এবার পুজো অন্যরকম

লেখক : অদিতি চ্যাটার্জি

মেহুলি আলমারিটা খুলে লাল-সাদা বুটিদার একটা শাড়ি বের করে। ক্লাস টুয়েলভের মেয়েকে শাড়ি কিনে দিতে মা’র আপত্তি ছিল, মেহুলি জোর করে বায়না করে আদায় করেছে। আজ প্রথমবার অয়নের সঙ্গে পুজোয় বেরোবে, তার আগে একসাথে অষ্টমীর অঞ্জলি দেবে। পাড়া আর কোচিংয়ের বন্ধু ওরা। শুধুই বন্ধু? ছোট্ট লাল টিপটা পরতে গিয়ে ফিক করে হেসে ফেলে মেহুলি।

অষ্টমীর রাত, কলকাতার রাস্তা যেন আজ ঘুমোবে না বলে স্থির করেছে। ভিড়, ঢাকের আওয়াজ, আলোর রোশনাই, মাইকে কোথাও দুর্গাস্তোত্র, কোথাও পুরনো বাংলা গানে শহরটা আজ নিজেই উৎসব। বাগবাজারের মণ্ডপের দমবন্ধ করা ভিড়টা থেকে অয়ন আর মেহুলি কোনমতে বের হয়। এখনও শোভাবাজার রাজবাড়ি, জগৎ মুখার্জি পার্ক দেখা বাকি। মূল রাস্তার তীব্র ভিড় আর আওয়াজ থেকে দূরে একটা পুরনো গলিপথ ধরে হাঁটতে লাগল ওরা। দু’পাশের পুরনো দিনের বাড়ি, ফ্ল্যাটের বারান্দা ছুঁয়ে মাথার ওপর দিয়ে চলে গেছে অসংখ্য তার, আর সেই তারে জড়ানো ছোট ছোট হলুদ টুনি বাল্ব। পুরো গলিপথ হলুদ মায়াবী উষ্ণতায় মাখা। নীল রঙের ওপর গোলাপি বুটিদার ঢাকাই জামদানির কুঁচিটা এক হাতে ধরে মেহুলি অয়নকে তাড়া দিল, “কী রে, চল…?”
অয়ন গরমে ক্লান্ত। তার রানী কালারের জামদানি কাজের পাঞ্জাবীর গায়ে ফুটে উঠেছে ঘামের ছোপ। ক্লান্তি নিয়ে বলে, “তুই আমাকে প্রায় দু’ কিলোমিটার হাঁটালি, সেই আহিরীটোলা না বেনিয়াটোলা থেকে হাঁটছি।”
“অয়ন, তুই কিন্তু বেজায় কুঁড়ে,” বিরক্তিভরা গলায় বলে মেহুলি।
হাসতে হাসতে অয়ন বলে, “কুঁড়েই তো, তুই না থাকলে আমার এই অগোছালো জীবনটা কবেই বোরিং হয়ে যেত। দেখ, এই গলিটার মাথায় কেমন হলুদ রঙের তারারা জেগে রয়েছে আর আমার সামনে নীল শাড়িতে তুই – সেই বিশেষ কথাটা এবার বলেই ফেলি। আমাদের প্রথম একসাথে পুজো দেখার সাত বছর পর আবার একটা অষ্টমীর রাত – ‘সহি টাইম’, তাই তো মেহুলি? আর দেরি করা ঠিক না।”
বুকের ভেতরটা কেমন যেন দুরুদুরু করে ওঠে মেহুলির।

সেই বাগবাজারের গলিপথের অষ্টমীর রাতের পর চারটে বছর কেটে গিয়েছে। এখন ওরা বিবাহিত। তবে বিয়ের পর একটাও অষ্টমীর অঞ্জলি, ভোগ খাওয়া, রাতে ঘুরতে যাওয়া – কিছুই অয়ন করেনি। সারাদিন ঘুমিয়ে, সন্ধ্যায় বারমুডা পরে বন্ধুদের আড্ডায় চলে যায়। মেহুলি একা ঘোরে অথবা হাউজিং সোসাইটির পূজামণ্ডপে মা দুর্গার কাছে গিয়ে নিজের নালিশ, কষ্ট জানায়।

