরাজিত করা কঠিন নয়। যদি আমরা একসঙ্গে দাঁড়াই এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলি, তাহলে তা সম্ভব। গত নির্বাচনে এই কক্ষে উপস্থিত প্রায় কেউই বিশ্বাস করেননি যে বিজেপিকে হারানো যেতে পারে। কিন্তু এখন এই কক্ষে উপস্থিত প্রত্যেকের বিশ্বাস করতে শুরু করা উচিত যে আমরা তাদের পরাজিত করব। সেই বিশ্বাস থেকেই শুরু করুন। আর আমি আপনাদের নিশ্চয়তা দিচ্ছি, একের পর এক রাজ্য নির্বাচন, একের পর এক নির্বাচনের পর—তারা প্রতারণা করুক বা না-ই করুক—শেষ পর্যন্ত তারা ক্ষমতা থেকে পতিত হবে। আমার কাছে এটি কেবল রাজনৈতিক বিষয় নয়। এটি আমার ধর্মীয় কর্তব্য। এটি আমার আধ্যাত্মিক কর্তব্য। এটি আর শুধুমাত্র রাজনীতি নয়।
আপনাদের সবাইকে অনেক ধন্যবাদ।”
দেখুন, আমি কংগ্রেস কিংবা এনডিএ—কোন পক্ষেরই সমর্থক নই। কিন্তু রাহুল গান্ধীর এই বক্তব্যের মধ্যে যে আন্তরিকতা, যে নিষ্ঠা এবং যে স্বচ্ছতা লক্ষ্য করলাম, তা আশা করি অনেককেই ভাবাবে এবং সমৃদ্ধ করবে।
লেখক পরিচিতি : অলভ্য ঘোষ
শ্রী রবি ঘোষ ও কমলা ঘোষের তিন পুত্রের মধ্যে মধ্যম পুত্র অলভ্য ঘোষ ১৯৭৬ সালের ১০ জুন কলকাতার টালিগঞ্জে জন্ম গ্রহণ করেন ; ছোট থেকেই একরোখা অলভ্য প্রথাগত শিক্ষা সমাজ ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থাশীল-প্রতিবাদী । শিল্প কলা তার উপজীব্য হলেও ব্যতিক্রমী এই মানুষটি নিজেকে একজন সৈনিক বলে মনে করেন যার অস্ত্র কালি মাটি কলম । দেশে বিদেশের পত্র পত্রিকায় তার কাব্য ,ছোটগল্প ,প্রবন্ধ সসম্মানে প্রকাশিত হবার পর তিনি স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণে আত্মমগ্ন ।

