লেখক : সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত
স্বামীর চলে যাওয়াটা ইভা শান্তভাবেই মেনে নিয়েছিলেন। বউরা মুখ ভেটকে বলেছিল, “বুড়ি এবার কত নাটক করবে।” সেসব কিছুই হয়নি।
শ্মশানে যাবেন শুনে বউরা – বড়বউ, মেজবউ, সেজ আর রাঙা, সবাই চোখ চাওয়াচাওয়ি করছিল। দেবু বারণও করেছিল। “মা তুমি যাবে কেন। যা কাজ তো আমরা করব।” ইভা শোনেননি। নরম নিরীহ মানুষটার এ হেন জেদ দেখে কেউ ঘাঁটায়নি আর। এ’সময়ে মানুষ একটা শক্তি পেয়ে যায় কীভাবে যেন।
শ্মশানে চুপচাপ অলকের মাথার পাশে বসে রইলেন। মাঝে মাঝে পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। কেউ কাঁদতে দেখেনি। শুধু দিয়া দেখেছিল, ঠামা বিড়বিড় করে কী যেন বলছে আর হাসছে। দিয়া মায়ের চামচা। অমনি মেজগিন্নিকে রিপোর্ট। বউরা কড়া চোখে তাকিয়েও আর কিছু দেখেনি – হতাশ হয়েছিল বোধহয়। একটু পাগলামি করলে বরং বৃদ্ধাশ্রমে ঠেলে দেওয়া যেত। সেজর ভাই প্রমোট করবে বলে সেই গেলবার একটা আওয়াজ উঠেছিল। বড়বউ ফিকির করে করতে দেয়নি সন্দেহে। সেজবউ কবি, কিন্তু সেজদেওর ভয়ঙ্কর কুচুটে। শালা-জামাইবাবু মিলে কোথায় কী লুটবে কে জানে ভেবেছিল।
ইভা অলকের করা কুদ্ঘাটের একতলা বাড়িতেই থাকতেন শেষ অবধি। বড়ছেলে আর বড়বউ – প্রসূন আর নীলা বিয়ের পরেই আলাদা হল। ইভারা শান্তমনেই মেনে নিলেন। বাড়িতে জায়গা কম। মেজ দেবু আর বউ সুমনা ভাড়া বাড়ি করল শ্বশুরবাড়ির পাশেই। সেজ পিনাকী অবশ্য বিয়ের পর দশমাস ছিল। বাচ্চা হওয়ার জন্য সেই যে জয়িতা বাপের বাড়ি গেল, আর ফিরল না। থেকে গেল জয়িতার দাদার করা একটা ফ্ল্যাটে। সেটা কেনার কথাও চলছে এখন। জয়িতা একটু আদুরে। বাপ-মা-ভাই ছেড়ে আসতে তার মন চায় না। সে ফ্ল্যাটেই আবৃত্তির ক্লাস খুলে সে এখন মিনি সেলিব্রিটি।
হবিষ্যিতে ইভার গ্যাসের ব্যথা বাড়তে পাড়ার ডাক্তার এল। সে সুযোগেই নীলা বলল, “এবার বাবার ঘর পরিষ্কার করা হোক। মা’কে জাপিজ পয়েণ্ট ফাইভ দিয়েছে। টেনে ঘুমোবে।” ইভা কিছুতেই অলকের ঘর পরিষ্কার করতে দিচ্ছিলেন না। খালি “না থাক… না থাক…”
শ্রাদ্ধ বলে সবাই এখন এক ছাদের তলায় কুদ্ঘাটে। অলক সারাজীবন বই পড়েছেন এবং কিনেছেন। একতলার চারটে ঘরেই উপচে পড়ছে বই। ইভা চিরকালই শান্ত, ধীর স্থির। দাপুটে নন। ব্যাক্তিত্ব নেই বিশেষ। তাঁর দিবানিদ্রার মধ্যেই ঘর পরিষ্কার হয়ে গেল। সেজবউ জয়িতার আপত্তি ছিল, ধোপে টিকল না।