তবে এবার ওরা এসেছে বাঁকুড়া জেলার ছাতনায়, অয়নের মামাবাড়ির দুর্গাপুজোয়। যদি অন্যরকম ভাবে পুজো কাটানো যায়। সপ্তমীর দুপুরের মধ্যেই ওরা চলে এসেছিল। মহাসপ্তমীর সন্ধ্যারতি শেষে ওরা বড়ুচণ্ডীদাসের বাসুলি মাতাকে দর্শন করে রাজবাড়িতে যায়। সেখানে অল্প প্রসাদ খেয়ে মামাবাড়ি। কলকাতা থেকে দূরে ভিড়, আওয়াজ, আলোর রোশনাই কিছুটা কম হলেও শিউলির তীব্র মিষ্টি গন্ধ, ঢাকের আওয়াজ, ধুনোর গন্ধ, বাতাসে হিমের পরশ পুজোটাকে যেন অনেকটা কাছে এনে দিল। মেহুলির অনেকদিন পর খুব ভাল লাগছে। অয়নের কেমন লাগছে কে জানে? মামাবাড়ির সাবেকি একচালার ঠাকুরের গায়ের রঙ শিউলি ফুলের বোঁটার মত, মাথার ওপর সাদা-লালের চাঁদোয়া, মেহুলি স্থির করে এরপর থেকে ছাতনায় চলে আসবে পুজোতে, কলকাতায় থাকলে পুরনো দুর্গাপুজোর স্মৃতিগুলো মন খারাপ করে দেয়।

অষ্টমীর দিন খুব ভোরে ঘুম ভাঙে মেহুলির। স্নান সেরে দু’পায়ে আলতা পরে। আজ অনেকদিন পর মেহুলি আর অয়ন ম্যাচিং পাঞ্জাবী আর শাড়ি পরবে, মামাবাড়ির উপহার। অষ্টমীর পুজোর জন্য ফুল গোছাতে ঠাকুর দালানে চলে যায় মেহুলি, অয়ন ঘুমোচ্ছে, যা পারে করুক। অষ্টমীর অঞ্জলি শুরু হবে, আঁচলটা দিয়ে আলতো ঘোমটা দিতে গিয়ে চেনা পারফিউমের গন্ধ ধাক্কা মারে – অয়ন! স্নান সেরে সাদার ওপর লাল বুটিদার পাঞ্জাবীতে। বিস্মিত মেহুলির হাতে দিয়ে দেয় ফুল, বেলপাতা। মেহুলি চোখ বন্ধ করে।
অষ্টমীর অঞ্জলি ওদের শেষ, অয়ন ডাকে, “মেহুলি দাঁড়া।” চারপাশে লোকজন, এসব আবার কী? নাটমন্দিরের থামের আড়ালে গিয়ে দাঁড়ায় মেহুলি, একটু সরে চারদিকটা দেখে মেহুলির হাতটা নিজের মুঠোয় নেয় অয়ন। সবার সামনে ছটফটিয়ে ওঠে মেহুলি। “এ কী! সবাই দেখছে।”
“দেখুক। কিচ্ছু যায় আসে না। তোকে কথা দিয়েছিলাম প্রতি বছর অষ্টমীর রাতে তোর সঙ্গে উত্তর কলকাতার ঠাকুর দেখব, আর ক্লান্ত হলে তোর কাঁধে মাথা রাখব।”
চশমাটা ডান হাতের তর্জনী দিয়ে একটু ঠেলে দেয় অয়ন। মেহুলির চোখে সামনে ভেসে ওঠে হলুদ রঙের আলোমাখা বাগবাজারের গলিপথ, অয়নের কাতর গলাটা আবার কানে যায়, মেহুলির চোখের সামনে থেকে মায়াবী অষ্টমীর রাতটা মুছে যায়। শোনে, অয়ন বলছে, “বিয়ের পর তোকে পেলাম আর সব প্রমিস ভুলে গেলাম। চ, আবার নতুন করে একসঙ্গে পুজো দেখা শুরু করি, আবার সেই প্রেমিক-প্রেমিকা হয়ে যাই।”

চারদিকটা যেন হঠাৎ বড্ড শান্ত হয়ে গেল, ঢাকের আওয়াজ, অঞ্জলির মন্ত্রোচ্চারণ, সন্ধিপুজোর তোড়জোড় ফিকে হয়ে যায়। শুধু শাশ্বত হয়ে জেগে থাকে অয়নের চোখের ঐ স্থির ছবিটা আর মুঠো করা হাতের উষ্ণতা।
ঠাকুরদালানে হেসে ওঠেন মা।


লেখক পরিচিতি : অদিতি চ্যাটার্জি
আমি অদিতি চ্যাটার্জি অল্প কিছু গল্প লিখেছি, শব্দ রেণু প্রকাশনী তাদের বৈশাখের ত্রৈমাসিক সংখ্যা য় আমার একটা লেখা প্রকাশ হয়েছে " আহ্লাদিনী রাধে " বলে। পাঠক হিসাবে আমার সব ধরনের লেখা পড়তে ভালো লাগে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up