হাসনাবাদ লোকাল

লেখক : অর্দ্ধেন্দু গায়েন

রোজ একই ট্রেনে চেপে প্রায় দশটা পঞ্চাশ নাগাদ বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়, বছর তিরিশের যুবক শিক্ষক, শ্রী পল্লব সেন। ছেলেবেলা থেকেই পড়াশুনায় বেশ মনোযোগী। গত তিন-চার বছর ট্রেনে যাতায়াতের সূত্রে একজনকে তার খুব মনে ধরেছিল। সামনাসামনি বসলেও কোনদিন কথা বলা হয়ে ওঠেনি দু’জনের। বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজেই সারাটা সময় কেটে যেত মায়া’র। এমনকি পল্লব কোনদিন ভদ্রমহিলার মুখটি ভাল করে দেখতে পায়নি চর্মচক্ষে। কাজীপাড়া স্টেশনে, মানুষের ভিড় ঠেলে সে নেমে যেত। তার যাওয়ার দৃশ্যের সেই পরিচিত ছবি মনের মধ্যে নিয়ে অগত্যা তাকেও নামতে হত বারাসাত স্টেশনে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের জায়গা থেকে উঠে পড়ত পল্লব। তারপর সেই একই কাজ, প্রত্যেক দিনের মত হাজারো ভিড়ের গভীরে হারিয়ে যেত তার রঙীন ভাবনাগুলো।

বাইশ-তেইশ বছরের যুবতী, বনফুলের মত নরম, সুন্দরী। ভোরের প্রথম আলোর মত সোনালী আভায় প্রজ্জ্বলিত। দূর থেকে দেখা যায়, ছোঁয়া যায় না। আলতা পরা দু’টি সুন্দর পা দেখে মন কেবলই তার মুখখানি দেখবার অভিপ্রায়ে থাকে। যার চরণ দু’টি কোমলের ন্যায় এত সুন্দর, না জানি তার মুখমণ্ডল আরও কত রমণীয় হবে। এই সমস্ত ভাবনা বেশ কয়েকদিন ধরে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল পল্লবকে। বাড়ি ফেরার পথে রোজ তার চোখদু’টি তাই খুঁজে বেড়াত ‘মায়া’কে। কোনও দিন তার দর্শন পেয়ে মনের সুখে তাকে দেখতে দেখতে বাড়ি ফিরত, আবার কোনও দিন একবুক শূন্যতা নিয়ে ক্লান্ত শরীরে ধীরে ধীরে হাসনাবাদ স্টেশনে নেমে মিলিয়ে যেত অন্ধকারের নিচে।

আজকাল মায়া’কে আর দেখতে পায় না পল্লব। আগের মত বাঁধাধরা রুটিন করে আর কেউ বসে না পল্লবের চোখের আগে। রোজ নতুন নতুন মুখ এসে ভিড় করে। চোখ ভিজে যাওয়ার যন্ত্রনা কাউকে শেয়ার করতে পারে না সে। আজ বাড়ি ফেরার পথে চোখটা একটু লেগে এসেছিল তার। স্বপ্নের মাঝে হাজারো মান-অভিমানের গণ্ডি পেরিয়ে অবশেষে ট্রেন থামল। চোখ খুলে অন্ধকারের হালকা আলোতে পল্লব দেখে— নিঃসঙ্গ একটি হাত, হাতড়ে বেড়াচ্ছে তার হারিয়ে যাওয়া অবলম্বন। এই প্রথম মায়াকে হালকা আলোতে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখল পল্লব।

যার স্পর্শসুখের জন্য পল্লব ভিতরে ভিতরে জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছিল, সে আজ তার চোখের সামনে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে। হালকা আকাশী রঙের টপ পরিহিত সুন্দরী মেয়েটি চমকে উঠল অপরিচিত হাতের স্পর্শে।
“আ-আমি পল্লব।” মায়ার পড়ে যাওয়া লাঠিটা সামনে ধরে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “আপনি বোধহয় এটাই খুঁজছিলেন?”
“হ্যাঁ… না মানে বলছিলাম, আমাকে একটু নামিয়ে দেবেন পল্লব বাবু?”
গভীর যন্ত্রণার মধ্যেও একটু হাসি দিয়ে পল্লব বলল, “হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। চলুন আমি আপনাকে ছেড়ে দিচ্ছি।”

মনের মধ্যে অনেক প্রশ্নেরা ভিড় জমালেও কথা হয়ে বাইরে আসতে পারে না ওরা। সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে মায়া মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। পল্লবের সঙ্গে চোখের জল আর এক বুক যন্ত্রনা নিয়ে একাকী দাঁড়িয়ে হাসনাবাদ লোকাল।


লেখক পরিচিতি : অর্দ্ধেন্দু গায়েন
জন্ম উত্তর চব্বিশ পরগনার যোগেশগঞ্জের মাধবকাটী গ্রামে।পেশায় সরকারী চাকুরী হলেও নেশা পড়াশোনা , ইচ্ছে হলেই লেখা-সে কবিতা, ছোটগল্প, অণুগল্প, প্রবন্ধ যা কিছু হতে পারে, অবসরে বাগান করা,ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাদের সঙ্গে খেলা ইত্যাদি।তবে সব পরিচয়ের সমাপ্তি ঘটে সৃষ্টিতে --পাঠক যেভাবে চিনবেন আমি সেভাবেই থেকে যাবো।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up