লেখক : অঙ্কিতা দে
মহাদেব: (গালে হাত দিয়ে, মুখ একটু ভার করে) পার্বতী, আমার একটা কথা কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না। তুমি এই গাবদা সিংহটাকে যখন-তখন ‘কুচু-পুচু’ বলে আদর করো, অথচ আমাকে আজ পর্যন্ত একটা ভাল নামে ডাকলে না! আমি কি কৈলাসের বাতিল মানুষ?
মা দুগ্গা: (হেসে ফেলে) ওমা! শোনো কথা! তুমি দেবাদিদেব মহাদেব, ত্রিলোকের মালিক। তোমাকে কি আমি বাজারে দাঁড়িয়ে ‘কুচু-পুচু’ বলে ডাকব? লোকে শুনলে কী বলবে? আর তাছাড়া, আমার সিংহ তো আমার বাহন, আমার আদরের ছানা। ও তো লক্ষ্মীটি হয়ে বসে থাকে।
সিংহ: (ঘ্যাঁ ঘ্যাঁ করে কেশর নাড়িয়ে) হুকুম করুন মা! বাবা আবার কী ঘ্যাঁচঘ্যাঁচ করছে? আমি তো চুপচাপ তোমার পায়ের কাছে ঘুমোচ্ছিলাম। আমার মিষ্টি নামটা শুনলেই বাবার গায়ে বিষমজ্বালা ধরে!
মহাদেব : (চোখ রাঙিয়ে) মুখ সামলে কথা বলবি পশুর অধম! তুই আমার সামনে বেশি ডাঁট দেখাবি না। তোকে আমি এক ফুটে বনের মধ্যে উড়িয়ে দিতে পারি। পার্বতী, তুমি একে মাথায় তুলেছ। ও কালকে আমাকে পাত্তাই দেবে না!
গণেশ: (মোয়া চিবোতে চিবোতে) বাবা, তুমি মিছেমিছি রাগ করছ। মায়ের মন তো সবার জন্যই বড়। এই দেখো না, মা আমাকেও কত ভালবাসে, আবার ছোটভাই কার্তিককেও ভালবাসে। কিন্তু মোয়াটা কিন্তু আমাকেই বেশি দেয়!
কার্তিক: (আড়চোখে তাকিয়ে) দাদা, তুমি বেশি কথা বলো না তো! মা তোমাকে বেশি মোয়া দেয় কারণ তুমি সারাদিন বসে বসে খাও আর ভুঁড়ি বাড়াও। আমি যুদ্ধক্ষেত্রে যাই, সেনাপতি আমি! আমার শক্তির দরকার বেশি।
ময়ূর: (পেখম মেলে) একদম ঠিক বলেছ প্রভু কার্তিক! আমাদের রাজকীয় ব্যাপারই আলাদা। এই মোটা ইঁদুর আর হিংসুটে সিংহের মত আমরা সারাদিন ঘরে বসে ক্যাঁচক্যাঁচ করি না। আমরা আকাশে উড়ি, সৌন্দর্য ছড়াই!
ইঁদুর: (দুটি ছোট দাঁত বের করে কিচিরমিচির করে) ওহে মেকি পাখির দল! বেশি লাফিও না! আকাশে ওড়ো ঠিকই, কিন্তু ধান-চালের বস্তা কাটতে পারো? গণেশ দাদার বুদ্ধির চাবিকাঠি তো আমার হাতেই! আমি না থাকলে গণেশ দাদা পূজোর মণ্ডপে পৌঁছাবে কী করে? তোমার ওই বিশাল পেখম নিয়ে কি আর সরু গর্তে ঢোকা যায়?
লক্ষ্মী: (শান্ত গলায়) তোমরা সবাই থামো তো! ইঁদুর, ময়ূর—তোমরা বাহন হয়ে দেবতাদের মত তর্ক করছ কেন? আর বাবা, তুমিও না… শেষমেশ তুমি সিংহের সাথে ঝগড়া করছ!
