এক রাজকীয় অভিমান ও বারো দেবতার মিলনক্ষেত্র : বারদোলের মেলা

লেখক : সৈকত প্রসাদ রায়

নদীয়ারাজ কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ী কেবল ইঁট-পাথরের স্থাপত্য নয়, এক কালজয়ী প্রেম, অভিমান আর ঐতিহ্যের সজীব দলিল। চৈত্রমাসের শুক্লপক্ষে একাদশী তিথি আসতেই এই প্রাঙ্গণে যেন এক অলৌকিক আনন্দের বন্যা নামে, যা ‘বারদোলের মেলা’ নামে পরিচিত। এটি কেবল একটি মেলা নয়, এটি নদীয়ার ইতিহাসের এক ঝলমলে অধ্যায়, এক রাজমহিষীর অপূর্ণ ইচ্ছাপূরণের সুমিষ্ট ফল।

জনশ্রুতি: যে অভিমান জন্ম দিল উৎসবের

কথিত আছে, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের হৃদয় জুড়ে ছিলেন দুই মহিষী। দ্বিতীয়া মহিষী, যাঁর রূপ আর গুণ নিয়ে রাজবাড়ীর বাতাসেও ফিসফিসানি, শিবনিবাসের প্রতিষ্ঠাফলক যাঁকে ‘মুর্ত্তেব লক্ষ্মীঃ স্বয়ং’ —স্বয়ং মূর্তিমতী লক্ষ্মীর সঙ্গে তুলনা করেছে। এমন রূপবতী, গুণবতী মহিষীকে মহারাজা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, উলায় (আজকের বীরনগর) নদীয়ারাজ রাঘব রায় নির্মিত মনোহর জলবাটিকায় কয়েকটা দিন একান্তভাবে কাটাবেন। রাজকীয় প্রমোদ, রাজকীয় বিশ্রাম। কিন্তু রাজকার্যের জটিল জাল, প্রজাপালনের গুরুভার – রাজার তো আর অবসর মেলে না। সময়ের হাতে বাঁধা মহারাজ শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারলেন না।

ওদিকে, মহিষীর মনে জমা হয়েছে এক অব্যক্ত অভিমান। তিনি দেখতে চেয়েছিলেন উলার ‘জাতের মেলা’। কিন্তু রাজবাড়ীর অন্দরমহলে আবদ্ধ, কুলবধূর পক্ষে সেই উন্মুক্ত মেলা দেখা ছিল একরকম অসম্ভব। বারবার তাঁর সাধ অপূর্ণ থেকে গেল। এই অপূর্ণতার বিষাদ, এই চাপা অভিমান—যা কি না লক্ষ্মীমূর্তির মত মহিষীর চোখে জল এনেছিল—তা কি আর মহারাজ সইতে পারেন? রাজার মন ব্যাকুল হ’ল। তিনি বুঝলেন, তাঁর কর্তব্য এখন রাজমহিষীর মন রক্ষা করা, তাঁর অভিমানের অবসান ঘটানো।

ফলে, যে মেলা দূর ছিল, যে আনন্দ ছিল নাগালের বাইরে, তাকেই মহারাজা টেনে আনলেন রাজবাড়ীর সীমানায়। কৃষ্ণনগরে তিনি প্রবর্তন করলেন এক নতুন উৎসব, এক বিশেষ মেলা, যা রাজবাড়ী থেকেই দেখা যাবে, উপভোগ করা যাবে। রাজমহিষী এবং অন্যান্য অন্তঃপুরবাসিনীরা, যাঁরা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকার বিধিনিষেধে বাঁধা, তাঁদের আনন্দদানের জন্যই জন্ম নিল এই বারদোলের মেলা। অনুমান করা হয় যে, ১৭৬৩ খ্রিষ্টাব্দে কৃষ্ণচন্দ্র রাজবাড়িতে ফেরার পর ১৭৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বারদোলের মেলার প্রবর্তন করেন। এটি কেবল উৎসব নয়, এক রাজকীয় প্রেমের নির্দশন, যেখানে রাজার কাজ কেবল রাজ্য জয় নয়, রানীর মন জয়ও বটে। এই জনশ্রুতি যেন চৈত্র মাসের বাতাসে রাজার ভালবাসার বিজয়ের কাহিনী হয়ে আজও অনুরণিত হয়।

নামকরণ: বারো দেবতার লীলাখেলা

নাম নিয়ে যদিও একটি লোকভ্রান্তি প্রচলিত আছে, যে এটি দোল পূর্ণিমার ১২ দিন পরে হয়, তাই ‘বারদোল’। কিন্তু ইতিহাসের পাতা অন্য কথা বলে। এ নাম আসলে কোন সময় গণনার হিসেব নয়, বরং দেবদেবীর এক পবিত্র সমাবেশের নাম।