ঘুম থেকে উঠে কিন্তু ইভা চেঁচামেচি জুড়লেন। সে হুলুস্থুলু। যা মুখে আসে তাই বলছেন। বউরা অভিমানের ভান করল। ছেলেরা ধমক দিল। কিছুতেই মানছেন না। “বই নিয়ে এস।” শেষে প্রেশার বাড়িয়ে আবার অসুস্থ। আবার ডাক্তার। কিন্তু বই তো কাগজওয়ালা নিয়ে চলে গেছে। তবে? শেষমেশ ইভা শান্ত হলেন। বললেন, “ওঁর টাইপরাইটার আর ওঁর ডায়েরি খাতা যদি বেচা হয়, আমি এই বাড়ি মিশনকে দিয়ে সেখানেই চলে যাব”। এতে হাসাহাসি বিদ্রূপ খানিক হল বটে, কিন্তু কিছুটা শঙ্কাতেও ওসব জিনিসে আর কেউ হাত দিল না। বুড়ি যদি সত্যিই তা করে বসে, তাহলে চিত্তির হবে। মেট্রোর ধারে বাড়ি, প্রমোট হতেই পারে।
শ্রাদ্ধ মিটে গেছে। সবাই ফিরে গেছে। ইভা রাতে টাইপরাইটারের উপর হাত বোলাচ্ছেন। রাত বারোটা। মমতা টিভি দেখছিল। এই ঘুমলো। বছর পঞ্চাশের মমতাকে রাখা হয়েছে সবসময়ের জন্য। আগেও মমতা এ বাড়িতে কাজ করেছে। ইভা বললেন, “নাহ, আমার ডাকে উনি আসবেন না। সে তোমার ক্ষমতা ছিল।”
অলকের জবাব আসে না। তবু প্রতি রাতে ইভা অলকের সাথে কথা বলেন, ডাকেন, দেখা দিতে বলেন। ইভা একটু ভীতু হলেও অলককে তাঁর ভয় নেই। শুধু অলক কেন, অলক যাদের ডাকতেন, তাদের প্রতিও ভয় কেটে গিয়েছিল।
অলক কেরানী হিসেবে সরকারী চাকরিতে ঢুকে শেষে অফিসার হয়েছিলেন। সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবন। কিন্তু অলক মধ্যবিত্তের বারফট্টাই, সুযোগসন্ধানীতা ও কুচুটেপানার ঊর্ধ্বে ছিলেন। বই তাঁর জীবন পাল্টে দিয়েছিল। আর দিয়েছিল অরুণাভ। পে অ্যাণ্ড অ্যাকাউণ্টসে অরুণাভ তাঁর কলিগ ছিল। অরুণাভর বাড়িতে একদিন গিয়ে দেখেন অরুণাভ টেবিলে বসে লিখছে আর কাঁদছে। অলক চেপে ধরেছিলেন। অবশেষে জানা যায়, এ হ’ল প্ল্যানচেট। অরুণাভ ডাকে তাঁর মেয়েকে। প্রেম করে বিয়ে, শ্বশুরবাড়িতে মৃত্যু। আত্মহত্যা নয়। চূড়ান্ত অপমান ও নেগলেক্ট। প্রায় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু হয় টাইফয়েডে। সেই শুরু। দুই বন্ধু মিলে রোজ রবিবার। তখনও কেউ রিটায়ার করেননি। একদিন অরুণাভর স্ত্রী যাচ্ছেতাই অপমান করে তাড়িয়ে দিলেন অলককে। তিনি ভয় পেয়েছেন। ততদিনে শুধু মেয়ে নয়, দুই বন্ধু মিলে বহুজনের সাথে কথা বলেছেন, যারা এই জগত চিরতরে ছেড়ে চলে গেছেন। অলক আর যাননি ও বাড়ি। রিটায়ারমেণ্টের আগেই স্ট্রোকে অরুণাভ চলে গেলেন। অলক ভয়ে শ্মশানেও যাননি, নিজেও ভেবেছিলেন এসব ছেড়ে দেবেন। পলতার এক খোঁড়া সাধু তাকে ভয় দেখিয়ে বলেছিলেন “আপনার চারপাশে খুব ভিড় দেখছি। এরা ভাল নয়। তক্কে তক্কে আছে…”
কিন্তু নেশা হয়ে গেছে ততদিনে। অলক একদিন আবিষ্কার করলেন তিনি নিজেই ডাকতে পারেন। ওরা সাড়া দেয়। অলক ইভাকে বলেছিলেন পাশে থাকতে। ইভা ভয় পেলেও রাজি হয়েছিলেন। এরপরই সস্তায় টাইপরাইটার কেনা হয়। বুড়ো সরকার উকিল মরতে তার বউ বেচে দিল।