পেঁচা: (গোল গোল চোখে তাকিয়ে, গম্ভীর গলায়) ঠিক ঠিক! গোলমাল বড্ড বেশি হচ্ছে। দিনে দিনে কৈলাসের শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে। শিবঠাকুরের মাথাতেই তো গঙ্গা থাকেন, মাথায় একটু ঠাণ্ডা জল ঢালুন না! এত হিংসা কিসের? ‘কুচু-পুচু’ শব্দে এত আপত্তি হলে আপনাকে না হয় আমরা ‘টুপুটুপু’ বলে ডাকব!
মহাদেব: (ত্রিনয়ন খুলতে গিয়েও সামলে নিয়ে) পেঁচা! তোর সাহস তো কম নয়! তোকে পিষে ছাতু করে দেব। পার্বতী, দেখেছ তোমার মেয়ের বাহনের কথা? আমাকে নাকি ‘টুপুটুপু’ ডাকবে! এ তো পুরো আমার অপমান!
সরস্বতী: (বীণায় একটা সুর তুলে) বাবা, রাগ করো না। শব্দের তো কোন দোষ নেই। ‘কুচু-পুচু’ শব্দটার মধ্যে স্নেহের সুর আছে। তুমি যদি রোজ ধ্যানে না বসে একটু রসিকতা করতে, তবে মা তোমাকেও মিষ্টি নামে ডাকত। তুমি সারাদিন ‘ব্যোম ব্যোম ভোলানাথ’ করবে আর আশা করবে মা তোমাকে গান শোনাক, তা তো হয় না!
হাঁস: (প্যাঁক প্যাঁক করে) সরস্বতী দেবী একদম ঠিক বলেছেন! যে হৃদয়ে সুর নেই, সেখানে তো অভিমান থাকবেই। আপনি একটু নাচ-গান শিখুন না! আমাদের দেবী যেমন বীণা বাজান, আপনি না হয় একটু ডমরু বাজিয়ে নেচে নিন!
সিংহ: (মুচকি হেসে) হাঁস ভাই, একদম খাঁটি কথা বলেছ। বাবা তো সারাদিন বাঘছাল পরে ভস্ম মেখে থাকেন, তার ওপর গলায় ওই সাপটা! ওটাকে দেখলেই তো ভয়ে গা রি-রি করে। মা আমাকে আদর করবে না তো কাকে করবে? আমার গায়ের সুন্দর সোনালী পশম দেখেছ?
সাপ: (মহাদেবের গলা থেকে ফোঁস করে উঠে) ওরে ব্যাটা সিংহ! বেশি ফোঁসফাঁস করবি না! আমি মহাদেবের গলায় থাকি বলে আমার সম্মান আলাদা। তোকে তো মা শুধু যুদ্ধে চড়ার জন্য ব্যবহার করে। কাজের সময় কাজী, কাজ ফুরালে পাজি! আর আমার কথা তো আলাদা, আমি বাবার অলঙ্কার!
সিংহ: (গর্জন করে) কী বললি? আমি কাজের লোক? আমি যদি একটা হাঁক দিই, তোর লেজ গুটিয়ে যাবে! মা দুর্গাকে জিজ্ঞেস কর, অসুর বধের সময় কে রক্তবীজের বংশ ধ্বংস করেছিল? তুই তো শুধুই বাবার গলায় ঝুলে ঝুলে জিলিপি খাস!
মা দুগ্গা: (কঠোর সুরে) সিংহ! একদম চুপ! আর সাপ, তুমিও শান্ত হও। কৈলাসে কোন মারামারি চলবে না। (মহাদেবের দিকে তাকিয়ে) আর তুমি? তুমি এত বড় হয়ে বাচ্চাদের মতো মুখ হাঁড়ি করে বসে আছ কেন?
মহাদেব: (মুখ ঘুরিয়ে) আমি মুখ হাঁড়ি করব না তো কী করব? কৈলাসের সবাই তোমার দিকে। ওই ইঁদুর, ময়ূর, হাঁস, পেঁচা—সবাই সিংহটার দল ভারী করছে। কার্তিক-গণেশও মায়ের ভক্ত। আমি তো এখানে একদম একা! আমার ভূত-প্রেতগুলোও আজকাল আমাকে ছেড়ে তোমার প্রসাদ খেতে ছোটে!
গণেশ: (হেসে) বাবা, তুমি রাগ করো না। তোমার জন্য আমি আলাদা করে একটা বড় লাড্ডু বানিয়ে রেখেছি। খাবে?
