বিশ শতকের বাংলা কবিতায় অতীন্দ্রিয় জগৎ

লেখক : রাজশ্রী ঘোষ

বিশ শতক বাংলা কাব্য সাহিত্যের ইতিহাসে কালের ঝড়ো হাওয়ায় বহমান বন্ধনহীন পাগলপারা নৌকায় পাল তুলে দিয়েছিল।
বিশ শতকের কবিদের চোখে অতীন্দ্রিয় জগত ধরা পড়েছে সমসাময়িক ভাবেই কালের চেতনার মধ্যে দিয়ে। কবি চিত্তের রসনার মধ্য দিয়েই অতীন্দ্রিয় সত্তার দ্বারোদ্ঘাটন ঘটিয়ে কাল চেতনার প্রবহমান ধারা যুগস্রোতে বহমান। অতীন্দ্রিয় লোকের রূপ ও রহস্য, আধ্যাত্ম সাধনার বেদনায় কবিতাগুলি আলোক মন্ডিত হয়ে উঠেছে।
বিশ শতকের কাব্য সাহিত্যের ইতিহাসে সিংহ দ্বারোদঘাটন ঘটিয়ে যিনি আমাদের মধ্যে অনন্ত কাব্যের সম্ভার উপহার দিয়েছিলেন তিনি হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বরাবরই অমৃতের সন্ধানে রবি ঠাকুরের জীবন-মৃত্যু অখন্ড বোধে সমন্বিত। অমৃতের উৎস সন্ধানে উপনিষদিক মন্ত্রে বিশ্বাসী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে জীবন, মৃত্যু নয় অমৃতত্ব লাভেই জীবনের চরম কথা।

তিনি অতীন্দ্রিয় জগতের বাস্তবতার ঊর্ধ্বে অন্তর্গূঢ় ধারণাকে রূপ থেকে অরূপ, সীমাকে যেন অসীমের বোহেমিয়ান স্রোতে ভাসিয়ে অন্তর্গূঢ় কালের যাত্রার দিকে টেনে নিয়ে গেছেন।
“আমি পথিক পথ আমারি সাথী
… … … … … … … …
যত আশা পথের আশা
পথে যেতেই ভালোবাসা,
পথে চলার নিত্যরসে
দিনে দিনে জীবন ওঠে মাতি।”
এই কবি চিত্তের রস-বৃত্তিতে খন্ডের সঙ্গে পূর্ণের, ব্যক্তি জীবনের সঙ্গে বিশ্ব জীবনের স্রোতের আনুকূল্যে তিনি আকণ্ঠ ডুব দিয়েছেন। এবং সেই অভিজ্ঞতা অতীন্দ্রিয় সত্তার সঙ্গে মিশ্র জগতের বাস্তবতার গূঢ় ধারণাকে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাবে আমাদের হৃদয়ে মনের মনিকোঠায় গেঁথে দিয়েছেন।

অতীন্দ্রিয় জগৎকে সুনিপুণভাবে ব্যাখ্যা করেছেন ঋষি সুলভ দৃষ্টিতে, যার মাধ্যমে আনন্দ রূপকে উপলব্ধি করেছেন। কবি পরিপূর্ণ মানব মহিমার সঙ্গে একাত্ম হয়ে অখন্ড নিসর্গানুভূতিকে কাব্য সাহিত্যের অতীন্দ্রিয় জগতে বর্তমান বাঙালি জীবনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আমরা বলতে পারি যে, আমাদের জীবনের পঙ্গুতা, গর্বতা, দৈন্যতা তাঁর হৃদয়ের অন্তস্থল আঁচড় কেটেছে।

কথা (১৯০০) ও ক্ষণিকা (১৯০০) গ্রন্থকে কবির যে জীবন তাকে জীবনের সন্ধিক্ষণের যুগ বলা যায়। তাঁর কবি চিত্তের রসবোধের সাধনা যে কালের পর কাল এবং যুগের পর যুগ ধরে সৌন্দর্যতা ছিল, তন্ময়তা ছিল, নিসর্গ সাধনা ছিল তা মন্থর গতিতে নৈসর্গিক চিত্তে অতীন্দ্রিয় জগতে জীবনকে উপলব্ধি করবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে।