টাইপরাইটারটা বেশ পুরনো। সে আমলের রেমিংটন। অলক যত্ন নিতেন বলে দিব্যি চলত। অলকের গোছানো স্বভাব ছিল। বাড়িতে উপচে পড়া বই, কিন্তু রীতিমত ক্যাটালগ করে সাজানো থাকত। ইভা দেখল, এই ক’দিনে একটু ধুলো পড়েছে। কেউ দেখার নেই। সবকটাই বউয়ের গোলাম। ইভা ঝাড়ন নিয়ে খানিক চেষ্টা করলেন। তারপর কাগজ ঢোকালেন। বৃথাই এসব করা। জানেন, তাঁর ডাকে কেউ সাড়া দেবে না। ও অলক-অরুণাভরই ক্ষমতা ছিল।
কাগজ দেখে ইভার মনে পড়ল। তড়িঘড়ি উঠে ডেস্ক ঘাঁটলেন। আছে, অলকের সব নোট। আত্মা আসত। কথা বলত। অলক টাইপ করতেন। তারপর শেষ হ’লে অবসরমত নতুন কাগজে আবার পুরোটা লিখতেন। প্রশ্ন আর উত্তর ফর্ম্যাটে। সেইটা? সেইটা আছে তো? ইভার মনে পড়ল তিনি আলাদা করে লুকিয়ে রেখেছিলেন। কোথায় যেন? সাম্প্রতিক ঘটনায় একটু থতিয়ে গেছেন বটে, কিন্তু তাহলেও তাঁর মনে পরে গেল। ওই যে। ওপরের ড্রয়ারের ভিতর, চাবি দেওয়া। এ জিনিস যার তার হাতে পড়লে সর্বনাশ। চকিতে চাবি দিয়ে খুললেন। এই তো। কাগজের তাড়া। একটা ব্রাউন এনভেলপের মধ্যে রেখে দিয়েছিলেন তিনি, অলকের মৃত্যুর দিন। তখন আর অলকের খোঁজ নেবার উপায় নেই। খাম থেকে তাড়াটা বার করলেন ইভা। কী ভেবে খানিক চুপ রইলেন। তারপর দোনোমনা হয়েও খুলে পড়তে লাগলেন।
সেদিন মনে হয় ভাইফোঁটা ছিল। অলক দুর্গানগর গিয়েছিলেন পিসতুতো দিদির ফোঁটা নিতে। খাওয়াদাওয়া সেরে একেবারে রাতে ফিরবেন। ইভার ফোঁটা নেওয়ার আর বিশেষ কেউ নেই। এক-দু’জন যে আছে, তাদের সাথে বিশেষ যোগাযোগ নেই। ফলে সেদিন ফাঁকা পেয়ে একটু ঘর গোছগাছ করছিলেন। অলকের ডেস্কও পরিষ্কার করেন। ড্রয়ারে হাত ঢোকাতে খামটা পান। এমনিতে অলক ফ্ল্যাট ফাইল কিনে তার মধ্যে টাইপ করা কাগজ রাখেন। কার সাথে কী কথা হয়েছে তার ফাইনাল ড্রাফ্ট। খামে সেই কথোপকথনের টাইপ করা কাগজ দেখে ইভা কৌতূহলী হন। শেষমেশ খুলে ফেলেন।
এত আত্মার আনাগোনা দেখে সারাজীবনে চমকাননি ইভা। কিন্তু এই কাগজের তাড়া তাঁকে টলিয়ে দিল। এ-ফোর কাগজের উপরের দিকে লেখা আগত ব্যক্তির নাম। ইভা পড়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। এতদিন পরে এ নাম? ইভা অনুভব করেছিলেন তাঁর শরীর কাঁপছে। কোনও মতে পড়েছিলেন। আর পড়ার পর দুনিয়া পাল্টে গেল একেবারে ইভার।
অলক অনেক রাত অবধি বই পড়েন বলে ইভা অন্য ঘরে ঘুমান। নিজের ঘরে এসে টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে ইভা পড়লেন আবার। এক-দু’বার নয়। বেশ কয়েকবার। তারপর দৌড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সামনে জেরক্সের দোকানে এসে এক কপি জেরক্স করলেন। খামের জিনিস এরপর খামে ঢুকে গেল। অলক কিছুই টের পাবেন না।
