লেখক : সৈকত প্রসাদ রায়
বাংলার ইতিহাসে কিছু পরিবার আছে, যাদের কাহিনী কেবল ব্যক্তিগত নয় – একটি যুগের প্রতিচ্ছবি। রায় পরিবার তেমনই এক বংশ, যার শিকড়ে নবজাগরণ, আর শাখায় বিস্তার বিশ্বসংস্কৃতিতে। রামসুন্দর দেও থেকে সত্যজিৎ রায়—এই দীর্ঘ যাত্রা কেবল একটি পরিবারের নয়, বরং আধুনিক বাঙালি মানসের গঠনের ইতিহাস। রামসুন্দর দেও থেকে সত্যজিৎ রায় পর্যন্ত রায় পরিবারের যাত্রা কেবল একটি বংশের ইতিহাস নয় — এটি বাংলার নবজাগরণের ইতিহাস, আধুনিক বাঙালি মানসের গঠনের ইতিহাস। Andrew Robinson তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Satyajit Ray: The Inner Eye : The Biography of a Master Film-Maker’-এ প্রথম অধ্যায়ের শিরোনাম দিয়েছেন “A Bengali Banyan Tree: The Ray Family” — অর্থাৎ একটি বাঙালি বটবৃক্ষ। এই রূপকটি যথার্থ, কারণ রায় পরিবার ছিল সত্যিকার অর্থেই একটি বিশাল বটবৃক্ষের মত — যার মূল গভীরে প্রোথিত, শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত, এবং যার ছায়ায় বাংলার সাংস্কৃতিক জীবন বহু দশক ধরে আশ্রয় পেয়েছে। সত্যজিৎ রায়ের প্রতিভাকে বুঝতে হ’লে তাঁর পারিবারিক উত্তরাধিকারকে বোঝা অপরিহার্য। সত্যজিৎ নিজেও জানতেন যে তাঁর মধ্যে যা কিছু সৃজনশীল ও মৌলিক, তার একটি বড় অংশ এই পরিবারের কাছ থেকেই পাওয়া।
রায় পরিবারের কাহিনী শুরু হয় বর্ধমান জেলার মসুয়া গ্রামে। সেই সুদূর অতীতে, পরিবারের আদি পুরুষ ছিলেন রামসুন্দর দেও — যাঁর পদবি ছিল ‘দেও’, পরে যা ‘রায়’ হয়ে যায় এবং এই পরিবার ছিল বাংলার কায়স্থ সম্প্রদায়ের অন্তর্গত। বাংলার কায়স্থ সম্প্রদায় ছিল ঐতিহ্যগতভাবে লেখক ও প্রশাসক শ্রেণী। মোগল আমলে এবং পরবর্তী ইংরেজ আমলে কায়স্থরা ছিলেন নথিপত্র রচনা, হিসাব রক্ষা ও প্রশাসনিক কাজে দক্ষ। রামসুন্দর দেও-এর বংশধরেরা এই পেশাগত দক্ষতাকে কালক্রমে সাহিত্য ও শিল্পকলার ক্ষেত্রে নিয়ে গিয়েছিলেন। রামসুন্দর সম্পর্কে বিশেষ তথ্য ইতিহাসের আলোয় বিশেষ স্পষ্ট নয়, কিন্তু তাঁর বংশধরদের কর্মকাণ্ড থেকে বোঝা যায় যে পরিবারটিতে মেধা ও সংস্কৃতির একটি ধারা প্রবহমান ছিল। মসুয়া থেকে এই পরিবারের একটি শাখা কলকাতামুখী হয় এবং ক্রমে বাংলার বৌদ্ধিক জীবনের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করে নেয়।
রামসুন্দরের পরবর্তী প্রজন্মে লোকনাথ রায়ের আবির্ভাব। লোকনাথ ছিলেন সেই মানুষ যিনি পরিবারটিকে কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ করে তোলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা ছিল এক বিশেষ ঐতিহাসিক মুহূর্তে — যেখানে ইংরেজ শাসনের অধীনে একটি নতুন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব হচ্ছিল। রামমোহন রায়ের নেতৃত্বে সূচিত হয়েছিল বাংলার সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কারের এক নতুন যুগ। সেই যুগের উত্তাপ রায় পরিবারকেও স্পর্শ করেছিল। রায় পরিবার ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল – যা তাদের মুক্তচিন্তা ও আধুনিক শিক্ষার দিকে আকৃষ্ট করেছিল। ব্রাহ্মসমাজের প্রভাব ছিল গভীর – এটি কেবল একটি ধর্মীয় আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল একটি সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের মঞ্চ। জাতিভেদের বিরোধিতা, নারীশিক্ষার সমর্থন, যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি — এই সবই পরিবারের মেধাবী সদস্যদের মনকে গড়ে তুলেছিল।
