নারীশিক্ষার আদি ঋষি: রাজা রামমোহন রায়

লেখক : সৈকত প্রসাদ রায়

ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা তথা ভারতের নবজাগরণের অগ্রদূত ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। তিনি ছিলেন এমন এক দূরদর্শী পুরুষ, যিনি মধ্যযুগীয় কুসংস্কারের অন্ধকার থেকে সমাজকে আধুনিকতার আলোয় নিয়ে আসার ব্রত গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর সমাজ সংস্কার আন্দোলনের একটি অবিচ্ছেদ্য এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল নারীজাতির উন্নয়ন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির সার্বিক উন্নতি তখনই সম্ভব, যখন সেই জাতির নারীরা শিক্ষিত এবং সচেতন হবেন।

রামমোহন রায়ের সময়ে বঙ্গদেশের হিন্দু সমাজ নানা কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিল। নারীদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। বাল্যবিবাহ, সতীদাহ প্রথা এবং বহুবিবাহের মত প্রথাগুলো নারীদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। সেই সময়ে হিন্দু সমাজে নারীর কোন স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ছিল না। জন্মের পর পিতা, বিবাহের পর স্বামী এবং বার্ধক্যে পুত্রের অধীনে থাকাই ছিল নারীর ভাগ্য। নারীদের কেবল গৃহকর্মের নিপুণতা এবং সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবে দেখা হত। তাদের নিজস্ব কোন মত প্রকাশের অধিকার ছিল না। অল্প বয়সে কন্যাদের বিবাহ দেওয়া ছিল তৎকালীন সমাজের অলিখিত নিয়ম। ৫-৬ বছরের কন্যাদের অনেক সময় বয়স্ক পাত্রের সাথে বিবাহ দেওয়া হত। এর ফলে সেই সব কন্যারা কৈশোর না পেরোতেই বিধবা হয়ে যেত। অন্যদিকে ‘কৌলীন্য প্রথা’-র দোহাই দিয়ে কুলীন ব্রাহ্মণরা শত শত বিবাহ করতেন। এর ফলে অনেক নারী স্বামীর মুখ পর্যন্ত দেখার সুযোগ পেতেন না, কিন্তু আজীবন বৈধব্যের কঠোর যন্ত্রণা ভোগ করতেন। যদি কোন নারী সতীদাহ থেকে বেঁচে যেতেন, তবে তাঁর জীবন হত নরকতুল্য। আমিষ আহার বর্জন, সাদা থান পরা, একাদশী পালন এবং পরিবারের সব শুভ কাজ থেকে দূরে থাকা ছিল তাঁদের বাধ্যতামূলক নিয়ম। তাঁদের অলক্ষুণে মনে করা হত। রামমোহন রায় দেখেছিলেন, এই বিধবাদের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে সমাজের এক শ্রেণির মানুষ তাঁদের ওপর চরম অবিচার করত। তৎকালীন হিন্দু সমাজে একটি বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে, “মেয়েরা যদি পড়াশোনা করে, তবে তারা বিধবা হবে।” এই কুসংস্কারের কারণে নারীদের শিক্ষার আঙিনা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। সংস্কৃত শিক্ষার অধিকার কেবল পুরুষদের ছিল, আর ইংরেজি শিক্ষা তখনও সেভাবে শুরু হয়নি। জ্ঞান ও যুক্তির পরিবর্তে সমাজ চলত কুলীন ব্রাহ্মণ ও রক্ষণশীল পণ্ডিতদের নির্দেশে। শিক্ষা তো দূরের কথা, নারীদের গৃহকোণের বাইরে আসাই ছিল নিষিদ্ধ। তৎকালীন সমাজপতিরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য হিন্দু শাস্ত্রের ভুল ব্যাখ্যা দিতেন। সাধারণ মানুষের শাস্ত্রপাঠের সুযোগ না থাকায় তাঁরা পুরোহিতদের কথাকেই ধ্রুব সত্য বলে মেনে নিতেন। নারীর বুদ্ধিবৃত্তি বা আধ্যাত্মিক উন্নতির কথা সমাজ স্বীকার করতে চাইত না। নারীদের সম্পত্তিতে কোন আইনগত অধিকার ছিল না। স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী নিঃস্ব হয়ে পড়তেন। এই অর্থনৈতিক পরাধীনতাই নারীদের চরম অসহায় করে তুলেছিল এবং তাঁদের ওপর পুরুষতান্ত্রিক শাসনকে আরও শক্তিশালী করেছিল। এই অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে রামমোহন রায় শাস্ত্রীয় প্রমাণের মাধ্যমেই প্রমাণ করেন যে, নারীশিক্ষা কোন অধর্ম নয়, বরং সমাজের উন্নতির চাবিকাঠি।

