দানব

লেখক : প্রযুক্তিকা মিত্র

শহরের কোলাহল যেখানে ক্লান্ত হয়ে থমকে দাঁড়ায়, যেখানে পিচঢালা রাস্তার শেষ প্রান্তে মরা ঘাস আর আগাছার জঙ্গল শুরু হয়, ঠিক সেখানেই পড়ে আছে সেই পরিত্যক্ত রেল ইয়ার্ড। শত শত লোহার ওয়াগন সেখানে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে—যেন কোন এক বিস্মৃত যুদ্ধের কঙ্কাল। বৃষ্টির জলে ধুয়ে যাওয়া, জং ধরা সেই লোহাগুলোর গা থেকে এক অদ্ভুত ধাতব গন্ধ বেরোয়, যা নাকে লাগলে মনে হয় সময় এখানে থমকে আছে। এই পরিত্যক্ত নরকেই অয়নের রাজত্ব।

অয়ন ছেলেটা ছিল সমাজের কাছে এক মূর্ত অভিশাপের মত। তার অপরাধ ছিল সে কথা কম বলত, আর তার চোখের দৃষ্টি ছিল বড্ড বেশি শান্ত। স্কুলের ছেলেরা যখন ক্রিকেটের রান নিয়ে তর্কে মেতে থাকত, অয়ন তখন মাঠের এক কোণে বসে পিঁপড়েদের সারি দেখত। ওর এই নিস্তব্ধতাকেই স্কুলের ‘লিডার’ রাহুল আর তার দলবল দুর্বলতা ভেবে নিয়েছিল। রাহুল ছিল এই শহরের এক প্রতাপশালী ব্যবসায়ীর ছেলে। দামী বাইক, দামী স্মার্টফোন আর এক আকাশ সমান অহংকার নিয়ে সে চলত। তার কাছে আনন্দ মানেই ছিল কাউকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা। অয়নকে সে ডাকত ‘জ্যান্ত মমি’ বলে।

কিন্তু অয়নের এই শান্ত রূপের আড়ালে ছিল এক বিশাল সমুদ্রের মত ভালবাসা। সেই ভালবাসার ভাগিদার কোন মানুষ ছিল না। প্রতিদিন স্কুল শেষ করে অয়ন যখন রেল ইয়ার্ডের ওই ভাঙা পাঁচিল টপকে ভিতরে ঢুকত, তখন এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটত। নিঝুম ইয়ার্ডের নিস্তব্ধতা ভেঙে ছয়টি প্রাণী ঝড়ের বেগে ছুটে আসত। বাঘা ছিল এদের মধ্যে বয়সে বড়, তার গায়ের রঙ ছিল পোড়া মাটির মত। লালি, যার দু’চোখে মায়া মাখানো। কালু আর মিনি ছিল যমজ ভাইবোনের মত, সবসময় খুনসুটিতে ব্যস্ত। ভুতু ছিল ধবধবে সাদা, আর সবার শেষে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে আসত নান্টু—এক মাস আগে এক ট্রাকের ধাক্কায় যে তার পিছনের পা হারিয়েছিল। অয়ন যখন নিজের ছেঁড়া ব্যাগ থেকে টিফিনের বেঁচে যাওয়া রুটি বা বিস্কুটের প্যাকেট বের করত, তখন ওই চারপেয়ে বন্ধুগুলোর আনন্দের সীমা থাকত না। অয়ন ওয়াগনের ভেতরে বসে ওদের সাথে কথা বলত। ও জানত ওরা উত্তর দেবে না। কিন্তু বাঘা যখন অয়নের হাঁটুতে মাথা রেখে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলত, তখন অয়ন বুঝত যে এই পৃথিবীতে সে একা নয়। এই অবলা প্রাণীগুলোই ছিল ওর অস্তিত্বের একমাত্র আশ্রয়।