এই প্রসঙ্গে আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা’কনিকা (১৯০০)’উল্লেখ করতে পারি। এখানে আমরা দেখতে পাবো যে ‘কনিকা’-র অধিকাংশ কবিতা ক্ষুদ্র। এর প্রেরণা অনেকক্ষেত্রেই বাস্তবতার গূঢ ধারণা থেকে অতীন্দ্রিয় জগতের সীমাকে যেন অসীমের দিকে টেনে নিয়ে গেছেন –
“ওগো মৃত্যু, তুমি যদি হতে শূন্যময়
মুহূর্তে নিখিল তবে হয়ে যেত লয়”।

কবির ধ্যানমগ্ন অতীন্দ্রিয় জগত সত্তার গভীরতম জীবনের ধ্যান ‘কল্পনা’ (১৯০০) কাব্যগ্রন্থ এ লক্ষ্য করা যায়। এবং সেই জীবনে অতীন্দ্রিয় জগতের আলোকে যে পরিণতি তা আমরা ‘নৈবেদ্য (১৯০২)’কাব্যগ্রন্থ লক্ষ্য করতে পারি। যে তপস্যাক্লিষ্ট জীবনের দুর্বলতা তাঁকে বারবার টেনেছে এবং তিনি সেই জীবনকে দমকা ঝোড়ো হাওয়ায় দরজা পড়ার মতো ঠেলে সরিয়ে দিয়েছেন এবং অতীন্দ্রিয় জগতের পরিমণ্ডলে রূপ থেকে অরূপের সন্ধানে নিমজ্জমান হয়েছেন এবং ব্যঙ্গ করে বলেছেন-
“আমি হবো না তাপস।”
কিন্তু সেই আপাতচটুল ও ব্যঙ্গের ভিতর দিয়ে বিগত জীবনের বিরহের কি মর্মান্তিক অসহনীয় বেদনা কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে তা তিনি গোপন করতে পারছেন না । ‘ক্ষণিকা’য় কবি ক্ষণকালের জন্য অতীন্দ্রিয় জগতকে উপলব্ধি করে সহজ সাধনার পথে নেমেছেন।

তাই আমরা ভেবেছিলাম ‘গীতাঞ্জলি (১৯১১)-গীতিমাল্য (১৯১৪)-গীতালি (১৯১৫)’ কবি চিত্তের প্রবহমান স্রোতে রসবোধের আত্ম নিমজ্জিত করে অতীন্দ্রিয় জগতের কাল দন্ডে আত্মসমর্পনে এই তার আশ্রয়স্থল হবে। কিন্তু, প্রকৃতির সমন্বয় চিরচঞ্চল, চির-পথিক কবি চিত্ত অধ্যাত্ম উপলব্ধির অতীন্দ্রিয় জগতের বাস্তবতার অতিরিক্ত গুঢ ধারণায় জীবন থেকেই মহাজীবন, রূপ থেকে অরূপ, সীমা থেকে অসীমের পথে বিশ শতকে নতুন কাব্য সাহিত্যের ইতিহাসে এক যুগের সূচনা করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

