লেখক : আবুল হাসান তুহিন
কাহিনী সংক্ষেপ:
বর্ষা মৌসুমে গৃহিণী রুনা ঘরের ইনডোর প্ল্যান্ট এবং বারান্দার টবে জমে থাকা পরিষ্কার পানি নিয়মিত পরিষ্কারের জন্য তার স্বামী আসিফকে বারবার অনুরোধ করে। কিন্তু আধুনিক ফ্ল্যাটের বাসিন্দা আসিফ আলসেমি এবং অতি-আত্মবিশ্বাসের কারণে বিষয়টি হেসে উড়িয়ে দেয় এবং ডেঙ্গুর আশঙ্কাকে নারীদের অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বলে মনে করে। এর ঠিক চারদিন পর হঠাৎ আসিফ তীব্র ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়। শরীর ভেঙে যাওয়া হাড়ভাঙা ব্যথা আর প্রচণ্ড জ্বরে তার অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। রুনা তাকে নিয়ে তড়িঘড়ি করে ডাক্তারের চেম্বারে ছোটাছুটি করে। রক্তের পরীক্ষায় ডেঙ্গু পজিটিভ আসে। ডাক্তারবাবু তাদের স্পষ্ট সতর্ক করে দেন যেন ভুলেও রোগীকে কোন ব্যথানাশক ওষুধ না খাওয়ানো হয় এবং রোগীকে যেন অবশ্যই ২৪ ঘণ্টা মশারির ভেতরে রাখা হয়। নিজের ভুল বুঝতে পেরে আসিফ ভীষণ অনুতপ্ত হয়। রুনার দিন-রাত এক করা সেবা এবং ডাক্তারের দেওয়া সঠিক নিয়মে (প্রচুর তরল খাবার ও সম্পূর্ণ বিশ্রাম) আসিফ ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে। সুস্থ হওয়ার পর ডাক্তারবাবু তাদের ফলো-আপ চেকআপে এলে, আসিফ শুধু নিজের ঘরই নয়, বরং পুরো সমাজকে ডেঙ্গুমুক্ত করার এক নতুন শপথে দীক্ষিত হয়।
চরিত্র লিপি:
১. আসিফ: ৩৫ বছর, মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী
২. রুনা: ৩০ বছর, আসিফের স্ত্রী/গৃহিণী
৩. ডাক্তার: ৪০ বছর, স্থানীয় চিকিৎসক
দৃশ্য।।০১।। ড্রয়িংরুম।।সকাল
চরিত্র: রুনা, আসিফ
(আসিফ খবরের কাগজ পড়ছে। মাঝে মাঝে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। রুনা ঝাড়ু দিয়ে ঘর পরিষ্কার করছে)
রুনা: (ঝাড়ু দিতে দিতে ইনডোর প্ল্যাণ্টের টবটার সামনে ঝুঁকে পড়ে টবের নিচের প্লাস্টিকের ট্রে-টা টেনে) এ কী! ট্রে-র ভিতর এত পানি জমে আছে! ওগো! একটু এদিকে তাকাবে? শুনছ আমার কথা?
আসিফ: (উদাসীনভাবে) উঁহু, বলো। শুনছি তো। খবরের কাগজে একটা দারুণ কলাম ছেপেছে, ওটা পড়ছি।
রুনা: (কোমর বেঁধে দাঁড়ায়) কাগজের কলাম পরে পড়ো। আগে ঘরের ভেতরের খবর নাও। এই যে বারান্দার আর ড্রয়িংরুমের টবের নিচের প্লাস্টিকের ট্রেগুলো—এগুলোতে কত পানি জমে আছে দেখেছ? আজ তিন দিন ধরে তোমাকে বলছি এই পানিটা একটু বারান্দায় গিয়ে ফেলে আসতে, তোমার তো কোন হুঁশই নেই!