কিন্তু মানুষের কুদৃষ্টি থেকে কোন পবিত্রতাই রেহাই পায় না। রাহুল একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে লক্ষ্য করল অয়ন কোথায় যায়। সে আর তার দুই সাঙ্গাত, বিশাল আর সুমিত, চুপিচুপি পিছু নিল। ইয়ার্ডের ভাঙা জানলা দিয়ে যখন রাহুল দেখল অয়ন এক ময়লা কুকুরকে জড়িয়ে ধরে পরম শান্তিতে বসে আছে, তখন ওর মনে এক বিকৃত ঈর্ষা জেগে উঠল। ও ভাবল, “আমি এত কিছু পেয়েও শান্তিতে নেই, আর এই ভিখারিটা এই জানোয়ারগুলোর সাথে এত সুখে আছে?” রাহুলের মাথায় তখন এক পৈশাচিক পরিকল্পনা খেলে গেল। সে বুঝতে পারল অয়নকে মারলে অয়ন হয়ত আবার উঠে দাঁড়াবে, কিন্তু তার এই ভালবাসার জায়গাটাকে যদি ধ্বংস করে দেওয়া যায়, তবে অয়ন ভিতর থেকে মরে যাবে। আর রাহুল ঠিক সেটাই চেয়েছিল।

সেই রাতের আকাশটা ছিল অস্বাভাবিক কালো। মেঘগুলো যেন কোন এক আসন্ন বিপদের সংকেত দিচ্ছিল। অয়ন সেদিন বাড়ি ফেরার সময় রাহুলের পাঠানো এক মিথ্যে চিরকুট পেল। সেখানে লেখা ছিল, ইয়ার্ডের ওপাশে কেউ একজন এক বস্তা খাবার ফেলে গেছে, যা ওর কুকুরদের জন্য কাজে লাগবে। সরল অয়ন বিন্দুমাত্র সন্দেহ করেনি। সে ছুটে গিয়েছিল তার বন্ধুদের মুখে ভাল খাবার তুলে দেওয়ার আশায়।

ইয়ার্ডে পৌঁছনোর পর অয়ন দেখল পরিবেশটা নিঝুম। কোন ডাক নেই, কোন লেজ নাড়ার শব্দ নেই। হঠাৎ একটা তীব্র টর্চের আলো ওর চোখে পড়ল। অয়ন চোখ পিটপিট করে দেখল রাহুলরা দাঁড়িয়ে আছে। ওদের হাতে লোহার রড আর মোটা মোটা লাঠি। অয়ন কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিশাল আর সুমিত ওকে জাপটে ধরল। ইয়ার্ডের এক কোণে রাখা এক পুরনো লোহার খাঁচায় ওকে বন্দি করে তালা মেরে দেওয়া হ’ল। রাহুল একটা শয়তানি হাসি দিয়ে বলল, “আজ তোর বন্ধুদের এক বিশেষ ভোজ দেব অয়ন। তবে খাওয়ার জন্য নয়, মার খাওয়ার জন্য।”

অয়ন খাঁচার গরাদ ধরে চিৎকার করতে লাগল, কিন্তু ইয়ার্ডের সেই গভীর নির্জনতায় ওর চিৎকার শোনার মত কেউ ছিল না। রাহুল ইশারা করতেই অন্ধকার থেকে বাঘা আর লালিকে দড়ি দিয়ে বেঁধে টেনে আনা হ’ল। ওরা তখন আর্তনাদ করছিল, ওদের চোখে ছিল এক তীব্র আতঙ্ক। অয়নের চোখের সামনেই শুরু হ’ল সেই নারকীয় ধ্বংসলীলা। লোহার রডের প্রতিটি আঘাতে যখন বাঘার হাড় ভাঙার মড়মড় শব্দ হচ্ছিল, তখন অয়ন খাঁচার ভিতর নিজের মাথা ঠুকছিল। ওর কপাল ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল, কিন্তু সেই শারীরিক যন্ত্রণার চেয়ে হাজার গুণ বেশি যন্ত্রণা হচ্ছিল ওর হৃদয়ে। লালিকে যখন নির্মমভাবে পিটিয়ে নিথর করে দেওয়া হ’ল, অয়ন তখন শব্দ করে কাঁদতে ভুলে গেছে। ওর গলা দিয়ে কেবল এক অমানুষিক গোঙানি বেরোচ্ছিল।