রাতে ফের পড়ছেন ইভা। অলক এসে অ্যাণ্টাসিড খেয়ে শুয়ে পড়েছেন। ইভা পড়ছেন জেরক্স করা কাগজ। চন্দনের নাম কতদিন বাদে দেখছেন, প্রায় পঞ্চাশ বছর তো বটেই। সেই চন্দন আবার এসে লিখেছে? অলক ডেকেছিল? কেন জানায়নি ইভাকে? অপরাধবোধ? চন্দন লিখছে, “…তুই বেইমান…তুই আমায় ধরিয়ে দিলি…”
অলক বলছে, “কি করব… প্রাণে বাঁচতে…তোরা তো সব জানিস…মানুষ খুব দুর্বল…”
চন্দন বলছে, “…পুলিশ আমায় পিটিয়ে মেরে ফেলেছিল…কেউ দেহও পায়নি…”
অলক লিখছে, “আমায় ক্ষমা কর…”
“তোকে ক’জন ক্ষমা করবে? তুই বাচ্চুদাকে ধরিয়ে দিলি… বাচ্চুদা শেল্টারে ছিল…”
“জানি… একদিন আমি, একদিন তুই, একদিন ইভা খাবার নিয়ে আসত… ক্রিস্টোফার রোড”
“আর ক’টাদিন গেলেই বাচ্চুদা বেঙ্গল থেকে বেরিয়ে যেত… প্ল্যান সব ঠিক ছিল…”
“জানি রে… ও কল্যাণী হয়ে বাংলাদেশ ঢুকে যেত… ওদিকে সব তৈরি ছিল…”
“তুই কেন করলি?”
“চাকরি… জানিসই তো… নৃপেনমামা পুলিশে ছিল… সেই টোপ দিল… বলল লিস্ট থেকে আমার নাম বাদ দিয়ে দেবে… শুধু পুলিশ নয়, অন্য পার্টির গুণ্ডারাও তখন আমায় খুঁজছে…আর সরকারী চাকরি…”
“জানোয়ার, বেইমান…তুই ইভার জন্যও করেছিস…”
“জানোয়ার…” ইভাও চেঁচিয়ে উঠেছিল। অলক শুনতে পাননি। ভাইফোঁটার ভারী খাওয়াদাওয়ার পর গভীর ঘুমে তখন।
ইভা বেথুনে পড়তে পড়তেই আন্দোলনে এসেছিলেন। নিয়ে এসেছিল কল্যাণদা। ইভার দাদা সুবিমলের বন্ধু। ইভা ভালবেসে ফেলেছিল কল্যাণকে। তাদের বাড়িতে এলে সে দূর থেকে দেখত অপলক দৃষ্টিতে। কল্যাণদা আর দাদা তর্ক করত ছাদে। লুকিয়ে সিগারেট খেত। তখন যুক্তফ্রণ্ট সরকার এসে কংগ্রেসকে গদি থেকে সরিয়েছে। অজয় মুখার্জী মুখ্যমন্ত্রী। সারা রাজ্যে এইবার আর কী কী হবে ভাব, আর তার আড়ালে বিরাট আশার ধুকপুকুনি। এর মধ্যে উত্তরবঙ্গে পরপর কয়েকটি জায়গায় চাষিদের দল সঙ্ঘবদ্ধভাবে কয়েকটি জমি জোতদারের হাত থেকে দখল করে বসল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যোতি বসুর হাতে পুলিশ দফতর। কমিউনিস্ট পার্টি চিরকালই সহানুভূতিশীল কৃষকদের প্রতি। কিন্তু মুশকিল হল এখন বামপন্থীরা জোটে হলেও ক্ষমতায়। এভাবে জোর করে জমি দখল তো প্রশ্রয় দেয়া যায় না সরকারের পক্ষে। পুলিশ প্রতিরোধ শুরু করল। একদিন ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটল। পুলিশের গুলিতে সাতজন মহিলা ও দু’জন শিশু মারা গেল। জ্বলে উঠল আগুন। তার আঁচ ছড়িয়ে পড়ল কলকাতায়। কল্যাণদা বলত, “পার্টি আমাদের বিট্রে করেছে। এর ফল পার্টিকে ভুগতে হবে। কৃষক মজদুরের সমব্যথী হয়ে এখন এইভাবে গুলি চালানো?”
