ক্ষুধা

লেখক : অর্দ্ধেন্দু গায়েন

কবিরাজ বুড়ো এবং তার স্ত্রী করুণা দেবী দু’জনেই বয়সের ভারে ন্যুব্জ। একদিন ভোরবেলা হঠাৎ বুড়োটা চলে গেল না ফেরার দেশে। চিৎকার করে কান্নাকাটি করার মত বয়স আর নেই করুণা দেবীর। পুকুরের পাড়ে খড় দিয়ে ছাওয়া ছোট্ট একটি অন্ধকার ঘরে বুড়ো-বুড়ির সাধের সংসার। ঘরের পাশে দিবারাত্রি দণ্ডায়মান শিরিষ গাছটির বুক ভেঙে বেরিয়ে আসে কান্না, ওদের অসহায়তা, ওদের যন্ত্রণায়। অনতিদূরে ছেলে-বউয়ের দু’কামরার ঘর। শেষ বয়সেও আলাদা রান্না করে খেতে হয় মা-বাবাকে। ছোট্ট গোপালকে যে দরিদ্র বাবা-মা তাদের স্নেহ,মায়া, মমতা, ভালবাসায় বড় করে তুলেছিলেন, সেই গোপাল আজ বড়ই অসহায়।

ক্রমে বেলা বাড়তে থাকে। সারাদিন কায়িক পরিশ্রম করে ছেলেটা ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরি করে, তা করুণা দেবীর অজানা নয়। তাই ভোর থেকেই মৃত স্বামীকে আগলে দু’চোখের পাতা এক করে, স্বপ্নকে অবলম্বন করে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন যৌবনের দীপ্তিতে উজ্জ্বল স্মৃতির অরণ্যে। বহুদিন অনাহারের মধ্যে কাটিয়েছেন দু’জনে। ছেলে-বৌমা এই বুঝি এসে বলবে, ‘মা, বাবা, এসো কিছু খেয়ে নাও।’ দীর্ঘদিন এই স্বপ্ন বুকে নিয়ে উপবাসী দুটি হৃদয় ঘুমিয়ে গেছে সুদীর্ঘ রাতের গভীরে।

এবারে বৃদ্ধা ধীরে ধীরে উঠে এসে দাঁড়ালেন ছেলের ঘরের সামনে। মৃদু স্বরে বললেন, ‘খোকা তোর কাছে আমাকে আসতেই হ’ল। যাবি না? তোর বাপ যে মরেছে।’ চোখে জল না থাকলেও দেখা গিয়েছিল তীব্র এক যন্ত্রণার স্পষ্ট ছাপ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে উৎসুক জনতার ভিড় আর চাপা কোলাহল, ‘কী যেন একটা রোগে ভুগছিল বুড়োটা?’

লম্বা ঘোমটার আড়াল হতে বৃদ্ধা উত্তর করলেন, ‘খিদে’।


লেখক পরিচিতি : অর্দ্ধেন্দু গায়েন
জন্ম উত্তর চব্বিশ পরগনার যোগেশগঞ্জের মাধবকাটী গ্রামে।পেশায় সরকারী চাকুরী হলেও নেশা পড়াশোনা , ইচ্ছে হলেই লেখা-সে কবিতা, ছোটগল্প, অণুগল্প, প্রবন্ধ যা কিছু হতে পারে, অবসরে বাগান করা,ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাদের সঙ্গে খেলা ইত্যাদি।তবে সব পরিচয়ের সমাপ্তি ঘটে সৃষ্টিতে --পাঠক যেভাবে চিনবেন আমি সেভাবেই থেকে যাবো।

One comment

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up