রায় পরিবারের ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় শুরু হয় উপেন্দ্রকিশোর রায়ের সঙ্গে। সত্যজিৎ রায়ের পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর (১৮৬৩-১৯১৫) ছিলেন ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সন্ধিলগ্নে বাংলার এক অসাধারণ বহুমুখী প্রতিভা। উপেন্দ্রকিশোর ছিলেন একাধারে লেখক, চিত্রশিল্পী, সঙ্গীতজ্ঞ, বেহালাবাদক, ফটোগ্রাফার, জ্যোতির্বিদ এবং মুদ্রণকলার পথিকৃৎ। এই বৈচিত্র্যময় প্রতিভার প্রতিফলন পরবর্তী প্রজন্মেও দেখা যায়। শিশুসাহিত্যের ক্ষেত্রে উপেন্দ্রকিশোরের অবদান ছিল যুগান্তকারী। ‘ছেলেদের রামায়ণ’, ‘ছেলেদের মহাভারত’, ‘টুনটুনির বই’ — এই সব রচনা বাংলা শিশুসাহিত্যের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। তাঁর ভাষা ছিল সহজ, প্রাণবন্ত এবং শিশুদের কাছে বোধগম্য। এর আগে বাংলায় শিশুদের জন্য এতটা সুলিখিত ও পরিমার্জিত সাহিত্য তৈরি হয়নি।
মুদ্রণকলায় উপেন্দ্রকিশোরের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উপেন্দ্রকিশোর হাফটোন ব্লক তৈরির কৌশল স্বাধীনভাবে আবিষ্কার করেছিলেন এবং এই বিষয়ে ইংল্যান্ডের বিশেষজ্ঞ পত্রিকায় প্রবন্ধও লিখেছিলেন। ১৯১৩ সালে তিনি কলকাতার গড়পার রোডে নিজস্ব মুদ্রণালয় স্থাপন করেন — ‘ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স’ নামে। এই মুদ্রণালয় থেকেই পরে বাংলার সেরা শিশু পত্রিকা ‘সন্দেশ’ প্রকাশিত হত। সঙ্গীতের প্রতি উপেন্দ্রকিশোরের আগ্রহও ছিল গভীর। তিনি বেহালা বাজাতেন এবং রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্ক পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও রবীন্দ্রনাথের কাছাকাছি থাকার সুযোগ তৈরি করেছিল। সর্বোপরি উপেন্দ্রকিশোর ছিলেন একজন ব্রাহ্ম — যুক্তিবাদী, উন্মুক্তমনা এবং ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরোধী। এই মানসিকতা তিনি তাঁর পুত্রদের মধ্যে সঞ্চারিত করেছিলেন।উপেন্দ্রকিশোর ১৯১৫ সালে মাত্র বায়ান্ন বছর বয়সে মারা যান — তাঁর অকালমৃত্যু পরিবারের জন্য এক বিশাল ক্ষতি ছিল।
উপেন্দ্রকিশোরের সন্তানদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিলেন সুকুমার রায় (১৮৮৭-১৯২৩) — সত্যজিৎ রায়ের পিতা। সত্যজিতের চরিত্র ও রুচি বোঝার জন্য তাঁর পিতার প্রভাব অপরিহার্য। সুকুমার রায় ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করেছিলেন ফটোমেকানিক্স ও মুদ্রণকলায়। এই পেশাগত শিক্ষার পাশাপাশি তিনি সাহিত্যচর্চাও করতেন। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন তিনি ‘ননসেন্স’ সাহিত্যের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হন – বিশেষত Edward Lear ও Lewis Carroll-এর রচনার। এই প্রভাব তাঁর নিজস্ব লেখার ধারাকে রূপ দিয়েছিল।
বাংলায় ফিরে সুকুমার শিশুদের জন্য এমন সাহিত্য তৈরি করলেন যা সম্পূর্ণ অভিনব। তাঁর ‘আবোল তাবোল’ (১৯২৩) বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সৃষ্টি। এই ছড়ার বইতে তিনি শব্দ দিয়ে এমন একটি অদ্ভুত জগৎ তৈরি করলেন যেখানে যুক্তি নেই, কিন্তু আনন্দ আছে অফুরন্ত। হাঁসজারু, মাথাব্যথার ওষুধ, কুমড়োপটাশ — এই সব অসম্ভব সৃষ্টিগুলো বাংলার শিশুমনে এক নতুন কল্পনার জগৎ খুলে দিল।