দাদাও উত্তেজিত হত। ইভা মুড়ি-তেলেভাজা, কখনও রুটি-তরকারি দিতে এসে দাঁড়িয়ে পড়ত। তাকে কেউ খেয়াল করত না। কিংবা হয়ত করত।
একদিন ছাদে রাতে পুঁচকে রেডিও নিয়ে এল কল্যাণদা। চীন থেকে বুলেটিন শোনা গেল সেই প্রথম। নারীকণ্ঠ জানাল ভারতের বিক্ষুব্ধ কমিউনিস্ট গোষ্ঠী চীনের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে কর্মসূচী নিয়েছে। অস্ত্র আসবে। ততদিন কুড়ুল, দা, কাস্তে কেড়ে নেওয়া বন্দুক দিয়ে আন্দোলনকারীরা কাজ চালাবে…
সে এক দিন গিয়েছে। দেওয়ালে দেওয়ালে পোস্টার। উত্তেজনা। নেহরুর উত্তরসূরিরা তখন পুঁজিবাদের দালাল হিসেবে মার্কড হয়ে গেছে। নতুন ভারত গড়তে হবে। কাজ শুরু হবে এই বাংলা থেকে। সব প্ল্যান রেডি নাকি। এর মাঝেই ছাদে অন্ধকারে কল্যাণদা তাকে বলল, “আদর করতে দে… প্লিজ।” ইভার রাজি না হয়ে উপায় আছে? সে ফিসফিস করে বলেছিল “চলো, আমরা চলে যাই এখান থেকে।” কল্যাণদা নিয়ে গিয়েছিল। পালিয়ে সংসার করতে নয়। কলুটোলা স্ট্রিটের এক অন্ধকার ছাদের ঘরে। ইভা ভেবেছিল কল্যাণদা তার শরীর চায়। সে হয়ত রাজিও হয়ে যেত।
ইভা ফিরল মন্ত্রগুপ্তির শপথ নিয়ে। সেই প্রথম তার নকশাল মিটিংয়ে যোগদান। সেই প্রথম তার রাজর্ষি মিত্রকে দেখা। নকশালবাড়ির আগুন ছড়াতে কলকাতায় এসেছে।
অলক ওষুধ চেয়ে নিতেন, নিজে খেতেন না। “কই দাও” বললেই ইভা ওষুধ নিয়ে পড়ার টেবিলের পাশে চলে আসতেন। ইভার নিঃশব্দ অথচ সজাগ দৃষ্টি ছিল অলকের প্রতি। নিজেকে ইভার হাতেই ছেড়ে দিয়েছিলেন অলক।
প্রেশারের ওষুধটা ক’দিন দিলেন না ইভা। অলক একদিন বাথরুমে কোল্যাপ্স করলেন। বড় বিপদ হতে পারত। কিন্তু সেদিন দেবু ছিল। আওয়াজ হতেই দৌড়ে যায়। দরজা ভেঙে বাবাকে বার করে নার্সিংহোমে ছুটেছিল। ইভার তখন ভুল ভাঙে। এ সে কী করতে চেয়েছিল? নাহয় বাচ্চুদাকে সে ভালবেসে ফেলেছিল, নাহয় ক্রিস্টোফার রোডের বাড়ির সেই দোতলার কালকুঠুরিতে তারা বহুবার শরীরী হয়েছে। তবু অলক স্বামী তো। একসময়ের কমরেড যোদ্ধা। দু’জনেই পিস্তল চালিয়েছেন, বোমা ছুঁড়েছেন। একসাথে বোমা ছুঁড়তে ছুঁড়তে শীতের রাতে পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে গঙ্গায় ঝাঁপিয়েছেন। সেদিন ইভার বাঁচার কথা নয়। নিজেদেরই বোমার স্প্লিনটার ঢুকেছিল পায়ে। অলক বাঁচিয়েছিলেন। একহাতে জড়িয়ে ধরে ওই বিশাল গঙ্গায় যে সাঁতারটা কেটেছিলেন অলক, তা অতিমানুষই পারে। পাড়ে ওঠার সময় ইভা অচেতন ছিলেন। তারপর লুকিয়ে থাকা মফঃস্বলে। বাহাত্তরের মাঝামাঝি কলকাতায় ফিরে আরেকপ্রস্থ লুকিয়ে থাকা ট্যাংরাতে। অলকের দাদার চেনা বাড়ি। তখনই তাঁরা পরস্পরের কাছে আসেন। এক বাড়ির মধ্যে থাকলেও দেখা হত কম। তবু তার মধ্যেই…