কবি অতীন্দ্রিয় জগতের সত্তাকে উপলব্ধি করে আমরা ডঃ দেবেশ কুমার আচার্য এর ভাষায় বলতে পারি ‘অধ্যাত্ম জীবনের দাঁড়িয়ে কবির পক্ষে বলা সম্ভব হল :”বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি, সে আমার নয়/অসংখ্য বন্ধন মাঝে মহানন্দময় লভিব মুক্তির স্বাদ”।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর আমরা বিশ শতকের বাংলা কাব্য সাহিত্যের ইতিহাসে যার কথা বলতে পারি তিনি হলেন জীবনানন্দ দাশ। ‘ধূসর পান্ডুলিপি’ (১৯৩৬) কাব্যের অন্তর্গত ‘বোধ’ কবিতার শুরুতেই আমরা দেখতে পাই কবি অতীন্দ্রিয় জগতের সত্তাকে উপলব্ধি করেছেন। কবি চিত্তের দ্বিধা ও অনিকেত মনোভাবকে স্পষ্ট করেছেন —
“আলো অন্ধকারে যাই – মাথার ভিতরে/ স্বপ্ন নয় – কোন এক বোধ কাজ করে”
অর্থাৎ, এ বোধ সবার হয় না যার হয় সেই জানে দুঃসহ যন্ত্রণা কত মর্মান্তিক কতটা অসহনীয় অথচ এর স্বাদ সবাই গ্রহণ করতে চায় কারণ, রবীন্দ্রনাথের ‘গুপ্তধন’ছোটগল্পে যেমন হাজার সোনা মণিমাণিক্য পেয়েও বন্ধ গুপ্ত ঘর থেকে বের হবার জন্য কাকুতি-মিনতি করেছে তেমনি হাজার দুঃখ কষ্ট আছে জেনেও কবি অবরুদ্ধ জীবনের গতিকে অতীন্দ্রিয় জগতে এর দিকে ঠেলে দিয়েছেন বান আসা উথালপাতাল করা নদীর মতো। সবকিছু ভেসে গেলেও যেমন নদীর তীরগুলি আবার আগের মতো প্রাণবন্ত সচ্ছল থাকে ঠিক তেমনি ভাবে কবি অতীন্দ্রিয় জগতকে উপলব্ধি করতে চেয়েছেন সহস্র কষ্ট সহ্য করেও।

আবার আমরা বলতে পারি যে, ‘মহাপৃথিবী (১৯৬৯)’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতাতে কবি অতীন্দ্রিয় জগতের দ্বারোদঘাটন ঘটিয়েছেন। এবং এ কবিতায় দেখা যাচ্ছে যে একটা মানুষের যা পাওয়ার থাকে নারীর হৃদয়, প্রেম, শিশু, গৃহ, অর্থ সবি সে পেয়েছে কোন হাড় হিম করা শীতে তাকে কাঁপতে হয়নি, তবুও সে আত্মহত্যা করল। এইযে অতীন্দ্রিয় জগতে নিজেকে উপলব্ধি করার চৈতন্য বোধ জেগে উঠেছিল। তাই কবি বলেছেন—
“প্রেম ছিল, আশা ছিল – জ্যোৎস্নায় তবু সে দেখিল”
হঠাৎ করেই জ্যোৎস্নায় যে লোকটির চৈতন্য বোধ জেগে উঠলো যাকে আমরা বলি ভূত দেখা। কবি বলেছেন–
“কোন ভূত? ঘুম কেন ভেঙে গেল তার?
কবি ও তাই বলছেন জ্যোৎস্না একটা মায়াবী জাল যা আমাদের মোহ গ্রস্ত করে রাখে।

এইযে বাস্তব জগতে এর গুঢ ধারণা থেকে আমরা বাস্তবতার বাইরে সমস্ত মোহ, কাম ত্যাগ করে জীবন থেকে মহাজীবনের পথে অগ্রসর হতে চাই এবং নদীর পার যেমন বেশি দিন স্থায়ী হয় না ধীরে ধীরে ধসে যায় ঠিক তেমনই কবি ও মোহ, কাম, রিপু, কামিনী-কাঞ্চন ত্যাগ করে কাল দণ্ডের বিপাকে দাঁড়িয়েও অতীন্দ্রিয় জগতে নিমজ্জিত হতে চেয়েছেন।
“তোমার বুকের থেকে একদিন” কবিতায় আমরা দেখতে পাই এবং তরুণ মুখোপাধ্যায় এর ভাষায় বলতে পারি যে “কবি সৌন্দর্যের মধ্যে বিলীন হওয়ার ইচ্ছা জানাচ্ছেন ‘মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে’।