মহাদেব: (একটু নরম হয়ে) হুম… দে তো দেখি। তবে মনে রাখিস, লাড্ডু দিয়ে কিন্তু আমার অপমান ঢাকা যাবে না! পার্বতী, জবাব দাও, আমাকে কবে ‘কুচু-পুচু’ বলবে?
লক্ষ্মী: (হেসে খুন) ওগো মা! তুমি বাবাকে একবার বলেই দাও না! নাহলে আজ রাতে কৈলাসে আর অন্ন জুটবে না। বাবার রাগে সব বরফ গলে জল হয়ে যাবে!
সরস্বতী: (হেসে) সত্যি মা, বাবার অভিমান ভাঙানো জরুরি। বীণার সুরের চেয়েও মিষ্টি করে একবার বলো তো দেখি!
মা দুগ্গা: (হেসে শিবের কাছে গিয়ে) আচ্ছা বাবা, আচ্ছা! শোনো দেবাদিদেব, শোনো ভোলানাথ! তুমি হলে আমার প্রাণ, আমার সর্বস্ব। সিংহকে আমি স্নেহে ডাকতে পারি, কিন্তু তুমি তো আমার হৃদয়ে আছ। এবার তোমার রাগ ভেঙেছে, আমার ‘কুচু-পুচু’ ভোলানাথ?
(কথাটা শোনামাত্রই কৈলাসে যেন আনন্দের জোয়ার এলো। সব বাহন একযোগে হেসে উঠল।)
ইঁদুর: (নাচতে নাচতে) আহা! শিবঠাকুর এখন ‘কুচু-পুচু’! এবার থেকে কৈলাসের নতুন নাম রাখা হোক—’কুচু-পুচু ভবন’!
ময়ূর: (পেখম তুলে) বাহ্! কী চমৎকার মিলন দৃশ্য!
পেঁচা: (চোখ পিটপিট করে) তবে ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত লাগল। শিবঠাকুরকে ‘কুচু-পুচু’ বললে কেমন যেন বাঘের গায়ে লাল ফিতে বাঁধার মতো লাগে!
মহাদেব: (লজ্জা পেয়ে, লাড্ডুটা মুখে পুরে) এই পেঁচা! বেশি কথা বলবি না! পার্বতী আমাকে যা খুশি ডাকতে পারে। তোদের কিছু বলার দরকার নেই। (সিংহের দিকে তাকিয়ে) এই শোন সিংহ, মা তোকে আদর করতেই পারে, কিন্তু মনে রাখিস, কৈলাসের আসল মালিক কিন্তু আমিই!
সিংহ: (পায়ের ওপর মাথা রেখে) জানি বাবা, জানি! তোমার রাগ যেমন চট করে আসে, তেমনই আবার মোয়া-লাড্ডু পেলেই জল হয়ে যায়। আমাদের মা তোমাকে খুব ভাল করেই চেনে!
কার্তিক: (হাসতে হাসতে) যাক, অবশেষে কৈলাসে শান্তি ফিরল! চল দাদা, আমরা এবার একটু খেলা করি!
গণেশ: (পেট চাপড়ে) খেলা পরে হবে ছোটু, আগে চল মায়ের হাতের পায়েসটা খেয়ে আসি!
মা দুগ্গা: (সবাইকে দেখে হেসে) চল চল, সবাই মিলে আজ পেট পুরে খাব। কৈলাসে রাগ-অভিমানের কোন স্থান নেই, এখানে শুধুই ভালবাসা!
(সবাই হাসতে হাসতে অন্নপূর্ণা গৃহের দিকে এগিয়ে চলল, আর মহাদেব মনে মনে বেশ তৃপ্তি নিয়ে দেবী দুর্গার পাশে হেঁটে চললেন।)
লেখক পরিচিতি : অঙ্কিতা দে
আমি অঙ্কিতা দে, বর্তমানে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট' বিষয়ে এম.এ. দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছি। আমার বাড়ি কলকাতায়। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, ধারাবাহিক গল্প ও প্রবন্ধ লিখতে আমি ভীষণ ভালোবাসি। সেই ভালোবাসার জায়গা থেকেই আপনাদের প্ল্যাটফর্মে আমার এই লেখাটি জমা দিচ্ছি।