অলক একদিন জানাল, “রাজর্ষি মিত্র থাকবে এখানে। স্টপ গ্যাপ। ওঁকে বাংলাদেশ পাচার করব। নইলে ধরা পড়লে এখানকার পুলিশ নয়ত গুণ্ডারা টুকরো করে কাটবে।”
কয়েকটা বাড়ি পরে একটা খাটাল। তার পাশেই একটা ছোট ঘরে একদিন থাকতে এলেন রাজর্ষি মিত্র ওরফে বাচ্চুদা। শরীর ভেঙে গিয়েছে। শীর্ণ রোগগ্রস্ত কঙ্কালপ্রায়। তবু চোখ দু’খানি…
অলক ফিরলেন নার্সিং হোম থেকে একদিন। শরীরের একদিক তখনও পুরোপুরি সাড় পায়নি। ইভা হাপুস নয়নে কাঁদলেন।
ইভাকে ভূতে পায়। ভূতে পেয়েছিল বলেই আগুপিছু না ভেবেই নকশাল আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তা কল্যাণদার জন্য না আদর্শের খাতিরে – তা ইভা আজও বুঝে উঠতে পারেননি। ভূতে পেয়েছিল বলেই হয়ত আশ্রয়দাতা এবং জীবনদাতা অলকের সাথে জড়িয়ে পড়েছিলেন। অলককে পছন্দ করতেন না ইভা আন্দোলনের প্রথম দিকটায়, কেমন ধূর্তগোছের লাগত। সবসময় ভাবছে, কথা বলে না, কেমন একটা চোর চোর ভাব। ইভার দিকে আড়ে আড়ে দেখত। কিন্তু নদীর বুকে ওই সাঁতার ইভাকে টলিয়ে দিয়েছিল। রাতে অন্ধকারে ওই ক্রিস্টোফার রোডের ছাতে অলকের নিষ্পেষণে চূর্ণ হতে হতে সাড়া দিতেন ইভাও।
কিন্তু রাজর্ষি মিত্র? বাচ্চুদা? সে চলে এলে হঠাৎ ইভা আর কী করতে পারে? ওই সফটটোন মখমলের মত ভয়েস, ওই মায়াবী যুক্তির জাদু, ওই মানবসভ্যতার প্রতি দায়বদ্ধতার আকুতি। ইভা ভাবলে শরীরে কাঁপুনি অনুভব করতেন। সে এখন কয়েক পা দূরে খাটালঘরের পাশে অসুস্থ শরীরে নিয়তির অপেক্ষায়। তাকে মরতে দেওয়া যায়?
ইভার রোজ খাবার দেওয়া নিয়ে আপত্তি তুলেছিল অলক। তারপর পালা করে সে আর চন্দন খাবার নিয়ে যেত। চন্দন তাদেরই সাথী, ভবানিপুরের কুণ্ডু লেনের ছেলে। অলক তাকেও নিয়ে এসে এখানে রেখেছিল। মাঝেমধ্যে অলক নিজেও খাবার নিয়ে যেত। কিন্তু সন্দেহ একবার ঢুকে গেলে মানুষ আর প্রকৃতিস্থ থাকে না। খড়ের বিছানায় ইভা আর রাজর্ষির সঙ্গম আড়াল থেকে চুপচাপ দেখছিল অলক। রাজর্ষি মিত্রের চোখ তখনও আগুন ওগরায়। সে ঠিক দেখতে পেয়েছিল চিনতে না পারলেও। চেঁচিয়ে ওঠে। অলক পালিয়ে গিয়েছিল, তারপর শান্ত মাথায় পরিকল্পনা করে নিয়েছিল। ইভার এখন তাই বদ্ধমূল ধারণা।
স্ট্রোক হয়ে নার্সিংহোম থেকে ফেরার পর ইভা পাশেই শুতেন অলকের। সকাল আটটা থেকে বারো ঘণ্টার জন্য নার্স রাখা হয়েছিল। রাতটা ইভা বলেছিলেন, তিনি নিজেই সামলাতে পারবেন। কিন্তু ভূত? ইভার মাথায় যে ভূত চাপে! ভূত আঙুল তুলে দেখায় আর ইভা ঝাঁপিয়ে পড়েন। নভেম্বরের শেষ রাতে ইভা অলককে নিয়ে পড়লেন আবার।
