বিষের বিষাদ

লেখক : আবুল হাসান তুহিন

কাহিনী সংক্ষেপ :

রহমত আলী একজন আদর্শবান ও সৎ ফল চাষী, যিনি সব সময় প্রাকৃতিকভাবে ফল পাকানোর পক্ষপাতী। অন্যদিকে, একই এলাকার তরুণ ফল ব্যবসায়ী রাসেল দ্রুত ও বেশি মুনাফার লোভে ফলে কার্বাইড, ইথ্রেল ও ফরমালিনের মত বিষাক্ত কেমিক্যাল প্রয়োগ শুরু করে। তার লোভের প্রভাবে সাধারণ ক্রেতারা চকচকে বিষাক্ত ফল কিনে প্রতারিত হতে থাকে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, রাসেল নিজেই নিজের ভেজানো বিষাক্ত ফল খেয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে জীবনের চরম শিক্ষা পায় সে। ডাঃ নাবিলার চিকিৎসা ও পরামর্শে রাসেল উপলব্ধি করে যে, অন্যের ক্ষতি করে নিজে ভাল থাকা অসম্ভব। সুস্থ হওয়ার পর রাসেল তার ভুল স্বীকার করে এবং রহমত আলীর সহায়তায় এলাকাবাসীকে সচেতন করতে ও বিষমুক্ত ফলের বাজার গড়তে ব্রতী হয়।

চরিত্র লিপি:

১. রহমত আলী (৫৫): সৎ, বিবেকবান ও ধর্মভীরু প্রবীণ ফল চাষী।
২. রাসেল (২৮): অসৎ ফল ব্যবসায়ী।
৩. ডাঃ নাবিলা (৩৫): সচেতন, স্পষ্টভাষী ও কর্তব্যপরায়ণ নারী চিকিৎসক। 

দৃশ্য।।০১।। আম বাগান।।দিন।।

চরিত্র: রহমত, রাসেল 

(আবহ: ভোরের শান্ত স্নিগ্ধ গ্রামীণ পরিবেশের আওয়াজ। পাখিদের কলকাকলি, দূরে কোথাও গরু ডাকার শব্দ। পায়ের নিচে শুকনো পাতার মড়মড় শব্দ শোনা যাচ্ছে।)

রহমত: (নিজের মনে গান গাইতে গাইতে আম গাছ পরিষ্কার করছিলেন) 

।।গান।।

হায়রে আইলো মধুমাস
আম কাঁঠালের গন্ধে বিভোর
করব সুখে বাস
হায়রে আইলো মধুমাস।।

(হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে) আল্লাহ, কদিন পরেই আমগুলো পাকবে। আল্লাহর রহমতে এবার ফলনটা ভাল হয়েছে। একটু দাগ থাকুক, তাও তো আসল স্বাদটা মানুষ মুখে বুঝতে পারবে!

(আবহ: ঝোপঝাড় সরিয়ে কারও দ্রুত হেঁটে আসার শব্দ। রাসেল দ্রুত পায়ে হেঁটে আসছে)

রাসেল: (উত্তেজিত গলায়, একটু হাঁপাতে হাঁপাতে) আরে রহমত চাচা! এই অসময়ে এখনও গাছে আম ঝুলিয়ে রেখেছেন? বাজারে তো এখন আগাম আমের তুফান চলছে!
রহমত: (শান্ত কণ্ঠে) এখন তো আম পাকার সময় হয়নি বাবা। কটা দিন সবুর করলেই তো হয়।
রাসেল: (হেসে উঠে) চাচা, আপনি সেই যুগের মানুষই রয়ে গেলেন! বাজারে এখন আমের চড়া দাম। সব আম একসাথে পেড়ে কার্বাইড বা ইথ্রেল স্প্রে করে দিন। দুই দিনে এমন টকটকে হলুদ হবে যে, মানুষ দেখার সাথে সাথেই ঝাঁপিয়ে পড়বে। দ্বিগুণ লাভ, বুঝলেন?
রহমত: (দৃঢ় গলায়) ধুর পাগল! ওসব পাপের কাজে আমি নেই। প্রাকৃতিকভাবে যে আম পাকবে, আমি সেটাই বেচব। মানুষের অনিষ্ট করে সেই টাকায় সংসার চালানোর চেয়ে উপোস থাকা অনেক ভাল।
রাসেল: (অবজ্ঞাভরে) আরে চাচা, যুগ পাল্টেছে। সবাই এখন কার্বাইড আর ইথ্রেল মারে। কাস্টমার এখন চকচকে আম খোঁজে, আপনার ওই ন্যাতানো দাগওয়ালা আম কেউ ফিরেও দেখবে না। লোকসান গুনতে গুনতে রাস্তায় বসবেন, তখন বুঝবেন! চললাম আমার আড়তে!