সুকুমার রায় কেবল ছড়াকারই ছিলেন না – তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট নাট্যকারও। তাঁর ‘অবাক জলপান’, ‘ঝালাপালা’, ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’ – এই নাটকগুলো ব্রাহ্মসমাজের সভায় অভিনীত হত এবং সবার মুখে হাসি ফোটাত। তাঁর নাটকে ব্যঙ্গের আড়ালে সমাজ সমালোচনাও থাকত।সুকুমার ‘সন্দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক হয়েছিলেন পিতার মৃত্যুর পর। এই পত্রিকায় তিনি লিখতেন, আঁকতেন এবং সম্পাদনা করতেন। পত্রিকাটি সেই সময়ে বাংলার শিশু ও কিশোরদের কাছে ছিল অত্যন্ত প্রিয়।
কিন্তু নিয়তি নির্মম ছিল। সুকুমার রায় ‘কালাজ্বরে’ (লেইশমানিয়াসিস) আক্রান্ত হ’লেন। এই রোগের চিকিৎসা তখন অত্যন্ত কঠিন ছিল। দীর্ঘ যন্ত্রণাদায়ক অসুস্থতার পর ১৯২৩ সালে মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে সুকুমার রায় মারা যান। তখন তাঁর পুত্র সত্যজিৎ রায়ের বয়স মাত্র দু’বছর। এটি ছিল সত্যজিতের জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি। পিতার সঙ্গে কোনো স্মৃতি নেই, পিতার কণ্ঠস্বর শোনার সুযোগ হয়নি — এই বেদনা সত্যজিতের মনে সারাজীবন ছিল।রায় পরিবারের বটবৃক্ষটি কেবল উপেন্দ্রকিশোর ও সুকুমারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এই পরিবারের অন্যান্য শাখাও বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন।
সুবিনয় রায়: উপেন্দ্রকিশোরের ভাই সুবিনয় রায় ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞ। তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতের একজন উৎকৃষ্ট শিল্পী হিসেবে বাংলার সাংস্কৃতিক মহলে পরিচিত ছিলেন।
কুলদারঞ্জন রায়: পরিবারের আরেক সদস্য কুলদারঞ্জন রায় ছিলেন লেখক। তিনি শিশুসাহিত্যে অবদান রেখেছিলেন।
রায় পরিবারের এই সাংস্কৃতিক ধারাটি কোনো কাকতালীয় বিষয় ছিল না। এটি ছিল সচেতনভাবে লালিত একটি ঐতিহ্য, যেখানে প্রতিটি প্রজন্ম আগের প্রজন্মের সৃষ্টিকর্মকে সম্মান করেছে এবং তার উপর দাঁড়িয়ে নিজেদের কাজ করেছে।
সুকুমার রায়ের অকালমৃত্যুর পর পরিবারের সম্পূর্ণ দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর স্ত্রী সুপ্রভা রায়ের (পরে পরিচিত সুপ্রভা দেবী হিসেবে) উপর। সুপ্রভা দেবী ছিলেন এক অসাধারণ মহিলা। স্বামীর মৃত্যুর পর প্রায় কপর্দকশূন্য অবস্থায় তিনি শিশুপুত্র সত্যজিতকে নিয়ে জীবনযাপন করতেন। তিনি সঙ্গীত শিক্ষিকা হিসেবে কাজ করতেন এবং তাঁর স্বামীর ভাই-ভাইপোদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সুপ্রভা দেবীর কণ্ঠস্বর ছিল অত্যন্ত মধুর এবং তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতে পারদর্শী ছিলেন। এই সঙ্গীতের পরিবেশেই বড় হয়েছিলেন সত্যজিৎ। মায়ের কাছ থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসা এবং পশ্চিমী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহ — এই দু’টি ধারাই সত্যজিতের সঙ্গীতরুচিকে গড়ে দিয়েছিল। দারিদ্র্যের মধ্যেও সুপ্রভা দেবী পুত্রের শিক্ষার কোনো আপস করেননি। সত্যজিৎ কলকাতার বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল থেকে পড়াশোনা করেন এবং পরে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। এই শিক্ষার সুযোগ সম্ভব হয়েছিল মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগের কারণে। সত্যজিতের মায়ের কাছে প্রতিদিন কেউ না কেউ সঙ্গীতচর্চা করতেন। এই পরিবেশই ছোট্ট সত্যজিতের মানসে শিল্পের প্রতি প্রথম অনুরাগ জাগিয়েছিল।