আসিফ: (বিরক্ত হয়ে) ধুর রুনা! ছুটির দিনের এই সুন্দর সকালটা অন্তত একটু শান্তিতে কাটাতে দাও। প্রতিদিন সকাল হলেই তোমার ঘ্যানঘ্যানানি শুরু হয়ে যায়।
রুনা: (উত্তেজিত কণ্ঠে) আমি ঘ্যানঘ্যান করছি না আসিফ! পরিস্থিতি বোঝো। গত পরশুই তূর্যর স্কুলের অভিভাবক গ্রুপে একজন মেসেজ দিয়েছেন। ওদের ক্লাস সেভেনের একটা বাচ্চা ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি। অবস্থা এত খারাপ যে আইসিইউতে নিতে হয়েছে। বর্ষার এই সময়টায় একটু অসতর্ক হলেই বিপদ!
আসিফ: (হেসে উড়িয়ে দিয়ে) আরে বাবা, ওই বাচ্চাটার ডেঙ্গু নিশ্চয়ই স্কুল থেকে কিংবা বাইরের কোন নোংরা নর্দমা থেকে হয়েছে। আমাদের চারতলার এই এয়ার-টাইট ফ্ল্যাটে ওসব এডিস মশা আসবে কোথা থেকে? তুমি বড্ড বেশি চিন্তা করো, তিলকে তাল করা তোমার পুরনো স্বভাব।
রুনা: (আসিফের হাত থেকে কাগজটা টেনে নিয়ে গম্ভীর স্বরে) এটা তিলকে তাল করা নয়, আসিফ। খবরের কাগজটা উল্টেই দেখ, ডাক্তাররা রোজ বলছেন, এডিস মশা কোন নোংরা ড্রেনে থাকে না। এরা থাকে এই আমাদের ড্রয়িংরুমের শোপিস, বারান্দার টবের জমে থাকা একদম পরিষ্কার পানিতে। আর এরা নাকি চারতলা কেন, বহুতল ভবনেও লিফটে করে মানুষের কাপড়ে চেপে চলে আসতে পারে। চিকিৎসকদের একটাই কথা—‘৩ দিনে ১ দিন, জমা পানি ফেলে দিন।’
আসিফ: (হেসে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে, ঘড়ির দিকে তাকায়) আচ্ছা বাবা আচ্ছা, তোমার সাথে যুক্তিতে জেতা অসম্ভব! ঘরের এই জমে থাকা পানিগুলো নাকি এডিস মশার আতুঁড়ঘর! আমি এখন চললাম বন্ধুদের সাথে ক্লাবে আড্ডা দিতে। এসে না হয় তোমার ওই মহামূল্যবান টবের পানি ফেলে দেব, কেমন? এখন একটু আসি!
রুনা: (আসিফের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রাগে-দুঃখে পা ঠোকে) মানুষটার গা-ছাড়া ভাবটা কখনও গেল না? কোন কথাই কানে তোলে না! ও তো নিজে বিপদে না পড়লে বুঝবে না। (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) কাজটা যখন আমাকেই করতে হবে, শুধু শুধু অন্যকে অনুরোধ করার কী দরকার! একা একাই টবের নিচের ট্রে-টা তুলে নেয় এবং পানি পরিষ্কার করে)
।।পটপরিবর্তন।।
দৃশ্য।।০২।।রুম।।
চরিত্র: রুনা, আসিফ
(আসিফের প্রচণ্ড জ্বর, কাতর শুয়ে কাঁপছে, তার গায়ে জড়ানো মোটা চাদর)
আসিফ: (খুব দুর্বল এবং কাঁপানো কণ্ঠে) উফ! রুনা… আমার পুরো শরীরটা যেন কেউ ভেঙে গুঁড়ো করে দিচ্ছে রে। বিশেষ করে মেরুদণ্ড আর পায়ের জয়েণ্টগুলোতে অসহ্য ব্যথা! চোখের পিছনে এত টান লাগছে যে আমি চোখ মেলতেই পারছি না…
রুনা: (কপালের জলপট্টি বদলে) জ্বর নামানোর জন্য আমি বারবার জলপট্টি দিচ্ছি। একটু স্থির হয়ে শোও, বেশি নড়াচড়া করো না। কপালটা একদম তপ্ত তাওয়ার মত পুড়ে যাচ্ছে। থার্মোমিটারটা দিয়ে জ্বর মেপে দেখি তো। এ্যাঁ এ্যাঁ, দেখি দেখি! ওমা! জ্বর তো কমছেই না, ১০৪ ডিগ্রি ছুঁইছুঁই!