(প্রস্থান)

(আবহ: রাসেলের দ্রুত পায়ে হেঁটে চলে যাওয়ার শব্দ। রহমত আলীর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ এবং আবার পাখির ডাক)

রহমত: (স্বগতোক্তি) মানুষের লোভ মানুষকে অন্ধ করে দেয়। আল্লাহ তুমি সবাইকে হেদায়েত দিও। গাছতলায় দু’-একটা পাকা আম পড়েছে! এগুলো বাড়ি নিয়ে যাই, গরম যা পড়েছে ! হাতমুখ ধুয়ে পুকুরপাড়ে বসে খাতি ভালই লাগবেনে!

(প্রস্থান)

(আবহ: ধীরে ধীরে মিউজিক বেড়ে দৃশ্যটি শেষ হবে) 

দৃশ্য।।০২।। রাসেলের আড়ত।। রাত।।

চরিত্র: রাসেল, রহমত আলী

(আবহ: অস্বস্তিকর, একটু থমথমে আবহ সংগীত শুরু হবে। তার সাথে আড়তের ভেতরে মালপত্র ওঠানামার ঝনঝন শব্দ, দূরে ট্রাকে মাল তোলার আওয়াজ।)

রাসেল: (নিজের মনে বিড়বিড় করে) এই তো সুযোগ। আজ রাতে এই আমগুলোর রঙ বদলে না দিলে কালকের হাটে দাম পাওয়া যাবে নানে! মুখের মাস্কটা কোথায় রাখিছি? এইতো পাইছি! মাস্কটা মুখে পড়ি। তারপর কেমিক্যালের মিশ্রণটা সমস্ত আমে এবার স্প্রে করব। আম দেখতে যেমনটা হবে, কাস্টমার আম দেখে কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়বে।

(আবহ: স্প্রে করার মেশিনের ‘পাম্প’ করার জোরালো আওয়াজ এবং তরল স্প্রে হওয়ার হিসহিস শব্দ)

রহমত: কী ব্যাপার! রাসেলের আড়তে এখনও আলো জ্বলতিছে! ভিতরে নিশ্চয়ই কেউ আছে। আর কিসের জন্য একটা তীব্র গন্ধ বের হচ্ছে – যাই গিয়ে দেখি তো।
রাসেল: (মনে মনে হাসতে হাসতে) ব্যাস! এই ইথ্রেল আর কার্বাইডের কামাল দেখ এবার। কাল সকালের মধ্যে সব আম সোনার মত চকচকে হলুদ হয়ে যাবে। আর এই ফরমালিন স্প্রে করে দিলাম, দশ দিনে একটা মাছিও এর কাছে ভিড়তে পারবে না! কী দারুণ বুদ্ধি আমার!

(আবহ: আড়তের কাঠের দরজায় ধাক্কা বা খোলার শব্দ। রহমত আলীর ভারী পায়ের আওয়াজ)

রহমত: (গম্ভীর ও ক্ষুব্ধ কণ্ঠে) যা ভেবেছি তাই! ভিতরে নিশ্চয়ই কেউ আছে! আমের গায়ে কেমিক্যাল স্প্রে করছে! এ কী করছিস রাসেল?
রাসেল: (চকিত হয়ে) আরে চাচা! আপনি? এই রাতে আমার আড়তে কী করছেন?
রহমত: (তীব্র ক্ষোভের সাথে) রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম, রাসায়নিকের গন্ধে পেট গুলিয়ে উঠল। এই বিষাক্ত কেমিক্যাল মেশানো ফল মানুষ খাবে, রাসেল! তুই কি জানিস না এতে মানুষের লিভার-কিডনি ধ্বংস হয়ে যায়? এমনকি ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে! তোর নিজের কি একটুও দয়া-মায়া নেই?
রাসেল: (বিরক্তির সাথে) চাচা, জ্ঞান দেবেন না তো! ব্যবসা করতে এসেছি, সমাজসেবা করতে না। বেশি চকচকে ফল না দেখালে ক্রেতারা কেনেই না। তারা চোখ দিয়ে কেনে, পেট দিয়ে না। মানুষ মরলে আমার কী? আমার পকেট ভরলেই হ’ল!
রহমত: (হতাশ গলায়) টাকার নেশায় তুই তো অন্ধ হয়ে গিয়েছিস। মনে রাখিস, এই বিষ একদিন ঠিকই তোকে জাপটে ধরবে। এই অন্যায় কাজের শাস্তি তোরে ভোগ করতেই হবে!

