দূরে থেকেও কাছে

লেখক : হৈমন্তী চৌধুরী

প্রজ্জ্বলন প্রকাশনীর প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে শহরের ব্যস্ততম অডিটোরিয়ামে আজ তিল ধারণের ঠাঁই নেই। দামী সুগন্ধি, জাঁকজমক আলো আর হাজারও অভিজাত মানুষের মাঝখানে যিনি বসে আছেন, সেই মানুষটি যেন একেবারে সাদামাটা। এত মানুষের মধ্যে থেকেও যেন সম্পূর্ণ একা আর তিনি হ’লেন বর্তমানে পাঠকদের বেশ জনপ্রিয় লেখক, যার নাম অরবিন্দ কর্মকার। তার লেখা বই পড়েনি এমন মানুষ খুবই কম। তার ভাষাশৈলীর নৈপুণ্যের কথা সবার মুখে মুখে। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব কমই কথা বলেন, তাই বিবাহিত নাকি অবিবাহিত – সে সম্পর্কে সবার ধারণা নেই বললেই চলে। ইতিমধ্যেই সাংবাদিকরা প্রশ্ন করা শুরু করে দিয়েছে। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ বাল্ব বারবার জ্বলে উঠছে তার সামনে। এক তরুণ সাংবাদিক মাইক্রোফোন এগিয়ে দিয়ে বলল, “স্যার, আপনার চরিত্রগুলো কি বাস্তব জীবন থেকে নেওয়া? নাকি মস্তিষ্কের কল্পনা?”
অরবিন্দ হালকা হেসে উত্তর দিল, “আমাদের সবার জীবনই একেকটা গল্প, একেকটা চলন্ত উপন্যাস। সেটা হোক আমার বা আপনাদের। কারও গল্প শুরু হয় হাসিতে তো কেউ বেঁচে থাকে হাহাকারে, কারও গল্প বিশাল রাজপ্রাসাদ এর তো কারও গল্প শুরু হয় ভেজা মাটির গন্ধে। একজন লেখক হিসেবে আমি চেষ্টা করি সেসব চেনা চরিত্রগুলোকে শব্দে বন্দি করার। তাই আমার লেখায় কল্পনা আর বাস্তবের মধ্যে কোন বিভেদ নেই।”
আরেকজন জিজ্ঞেস করল, “কখনও লেখক ছাড়া অন্য কিছু হতে মন চেয়েছিল?”
অরবিন্দ উত্তর দিলেন, “ছোটবেলার স্বপ্নই ছিল লেখক হওয়া। কিন্তু কিশোর বয়সে যখন প্রথম খাতায় কলম ধরি, বাবা সেটা পছন্দ করেননি। তাঁর কাছে এসব লেখালেখি ছিল সময় অপচয়। তাঁর ইচ্ছে ছিল এক যেন হিসাবরক্ষক হই। তবে বাবার সাহায্য না পেলেও মা প্রচুর উৎসাহ দিয়েছিলেন। তিনি আমাকে বলতেন, “তুই লিখে যা অরি, একদিন তোর শব্দেরা তোর পরিচয় হবে।” তাঁর উৎসাহ আর সাহসের কারণেই আজ আমি এখানে। আজ যদিও তিনি নেই। তবে তাঁর উৎসাহ, তার অনুপ্রেরণা আজও আমার সাথে আছে।”
সবাই করতালি দিয়ে উঠল। হঠাৎ এক সাংবাদিকের প্রশ্নে কিছু বিচলিত হয়েও হ’ল না অরবিন্দ। “আপনার সব গল্পেই এক অস্পৃশ্য বিরহ থাকে। কখনও কি কাউকে জীবনের সাথে জড়িয়েছেন? বা কেউ কি আছে আপনার কাছের মানুষ?”
এই প্রশ্নের উত্তরে কিছু না বলে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিল অরবিন্দ। “আজ প্রকাশনীর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। আমার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করে অনুষ্ঠানের গাম্ভীর্য নষ্ট না করাই ভাল। ব্যক্তিগত জীবনকে একান্তই নিজের রাখতে ভালবাসেন একজন শিল্পী। আশাকরি বুঝতে পারছেন।”
উপস্থিত সবাই বুঝতে পারল, তিনি এই দেওয়াল ভাঙতে চাইছেন না। তাই আয়োজকরা সাংবাদিকদের বসতে বলে মূল অনুষ্ঠান শুরু করে দিলেন।