রাজা রামমোহন রায় কেবল ভাবাবেগ দিয়ে নয়, বরং গভীর পাণ্ডিত্য এবং অকাট্য শাস্ত্রীয় ও যুক্তিভিত্তিক তথ্যের মাধ্যমে নারী অধিকার ও শিক্ষার সপক্ষে তাঁর মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ১৮১৮ সালে প্রকাশিত ‘সহমরণ বিষয়ক প্রবর্তক নিবর্তক সংবাদ’ থেকে শুরু করে ১৮২২ সালে রচিত ‘নারীদের প্রাচীন অধিকারের বর্তমান সংকোচনের উপর সংক্ষিপ্ত মন্তব্য’ নামক পুস্তিকায় তিনি স্পষ্ট করেন যে, নারীশিক্ষা কোন বিজাতীয় ধারণা নয়, বরং প্রাচীন হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী এটি একটি স্বীকৃত অধিকার। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ দাবি করত যে নারীদের বুদ্ধি কম এবং তাঁরা শিক্ষার অযোগ্য। এর প্রতিবাদে রামমোহন অত্যন্ত জোরালো যুক্তি দেন। তিনি “ভট্টাচার্যের সহিত বিচার” (১৮১৭) এবং “গোস্বামীর সহিত বিচার” (১৮১৮)-এর মত গ্রন্থগুলোতেও শাস্ত্রীয় প্রমাণের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে নারীরা পুরুষদের তুলনায় কোন অংশেই কম বুদ্ধিসম্পন্ন নন। তিনি যুক্তি দেখান যে, নারীদের কোনদিন শিক্ষার সুযোগই দেওয়া হয়নি। তবে তাঁদের বুদ্ধির অভাব আছে—একথা বলা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। কোন বিষয় শেখানোর পর যদি কেউ তা গ্রহণ করতে না পারে, তবেই তাকে ‘অল্পবুদ্ধি’ বলা সাজে। তিনি প্রাচীন ভারতের বিদুষী নারী, যেমন লীলাবতী, ভানুুমতী, মৈত্রেয়ী এবং গার্গীর উদাহরণ টেনে আনেন। তিনি প্রমাণ করেন যে, প্রাচীনকালে হিন্দু নারীরা কেবল শিক্ষিতই ছিলেন না, তাঁরা দর্শনে এবং বিজ্ঞানে পুরুষদের সাথে পাল্লা দিতেন। নারীদের ‘অবিশ্বস্ত’ বা ‘চপলমতি’ বলে যে সামাজিক অপবাদ দেওয়া হত, রামমোহন তার তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, পুরুষরা সামান্য বিপদে বিচলিত হলেও নারীরা সংসারের সীমাহীন কষ্ট এবং সামাজিক লাঞ্ছনা নিঃশব্দে সহ্য করেন। সতীদাহের মত ভয়ানক প্রথার মুখেও নারীদের যে অটল ধৈর্য, তা তাঁদের উচ্চতর চারিত্রিক গুণাবলিরই পরিচয় দেয়। তিনি উল্লেখ করেন যে, পুরুষদের তুলনায় নারীরা অধিকতর ধর্মপ্রাণ এবং সত্যনিষ্ঠ। তাই তাঁদের শাস্ত্রীয় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা অধর্মের শামিল।