(প্রস্থান) 

(আবহ: রহমত আলীর ভারী পায়ে চলে যাওয়ার শব্দ। রাসেল আবার স্প্রে করার মেশিনের আওয়াজ শুরু করে—হিসহিস শব্দ)

রাসেল: (নিজে নিজেই) যা খুশি বলুক বুড়োটা! পয়সাটাই আসল। বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্নি এক ক্যারেট আম আলাদা করে রাখিলাম, কিন্তু মাঝপথে বুড়োটা এসে সব উল্টোপাল্টা করে দিল। মনে হয় এই ক্যারেটটা হবে! যাই এটা বাড়ি নিয়ে যায়।

(প্রস্থান)

(আবহসংগীত: মিউজিকটি হঠাৎ কর্কশ হয়ে শেষ হবে)

দৃশ্য।।০৩।। হাসপাতাল।।দিন।।

চরিত্র: রাসেল, ডাঃ নাবিলা

(আবহসংগীত: একটি করুণ ও আতঙ্কের আবহ সংগীত। অস্থির পরিবেশ। মাঝে মাঝে রাসেলের কষ্ট করে শ্বাস নেওয়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে।)

রাসেল: (কান্নাজড়িত ও কাঁপাকাঁপা স্বরে) ওহ ডাক্তার আপা! বাঁচান আমারে! পেটে ব্যথায় মনে হচ্ছে কেউ ছুরি চালাচ্ছে। সকাল থেকে অনবরত বমি আর পাতলা পায়খানা হচ্ছে… আমি আর সহ্য করতে পারছি না!
ডাঃ নাবিলা: (গম্ভীর ও ধীরস্থির কণ্ঠে) রাসেল সাহেব, একটু শান্ত হোন। বেশি ছটফট করবেন না। আপনার রিপোর্টগুলো হাতে এসেছে। আপনার লিভারে মারাত্মক ইনফেকশন হয়েছে, সাথে তীব্র ফুড পয়জনিং। দু’-একদিনের মধ্যে বাইরে উল্টাপাল্টা কিছু খেয়েছিলেন কি?
রাসেল: (অস্পষ্ট স্বরে, যন্ত্রণায় কুঁকড়ে) না আপা, আমি তো নিজের আড়তের আমগুলো ছাড়া কিছুই খাইনি। আমগুলো বাছাই করা কেমিক্যালমুক্ত ছিল… আমি প্রতিদিন অনেকগুলো করে খেয়েছি।
ডাঃ নাবিলা: (কড়া গলায়, কিছুটা বিস্ময় ও ভর্ৎসনার সুরে) নিজের আড়তের আম? রাসেল সাহেব, আপনি তো নিজেই নিজের সর্বনাশ ডেকে এনেছেন!
রাসেল: (কাতর স্বরে) আমার সর্বনাশ আমি কীভাবে করব আপা? আমি তো গাছ থেকে পেড়ে এনে এক ক্যারেট ভাল আম আমি বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলাম।
ডাঃ নাবিলা: আপনার যে রিপোর্ট আমরা পেয়েছি, তাতে ধারণা করা হচ্ছে আপনার আড়তের ওই চকচকে আমগুলোর ভেতরে কার্বাইড, ইথ্রেল আর ফরমালিন মেশানো ছিল। সেটাই আজ আপনার শরীরে বিষক্রিয়া তৈরি করেছে।
রাসেল: (কাতর স্বরে) আপা… আপনি কী বলছেন? আমি এক ক্যারেট ফ্রেশ আম তো বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলাম! ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে। আসলে আমি যখন আমে স্প্রে করছিলাম, মাঝপথে একজন এসে যাওয়ার কারণে তখন ভুলবশত আলাদা করে রাখা আমের ক্যারেটটি গুলিয়ে ফেলেছিলাম। আমি কি তবে নিজের হাতের বিষই নিজে খেয়েছি?
ডাঃ নাবিলা: (দৃঢ় গলায়) ঠিক তাই। ল্যাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আমরা বুঝতে পেরেছি, আপনার লিভার এখন আর এই বিষাক্ত খাবারের চাপ নিতে পারছে না। মনে রাখবেন, সমাজকে বিষাক্ত খাবার খাওয়ানো আর নিজেকে বিষ খাওয়ানো—দু’টিই সমান। বিষ বিক্রি করলে সেই বিষ কোন না কোনভাবে নিজের ঘরেই ফেরত আসে।

(আবহ: রাসেলের কাতারানোর করুণ আওয়াজ)