অনুষ্ঠান শেষ হতে অনেক রাত হ’ল। অরবিন্দ যখন গেট দিয়ে বাড়িতে ঢুকছিলেন, চারপাশ নিস্তব্ধ। তার পদাঘাতের শব্দও যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ক্লান্তি ভরা শরীরে ঘরে ঢুকে আলো না জ্বালিয়ে রকিং চেয়ারে বসল সে। অন্ধকারেরও এক আলাদা ভাষা আছে, যা খুব ভাল করে বছরের পর বছর রপ্ত করেছে অরবিন্দ। আর এই অন্ধকারই যে তাকে বড় তৃপ্তি দেয় আজকাল।
হঠাৎ এক পরিচিত নারীকণ্ঠ তার কানে এল। “বলছি, এভাবেই থাকবে বুঝি? সেই একগুঁয়ের মত। মাথার চুলগুলো অগোছালো, মুখভর্তি দাড়ি, পোশাকের বালাই নেই। এই অরবিন্দকে বুঝি আমি ভালবেসেছিলাম?”
চোখ মেলতে ইচ্ছে করল না অরবিন্দের। সেভাবেই বলল, “তোমার ক্লান্তি আসে না প্রণয়া, প্রতিদিন এভাবে এসে আমার ভুল ধরিয়ে দিতে? নাকি এসব আমার মনেরই ভুল? তুমি মায়া নাকি ভ্রম, প্রণয়া?”
“ক্লান্তি হবে কেন? তুমি নিজের খেয়াল রাখো না বলেই আমায় বারবার আসতে হয়। তাছাড়া মনকেই জিজ্ঞেস করো, আমি মনের ভুল কি না! আমার প্রতি তোমার অনেক অভিমান, তাই না অরি? তাইতো এভাবে নিজেকে নিঃশেষ করে দিচ্ছ।” গলার স্বরটা যেন কান ঘেঁষে গেল অরবিন্দর।
অরবিন্দ মলিন হেসে বলল, “অভিমান করার অবকাশ রেখেছ কি প্রণয়া? যে প্রণয়ের সূচনা করেছিলে, তা পূরণ হওয়ার আগেই আমাকে একা রেখেই চলে গেলে। এখন এই অপূর্ণ প্রণয়ই তো আমার চলার পাথেয়।”
নারীকণ্ঠের হাসির ঝংকার শোনা গেল। অরিন্দম ব্যাকুল কণ্ঠে বলল, “হেসো না প্রণয়া। এ হাসির ঝংকার আমার হৃদয়ে ঝড় তুলে দেয়। মনে হয় সবটাই বাস্তব। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝি, আমি এক অলীক কুহকের পেছনে ছুটছি।”
অদৃশ্য প্রণয়া এবার শান্ত স্বরে বলল, “আর কতদিন এভাবে একা থাকবে অরি? কাউকে তো এবার জড়াও নিজের সাথে। এভাবে কি জীবন চলে? তোমায় সুখী দেখলে তবেই আমার মুক্তি।”
“এটা বলা যতটা সহজ, করা কি ততটাই সহজ প্রণয়া? আমার পৃথিবীটা ছিল তোমাকে ঘিরে। বাবা-মার পর একমাত্র কাছের মানুষ বলতে তুমিই তো ছিলে প্রণয়া। এখন আমার আর কাউকে প্রয়োজন নেই। একাকিত্বের এ সংসারে আমার বেশ কেটে যাচ্ছে।”
অদৃশ্য প্রণয়া আবার বলল, “সবারই তোমার জীবন সম্পর্কে এত কৌতূহল। অথচ তুমি যে থেমেই আছ, এটা ক’জন জানে?”
“ইচ্ছা নেই তো জানানোর। আমার পৃথিবী আমার কাছে বেশ সুন্দর প্রণয়া। আমি, তুমি, আর অন্ধকার। আলো যে অসহ্য লাগে আজকাল।”
“তবে কি আমাকে মুক্তি দিতে চাও না তুমি?”
অরবিন্দের কিছু বলার আগেই হঠাৎ ফোন বেজে উঠল তার। ভ্রূ কুঁচকে কল রিসিভ করল সে, প্রকাশকের ফোন। তিনি জানালেন, আগামী সপ্তাহে অরবিন্দের লেখা বই “দূরে থেকেও কাছে” মেলায় প্রকাশিত হবে। তাকে সেখানে উপস্থিত থাকতেই হবে। ফোন রেখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে ধ্রুবতারার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল আজ থেকে ছ’বছর আগের কথা –

তখন অরবিন্দ আর প্রীতির বিয়ের ২ বছর পূর্ণ হ’ল। প্রীতিকে অরবিন্দ ভালবেসে প্রণয়া ডাকে। তাদের পরিবারের পছন্দেই বিয়ে হয়, কিন্তু দেখে মনে হবে তাদের ভালবাসার বিয়ে। অরবিন্দ তখন নামকরা লেখক হয়নি, একটা ছোট প্রকাশনীতে প্রুফ দেখার কাজ করত। বিবাহবার্ষিকীতে প্রণয়াকে একটি ছোট্ট ডায়েরি দিয়েছিল অরবিন্দ। অথচ প্রণয়া যে কি খুশি হয়েছিল! আর অরবিন্দও অবাক হয়ে দেখছিল তাকে।