১৯২১ সালের ২রা মে কলকাতায় জন্ম নেন সত্যজিৎ রায়। জন্মের সময় পরিবারটি বসবাস করত দক্ষিণ কলকাতার গড়পার রোডে — সেই বাড়িতেই যেখানে উপেন্দ্রকিশোর তাঁর মুদ্রণালয় ও ‘সন্দেশ’ পত্রিকার কার্যালয় গড়ে তুলেছিলেন। বই, পত্রিকা, ছবি, সঙ্গীতের আওয়াজ — সব মিলিয়ে সেখানে একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক আবহাওয়া ছিল। ছোট সত্যজিৎ এই পরিবেশেই বড় হয়েছিলেন, যদিও তাঁর স্মৃতিতে পিতার কোনো ছবি ছিল না। পিতার মৃত্যুর পর সত্যজিৎ ও তাঁর মা চলে আসেন মামার বাড়িতে — কলকাতার আরেক অংশে। সেখানে অনেক মানুষের মধ্যে সত্যজিৎ একটু একা ছিলেন। এই একাকীত্ব সত্যজিতকে পর্যবেক্ষণশীল করে তুলেছিল — মানুষের আচরণ, কথা বলার ধরন, ছোট ছোট বিষয়ের মধ্যে বড় সত্য খোঁজার অভ্যাস তাঁর শৈশব থেকেই গড়ে উঠেছিল।
শৈশবে সত্যজিতের দু’টি বিশেষ আগ্রহ ছিল — একটি হ’ল ছবি আঁকা, অন্যটি হ’ল পশ্চিমী সঙ্গীত। পিতামহের রক্ত তাঁর মধ্যে কাজ করছিল — তিনিও ছবি আঁকতে ভালোবাসতেন, নানারকম জিনিস সংগ্রহ করতেন এবং নতুন কিছু শিখতে উৎসুক থাকতেন। কিশোর বয়সে সত্যজিৎ পশ্চিমী চলচ্চিত্রের প্রতি আকৃষ্ট হন। কলকাতায় তখন বিদেশি ছবি দেখানো হত এবং সত্যজিৎ সেই সব ছবি দেখতে যেতেন। চ্যাপলিন, ফ্রাঁক ক্যাপরা, জন ফোর্ড — এই নির্মাতাদের ছবি তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল।
রায় পরিবারের বিশেষ গুণগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাহিত হয়েছিল। প্রথমত, বহুমুখী প্রতিভা, উপেন্দ্রকিশোর ছিলেন লেখক, চিত্রশিল্পী, সঙ্গীতজ্ঞ ও মুদ্রণবিশেষজ্ঞ। সুকুমার ছিলেন লেখক, চিত্রশিল্পী ও নাট্যকার। সত্যজিৎ হ’লেন চলচ্চিত্রকার, চিত্রশিল্পী, সঙ্গীতকার, লেখক ও গ্রাফিক ডিজাইনার। এই বহুমুখিতা রায় পরিবারের একটি বৈশিষ্ট্যলক্ষণ।
দ্বিতীয়ত, শিশুদের প্রতি ভালোবাসা ও শিশুসাহিত্যের প্রতি অঙ্গীকার। উপেন্দ্রকিশোর ‘সন্দেশ’ তৈরি করেছিলেন শিশুদের জন্য। সুকুমার ‘আবোল তাবোল’ লিখেছিলেন। সত্যজিৎ ‘সন্দেশ’ পত্রিকা পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন এবং ফেলুদা-প্রফেসর শঙ্কু সৃষ্টি করেছিলেন।
তৃতীয়ত, হিউমার বা রসবোধ। সুকুমার রায়ের হাস্যরস ছিল বিশ্বমানের। এই রসবোধের ধারাবাহিকতা সত্যজিতের চলচ্চিত্রেও দেখা যায় — বিশেষত পরশ পাথর, গুপী গাইন বাঘা বাইন এবং হীরক রাজার দেশে চলচ্চিত্রে।
চতুর্থত, পশ্চিমী ও প্রাচ্যের মধ্যে সমন্বয়। উপেন্দ্রকিশোর ইংরেজি সাহিত্য ও ইউরোপীয় মুদ্রণকলা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। সুকুমার ইংল্যান্ডে পড়েছিলেন। সত্যজিৎ পশ্চিমের চলচ্চিত্র ও সঙ্গীতের ধারায় দীক্ষিত হয়েছিলেন। কিন্তু এই পশ্চিমী প্রভাব তাদের কখনও বাংলার মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি।