আমরা আবার বিশ শতকের কাব্য সাহিত্যের ইতিহাসে অতীন্দ্রিয় জগতের অনুসারী হিসাবে অমিয় চক্রবর্তীর মতো যুগান্তকারী ব্যক্তিকেও পাই।
একটু লক্ষ্য করলেই দেখতে পাবো যে আধুনিক কবি বিশ শতকের কান্ডারী অমিয় অমিয় চক্রবর্তী ‘এপার’ কবিতায় বলেছেন—
‘দেখলাম দু’চক্ষু ভরে; হে প্রভু ঈশ্বর মহাশয় চৈতন্যে প্রসন্ন সূর্য।’
এখানে তিনি কখনো কখনো প্রমাণ করতে চেয়েছেন অতীন্দ্রিয় জগত সত্তার মধ্যে যে ঈশ্বরচেতনা কিন্তু সব সময় যেই উত্তীর্ণ হয়েছে তা নয় মাঝে মাঝে হয়তো তত্ত্বগত দিক থেকেও বিকেন্দ্রিত হয়ে ওঠে।
কিন্তু তিনি যে অতীন্দ্রিয় সত্তাকে গভীরে নিমজ্জিত হয়েছে নিরবতার স্থির বিন্দুতে প্রত্যাদেশ পেয়েছেন তুলনামূলক ভাবে বলা যায় যে, মধ্যযুগের কবিরের উপলব্ধি এবং আমাদের অগোছালো জীবনের ভুল ভ্রান্তি, বৈষম্য কে সমাহিত করে কবি অমিয় চক্রবর্তী বাস্তবতার ঊর্ধ্বে নির্জ্ঞান অতীন্দ্রিয় জগতকে উজ্জ্বলতম আলোক মন্ডিত করে মন্ত্র উচ্চারণ করেন
“মধুর কো – রকে মুকুল রাশি, কমল দল নেই”।
তথাকথিত মানব চৈতন্য কে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি অলৌকিকের বিশ্বাসের থেকে বিশ্ব লোকের মধ্যে অতীন্দ্রিয় জগতের সত্তাকে উপলব্ধি করেছেন—‘পদাবলী’কবিতায় দেখতে পাই–
“পায়ের ছাপ কি দেখেছ ধুলোতে/ঠাকুর ঘরের পথে যেতে মাপ/কখনো মেয়ের, কখনো যে বাঁকা/শিশুর চরণ গেছে আঁকা বাঁকা/কত অসংখ্য তারি আনাগোনা সাক্ষাৎ ভগবান”।
কবি মানুষের মধ্যেই অতীন্দ্রিয় জগতকে উপলব্ধি করতে চেয়েছেন যেমনভাবে নদীতে স্রোত যেদিকে থাকে সেদিকে হাওয়া থাকলে নৌকো সেদিকে ছোটে তেমনি কবি ও অলৌকিক ঈশ্বরে বিশ্বাসী নয় তিনি অতীন্দ্রিয় জগতকে মানবতার বিশ্বলোকের মাধ্যমেই ছোঁয়ার চেষ্টা করেছেন।

অমিয় চক্রবর্তীর অস্তিত্বশীল চৈতন্য কেই মানবিকতার অতীন্দ্রিয় জগতের পদক্ষেপ বলা যেতে পারে
“………… এই চেতনার কথা বলেছিলেন হার্ডি, consciousness the will informing till it fashion all things fair! যতটা পারা যায় জগত কারণকে নিজের কারণ করে নেওয়া – দায়িত্ব তো এটাই।………….”(প্রবাল দাশগুপ্তকে দেওয়া সাক্ষাৎকার/কবিতীর্থ: ফেব্রুয়ারি ২০০২)
অমিয় চক্রবর্তীও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো সীমাকে যেন অসীমের দিকে টেনে নিয়ে গেছেন আমরা সিদ্ধান্ত করতে পারি।

তথ্য সূত্র —
১)প্রবন্ধ বিচিত্রা — ডক্টর দেবেশ কুমার আচার্য
২)কবি জীবনানন্দের অনুভবে ও অনুধ্যানে–তরুণ মুখোপাধ্যায়
৩) বাঙালি কবির ঈশ্বর ভাবনা (তৃতীয় অধ্যায়)

লেখক পরিচিতি : রাজশ্রী ঘোষ
রাজশ্রী ঘোষ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ পাঠরতা।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন
  •  
  •  
  •  
  •  

2 Comments

  1. অজ্ঞাতনামা কেউ একজন

    বিশ শতকের বাংলা কবিতায় অতীন্দ্রিয় জগৎ নিয়ে লেখাটি আরও একটু পরিসরের দাবিদার।লেখাটি ভালো, কিন্তু শেষ অবধি এটি একটি গবেষণা পত্রের মত অ্যাকাডেমিক লেখায় পরিণত হয়েছে। লেখকের নিজস্ব কোনো বার্তা পাওয়া যায়নি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।