সব ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু ঐ যে বলে, সুখের সময় শরতের মেঘের মত ক্ষণস্থায়ী। হঠাৎ একদিন প্রীতির প্রচণ্ড জ্বর হয়। জ্বরের মাত্ৰা এক সপ্তাহেও কমে না। শরীর ফ্যাকাসে হতে শুরু করল। শহরের বড় ডাক্তার এসে পরীক্ষা করার পর জানা গেল, প্রীতি এক স্নায়বিক ভাইরাসে আক্রান্ত, যার চিকিৎসা এ দেশে বিরল। উন্নত চিকিৎসার জন্যে দরকার প্রচুর অর্থ, যা অরবিন্দের কাছে তখন আকাশ কুসুম কল্পনা। ভয় জেঁকে ধরল অরবিন্দের, প্রীতিকে হারানোর। দেখতে দেখতে প্রীতির শরীর আরও দুর্বল হতে লাগল। অরবিন্দ প্রীতির কাছেই সারাক্ষণ থাকত।
এক সন্ধ্যায় প্রীতি ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, “অরি, এ’ভাবে গোমড়ামুখ করে বসে আছ কেন? কথা বলো আমার সাথে!”
“কী কথা বলব প্রণয়া? এ আমার কোন পরীক্ষা নিচ্ছেন ঈশ্বর! এমন রোগ দিলেন, যার কোন চিকিৎসাই নেই। আমি শব্দের জাদুকর, অথচ তোমার কষ্ট লাঘবের জন্যে কোন শব্দই নেই আমার কাছে। কি করব আমি!”
প্রীতি ম্লান হাসল। সে নিজেও জানে, বেশিদিন আর হয়ত নেই। অরবিন্দকে সাহস জোগাতে বলল, “তুমি চিন্তা করছ কেন বলো তো? আমি তো এখানেই আছি তোমার পাশে। আমার চিন্তায় তোমার শরীর তো ভেঙে পড়েছে একদম। দেখি খেয়ে নাও কিছু। এভাবে নিজে অসুস্থ হয়ে পড়লে আমায় দেখবে কে?”
সে রাতই ছিল তাদের শেষ স্বাভাবিক আলাপের রাত। সকালে অরবিন্দ যখন প্রীতিকে ঘুম থেকে ডাকতে যায়, তখন দেখে তার প্রণয়া আর নেই। তাকে একলা ফেলে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিয়েছে। অরবিন্দ চিৎকার করে কাঁদতে চেয়েও কাঁদতে পারেনি সেদিন। তার সব কষ্ট যেন বুকে জমা হয়ে থাকল প্রীতির নামে অভিযোগ হয়ে।

কিন্তু বিস্ময়করভাবে, প্রীতি মারা যাওয়ার কিছুদিন পর থেকেই অরবিন্দ তার উপস্থিতি অনুভব করতে শুরু করে। বিশেষ করে রাতের নির্জনতায় যখন সে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াত, মনে হত তার প্রণয়া তার পাশেই আছে। এক অমাবস্যার রাতে প্রীতির ছায়া অনুভব করে অরবিন্দ চমকে উঠেছিল।
“প্রণয়া তুমি!”
অদৃশ্য প্রণয়া বলে উঠল, “কথা দিয়েছিলাম তো অরি, কিভাবে একা ফেলে যাই বলো!তোমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি শব্দের ভাঁজে আমি ছিলাম, আছি আর থাকব।”

এভাবেই চলে গেল ছয় বছর। অরবিন্দের জানা নেই এটা তার হ্যালুসিনেশন, নাকি প্রীতির অতৃপ্ত আত্মা। তবে এই অনুভবটাই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে, তাকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুটিয়েছে। যতবার সে ভেঙে পড়ত, ততবার অদৃশ্য প্রীতি এসে তার মনোবল বাড়াত। তাকে উদ্দেশ্য করেই মূলত অরিন্দমের আসন্ন বইটি লেখা। যার মাধ্যমে মানুষ জানতে পারবে, মানুষ মারা গেলেই জীবন থেকে মুছে যায় না বরং আরও কাছে আসে। যারা হৃদয়ের গভীরে থাকে, তারা কখনও দূরে যায় না, বরং সবসময় হৃদয়েই থাকে।

গভীর রাতে অরবিন্দ তার ডায়েরি নিল। কলমে কাগজে ছোঁয়ানোর আগে একবারও শূন্যে তাকিয়ে হাসলেন, যেন প্রণয়া তাকে লিখতে উৎসাহ দিচ্ছে। অরবিন্দ লিখতে লাগল,
“প্রণয়া তুমি নও তো দূরে, আছো আমার হৃদয়ের খুব কাছে,
তোমার থেকে দূরে যাওয়ার সাধ্য কি আমার আছে?
হাজারও মানুষের ভিড়েও আমি তোমাকেই খুঁজে ফিরি প্রতিটি শব্দের ভাঁজে,
তাই তো সবাই জানবে আমার প্রণয়া আজও দূরে থেকেও কাছে।।”

কলম থামল। জানালার বাইরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। তার সাথে অরবিন্দও ভাবতে লাগল তার আর প্রণয়ার বিচ্ছেদহীন প্রেমের কথা। সত্যিই তো, মানুষ মরে গেলেই দূরে চলে যায়না। আমাদের আরও কাছে চলে আসে। এতটাই কাছে, যেন আর কেউ তাদের আমাদের থেকে দূর না করতে পারে।


লেখক পরিচিতি : হৈমন্তী চৌধুরী
আমি বাংলাদেশে থাকি। লেখালেখি টা মূলত শখের বসেই করি। আশা করি ভালো লাগবে গল্প।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up