রথের দিনে

লেখক : অদিতি চ্যাটার্জি

“মা, ও মা, এখনও হয়নি?” ঠাকুরঘরে ছোট্ট করে উঁকি দেয় নেহা।
“হয়ে এসেছে রে।”
রাত পোহালে রথ। দেবযানীদের বাড়িতে জগন্নাথ দেব না থাকলেও কষ্টিপাথরের শ্রীকৃষ্ণ এবং অষ্টধাতুর রাধারাণী আছেন, তাঁর সঙ্গে নাড়ুগোপালও আছেন। নিত্য সেবার পাশাপাশি বিশেষ দিনে ঠাকুরকে ভোগ দেওয়া হয়। নেহা দেখে, মা শ্রীকৃষ্ণকে হলুদ এবং রাধারাণীকে গোলাপি জামা পরিয়েছে, মাথায় নতুন মুকুট, বাঁশিটাও নতুন। এইগুলো রুপোর ওপর সোনার জল করা, সেটাও জানে। কাল শ্রীকৃষ্ণ, রাধারাণী, গোপালকে ফুলের গয়নায় সাজানো হবে, তবে আজ মা কাগজের ফুলের শিকলি এনে দরজায় ও জানলায় ঝুলিয়ে দিয়েছে … আহা, ঠাকুরঘরটা কী সুন্দর লাগছে ।

“মা, তোমার ছোটবেলায় রথের কথা মনে আছে? ঐ যখন টালিগঞ্জে থাকতে…”
দেবযানী নাড়ু পাকাতে পাকাতে বলেন, “হুম…”
“তাহলে একটু বলো।”
“তোর পড়া নেই? দু’দিন পরে কিন্তু পরীক্ষা। নম্বর কম হ’লে দেখ কী করি।”
“প্লিজ বলো, এই তো পড়ে আসলাম।”
সাদা চিনির নাড়ুগুলো হয়ে গিয়েছে, এইবার গুড়ের নাড়ুর পাক চলছে। দেবযানীর ঠোঁটে হালকা হাসি, “ওরে তোদের মত আমাদের না এত সোশাল মিডিয়া ছিল না, তাই রথ দেখতে আমরা রাস্তায় বের হতাম, দেখতাম কে কেমন রথ সাজিয়েছে। তবে কী জানিস, একটা ঘটনা জীবনেও ভুলব না। তুই এখন একটু বড় হয়েছিস, আশা করি আমার কথা গুলো বুঝতে পারবি।”
নাড়ু পাকানো প্রায় শেষ, থালার দিকে একটু তাকিয়ে থাকে দেবযানী। “জানিস, হাউজিংয়ে আমরা সবাই মিলেমিশে থাকতাম। অন্য ধর্মের প্রতি চাপা বিদ্বেষ ছিল কি ছিল না, টেরই পায়নি কোনদিন। তখন ধর আমার বয়েস ঐ বছর আটেক। জুলিদি বলে ওখানে একজন থাকত। কত বড় আমার চেয়ে, কখনও বোন, কখনও মা বলে ডাকত। তো সেই রথের দিনে মনে আছে, আমার রথের সামনে এসে বলেছিল ‘বোন, এইগুলো তোমার ঠাকুর?’
আমি ঘাড় নাড়ি। তারপর বলে, ‘আচ্ছা, ঐ ছোট থালায় ওগুলো কী?’
আমার বেশ মজা লাগল। জুলিদি কলেজে পড়ে, আর এটাও জানে না। বললাম, ‘প্রসাদ।’
‘খাওয়া যায় না?’
‘যায় তো। আগে রথটা নিয়ে ঘুরে আসি, মাঠ থেকে।’
‘আমিও টানি তোমার সঙ্গে?’
মুর্শিদাবাদের ভরতপুরের মানুষ ওরা। হক সাহেব জেঠুর চাকরির জন্য হাউজিংয়ে থাকে, কলকাতায় আত্মীয়স্বজন আছে। সে যাই হোক, রথটা টানার পর কী খুশি।তারপর হাতে নকুলদানা তুলে দি। মুখে রাখতে যাচ্ছে, বলি, ‘এম্মা, প্রণাম করো।’ দুই হাত জোড় করে প্রণাম করে জানিস।
ছোট মেয়ে একজন দিদিকে শেখাচ্ছে, কীভাবে প্রণাম করে প্রসাদ খেতে হয়, সেইভাবেই স্মৃতিতে ছিল রে। পরে, অনেক পরে মনে হ’ল, জগতের নাথ তো রথের দিনে ভক্তের মধ্যেই বিরাজ করেন। সেদিন যে চায়, সেই তাঁকে দেখতে পায়। তিনি তো পান-ই। কে জানে, সেই রথের দিনে হয়ত আমার রথ থেকে জুলিদি আর আমাকেও দেখেছিলেন। দুটি ভিন্ন বয়স এবং ভিন্ন ধর্মের মেয়ে কেমন তাকে সঙ্গে নিয়ে বিভেদ, বিদ্বেষ ভুলে মেতে উঠেছে…”

দেবযানী চুপ করে নাড়ু এইবার কৌটোতে তুলছে, ক্লাস এইটের নেহা এইটুকু তো বুঝতেই পারে, মা একটা বিরল অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছিল, যা হয়ত সবাই পায় না।


লেখক পরিচিতি : অদিতি চ্যাটার্জি
আমি অদিতি চ্যাটার্জি অল্প কিছু গল্প লিখেছি, শব্দ রেণু প্রকাশনী তাদের বৈশাখের ত্রৈমাসিক সংখ্যা য় আমার একটা লেখা প্রকাশ হয়েছে " আহ্লাদিনী রাধে " বলে। পাঠক হিসাবে আমার সব ধরনের লেখা পড়তে ভালো লাগে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up