সবশেষে বাকি ছিল নান্টু। ছোট্ট নান্টু, যে কী না ঠিকমত দৌড়াতেও পারত না। রাহুল নিজে নান্টুকে হাতে তুলে নিল। অয়নের খাঁচার ঠিক সামনে এনে রাহুল তার পকেট থেকে এক ধারাল ছুরি বের করল। অয়ন দু’হাত বাড়িয়ে খাঁচার ফাঁক দিয়ে নান্টুকে ছোঁয়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু রাহুল এক ঝটকায় অয়নের সেই আশাটুকুও কেড়ে নিল। নান্টুর ছোট্ট শরীরটা যখন যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে স্থির হয়ে গেল, তখন অয়নের চোখের মণি দু’টো যেন স্থির হয়ে গেল। ওর চোখের সেই শান্ত দৃষ্টি মুহূর্তে এক গভীর কালো গর্তে পরিণত হ’ল। রাহুলরা হাসতে হাসতে চলে গেল। যাওয়ার সময় রাহুল বলে গেল, “এখন শান্তিতে ঘুমো অয়ন। তোর জন্য আর কেউ অপেক্ষা করে নেই।”

সেই সারা রাত অয়ন সেই খাঁচার ভেতর বসে রইল। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ওর প্রিয় বন্ধুদের নিথর দেহ। চাঁদের ম্লান আলো যখন ওই রক্তের ওপর পড়ছিল, তখন সেই দৃশ্য কোন এক বীভৎস ভৌতিক সিনেমার মত লাগছিল। অয়ন তখন আর কাঁদছিল না। ওর মনের ভিতর তখন এক অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটছিল। ও দেখল ওর নখগুলো অনিচ্ছাসত্ত্বেও মাটির ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। ওর ঘ্রাণশক্তি যেন বহুগুণ বেড়ে গেল—ও বাতাসে রক্তের প্রতিটি অণু অনুভব করতে পারছিল। অয়নের ভেতর থেকে ‘মানুষ’ সত্তাটা বিদায় নিল, আর সেই শূন্যস্থানে জায়গা নিল এক আদিম, হিংস্র ঘৃণা।

ভোরবেলা যখন রেলের একজন পাহারাদার এসে ওকে উদ্ধার করল, অয়ন কোন কথা বলল না। পুলিশ এল, লাশগুলো সরানো হ’ল, অয়নকে বাড়িতে পাঠানো হ’ল। কিন্তু অয়নের সেই বাড়ি আর আগের মত ছিল না। সে ঘরের কোণে অন্ধকারে বসে থাকত। আলো দেখলেই ও গর্জন করে উঠত। ওর মা-বাবা ভেবেছিলেন ছেলের মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তারা জানতেন না, যে তাঁদের ছেলে আর তাঁদের নেই। সে এখন এমন এক সত্তা হয়ে উঠেছে, যা কেবল রাতের অন্ধকারেই শ্বাস নেয়।

মাসখানেক পরেই শহরে শুরু হ’ল সেই রহস্যময় ঘটনাগুলো। সুমিত ছিল প্রথম শিকার। সে একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে নিখোঁজ হয়ে যায়। তিন দিন পর তার দেহ পাওয়া যায় সেই রেল ইয়ার্ডের খাঁচার ভিতরে—যেখানে অয়ন বন্দি ছিল। সুমিতের শরীরের প্রতিটি অংশ ছিল ছিন্নভিন্ন। ডাক্তাররা দেখে অবাক হলেন, কারণ মনে হচ্ছিল কোন মানুষের হাত নয়, বরং কোন হিংস্র নেকড়ে তাকে আক্রমণ করেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ছিল, সুমিতের গলার নলিটা কামড়ে ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছিল, ঠিক যেভাবে কোন বন্য শিকারি শিকার ধরে।

