লেখক : ইয়াসেফ মোহাঃ রিয়ান
বেশ কিছু মাস আগে মাথায় একটি অনুগল্প জন্ম নিচ্ছিল। প্লটটা ছিল এ’রকম — ছোট্ট এক স্টেশন, নোয়াদার ঢাল, ডাউন লোকাল ট্রেন, বনপাশে নেমে মাটির ভাঁড়ের চা, গরম গরম চপ, তারপর খানা জংশন পেরোতেই চলন্ত ট্রেনে এক অন্ধ ভিখিরি, সাথে ছেঁড়া ফ্রক-পরা তার অর্ধ-অন্ধ মেয়ে, একটু পরে কাঁচা নারকেলের লম্বা টুকরোসহ ঝালমুড়ি (যদিও এখন “ঝালমুড়ি” আর স্রেফ ঝালমুড়ি নেই; এই ভোটের সময় সেটা পেটেণ্টেড হয়ে গিয়েছে, হকারের গণ্ডি ছাড়িয়ে “ঝালমুড়ি” এখন ব্র্যাণ্ড)।
চলন্ত ট্রেনের জানালার ওপারে দৃষ্টিনিবদ্ধ এক কিশোরের “স্বপ্ন” কিনে নেওয়ার অদ্ভুত দিবাস্বপ্ন। অন্যদিকে এক কামরা থেকে আরেক কামরায় ব্যস্ত এক ঝাঁক গৃহত্যাজ্য তৃতীয় লিঙ্গদের সই-সখা পরিবার। কানে ইয়ারফোন গুঁজে থাকা সদ্য তরুণের পাশে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধ বাউলের একতারায় একটানা গান।
বর্ধমান জংশনে নেমে সারি সারি স্থায়ী-অস্থায়ী স্টেশন-লাগোয়া ঘুগনির দোকান, ফলের ঠেলাগাড়ি, তিরিশ টাকার মাছভাতের হোটেল, লাল-চা আর দুধ-চায়ের সারিবদ্ধ স্টল, পুরনো কাঠের ছোট্ট টেবিলে সাজানো লটারির টিকিট, ছাতুর দোকান। এসব পেরিয়ে আমার গল্পের চরিত্ররা কোথায় যেন যাবে, কী যেন করবে— সে সব এখনও জন্ম নেয়নি। তারা সবেমাত্র জড়ো হয়েছে নোয়াদার ঢালে, লোকাল ট্রেনে, বনপাশের প্ল্যাটফর্মে, আর স্টেশন-লাগোয়া সেই অস্থায়ী, অপরিষ্কার দোকানগুলোর আশেপাশে।
কিন্তু হঠাৎ করেই আমার চরিত্ররা যেন অস্থির হয়ে উঠল। তারা ছোটাছুটি করতে লাগল, নিভে নিভে যেতে লাগল, আবছা হয়ে মিলিয়ে যেতে লাগল! আমি আর তাদের ধরে রাখতে গল্পের বুনোটে! এ কী! প্লটগুলো একটু একটু করে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে কেন ? বুলডোজার নামের এক নির্মম দানব স্টেশন আর ট্রেন বাদে গল্পের বাকি সব দৃশ্যপটগুলো গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্যও সে ভাবল না— কত নিষ্ঠুরভাবে সে ভেঙে দিচ্ছে একটি অসমাপ্ত গল্পের পটভূমি?
কিছু মাস পরে ট্রেনযাত্রীদের চলাচলের সুবিধা বেড়েছে অনেক। স্টেশন এখন ঝাঁ ঝকঝকে, ভিতরে-বাইরে পরিপাটি। উন্নয়নের আলোয় সবকিছু উজ্জ্বল।
কিন্তু আজও আমার সেই অপূর্ণ গল্পের চরিত্ররা অশরীরী আত্মার মত ট্রেনে, স্টেশনে, আর স্টেশনচত্বরে ঘুরে বেড়ায়। তারা মুক্তি চায়। তারা তাদের হারিয়ে যাওয়া গল্পটিকে শেষ করার আকুতি করে বার বার। কিন্তু আমি যে নিরুপায়!
লেখক পরিচিতি : ইয়াসেফ মোহাঃ রিয়ান
ইমাসেফ মোহাঃ রিয়ান একজন সাহিত্যনুরাগী। পেশাগতভাবে তিনি একজন স্থপতি এবং বর্তমানে চীনের Xi’an Jiaotong–Liverpool University-এর স্থাপত্য বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।