আসিফ: (যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে) রুনা… আমার আর সহ্য হচ্ছে না। ড্রয়ারে একটা ব্যথানাশক বড়ি আছে না? ওটা দাও না প্লিজ! গা-হাত-পায়ের এই হাড়ভাঙা ব্যথাটা অন্তত একটু কমুক, আমি একটু ঘুমোতে চাই…
রুনা: (দৃঢ় এবং কঠোর স্বরে) না আসিফ, একদম না! ভুলেও তোমাকে আমি কোন ব্যথানাশক বা অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ দেব না।
আসিফ: (খিটখিটে মেজাজে) কেন দেবে না রুনা? আমি ব্যথায় মরছি আর তুমি আমাকে একটা সাধারণ বড়ি খেতে দিচ্ছ না?
রুনা: (নরম সুরে) রাগ করো না আসিফ, বোঝার চেষ্টা করো। আজ বিকালেই আমি আমাদের পাশের ফার্মেসির ডাক্তারবাবুর সাথে ফোনে কথা বলেছি। উনি স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন—এ বছর যে ডেঙ্গু হচ্ছে, তাতে আক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথে প্লেটলেট কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই সময়ে যদি কেউ অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন বা কোন কড়া ব্যথানাশক ওষুধ খায়, তবে শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণ (Internal Bleeding) শুরু হতে পারে। তখন রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়বে!
আসিফ: (অনুতপ্ত কণ্ঠে) রুনা… আমার খুব অনুতাপ হচ্ছে। সেদিন তুমি কত করে বললে ঘরের কোণের জমে থাকা পানিগুলো পরিষ্কার করতে। আমি তোমার কথা তুড়ি মেরে উড়িয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে গেলাম। আজ মশার কামড়ে আমার এই দশা! আমার নিজের অবহেলার কারণেই আজ তোমাকে রাতে জেগে কষ্ট পেতে হচ্ছে।
রুনা: (আসিফের চাদরটা ভাল করে গায়ে টেনে দিয়ে) এখন ওসব ভেবে শরীর আরও খারাপ করো না। শান্ত হয়ে ঘুমনোর চেষ্টা করো। জ্বর আর ব্যথার জন্য শুধু প্যারাসিটামল খাও, আর আমি জলপট্টি দিয়ে জ্বরটা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছি। সকাল হলেই আমরা বড় ডাক্তারের কাছে যাব এবং রক্ত পরীক্ষা করাব।
দৃশ্য।।০৩।।ডাক্তারের চেম্বার।।
চরিত্র: ডাক্তার, আসিফ, রুনা
(অসুস্থ আসিফকে নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে গিয়েছে রুনা ডাক্তারের হাতে রক্তের রিপোর্টের ফাইলটি তুলে দেয়।)
রুনা: ডাক্তার সাহেব, আপনি যে সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়েছিলেন সব রিপোর্ট এই ফাইলের ভিতরে রয়েছে।
ডাক্তার: (ফাইলের রিপোর্টটি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখে) দেখি কী অবস্থা! হুম, আসিফ সাহেব। আপনার শরীরের লক্ষণ যা বলছিল, ল্যাবরেটরির রিপোর্টও ঠিক সেটাই বলছে। আপনার ডেঙ্গু টেস্ট (NS1 Antigen) পজিটিভ এসেছে।
আসিফ: (ভয়ার্ত কণ্ঠে) ডাক্তারবাবু, আমার কি খুব বড় কোন বিপদ হয়েছে? রক্তের প্লেটলেট কি খুব কমে গেছে? আমাকে কি এখনই হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে?