শহরের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু রাহুল আর বিশাল তখনও ভাবেনি যে তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে। বিশাল ভয়ে বাড়ি থেকে বেরনো বন্ধ করে দিল। সে তার মা-বাবাকে বলত, “আমি রাতে জানলার বাইরে কুকুরের ডাক শুনি। কিন্তু সেই ডাকটা অন্যরকম। মনে হয় কেউ আমার নাম ধরে ডাকছে।” বিশালের কথা কেউ বিশ্বাস করেনি। কিন্তু এক বর্ষণমুখর রাতে বিশালের ঘরের জানলাটা রহস্যজনকভাবে ভেঙে গেল। পরদিন সকালে বিশালের দেহ পাওয়া গেল পাশের ড্রেনে, ঠিক যেভাবে কালুকে মারা হয়েছিল—পা দুটো ভেঙে উল্টো দিকে মোচড়ানো।

রাহুল এখন একা। সে বুঝতে পেরেছে, কোন এক অদৃশ্য শিকারি তাকে তাড়া করছে। সে তার ঘরে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগাল, কড়া পাহারার ব্যবস্থা করল। কিন্তু সে জানত না যে মনের অন্ধকার যেখানে দানা বাঁধে, সেখানে লোহার দরজা কোন বাধা নয়।

সেপ্টেম্বরের সেই কালবেলা ঘনিয়ে এল। আকাশটা যেন এক বিশাল কালশিটে পড়া ক্ষতের মত দেখাচ্ছিল। রাহুল তখন তার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের ভিতরে থেকেও ঘামছিল। তার বাড়ির চারপাশে তখন চারজন সশস্ত্র প্রহরী, গেটে বিশাল অ্যালসেশিয়ান কুকুর। কিন্তু রাহুল জানে, যে বিপদ আসছে, তাকে কোন তালা বা দেওয়াল দিয়ে আটকে রাখা সম্ভব নয়। কারণ সেই বিপদ কোন মানুষ নয়, বরং এক পৈশাচিক ঘৃণা, যা হাড়-মাংসের শরীর ধারণ করেছে।

রাত যখন বারোটা, তখন হঠাৎ গোটা এলাকার বিদ্যুৎ চলে গেল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে রাহুলের ঘরটা যেন একটা কফিন হয়ে দাঁড়াল। বাইরে পাহারাদারদের কোন সাড়াশব্দ নেই। হঠাৎ সে শুনতে পেল এক অদ্ভুত আওয়াজ। ‘খচ-খচ-খচ’—যেন কেউ কার্পেটের ওপর দিয়ে তার নখ ঘষছে। রাহুল ভয়ে টর্চটা জ্বালাতেই তার রক্ত হিম হয়ে গেল। জানলার গ্রিলগুলো কেউ যেন কাঁচামাটির মত দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে। আর সেই জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকছে এক শীতল কুয়াশা, যার সাথে মিশে আছে পচা মাংস আর ভেজা কুকুরের লোমের সেই পরিচিত কটু গন্ধ।

রাহুল চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোন শব্দ বেরোল না। হঠাৎ খাটের নিচ থেকে একজোড়া জ্বলজ্যান্ত হলদেটে চোখ ওর দিকে তাকিয়ে থমকে গেল। সেই চোখদুটো মানুষের নয়, বরং কোন এক ক্রুদ্ধ শিকারির। অন্ধকার থেকে চার পায়ে হেঁটে বেরিয়ে এল এক ছায়া। তার গায়ের চামড়া ফ্যাকাশে, হাড়গুলো শরীরের বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে, আর তার দু’হাতের নখগুলো একেকটা ছুরির মত লম্বা। অয়ন! কিন্তু সে আর অয়ন নেই। তার মুখটা এক বিকৃত নেকড়ের মত হয়ে গিয়েছে, যা দিয়ে অবিরত লালা ঝরছে।
অয়ন যখন রাহুলের সামনে এসে দাঁড়াল, রাহুল দেখল অয়নের সারা গায়ে সেই মৃত ছয়টি কুকুরের ছোট ছোট রোঁয়া লেগে রয়েছে। অয়ন এক অদ্ভুত ঘড়ঘড়ে গলায় কথা বলে উঠল—সেই স্বরে মানুষের চেয়ে বাতাসের হাহাকার বেশি ছিল। সে বলল, “রাহুল… নান্টু বলেছিল তুই খুব একা… তাই আমি তোকে নিতে এসেছি।”
রাহুল ডুকরে কেঁদে উঠল, “আমায় মেরো না অয়ন! আমি তোমায় টাকা দেব, যা চাও সব দেব!”
অয়ন এক বীভৎস অট্টহাসি হাসল। সেই হাসিটা ছিল অনেকটা কুকুরের কান্নার মত। সে ক্ষিপ্রগতিতে রাহুলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার শক্ত থাবা রাহুলের কণ্ঠনালী টিপে ধরল। রাহুল দেখতে পেল অয়নের হাতের পেছনে ছয়টি অস্পষ্ট ছায়া দাঁড়িয়ে আছে। বাঘা, লালি, কালু—ওরা সবাই সেখানে উপস্থিত। অয়ন রাহুলের কানে ফিসফিস করে বলল, “এখন তুইও আমাদের মত হবি। কথা বলতে পারবি না, কেবল আর্তনাদ করবি।”