রামমোহন রায় জানতেন যে, অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তিনি ১৮২২ সালে ‘Modern Encroachments on the Ancient Rights of Females’ নামক প্রবন্ধে প্রাচীন হিন্দু আইন প্রণেতাদের উদ্ধৃতি দিয়ে যাজ্ঞবল্ক্য ও কাত্যায়ন সংহিতা – এই প্রাচীন সংহিতাগুলো থেকে প্রমাণ করেন যে, প্রাচীন হিন্দু আইনে স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রীর এবং পিতার সম্পত্তিতে কন্যার অধিকার স্বীকৃত ছিল। তিনি তৎকালীন সময়ের ‘দায়ভাগ’ আইনের অপব্যাখ্যার সমালোচনা করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, বিধবাদের সম্পত্তিতে অধিকার না থাকার কারণেই সমাজ তাঁদের সতী হতে বাধ্য করত অথবা তাঁরা অতি কষ্টে জীবন কাটাতেন। নারীশিক্ষার পাশাপাশি তিনি সম্পত্তিতে নারীর সমানাধিকারের দাবি তোলেন। তিনি ‘সংবাদ কৌমুদী’ পত্রিকার মাধ্যমে দরিদ্র বিধবাদের সাহায্যের জন্য আবেদন জানান এবং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে সচেষ্ট হন। তাঁর এই সমাজ সংস্কার আন্দোলনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ১৮২৮ সালে ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীকালে নারীশিক্ষা এবং নারীদের স্বাধীন চিন্তাভাবনার প্রসারে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল।

রামমোহন রায়ের চিন্তাধারায় ‘মহানির্বাণ তন্ত্র’-এর গভীর প্রভাব ছিল। তিনি এই শাস্ত্র থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলতেন, “কন্যাপি পালনীয়া শিক্ষণীয়াতি যত্নতঃ,” অর্থাৎ কন্যাকেও অত্যন্ত যত্নের সাথে পালন করতে হবে এবং তাকে শিক্ষাদান করতে হবে। তিনি প্রমাণ করেন যে, হিন্দু ধর্মশাস্ত্র অনুযায়ী কন্যাকে সুশিক্ষিত করা পিতার অন্যতম প্রধান ধর্মীয় কর্তব্য। রামমোহন যুক্তি দেন যে, মা যদি শিক্ষিত না হন, তবে একটি সুস্থ ও শিক্ষিত জাতি গঠন করা অসম্ভব। একজন শিক্ষিত নারী কেবল একজন ভাল গৃহিণীই নন, তিনি তাঁর সন্তানদের উপযুক্ত শিক্ষায় বড় করে তুলতে পারেন। পরিবারের নৈতিক মানদণ্ড ধরে রাখার জন্য নারীর শিক্ষা অপরিহার্য। তিনি বিশ্বাস করতেন, নারীরা শিক্ষিত হলে পরিবার থেকে ডাইনি প্রথা, কুসংস্কার এবং অহেতুক ধর্মীয় গোঁড়ামি দূর হবে। রামমোহনের যুক্তির মূলে ছিল মানবিকতা। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, ঈশ্বর যেখানে নারী-পুরুষ উভয়কেই সমান আত্মা ও বিচারবুদ্ধি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, সেখানে সমাজ কোন অধিকারে অর্ধেক জনসংখ্যাকে পশুর মত পরাধীন করে রাখে? তিনি ইউরোপীয় সমাজের উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছিলেন যে, নারীরা শিক্ষিত হলে সমাজ কতটা গতিশীল হতে পারে।