রাসেল: (চিৎকার করে) ডাক্তার আপা, আমি নিজের ভুলে বিষ খেয়েছি! পেটের যন্ত্রণা আর সহ্য করতে পারছি না! আমার পেটে আগুন জ্বলছে।
ডাঃ নাবিলা: আপনার রিপোর্ট অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থাপত্র দিয়েছি, একটু ধৈর্য ধরতেই হবে! আশা করছি কিছুদিনের মধ্যে আপনি সুস্থ হয়ে যাবেন! এখন শান্তভাবে ঘুমনোর চেষ্টা করুন।

(আবহসংগীত: একটি বিষাদময় সুর দ্রুত গতিতে বেজে ওঠে এবং ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়)

দৃশ্য।।০৪।। রাস্তা।। দিন

চরিত্র: রাসেল, রহমত আলী

(আবহ: বাজারের কোলাহল—রিকশার ঘণ্টা, মানুষের কথাবার্তা। রাসেল কিছুটা দুর্বল পায়ে হেঁটে আসছে)

রাসেল: (মনে মনে) শরীরটা এখনও দুর্বল, কিন্তু বুকের ভেতরের দহনটা কমেছে। ডাক্তার আপার সেই কথাগুলো—’বিষ বিক্রি করলে সেই বিষ নিজের ঘরেই ফিরে আসে’—প্রতি মুহূর্তে আমাকে দংশন করছে।
রহমত: (স্বগতোক্তি) রাসেল হেঁটে যাচ্ছে না? হ্যাঁ, রাসেলই তো! অসুস্থ হয়ে বেশ কয়েকদিন হাসপাতালে ছিল! শরীরের কী অবস্থা হয়েছে? আমি সামনের দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে ভাল-মন্দ জিজ্ঞাসা করি।
রহমত: রাসেল হাসপাতাল থেকে কবে ছাড়া পালি? দেখে মনে হচ্ছে শরীর এখনও অনেক দুর্বল!
রাসেল: কালকে ছাড়া পেয়েছি চাচা! হাসপাতালে থাকার কারণে অনেক দিন আড়তে যাওয়া হয়নি, তাই আড়তের দিকে যাচ্ছি।
রহমত: চল, আমিও তোর সাথে সাথে যাচ্ছি। আরও কয়েকদিন বাড়িতে বিশ্রাম নেওয়া উচিত ছিল! 
রাসেল: (আবেগপ্রবণ হয়ে) তা ছিল, কিন্তু একা মানুষ, না গিয়ে উপায় আছে! চাচা, আমি বড় অন্যায় করেছি। বেশি লাভের লোভে আমি মানুষকে বিষ খাওয়াইছি। ফলে আজ নিজের জীবনটাও খোয়াতে বসেছিলাম। 
রহমত: আমি তোরে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু তুই আমার কথা শুনিসনি!
রাসেল: এই যে, আমি তোমার গা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করতিছি, আমার আড়তে আর কোনদিন কেমিক্যালযুক্ত ফল ঢুকবে না। আমারে ক্ষমা করে দিন চাচা!

(আবহ: ভিড়ের মধ্যে মানুষের ফিসফাস এবং গুঞ্জন)

রহমত: (শান্ত কণ্ঠে) রাসেল! এই তো মানুষ হয়েছিস বাবা।
রাসেল: আপনার কথাই সঠিক হয়েছে চাচা, আমার অন্যায়ের শাস্তি আমি ভোগ করিছি।
রহমত: (সহানুভূতির সুরে) তুই যে সত্যটা বুঝতে পেরেছিস, সেটাই বড় কথা। মনে রাখিস রাসেল, এই বাজারের মানুষগুলো আমাদের পরিবারের মত। এদের সুস্থতার ওপরই আমাদের শান্তি নির্ভর করছে।
রাসেল: (কান্নাজড়িত কণ্ঠে) চাচা, আজ থেকে আমি শুধু প্রাকৃতিক নিয়মে পাকা ফলই বিক্রি করব। কাস্টমাররা রাগ করলে করুক, আমি আর বিষের ব্যবসা করব না।
রহমত: শোন, আগামীকাল আমাগের স্কুল মাঠে, মানুষকে সচেতন করার জন্য একটা সভার আয়োজন করা হয়েছে। তুই সেখানে উপস্থিত থাকবি। কারণ কেমিক্যাল দেওয়া ফল খেয়ে তুই অসুস্থ হয়ে পড়েছিস – এই বিষয়ে ডাক্তার নাবিলা সবাইকে বুঝিয়ে বলবে এবং সবাইকে সচেতন করবে। 

(আবহসংগীত: আশার সঞ্চার করে এমন একটি সুর মৃদুভাবে বাজছে)