পঞ্চমত, ব্রাহ্মসমাজের আদর্শ। মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ, সামাজিক সংস্কারের প্রতি সহানুভূতি — এই মূল্যবোধগুলো রায় পরিবারের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়েছে। সত্যজিতের চলচ্চিত্রেও এই মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটেছে। সত্যজিৎ একদিকে পারিবারিক উত্তরাধিকারকে বহন করেছেন, অন্যদিকে সম্পূর্ণ নিজস্ব পরিচয় তৈরি করেছেন।
পারিবারিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যোগ ছিল তাঁর গভীর। তিনি ‘সন্দেশ’ পত্রিকাকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন — যা ছিল পিতামহের সৃষ্টি। তিনি তাঁর পিতা সুকুমার রায়ের জন্মশতবার্ষিকীতে তাঁকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন। পিতার স্মৃতিকে তিনি সারাজীবন লালন করেছেন।
কিন্তু সত্যজিৎ কেবল পারিবারিক উত্তরাধিকারের বাহক ছিলেন না — তিনি ছিলেন একজন স্বতন্ত্র প্রতিভা। চলচ্চিত্র নির্মাণ — যা তাঁর পরিবারের কেউ করেননি — এই নতুন মাধ্যমটিকেই তিনি তাঁর প্রধান শিল্পক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, এবং এই মাধ্যমে তিনি যা করেছেন তা পরিবারের যেকোনো সদস্যের চেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। সত্যজিৎ কখনও তাঁর পিতার কথা বলতে বলতে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তেন। পিতাকে তিনি চেনেননি, কিন্তু পিতার রচনা পড়ে, পিতার আঁকা ছবি দেখে তিনি এক অদ্ভুত কাছাকাছি অনুভব করতেন। সুকুমার রায়ের হাস্যরস, তাঁর ভাষার খেলা, তাঁর অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার ক্ষমতা — এই সবই সত্যজিতের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হত।
রায় পরিবারের উত্থান ও বিকাশ ঘটেছিল বাংলার নবজাগরণের (Bengal Renaissance) সমান্তরালে। বাংলার নবজাগরণ ছিল মূলত ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে সংঘটিত একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন। রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর — এই মহীরুহদের মাধ্যমে বাংলা একটি নতুন সাংস্কৃতিক পরিচয় তৈরি করছিল। উপেন্দ্রকিশোর রায় ছিলেন এই নবজাগরণের একজন সক্রিয় অংশীদার। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব ছিল এবং ব্রাহ্মসমাজের আদর্শে তিনি বিশ্বাস করতেন। এই পরিবেশে তাঁর পুত্র সুকুমার এবং পৌত্র সত্যজিৎ বড় হয়েছিলেন। রায় পরিবার সর্বদা দু’টি জিনিসকে একসঙ্গে ধরে রেখেছিল: নিজস্ব বাঙালি পরিচয়ের প্রতি গর্ব এবং বিশ্বের বৃহত্তর সংস্কৃতির প্রতি উন্মুক্ততা। এই দ্বিবিধ চেতনাই সত্যজিতের চলচ্চিত্রকে একই সঙ্গে গভীরভাবে বাঙালি এবং সার্বজনীনভাবে মানবিক করে তুলেছে।
‘সন্দেশ’ পত্রিকাটি রায় পরিবারের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের একটি জীবন্ত প্রতীক। উপেন্দ্রকিশোর এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সুকুমার এটি সম্পাদনা করেছিলেন এবং সত্যজিৎ পরিণত বয়সে এটিকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। ‘সন্দেশ’ ছিল বাংলার শিশু-কিশোরদের জন্য একটি বিশেষ পত্রিকা — যেখানে কেবল বিনোদন নয়, জ্ঞান ও কল্পনার মিশ্রণে তৈরি হত প্রতিটি সংখ্যা। সত্যজিৎ এই