এই মেলা ছিল স্বয়ং নদীয়ারাজের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রবর্তিত। আর এখানে মূল কুলবিগ্রহ, স্বয়ং বড়নারায়ণের সঙ্গে আসতেন আরও বারোটি কৃষ্ণ বিগ্রহ! এই বারোটি বিগ্রহ নদীয়ারাজের দ্বারা বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত ও নিত্যপূজিত হতেন। মেলার সময় আসত সেই মহেন্দ্রক্ষণ, যখন এই বারো দেবতা মহাসমারোহে নিজ নিজ স্থান ছেড়ে, শত শত ভক্তের জয়ধ্বনি আর পালকির শোভাযাত্রায় কৃষ্ণনগরে রাজবাড়ীতে এসে সমবেত হতেন। তিন দিন ধরে রাজবাড়ীর সুসজ্জিত চাঁদনী বা নাটমন্দিরে তাঁদের পূজার্চনা চলত।

আসলে, ‘বারো দোল’ নয়, এই নাম ‘বারোটি বিগ্রহের দোল’! বারো দেবতার মিলনক্ষেত্র এটি। সেই বারোটি বিগ্রহের পুণ্য সমাগমই এই মেলাকে এক অসাধারণ মাহাত্ম্য দিয়েছে। তাই তো, এ মেলা আজও ‘বারদোলের মেলা’ নামেই অমর।

বারো বিগ্রহের মহিমাময় উপস্থিতি

বারদোলের মেলা হ’ল এক স্বর্গীয় দৃশ্য। বড়নারায়ণকে কেন্দ্র করে এই বারোটি কৃষ্ণ বিগ্রহের সমাবেশ ঘটে। প্রতিটি বিগ্রহই নদীয়ারাজের দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত, প্রতিটিই কোন না কোন অঞ্চলের প্রাণের ঠাকুর। তাঁরা হলেন বলরাম, শ্রীগোপীমোহন, লক্ষ্মীকান্ত, ছোটনারায়ণ, ব্রহ্মণ্যদেব, শান্তিপুরের অদূরে সুত্রাগড়ের গড়ের গোপাল, অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ, নদীয়া-গোপাল, তেহট্টের কৃষ্ণরায়, স্বয়ং কৃষ্ণচন্দ্র, শ্রীগোবিন্দদেব, এবং মদনগোপাল। এই বারোটি বিগ্রহ বিরহী, শান্তিপুর, সুত্রাগড়, নবদ্বীপ, অগ্রদ্বীপ, তেহট্ট, বহিরগাছি—নদীয়ার নানা প্রান্ত থেকে আসেন। এই দেবসমাবেশ এক মাস ধরে স্থায়ী হত। প্রথম তিন দিন তাঁরা থাকতেন রাজবাড়ীর নাটমন্দিরে। তারপর, রাজবাড়ীর দক্ষিণ দিকের ঠাকুরদালানে কুলবিগ্রহ বড়নারায়ণের সঙ্গে একমাস ধরে বিরাজ করতেন। একমাস পর, আবার মহাসমারোহে তাঁদের নিজ নিজ স্থানে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হত।

যদিও সময়ের স্রোতে এখন আর সব বিগ্রহ রাজবাড়ীতে না এলেও, ভক্তদের হৃদয়ে এই বারো দেবতার এককালীন সমাবেশের স্মৃতি আজও অম্লান। তাই উৎসবের নাম আজও ‘বারদোলের মেলা’।

তিন দিনের তিন বেশ

এই মেলার এক বিশেষ আকর্ষণ হ’ল বিগ্রহের বেশ পরিবর্তন। এই তিন দিন বিগ্রহগুলি পৃথক পৃথক মঞ্চে রাখা হয় এবং প্রতিদিন তাঁদের বেশভূষা হয় ভিন্ন ভিন্ন:

প্রথম দিন রাজবেশ: এ যেন রাজকীয় ঐশ্বর্য আর ক্ষমতার প্রতিরূপ। অতীতে সোনার অলঙ্কার আর বহুমূল্য পোশাকে সজ্জিত হতেন বিগ্রহেরা। যদিও আজ সেই রাজকীয় জৌলুস হয়তো কিছু ম্লান, তবুও সেই রাজকীয় মহিমা আজও ভক্তদের চোখে ভক্তির অশ্রু আনে।
দ্বিতীয় দিন ফুলবেশ: সুগন্ধি পুষ্পমাল্য আর তাজা ফুলে ঢাকা পড়ে যায় বিগ্রহের শরীর। প্রকৃতি আর দেবত্বের এক মধুময় মিলন ঘটে এই দিনে। যেন পুষ্পের সুবাসে ভরে ওঠে সমস্ত রাজপ্রাঙ্গণ।
তৃতীয় দিন রাখালবেশ: বৈপরীত্যের চরম প্রকাশ! রাজবেশের ঐশ্বর্য ছেড়ে এই দিনে তাঁরা ধারণ করেন এক দরিদ্র রাখালের বেশ। এ যেন শ্রীকৃষ্ণের মর্ত্যলীলার প্রতিচ্ছবি, যেখানে ঈশ্বর ধনী-দরিদ্রের ঊর্ধ্বে এক সাধারণ বালকের বেশে লীলা করেন।

কবি বিধুভূষণ সেনগুপ্ত তাঁর কবিতায় এই বারো দেবতার মহিমা ও বেশের বর্ণনা দিয়ে গেছেন:

“বিরহীর বলরাম, শ্রী গোপীমোহন ।
লক্ষ্মীকান্ত বহিরগাছি গুরুর ভবন ।।
নারায়ণচন্দ্র ছোট ব্রহ্মন্যদেব সহ ।
আর বড় নারায়ণ রাজার বিগ্রহ ।।
গড়ের গোপাল পেয়ে স্থান শান্তিপুর ।
অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ স্থানে ঘোষঠাকুর ।।
নদীয়ার গোপাল তবে নবদ্বীপে স্থান ।
ত্রিহট্টের কৃষ্ণরায়-অগ্রে ফল পান ।।
অত:পর কৃষ্ণচন্দ্র ; গোবিন্দদেব আর ।
উভয় বিগ্রহ স্থান-আবাস রাজার ।।
মদনগোপাল শেষে বিরহীতে স্থিতি ।
বারদোল তের দেব-আবির্ভূত ইতি ।।
হেরিলে দেবেরে হরে আধি-ব্যাধি-ক্লেশ ।
রাজবেশ ফুলবেশ রাখালের বেশ ।।
ভক্তিভরে দেবনাম করিলে কীর্তন ।
সকল পাতক নাশে শান্তি লভে মন ।।
ইতি চৈত্র শুক্ল পক্ষে শ্রীমন্ নদীয়াধীপস্য ।
প্রাসাদোদ্যানে বারদোলাবিভূর্তনাং দেববিগ্রহহানাং ।।”

এই কবিতা বারদোলের উৎসবের এক জীবন্ত চিত্র। ভক্তিতে নিমগ্ন হৃদয়ে দেবনাম কীর্তন করলে সকল পাপ, আধি-ব্যাধি, ক্লেশ দূর হয়—এই বিশ্বাস নিয়েই যুগে যুগে ভক্তেরা এই পুণ্য মেলায় আসেন।

ইতিহাসের পাতায় একাদশীর দোল

বারদোলের মেলার ঐতিহাসিক ভিত্তি কেবল জনশ্রুতিতে নয়, ধর্মীয় গ্রন্থ ‘হরিভক্তিবিলাস’-এও এর উল্লেখ পাওয়া যায়।

“চৈত্রে সিতৈকাদশ্যাঞ্চ দক্ষিণাভিমুখং প্রভৃম্।
দোলয়া দোলনং কুর্যান্নীতনৃত্যাদিনোৎসবম্।।”

অর্থাৎ, চৈত্রমাসের শুক্লা একাদশী তিথিতে দেব-দেবীকে দক্ষিণ মুখ করে দোলা দিয়ে নৃত্যগীতের মাধ্যমে উৎসব করতে হয়। গরুড় পুরাণেও এই প্রথাকে কলিযুগের জন্য নির্দেশ করা হয়েছে, একমাস ধরে দক্ষিণমুখী হরি বিগ্রহকে পূজার্চনা করে দোলনায় দোলাতে হয়। দোলযাত্রার পর এই বিশেষ একাদশীর দোল একমাত্র কৃষ্ণনগরেই মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয়। কৃষ্ণনগরের বারোদোল মেলা ২৭৯ বছরে পদার্পণ করেছে।

কৃষ্ণনগরের বারদোলের মেলা তাই কেবল একটি আঞ্চলিক উৎসব নয়। এটি এক রাজকীয় অভিমানের উপশম, বারো দেবতার ঐশ্বর্যময় মিলন এবং শাস্ত্রীয় আদেশের ফলপ্রসূ রূপায়ণ। এই মেলা নদীয়ার মাটিতে ভক্তি, প্রেম, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির এক মহামিলন ক্ষেত্র, যা আজও প্রতি বছর চৈত্র মাসে লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে আনন্দের আলো জ্বালিয়ে যায়।

তথ্যসূত্র :- “নদীয়া-কাহিনী ” – কুমুদনাথ মল্লিক।


লেখক পরিচিতি : সৈকত প্রসাদ রায়
সৈকত প্রসাদ রায় একজন লেখক, যিনি আধ্যাত্মিক ও সাহিত্যিক বিষয় নিয়ে লেখেন। তিনি সারদা মা-কে নিয়ে লিখেছেন বই “Teachings of The Holy Mother”, যেখানে সারদা মার জীবন, আদর্শ ও শিক্ষা নিয়ে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এছাড়া তিনি মাদার টেরেসা-কে নিয়ে লিখেছেন বই “The Universal Love of Mother Teresa”, যেখানে মানবতার প্রতি মাদার টেরেসার অমোঘ প্রেম এবং দয়ালু কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়েছে।এছাড়া তিনি বিভিন্ন জনপ্রিয় সাহিত্যিক গল্পগ্রন্থ রচনা করেছেন, যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো “সাতরঙা প্রেম”, যা পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে।লেখক সৈকত প্রসাদ রায় প্রতিলিপি, সববাংলা ব্লগ-সহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত লেখালিখি করেন। এছাড়া তাঁর লেখা আনন্দবাজার পত্রিকা, বর্তমান পত্রিকা এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up