দৃশ্য।।০৫।। স্কুল মাঠ।।দিন।।

চরিত্র: ডঃ নাবিলা, রাসেল, রহমত

(আবহ: বাজারে মানুষের আনাগোনার শব্দ, সচেতনতা সভা চলছে।)

ডাঃ নাবিলা: (মাইকে স্পষ্টভাবে) সুধী এলাকাবাসী, আসসালাম আলাইকুম। একজন চিকিৎসক হিসেবে আজ আমি আপনাদের সামনে দাঁড়িয়েছি শুধু রোগীদের সেবা করতে নয়, বরং রোগ হওয়ার আগেই সতর্ক করতে। আপনারা সবাই শান্ত হন এবং আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন।
রহমত: আপনি বলেন। আমরা সবাই মনোযোগ দিয়ে শোনবো।

(আবহ: বাজারের কোলাহল পুরোপুরি থেমে গেছে, সব নীরবতা)

ডাঃ নাবিলা: আপনারা দেখছেন, আপনাদের এলাকার রাসেল অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। কিন্তু কেন অসুস্থ হয়েছিল, এটা আপনারা জানেন?
রহমত: ভর্তি ছিল, এটা জানে। কিন্তু কেন ভর্তি হয়েছিল, কী হয়েছিল, এটা সবাই জানে না! আপনি বিষয়টা সবাইরে বুঝিয়ে বলেন।
ডাঃ নাবিলা: রাসেল কেমিক্যাল মিশ্রিত ফল খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল!

(আবহ: এলাকাবাসীর মধ্যে একটা গুঞ্জন)

ডাঃ নাবিলা: দিন দিন আমাদের মধ্যে লিভার ও কিডনিতে ক্যান্সারের মত মরণব্যাধি বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ হ’ল আমাদের খাদ্যের ভিতর মিশ্রিত থাকা বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ। রাসেল নিজের দেওয়া বিষ নিজেই খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। 

(আবহ: উপস্থিত জনতার মাঝে গুঞ্জন)

রহমত: সে নিজের ভুল স্বীকার করেছে এবং আমাদের শিখিয়েছে, লোভ কীভাবে মানুষের জীবন কেড়ে নেয়।
রাসেল: (মাইকের কাছে এসে নিচু স্বরে) আমি ফল তাজা রাখার জন্য এবং ফল পাকানোর জন্য বিভিন্ন প্রকার কেমিক্যাল ফলের গায়ে স্প্রে করতাম। নিজের অজান্তেই সেই ফল আমি খেয়ে ফেলি এবং গুরুতর অসুস্থ হয়ে যাই। আমি আর কোনদিন ফলের গায়ে কেমিক্যাল স্প্রে করব না। আপনারা দয়া করে আমাকে ভুল বুঝবেন না।
ডাঃ নাবিলা: (আবার মাইকে) এখন আপনাদের প্রতি আমার কিছু জরুরি পরামর্শ। ফল কেনার সময় মনে রাখবেন—

১. সব ফলই সবসময় চকচকে বা এক রঙের হয় না। প্রাকৃতিক ফলে দাগ থাকবেই, সেটিই আসল।
২. ফল কেনার পর খাওয়ার আগে অন্তত ২০ মিনিট পরিষ্কার পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। এতে রাসায়নিকের প্রভাব অনেকটাই কমে আসে।
৩. খুব বেশি ঊজ্জ্বল বা অস্বাভাবিক রঙের ফল দেখে প্রলুব্ধ হবেন না।

রহমত: (গম্ভীর গলায়) আর আমরা যারা ব্যবসায়ী, তারা মনে রাখি—মানুষের জীবন নিয়ে ব্যবসা করা মানে নিজের আত্মার সাথে বেইমানি করা। আসুন, সবাই মিলে বিষমুক্ত একটি বাজার গড়ে তুলি।

ডাঃ নাবিলা: আমাদের সচেতনতাই আমাদের পরিবার পরিজনের সুস্থ রাখার গ্যারান্টি। আজ আমরা সবাই মিলে শপথ করি—আমরা দেখে শুনে বিষমুক্ত ফল কিনব এবং খাব।

(আবহ: উপস্থিত জনতার সম্মিলিত করতালি ও স্লোগান: “বিষমুক্ত ফল খাই, সুস্থ দেহ বজায় রাখি!”)

ডাঃ নাবিলা: ধন্যবাদ সবাইকে। সুস্থ থাকুন, সচেতন থাকুন।


লেখক পরিচিতি : আবুল হাসান তুহিন
গীতিকার - নাট্যকার, বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up