পত্রিকায় নিজে লিখতেন, আঁকতেন এবং সম্পাদনা করতেন — ঠিক যেমন করেছিলেন তাঁর পিতামহ ও পিতা। পত্রিকাটির মাধ্যমেই সত্যজিৎ তাঁর বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র ফেলুদা ও বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর নায়ক প্রফেসর শঙ্কুকে পাঠকদের কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। এই চরিত্রগুলো আজও বাংলা সাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
রামসুন্দর দেও থেকে সত্যজিৎ রায় পর্যন্ত এই যাত্রাটি কেবল একটি পরিবারের ইতিহাস নয় — এটি বাংলার সাংস্কৃতিক জাগরণের ইতিহাস। প্রতিটি প্রজন্ম পূর্ববর্তী প্রজন্মের উত্তরাধিকারকে গ্রহণ করেছে, তাকে সমৃদ্ধ করেছে এবং পরের প্রজন্মের কাছে হস্তান্তর করেছে। উপেন্দ্রকিশোর মুদ্রণকলা ও শিশুসাহিত্যে যা করেছিলেন, সুকুমার তাকে ব্যঙ্গসাহিত্য ও নাটকের মাধ্যমে আরও বিস্তৃত করেছিলেন। এবং সত্যজিৎ সেই উত্তরাধিকারকে চলচ্চিত্রের পর্দায় নিয়ে গিয়ে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছিলেন।
সত্যজিৎকে বুঝতে হ’লে তাঁর পরিবারকে বুঝতে হবে। তাঁর বহুমুখী প্রতিভা, তাঁর রসবোধ, তাঁর মানবতাবাদ, তাঁর পশ্চিম ও প্রাচ্যের মধ্যে সেতু গড়ার ক্ষমতা — এই সবকিছুর শিকড় রয়েছে রায় পরিবারের মাটিতে। বাংলার এই বটবৃক্ষের সবচেয়ে বিখ্যাত শাখাটির নাম সত্যজিৎ রায়। তিনি তাঁর পূর্বপুরুষদের স্বপ্নকে সার্থক করেছেন — এবং তাদের অসমাপ্ত কাজকে সম্পূর্ণ একটি নতুন মাধ্যমে, নতুন ভাষায়, বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করেছেন। রামসুন্দর দেওয়ের বংশের এই সন্তান শুধু একটি পরিবারের নয়, সমগ্র বাঙালি জাতির গর্বের উৎস হয়ে উঠেছেন।
তথ্যসূত্র: – Satyajit Ray: The Inner Eye: The Biography of a Master Film-Maker – Andrew Robinson
লেখক পরিচিতি : সৈকত প্রসাদ রায়
সৈকত প্রসাদ রায় আধ্যাত্মিক ও সাহিত্যিক বিষয় নিয়ে লেখেন। তিনি সারদা মা-কে নিয়ে লিখেছেন বই “Teachings of The Holy Mother”, যেখানে সারদা মার জীবন, আদর্শ ও শিক্ষা নিয়ে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এছাড়া তিনি মাদার টেরেসা-কে নিয়ে লিখেছেন বই “The Universal Love of Mother Teresa”, যেখানে মানবতার প্রতি মাদার টেরেসার অমোঘ প্রেম এবং দয়ালু কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়েছে।এছাড়া তিনি বিভিন্ন জনপ্রিয় সাহিত্যিক গল্পগ্রন্থ রচনা করেছেন, যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো “সাতরঙা প্রেম”, যা পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে।লেখক সৈকত প্রসাদ রায় প্রতিলিপি, সববাংলা ব্লগ-সহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত লেখালিখি করেন। এছাড়া তাঁর লেখা আনন্দবাজার পত্রিকা, বর্তমান পত্রিকা এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।


একটা বিষয় ভুল, লেখাটি সৈকত প্রসাদ রায়ের কিন্তু ওপরে লেখা রয়েছে উৎপল অধিকারী , বিষয়টি একটু দেখবেন
বিষয়টি আমাদের অবগত করানোর জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আমরা ত্রুটিটি শুধরে নিয়েছি
অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই আমার লেখাটা এত সুন্দর ভাবে প্রকাশ করার জন্য