ডাক্তার: (হেসে, আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে) শান্ত হোন আসিফ সাহেব। ডেঙ্গু পজিটিভ মানেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে, এমন কোন কথা নেই। আপনার প্লেটলেট কাউণ্ট কিছুটা কমতির দিকে, তবে তা এখনও বিপজ্জনক স্তরে যায়নি। আপনার স্ত্রী যদি ঘরে বসে কিছু জরুরি নিয়ম মেনে চলেন, তবে আপনি ঘরেই সুস্থ হয়ে উঠবেন।
রুনা: (উদ্বিগ্ন হয়ে এগিয়ে এসে) ডাক্তারবাবু, ওনার শরীরটা ব্যথায় একদম ভেঙে যাচ্ছে। ও কি কোন কড়া ব্যথানাশক বা ড্রয়ারে থাকা কোন পুরনো ব্যথার ওষুধ খেতে পারবে?
ডাক্তার: (কঠোর এবং সতর্ক কণ্ঠে) ভুলেও এই কাজটি করবেন না, রুনা খন্দকার! ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে এটাই সবচেয়ে বড় ভুল। ডেঙ্গু হলে কোন ব্যথানাশক ওষুধ (যেমন: আইবুপ্রোফেন, ডাইক্লোফেনাক বা অ্যাসপিরিন) খাওয়ানো যাবে না। এতে শরীরের ভেতরে ইণ্টারনাল ব্লিডিং বা রক্তক্ষরণ শুরু হতে পারে, যা রোগীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।
রুনা: (ভয়ে চমকে উঠে) সর্বনাশ! তাহলে জ্বর আর ব্যথার জন্য আমরা কী করব?
ডাক্তার: জ্বর আর শরীর ব্যথার জন্য শুধুমাত্র প্যারাসিটামল দেবেন। তাও দিনে চারবারের বেশি নয়। আর জ্বর ১০১ ডিগ্রির ওপরে গেলেই শরীর বারবার সাধারণ পানি ও ভেজা কাপড় দিয়ে মুছিয়ে দিতে হবে।
রুনা: আর ওনার খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে কোন নিয়ম আছে কি?
ডাক্তার: (প্রেসক্রিপশনে লিখতে লিখতে) ডেঙ্গুর প্রধান চিকিৎসাই হ’ল পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং তরল খাবার । রোগীকে প্রচুর পরিমাণে পানি, ওআরএস (ওরস্যালাইন), ডাবের পানি, তাজা ফলের রস এবং ঘরে তৈরি গরম স্যুপ খাওয়াবেন । শরীরে যেন কোনভাবেই পানির ঘাটতি না হয়।
রুনা: ডাক্তারবাবু, আমাদের ঘরের বাকিদের সুরক্ষার জন্য আমাদের কী করণীয়?
ডাক্তার: খুব জরুরি প্রশ্ন করেছেন। আসিফ সাহেবকে ২৪ ঘণ্টা মশারির ভেতরে রাখবেন । কারণ কোন সাধারণ এডিস মশা যদি এখন ওনাকে কামড়ায়, তবে সেই মশার শরীরেও ডেঙ্গু ভাইরাস ঢুকবে। আর সেই মশাটি যখন আপনাকে বা ঘরের অন্যদের কামড়াবে, তারাও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হবে।
আসিফ: (অনুতাপের সুরে) আমি বুঝতে পেরেছি ডাক্তারবাবু। আমার নিজের অবহেলার কারণেই আজ এই দশা। আমি আপনার সব নিয়ম মেনে চলব।
ডাক্তার: (প্রেসক্রিপশনটি রুনার হাতে দিয়ে) একদম চিন্তা করবেন না। তবে হ্যাঁ, জ্বর ছেড়ে যাওয়ার পরের ৩ থেকে ৭ দিন খুব সাবধানে থাকবেন । যদি তীব্র পেটে ব্যথা, অনবরত বমি, মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্তপাত অথবা অতিরিক্ত শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়, তবে এক মুহূর্ত দেরি না করে রোগীকে সরাসরি হাসপাতালে ভর্তি করবেন ।
রুনা: (প্রেসক্রিপশন নিয়ে) অনেক ধন্যবাদ ডাক্তারবাবু। আমরা প্রতিটা নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে পালন করব।
দৃশ্য।।০৪।।রুম।।রাত।।
চরিত্র: রুনা, আসিফ
(আসিফ মশারির ভিতরে, রুনা মশারিরএক কোণ তুলে আসিফকে গ্লাসে করে, ওরস্যালাইন খাওয়াবে)
রুনা: ঠিকমত উঠে বসো, এই এক গ্লাস ওরস্যালাইন, সবটুকু খেতে হবে!