পরদিন ভোরে পুলিশ যখন রাহুলের ঘরে ঢুকল, তারা এক দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল। ঘরের চারদিকের দেওয়ালে রক্ত দিয়ে নান্টুর ছবি আঁকা। আর ঘরের মাঝখানে রাহুল বসে আছে—না, রাহুল নেই। তার শরীরের সব হাড় ভেঙে দেওয়া হয়েছে এমনভাবে যে সে এখন আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। সে চার পায়ে ঘরের এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। তার চোখদু’টো কোটর থেকে বেরিয়ে এসেছে, আর সে কেবল নিজের জিভ দিয়ে মেঝে চাটছে। সে পাগল হয়ে গিয়েছে। সে এখন আর মানুষ নয়, বরং মানুষের খাঁচায় বন্দি এক আতঙ্কিত পশু।

আর অয়ন? অয়নকে সেই রাতে শেষবারের মত শহরের শ্মশানের কাছে দেখা গিয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, তারা দেখেছিল এক কিশোর ছয়টি কুকুরের সাথে কুয়াশার ভিতরে হেঁটে যাচ্ছে। অয়ন আর কখনও কথা বলেনি, সভ্য সমাজে ফেরেনি।

আজও সেই পরিত্যক্ত রেল ইয়ার্ডের পাশ দিয়ে কেউ যদি মাঝরাতে হেঁটে যায়, সে শুনতে পায় এক অদ্ভূত ঐকতান। ছয়টি কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দের মাঝে একটা মানুষের মত দীর্ঘশ্বাস। লোকে বলে, অয়ন এখনও সেই ইয়ার্ডের রক্ষক। যারা অবলা প্রাণীদের ওপর অত্যাচার করে, অয়ন ছায়া হয়ে তাদের পিছু নেয়। অন্ধকারে জং ধরা ওয়াগনের ফাঁক থেকে আজও সেই হলদেটে চোখদু’টো জ্বলে ওঠে। মানুষ অয়নকে সমাজ মেরে ফেলেছে, কিন্তু সেই মৃত্যুর ছাই থেকেই জন্ম নিয়েছে এক ‘সাইকো মনস্টার’, যে এখন বিচার করে নিজের নিয়মে।

শহরের এই প্রান্তে এখন আর কেউ কোন কুকুরকে ঢিল মারে না। কারণ সবাই জানে, ওই কুয়াশার আড়ালে কেউ একজন নজর রাখছে, যে মানুষ হয়েও পশুর চেয়ে বিশ্বস্ত, আর পশু হয়েও মানুষের চেয়ে ভয়ংকর। সমাজ তাকে ভালবাসা দেয়নি, তাই সে সমাজকে দিয়েছে এক চিরস্থায়ী আতঙ্ক। এই অন্ধকারই এখন তার ঘর, আর এই নির্জনতাই তার রাজত্ব।


লেখক পরিচিতি : প্রযুক্তিকা মিত্র
বিশেষ কোন ব্যক্তি নই, লেখার মধ্য দিয়েই নিজের পরিচয় দেবার চেষ্টা করি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up