রামমোহন রায়ের এই যুক্তিগুলো তৎকালীন হিন্দু সমাজে এক প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তিনি কেবল আবেগ দিয়ে নয়, বরং স্মৃতিশাস্ত্র, উপনিষদ এবং যুক্তিবিজ্ঞানের মেলবন্ধনে নারী অধিকারের এক মজবুত ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। রামমোহন রায়ের দেখানো পথ ধরেই পরবর্তীতে পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বেথুন এবং কেশবচন্দ্র সেন নারীশিক্ষা আন্দোলনকে পূর্ণতা দান করেন। রামমোহন যদি সতীদাহ প্রথা বন্ধ না করতেন এবং নারীদের মানুষ হিসেবে মর্যাদা না দিতেন, তবে পরবর্তীকালে নারী শিক্ষার জোয়ার আসা অসম্ভব ছিল।রাজা রামমোহন রায় ছিলেন নারী জাগরণের প্রথম ঋষি। তিনি কেবল একজন ধর্মসংস্কারক ছিলেন না, ছিলেন এক মহান শিক্ষানুরাগী। তাঁর জীবনদর্শন আমাদের শেখায় যে, সংস্কার এবং আধুনিকতার মেলবন্ধনেই প্রকৃত অগ্রগতি সম্ভব। ভারতপথিক রাজা রামমোহন রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, “তিনি (রামমোহন) কী না করিয়াছিলেন? শিক্ষা বল, রাজনীতি বল, বঙ্গভাষা বল, বঙ্গসাহিত্য বল, ধর্ম বল, সমাজ বল, বঙ্গসমাজের যে কোন বিভাগে উত্তরোত্তর যতই উন্নতি হইতেছে, সে সকল কেবল তাঁহারই স্বাক্ষর নতুন নতুন পৃষ্ঠায় উত্তরোত্তর পরিস্ফুটতর হইয়া উঠিতেছে মাত্র।” রবীন্দ্রনাথের এই কথাগুলোর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, আধুনিক বাংলার প্রতিটি ধূলিকণায় এবং আমাদের উন্নতির প্রতিটি সোপানে রামমোহনের অবদান মিশে আছে। তিনি ছিলেন সেই প্রাতঃস্মরণীয় পুরুষ, যিনি একাকী এক অন্ধকার যুগের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আলোর মশাল জ্বালিয়েছিলেন। তাঁর বহুমুখী প্রতিভার প্রশংসা করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আরও বলেছিলেন, “Rammohan Roy inaugurated the Modern Age in India.”

আজ বাংলার নারীরা যে শিক্ষার আলোয় আলোকিত, তার বীজ বপন করেছিলেন স্বয়ং রামমোহন রায়। তাঁর প্রদর্শিত পথেই আধুনিক ভারতের নারী সমাজ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছে।


তথ্যসূত্র:

1) “Women’s Studies in India: A reader” – Mary E. John. (2008)
2) Geraldine Forbes, Women in Modern India Cambridge University Press (1996)
3) Rammohan Roy in Women Education


লেখক পরিচিতি : সৈকত প্রসাদ রায়
সৈকত প্রসাদ রায় আধ্যাত্মিক ও সাহিত্যিক বিষয় নিয়ে লেখেন। তিনি সারদা মা-কে নিয়ে লিখেছেন বই “Teachings of The Holy Mother”, যেখানে সারদা মার জীবন, আদর্শ ও শিক্ষা নিয়ে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এছাড়া তিনি মাদার টেরেসা-কে নিয়ে লিখেছেন বই “The Universal Love of Mother Teresa”, যেখানে মানবতার প্রতি মাদার টেরেসার অমোঘ প্রেম এবং দয়ালু কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়েছে।এছাড়া তিনি বিভিন্ন জনপ্রিয় সাহিত্যিক গল্পগ্রন্থ রচনা করেছেন, যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো “সাতরঙা প্রেম”, যা পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে।লেখক সৈকত প্রসাদ রায় প্রতিলিপি, লেখালিখি সববাংলায় ব্লগ-সহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত লেখালিখি করেন। এছাড়া তাঁর লেখা আনন্দবাজার পত্রিকা, বর্তমান পত্রিকা এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up