আসিফ: (স্যালাইন পানি এক চুমুক দিয়ে মুখ সরিয়ে নেয়, খুব ক্লান্ত কণ্ঠে) আর ভাল লাগছে না রুনা। মুখে কোন স্বাদ নেই। পানিটাও মনে হচ্ছে তিতা। জ্বরটা তো কাল রাত থেকেই আর আসেনি, তাহলে এই মশারিটার ভেতরে আমাকে কেন এভাবে বন্দী করে রেখেছ? অসহ্য লাগছে!
রুনা: একদম ছটফট করবে না। ডাক্তারবাবু কী বলে দিয়েছেন মনে নেই? ডেঙ্গু রোগীর জ্বর যখন কমে যায়, ঠিক তখনই আসল বিপদ শুরু হতে পারে। এই সময়টাকে বলে ‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’ বা বিপজ্জনক সময়। জ্বর ছাড়ার পর ৩ থেকে ৭ দিন রোগীকে কড়া নজরে রাখতে হয়। মশারি ছাড়া ঘুমনো যাবে না।
আসিফ: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) তা তো বুঝলাম। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা এই মশারির ভেতর দম আটকে থাকার মানে কী? ঘরে তো এখন মশা নেই!
রুনা: (সতর্ক কণ্ঠে) ভুল বলছ তুমি। ডাক্তারবাবু স্পষ্ট বলেছেন—এখন যদি সাধারণ কোন এডিস মশা তোমাকে কামড়ায়, তবে তোমার রক্তে থাকা ডেঙ্গু ভাইরাস সেই মশার শরীরে ঢুকে পড়বে। এরপর সেই মশাটা যখন আমাকে কামড়াবে, আমিও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হব। আক্রান্ত রোগীকে মশারির ভেতর রাখা মানে পুরো পরিবারকে সুরক্ষিত রাখা ।
আসিফ: (একটু থমকে গিয়ে) কিন্তু আমার তো এখন শুধু একটু দুর্বলতা লাগছে। আর কী হতে পারে?
রুনা: (গম্ভীর স্বরে) ডাক্তারবাবু বলেছেন, এই সময়েই শরীর সবচেয়ে বেশি দুর্বল হয়। যদি হঠাৎ তীব্র পেটে ব্যথা হয়, অনবরত বমি হতে থাকে, মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্ত পড়ে, কিংবা শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, তবে এক সেকেণ্ডও ঘরে বসে থাকা যাবে না, ওগুলো ডেঙ্গুর মারাত্মক রূপ । তখন রোগীকে সোজা হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। তাই তুমি চুপচাপ তরল খাবার খাও আর বিশ্রাম নাও।
আসিফ: (কৃতজ্ঞতায়) আমি আর কোন ভুল করব না রুনা। আমার এই কঠিন সময়ে তুমি যেভাবে রাত জেগে, নিজের খাওয়া-দাওয়া ভুলে আমাকে আগলে রেখেছ, তা না হ’লে আমি হয়ত মারাই যেতাম। আমার নিজের অবহেলার কারণেই আজ তোমাকে এত কষ্ট পেতে হচ্ছে।
রুনা: (নরম সুরে হেসে) এখন আর ওসব ভেবে মন খারাপ করো না। তুমি সুস্থ হয়ে উঠছ, এটাই আমার সবচেয়ে বড় স্বস্তি। এখন অনেক কথা হয়েছে, এবার চুপচাপ চোখ বন্ধ করে একটু ঘুমোও। বিশ্রামই এখন তোমার পরম বন্ধু।
।।পটপরিবর্তন।।
দৃশ্য।।০৫।। বারান্দা।।দিন।।
চরিত্র: রুনা, আসিফ, ডাক্তার
রুনা: (রসসহ গ্লাসটি টেবিলে রেখে, মুচকি হেসে) বাহ! আজ দেখছি সকাল সকাল মশা মারার বীর অভিযানে নেমেছ যে?