“শপথ নেওয়া হয়েছিল রেডবুক ছুঁয়ে। মাওএর ছবি সামনে রেখে। তোমাদেরও নিশ্চয়ই হয়েছিল।”
অলক তাকিয়েছিলেন ফ্যালফ্যাল করে শুধু। কথা তখনও জড়িয়ে যায়। ওষুধ খাওয়ানোর পর শোওয়ার তোড়জোড় চলছে। মমতা তখন কাজ সেরে রাতে বাড়ি ফিরে যায়।
“একটা শপথ ছিল কমরেডের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি। কী যেন শপথবাক্য, ভুলে গিয়েছি। গেলবার বইমেলায় বিজয়ার একটা বই বেরোল না আমাদের ওই সময়টা নিয়ে? তাতে পুরোটা ছিল…”
অলক তাকিয়ে রয়েছেন। স্পষ্টই সব বুঝতে পারছেন। বাক হারালেও চেতনা ঠিকই ছিল তাঁর।
“আরেকটা ছিল… এটা বাচ্চুদা যোগ করেছিল। প্রতিশোধ। সতীর্থের প্রতি অত্যাচার এবং মৃত্যু হ’লে মৃত্যুর প্রতিশোধ…”
ভূত তখন পুরো ঘাড়ে চেপে গিয়েছে ইভার। জ্বলন্ত চোখে তিনি পড়ছেন। হাতে সেই জেরক্স। চন্দন আর অলকের কথোপকথন। অলক শুনছেন। তাঁর চোখ বিস্ফারিত হতে শুরু করেছে। শেষ হ’ল যখন, তখন অলকের চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। ইভা খেয়াল করেও করলেন না। তাঁর মাথায় ভূত।
“…বুঝলে, এমন মেরেছিল, শরীরের প্রত্যেকটা হাড় ভেঙে গিয়েছিল। বিজয়া কোথা থেকে খবর পেয়েছে কে জানে, ওর সাথে একবার দেখা করা দরকার। লিখেছে, কে একজন অফিসার নাকি এক একটা হাড়ের নাম বলেছিল আর ভাঙছিল…”
অলক নির্বাক। মুখ দিয়ে আর আওয়াজ করছেন না।
“তুমি ন’টা নাগাদ বললে – সর্বনাশ হয়েছে ইভা। তুমি পালাও। আমি বাচ্চুদা আর চন্দনকে নিয়ে অন্য জায়গায় যাচ্ছি। পুলিশ তোমার খোঁজ পেয়েছে। সেই দারোয়ান ঝাওর না ঝাপার, তাকে দিয়ে ট্যাক্সি করে আমায় পাঠালে বৈষ্ণবঘাটায় তোমার সেই পিসির বাড়ি। আর তারপর…”
অলক চোখ বুজে ফেলেছেন।
“…তারপর তোমার খবর পেয়ে পুলিশ হাতেনাতে ধরল চন্দন আর বাচ্চুদাকে… সব তোমার সাজানো নাটক। পুলিশ আমার কোন খোঁজ পায়নি। আমার কেন আমাদের কারও খোঁজই পায়নি কখনই। তুমি বাচ্চুদা আর চন্দনকে ধরিয়ে দিলে… আর এতদিন বাদে…”
অলক খাট থেকে পড়লেন মেঝেতে। ইভা তখনও বলে চলেছেন অলকের দিকে তাকিয়ে।
“বেশ করেছি শুয়েছি। বাঘিনীর বাঘ লাগে। তোমার মত শেয়াল কুকুর নয়। ধূর্ত বদমাশ একটা তুমি। আমার…”
মমতার নাক ডাকছে। বেশ একটা ঘুরুত ফুড়ুৎ ছন্দ। ইভা টাইপে হাত রেখে বসে আছেন।
“কি হল। আসবে না? আসবে না তো? রাগ? কেন? তোমাকে ভালবাসিনি কখনও? বলতে পারবে? সত্যি পারবে? হ্যাঁ? ক্ষমা নেই আমার? কি গো?”
কেউ আসে না। ইভা টেবিলে একসময় ঘুমিয়ে পড়েন।
লেখক পরিচিতি : সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত
পেশায় উকিল নেশায় পাঠক। চর্যা , কল্পবিশ্ব ইত্যাদিতে ছোট গল্প প্রকাশিত।

