লেখক : রাধাকান্ত মণ্ডল
মানুষের জীবনে কৌতূহলের শেষ নেই। অজানাকে জানা, অচেনাকে চেনার কৌতূহল কার না থাকে। সেরকমই ঐতিহাসিক নিদর্শনের পূর্ণরূপের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় বীরভূম জেলার মহম্মদ বাজার থানার অন্তর্গত গনপুর গ্রামে। আমার জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখে চলেছি গনপুর গ্রামের চৌধুরিদের ছেলের বিয়েতে ডিঙা ফেরানোর প্রথা। বিয়ের দিনের ঠিক আগের শনিবার অথবা মঙ্গলবার দেখে বসানো হয় মনসা মাতার “বারি”। এদিন বারি বসানোর উপকরণ হিসাবে মাটির হাঁড়ি, লাল রঙের মার্কিন কাপড়ের খণ্ড, ফল-মূল, ধূপ-ধূনো সহ অন্যান্য নানাবিধ উপকরণ। আর মনসা মাতার পরনে নতুন কাপড় ও লাল রঙের রক্তজবা। বারি বসানোর দিন থেকেই যতদিন বারি বসানো তথা মনসা মাতা থাকেন, সেই দিনগুলোর প্রতি রাত ধরে চলে মনসামঙ্গল গান। বিয়ের দিনে সকাল থেকে মনসামঙ্গল গান হওয়ার পর একজন নবীন বিবাহিত কূলবধূ লক্ষ্মীন্দরকে কোলে নিয়ে বিবাহ বাড়িতে প্রবেশ করেন। সাথে জলধারা-শঙ্খধ্বনি সহযোগে শোভাযাত্রা করে হারমোনিয়াম-খোল-খঞ্জনির সঙ্গে মনসামঙ্গল গানের চিয়ান গান গাওয়া হয়। আর তারপরেই দুপুর বারোটা থেকে একটার মধ্যেই শুরু হয় মনসা মাতাকে মাথায় নিয়ে ঢাকঢোল, বাজনা ও কীর্তনদল সহযোগে কাঠের তৈরি পাটের দড়িবাঁধা নৌকাকৃতি ডিঙা নিয়ে ডিঙা ফেরানো। বিয়ের দিন পাত্র পরনে ধুতি-গেঞ্জি পরিধান করে একটা চারটে চাকা লাগানো কাঠের নৌকা নেয়, সেই নৌকার মধ্যে ছোট ছোট গহ্বরে বা কুঠুরিতে চাল-কলাই সহ একুশ রকমের বিভিন্ন সুগন্ধী, মশলা জাতীয় দ্রব্য পূর্ণ করে, চাঁদ মালা পরিয়ে পাটের দড়ি দিয়ে নৌকা, অর্থাৎ ডিঙাটিকে বাহুর মধ্যেই একটা ডাব নিয়ে টানতে টানতে গ্রাম প্রদক্ষিণ করে। সাথে চৌধুরী বংশের একজন বিবাহিত পুরুষ মনসা মাতাকে মাথায় নেয়, এবং অন্য একজন ব্যক্তি মা মনসার “বারি” মাথায় নিয়ে শোভাযাত্রা সহকারে গ্রাম প্রদক্ষিণ করে। এছাড়াও পাঁচ থেকে সাতজন বিবাহিত মহিলা মাথায় বাঁশের কুলোর মধ্যে লাল রঙের মার্কিন কাপড়ের খণ্ড, পান-সুপারি সহযোগে একটা করে মাটির হাঁড়ি কোমরে নিয়ে গ্রাম প্রদক্ষিণ করে। এছাড়াও মনসা মাতার মহিমার কৃপায় প্রায় সকলেরই বেশ ভর আসে। ভরের মধ্যেই গ্রাম প্রদক্ষিণ করার সময় ঢাক, ঢোল, বাজনা আর মনসামঙ্গল কীর্তন হয়। এই শোভাযাত্রায় গ্রামের কিছু মানুষ ও আত্মীয়দের সহযোগে বেশ ভিড় জমে যায়।
তবে এখনও আমাদের বহু মানুষের মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগে, ডিঙা ফেরানো কী? কবে থেকে বা কীভাবে এই ডিঙা ফেরানোর উৎপত্তি? এসব প্রথাগত প্রশ্নের উত্তর জানার আগ্রহ জাগলে আমার ঠাকুরদা বলেন, চৌধুরী বংশের প্রতিষ্ঠাতা অকিঞ্চন চৌধুরীর পুত্র গঙ্গারাম চৌধুরী চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন পাশের পর জমিদারী স্বত্ত্ব ক্রয় করে বিত্তশালী জমিদার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হন। সেই সময়ে গনপুর গ্রামের নাম ছিল “গনপুর গঞ্জ”। এই গনপুর গ্রাম থেকেই সেসময় কাঁচা লৌহ কিনে সুদূর কাটোয়া শহরে বিক্রয় করা হত। সেখান থেকে পরে গঙ্গা নদীপথে এই লৌহ অন্যত্র চালান হত। এই ব্যবসার মাধ্যমে সেই সময় তিনি প্রচুর টাকার মালিক হয়ে ওঠেন। একদিন ছেলের বিবাহ উপলক্ষ্যে গঙ্গারাম চৌধুরীর স্ত্রী ছেলেকে গ্রামের শেষপ্রান্তে একটি শান বাঁধানো পুকুরের ঘাটে তেল হলুদ মাখানোর উদ্দেশ্যে স্নান করানোর জন্য নিয়ে গেলে দেখেন, এক কুমারী বালিকা ব্রাহ্মণীর বেশে পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ব্রাহ্মণীবেশধারিণী সেই সুন্দরী কুমারী বালিকা তখন বলে ওঠেন, “মা, তোমার ছেলের বিয়ে বুঝি! তা আমাকে একটু তেল হলুদ মাখাবে না?”
তখন তার সরলা রমণী স্ত্রী সেই ব্রাহ্মণীর পা, হাত ও সারা শরীরে অত্যন্ত যত্ন সহকারে তেল হলুদ মাখিয়ে দেন। পরে রাতে স্বপ্নাদেশ হয়, “আমি একতলা গ্রামের মা মনসা। তোদের বংশে যত ছেলের বিয়ে হবে, আমাকে প্রতিবার নিয়ে যাবি।”
তখন সেই থেকেই চালু হয় চৌধুরী বংশের “ডিঙা ফেরানো”-র প্রথা। আর সেই প্রথা বিগত আড়াইশত বছর ধরে আজও চলে আসছে সমস্ত নিয়ম কানুন মেনে। এই প্রথা গ্রামের সকল মানুষের মনের মধ্যে গাঁথা স্বর্ণাক্ষরে রচিত এক ইতিহাসের মত হয়ে রয়েছে ও আজীবন থাকবে।
লেখক পরিচিতি : রাধাকান্ত মণ্ডল
গনপুর, মহম্মদ বাজার, বীরভূম, ৭৩১২১৬