আসিফ: (হেসে) ঠাট্টা করো না রুনা। জীবন দিয়ে শিক্ষা পেয়েছি। যে মশাকে আমি ডানাওয়ালা এক ফোঁটা পোকা ভেবে উড়িয়ে দিয়েছিলাম, সে আমাকে যেভাবে হাসপাতালের দোরগোড়া থেকে ঘুরিয়ে আনল, তা আমি জীবনেও ভুলব না।
রুনা: (ফলের রসের গ্লাস এগিয়ে দিয়ে) না না, আমি তো খুব খুশি হয়েছি। নাও, আগে এই মাল্টার রসটুকু খেয়ে নাও। ডেঙ্গু থেকে উঠলে তো কী হবে, শরীরের ভেতরের দুর্বলতা কাটতে কিন্তু অনেক দিন সময় লাগে। ভিটামিন সি আর পুষ্টিকর খাবার এখন রোজ খেতে হবে।
আসিফ: (গ্লাসটা হাতে নেয় এবং এক চুমুক দিয়ে বলে) উফ! অমৃত! যখন ডেঙ্গু হয়েছিল, তখন মুখের তিতা স্বাদের জন্য এই রসই বিষ মনে হত। আজ কত স্বাদ লাগছে! (টবের দিকে ইশারা করে) এই দেখো রুনা, ড্রয়িংরুম আর বারান্দার সব কটা টবের পানি আমি নিজে ফেলে একদম শুকিয়ে দিয়েছি। ফ্রিজ আর এসি-র পেছনের ট্রে-টাও পরিষ্কার করেছি। এখন থেকে প্রতি শুক্রবারে এটা আমার বাঁধা রুটিন। আমাদের স্লোগান হবে একটাই—‘৩ দিনে ১ দিন, জমা পানি ফেলে দিন।’
(ঠিক এই সময় ডাক্তারবাবু আসিফকে ফলো-আপ চেকআপের জন্য তাদের বাসায় প্রবেশ করেন।)
ডাক্তার: (ভেতরে ঢুকে আসিফকে কাজ করতে দেখে হেসে ওঠেন) সাবাশ আসিফ সাহেব! আপনাকে এই রূপে দেখে খুব ভাল লাগছে। ডাক্তার হিসেবে এটাই আমার সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
আসিফ: (ডাক্তারকে সালাম জানিয়ে) আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ডাক্তার সাহেব। আপনার সঠিক পরামর্শ আর রুনার সেবার কারণেই আমি আজ সম্পূর্ণ সুস্থ।
ডাক্তার: (আসিফের পিঠ চাপড়ে) খুব ভাল কথা। তবে শুধু নিজের ঘর পরিষ্কার রাখলেই হবে না, আমাদের চারপাশটাও এডিস মুক্ত রাখতে হবে। কারণ মশা তো আর দেওয়াল চেনে না, প্রতিবেশীর ঘরের মশা উড়ে এসে আমাদের কামড়াতেই পারে। আপনি সুস্থ হয়ে সমাজকে সচেতন করছেন, এটাই অনেক বড় কাজ।
রুনা: হ্যাঁ, ডেঙ্গু কোন সাধারণ জ্বর নয়। এর কোন সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বা বহুল প্রাপ্ত ভ্যাকসিন নেই। তাই মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করাই আমাদের একমাত্র হাতিয়ার।
ডাক্তার: ছোট্ট বাচ্চারা আর বয়স্করা এই রোগে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তাই জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা করান, বেশি বেশি তরল খাবার খাওয়ান আর রোগীকে সবসময় মশারির ভিতরে রাখুন ।
আসিফ: আতঙ্কিত না হয়ে আমরা সচেতন হই। অলসতা ও অবহেলা ত্যাগ করে আজই নিজের ঘর আর আঙিনা পরিষ্কার করি।
তিনজন একত্রে: সচেতনতাই হোক ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে আমাদের সবচেয়ে বড় দেওয়াল! পরিচ্ছন্ন দেশ গড়ি, ডেঙ্গুমুক্ত জীবন গড়ি!
লেখক পরিচিতি : আবুল হাসান তুহিন
গীতিকার - নাট্যকার, বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশন

