লেখক : সামিরা হিমু
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। এই সময়টাকে গোধূলি বলা হয়। গোধূলি মানে গরুর ক্ষুর থেকে ওড়া ধূলি। ঢাকা শহরে গরু নেই, তাই ক্ষুর থেকে ওড়া ধুলোও নেই। এখানে আছে বাসের ধোঁয়া আর পথের ধারের ধুলো। তবুও ছাদে দাঁড়ালে এই সময় আকাশটাকে অদ্ভুত লাগে। নীল রঙ ফিকে হয়ে একটা ধূসর মায়াবী রঙ ধারণ করেছে।
অপরাজিতা ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে একটা নীল শাড়ি। নীল অপরাজিতা ফুলের রঙ। ইমাদ অপরাজিতার পেছনে দাঁড়িয়ে। হাতে বরাবরের মত জ্বলন্ত সিগারেট থাকার কথা ছিল, কিন্তু নেই। অপরাজিতা ধোঁয়ার গন্ধ সহ্য করতে পারে না। ইমাদ খুব নিরীহ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে।
“সাজলে আপনাকে অসম্ভব সুন্দর লাগে, মেমসাহেবা।”
অপরাজিতা ঘুরে তাকাল। এই ছেলেটা তাকে ‘মেমসাহেবা’ বলে ডাকে। শুনতে খারাপ লাগে না। বরং ভালই লাগে।
“না সাজলে বুঝি সুন্দর লাগে না?”
ইমাদ হাসল। এই ছেলের হাসিটা বোকা বোকা। অথচ চোখের ভেতর একটা তীক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তা লুকিয়ে আছে, খেয়াল করলে তা স্পষ্টত বোঝা যায়।
“উহুম! তা কেন হবে? না সাজলে আপনাকে আর বেশি সুন্দর লাগে। এককথায় যাকে অপ্সরা বলে কিংবা বলে আকাশের পরী। মেকআপ হ’ল নারীর সৌন্দর্যের জন্য একটা আড়াল। আপনি যখন সকালে ঘুম থেকে উঠে এলোমেলো চুলে বারান্দায় দাঁড়ান, তখন আপনাকে সবচেয়ে পবিত্র লাগে।”
অপরাজিতা ভ্রু কুঁচকাল। “আপনি কি সকালে আমার বারান্দার দিকে তাকিয়ে থাকেন?”
“থাকি। সুন্দর দৃশ্য দেখা চোখের জন্য ভাল। ডাক্তাররা বলেন সবুজ দেখতে, আমি অপরাজিতা দেখি। আমার চোখের পাওয়ার মাইনাস টু থেকে এখন ভাল হওয়ার পথে।”
“ফাজলামি করবেন না ইমাদ ভাই।”
ইমাদ পকেট থেকে একটা চকলেট বের করে মুখে পুরল। সে টেনশন হ’লে চকলেট খায়।
“পটাচ্ছেন নতুন করে? নাকি অন্য কোন ঘটনা আছে এর পেছনে?”
“অন্য কারণটাই বেশ তীব্র।”
“তা সেই অন্য কারণটা কী, জানতে পারি?”
“আপনার বাবার নম্বরটা দিন, যা বলার তাকেই বলি।”
“সে কি ইমাদ ভাই! আমার দ্বারা কি কোন ভুল হ’ল? বাবার কাছে বিচার দেবেন?”
“বিচার কেন দেব? বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে। আমি নিভৃতে কাঁদাতে চাই না। আমি পাবলিকলি কাজ করতে পছন্দ করি।”
“তাহলে?”
“তোমাকে বিয়ে করতে চাই, সেই কথাটা তোমাকে গত দেড় বছরে বলেও কোন প্রতিক্রিয়া পাইনি, তাই তোমার বাবার কাছেই যাব সরাসরি। বাবারা সাধারণত জহুরি হন। তাঁরা রত্ন চিনতে ভুল করেন না। আমাকে দেখলেই তোমার বাবা বুঝবেন, এই ছেলের হাতেই মেয়ে নিরাপদ।”
অপরাজিতা খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসলে তার গালে টোল পড়ে। এই টোলে আটকা পড়ার প্রবল সম্ভাবনা আছে। ইমাদ চোখ সরিয়ে নিল। মায়া কাটিয়ে কাজের কথায় ফোকাস করা ভীষণ দরকার।
“আপনি সিরিয়াস?”
“হান্ড্রেড পার্সেন্ট। বাবার নম্বরটা দিন। নাকি আমাকে ডিটেকটিভ লাগিয়ে নম্বর বের করতে হবে?”
“আচ্ছা নিন। 0199…”
ইমাদ নম্বরটা ফোনে সেভ করল। নাম লিখল— ‘শ্বশুর আব্বা (পোটেনশিয়াল)’।
ইমাদ থাকে মেসে। ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়া মেস। মেসের নাম ‘শান্তি নিবাস’, কিন্তু শান্তির ছিটেফোঁটাও সেখানে নেই। ইমাদ বেকার। মানে সে নিজেকে বেকার বলে না, সে বলে— ‘মুক্তপেশাজীবী’। টিউশনি করে, মাঝে মাঝে পত্রিকায় কলাম লেখে, আর বাকি সময় পার্কে বসে বাদাম খায়।
রাতে মেসে ফিরে ইমাদ তার ফোনটা নিয়ে বসল। অপরাজিতার বাবা, জনাব সোবহান চৌধুরী, রিটায়ার্ড সরকারি কর্মকর্তা। মানুষ হিসেবে তিনি কেমন, সেটা গবেষণা করা দরকার ছিল। কিন্তু প্রেমের ময়দানে গবেষণার চেয়ে সাহসের দাম বেশি। ইমাদ ডায়াল বাটনে চাপ দিল। রাত দশটা। ভদ্রলোকেরা এই সময় খবর দেখেন। রিসিভ হ’ল তৃতীয় রিংয়ে।
“হ্যালো?” ভারী কণ্ঠস্বর। রাশভারী মানুষ বোঝা যাচ্ছে।
“আসসালামু আলাইকুম। আমি ইমাদ।”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। ইমাদ কে? চিনতে পারছি না।”
“চেনার কথা না। আমি আপনার মেয়ের বয়ফ্রেন্ড। যদিও সে আমাকে বয়ফ্রেন্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, আমি নিজেকে তাই মনে করি।”
ফোনের ওপাশে পিনপতন নীরবতা। ইমাদ বুঝতে পারল, ওপাশে সোবহান সাহেবের প্রেসার বাড়ছে। হয়ত তিনি চশমা খুলে টেবিলের ওপর রাখছেন।
“কী বললে? তুমি কে?”
“আঙ্কেল, উত্তেজিত হবেন না। আমি ইমাদ। আমি আপনার মেয়ে অপরাজিতাকে বিয়ে করতে চাই।”
“ইয়ার্কি করছ আমার সাথে? কে তুমি? কোথায় থাক? বাবার নাম কী?”
“আঙ্কেল, বায়োডাটা ফোনে দিলে আপনি মনে রাখতে পারবেন না। আমি বরং কাল আপনার বাসায় আসি? বিকেলের চায়ের দাওয়াত দিলে খুশি হতাম। আপনার বাসায় নাকি ভাল সমুচা বানানো হয়?”
সোবহান সাহেব গর্জন করে উঠলেন। “তুমি এখন আমার সামনে থাকলে তোমাকেই আমি সমুচা বানিয়ে ফেলতাম! বেয়াদব ছেলে! কাল বিকেলে আসবে মানে? তোমার সাহস তো কম না!”
“সাহস তো লাগবেই আঙ্কেল। আপনার মেয়ের মত সুন্দর মেয়েকে বিয়ে করতে হ’লে সাহস লাগে। ভীতু ছেলের হাতে আপনি নিশ্চয়ই মেয়ে দেবেন না?”
“তুমি কাল বিকেল পাঁচটায় এস। আমি দেখব তোমার কত সাহস। পুলিশে খবর দিয়ে রাখব।”
ইমাদ লাইন কেটে দিল। তারপর লম্বা শ্বাস ফেলল। যুদ্ধ শুরু হ’ল। প্রথম ধাপে পাশ। দাওয়াত তো পাওয়া গেছে, যতই হোক সেটা ধমকের দাওয়াত।
পরদিন বিকেল পাঁচটা। সোবহান সাহেবের ড্রয়িংরুম। ঘরটা ছিমছাম। দেওয়ালে পুরনো ক্যালেন্ডার, শো কেসে মাটির পুতুল। ইমাদ বসে আছে সোফায়। তার পরনে একটা হলুদ পাঞ্জাবি। হিমুরা হলুদ পাঞ্জাবি পরে খালি পায়ে হাঁটে। ইমাদ হলুদ পাঞ্জাবি পরেছে, কিন্তু পায়ে কেডস। খালি পায়ে শ্বশুরবাড়ি আসা ঠিক না, ব্যক্তিত্বে ঘাটতি মনে হতে পারে।
সোবহান সাহেব ঢুকলেন। হাতে লাঠি নেই, তবে চোখের চাউনিতে লাঠির চেয়েও ধার বেশি। তিনি বসলেন ইমাদের ঠিক উল্টো দিকে।
“তোমার নাম ইমাদ?”
“জি আঙ্কেল। পুরো নাম ইমাদ হাসান। তবে আমি হাসান অংশটা ব্যবহার করি না। ছোট নাম ডাকতে সুবিধা।”
“কী করো তুমি?”
“আমি জীবন ও জগৎ নিয়ে চিন্তাভাবনা করি।”
“মানে? কোন কাজ করো না?”
“কাজ করি তো। আমি দু’টা টিউশনি করি। একটা ক্লাস নাইনের ছাত্র, আরেকটা ইন্টারমিডিয়েট। ভাল ছাত্র। ফেল করত, আমার কাছে পড়ে এখন পাস করে। এটা কি সমাজসেবা না?”
সোবহান সাহেব কপাল কুঁচকালেন। “আর ইনকাম?”
“ওই টিউশনি আর লেখালেখি। হাজার দশেক টাকা হয়। একজন মানুষের জন্য যথেষ্ট।”
“কিন্তু দু’জনের জন্য? আমার মেয়েকে খাওয়াবে কী? হাওয়া?”
“অপরাজিতা কি রাক্ষস? আমার মনে হয় না। তাছাড়া ও নিজেও তো কিছু করবে। আর ভালবাসলে মানুষ কম খেয়েও বাঁচে। এটা সাইকোলজিক্যাল ফ্যাক্ট।”
সোবহান সাহেব হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছেন। এই ছেলের মাথায় কি গণ্ডগোল আছে? নাকি পুরোটাই অভিনয়? “শোনো ইমাদ সাহেব, সিনেমা আর বাস্তব জীবন এক না। সিনেমায় নায়ক গান গেয়ে নায়িকা পটিয়ে ফেলে। বাস্তবে মাসের শেষে বাড়িভাড়া দিতে হয়। আমার মেয়ে এসি ছাড়া ঘুমাতে পারে না। তুমি কি এসি লাগাতে পারবে তোমার মেসে?”
ইমাদ হাসল। “আঙ্কেল, আপনার মেয়ে আমার সাথে মেসে থাকবে কেন? আমরা ছোট একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নেব। আর এসির বাতাস স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। প্রাকৃতিক বাতাস ভাল। আমরা জানলা খুলে দেব, দক্ষিণের বাতাস আসবে। আর যদি খুব গরম লাগে, আমি হাতপাখা দিয়ে বাতাস করব। বর হিসেবে আমি বেশ কেয়ারিং।”
দরজার পর্দার আড়ালে অপরাজিতা দাঁড়িয়েছিল। তার হাসিও পাচ্ছে, আবার ভয়ও করছে। বাবা মানুষটা বেশ রাগী। কিন্তু ইমাদের লজিকের কাছে বাবার রাগ কেমন যেন ভেজা বারুদের মত হয়ে যাচ্ছে। সোবহান সাহেব চশমাটা খুললেন। তিনি কিছুটা কৌতুকবোধ করছেন। ছেলেটা অদ্ভুত। কিন্তু সৎ। আজকাল সৎ সাহস দেখা যায় না।
“তুমি কি কোন নেশা করো?”
“করি। চায়ের নেশা। দিনে দশ-বারো কাপ চা খাই। তবে চিনি ছাড়া। আপনি কি আমাকে এক কাপ চা খাওয়াবেন না? গলা শুকিয়ে গেছে।”
সোবহান সাহেব ডাক দিলেন, “অপু! ও অপু! দুই কাপ চা দে তো মা। সাথে বিস্কুট দে।”
ইমাদ বুঝল, সে হাফ ব্যাটেল জিতে গেছে। চা অফার করা মানে সন্ধি স্থাপন।
চা খেতে খেতে আলাপ জমে উঠল। ইমাদ রাজনীতি, অর্থনীতি, এমনকি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ে কথা বলল। সোবহান সাহেব দেখলেন, ছেলেটা বাউন্ডুলে হ’লেও তার পড়াশোনা আছে। বুদ্ধি আছে। চা শেষ করে ইমাদ বলল, “আঙ্কেল, তাহলে ফাইনাল করি?”
“কিসের ফাইনাল?”
“বিয়ের তারিখ। আগামী শুক্রবার ভাল দিন। পূর্ণিমা আছে। পূর্ণিমার রাতে বিয়ে করলে সংসার আলোয় ভরে থাকে।”
“তুমি কি পাগল হ’লে? বললেই বিয়ে? আমার মেয়ে কি রাজি?”
“ও রাজি। মেয়েদের মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ। ও যে আমাকে পুলিশে ধরিয়ে দেয়নি, এটাই প্রমাণ করে ও আমাকে চায়।”
সোবহান সাহেব অপরাজিতাকে ডাকলেন। “অপু, এদিকে আয়।”
অপরাজিতা গুটিগুটি পায়ে এল। নীল সালোয়ার কামিজ। ওড়নাটা গায়ে জড়ানো।
“তুই কি এই ছেলেটাকে চিনিস?”
অপরাজিতা মাথা নিচু করে বলল, “চিনি বাবা। উনি আমার সিনিয়র ছিলেন ভার্সিটিতে।”
“ও নাকি তোকে বিয়ে করতে চায়। তোর কী মত?”
অপরাজিতা ইমাদের দিকে তাকাল। ইমাদ মিটিমিটি হাসছে। তার চোখে আশ্বাস। ‘ভয় নেই, আমি আছি’। অপরাজিতা ফিসফিস করে বলল, “তুমি যা ভাল বোঝো বাবা।”
সোবহান সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “বুঝেছি। সব আগে থেকেই সেট করা। শুধু আমাকে ভিলেন বানানোর জন্য ডাকা। ঠিক আছে ইমাদ সাহেব, তুমি তোমার অভিভাবকদের পাঠাও, কথা বলি। কিন্তু শর্ত আছে।”
“কী শর্ত আঙ্কেল?”
“তোমাকে একটা স্থায়ী চাকরি নিতে হবে। মাস্টারি করো, বা কেরানিগিরি— একটা ফিক্সড ইনকাম লাগবে। ভালবাসার ফানুস বেশিক্ষণ ওড়ে না, সুতো ছিঁড়ে যায়। সংসারের জন্য শক্ত সুতো লাগে।”
“চেষ্টা করব আঙ্কেল। কিন্তু আমারও একটা শর্ত আছে।”
“তোমার আবার শর্ত কিসের?”
“আমি চাকরিতে জয়েন করব ঠিকই, কিন্তু জোছনা রাতে আপনার মেয়েকে নিয়ে আমি ছাদে বসে থাকব। তখন আমাকে ডিস্টার্ব করা যাবে না। আর মাসে একদিন আমরা বৃষ্টিতে ভিজব। আপনি আপত্তি করতে পারবেন না।”
সোবহান সাহেব হাসলেন। অনেকদিন পর তিনি এমন প্রাণ খুলে হাসলেন। “ঠিক আছে। পাগলের সাথে পাগল হওয়া ছাড়া উপায় কী?”
বিয়ের ছয় মাস পর। বর্ষাকাল। আষাঢ় মাসের আকাশ কালো করে আছে। সকাল থেকেই টিপটিপ বৃষ্টি। ইমাদ আর অপরাজিতা তাদের ছোট্ট দুই রুমের ফ্ল্যাটে সংসার পেতেছে। সোবহান সাহেবের কথা রাখতে ইমাদ একটা ছোটখাট চাকরি নিয়েছে – প্রকাশনা সংস্থায় প্রুফ রিডারের কাজ। খুব আহামরি বেতন না, কিন্তু শান্তি আছে।
অপরাজিতা বারান্দায় বসে আছে। তার হাতে ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ির প্লেট। ইমাদ অফিস থেকে ফেরেনি। আজ তার ফিরতে দেরি হবে। বৃষ্টির শব্দ শুনলে অপরাজিতার মন কেমন করে। এই মেঘলা দিনে ইমাদকে খুব মনে পড়ে। মানুষটা কাছেই থাকে, তবুও মনে পড়ে। এটাকেই কি ভালবাসা বলে? হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের মত— “কাছে থেকেও যে বিরহ, তাই প্রেম।”
কলিংবেল বাজল। অপরাজিতা দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলল। ইমাদ দাঁড়িয়ে আছে। পুরোদস্তুর ভিজে গেছে। শার্ট গায়ের সাথে লেপটে আছে। হাতে একটা কদম ফুল। বর্ষাকালে ঢাকায় কদম ফুল পাওয়া কঠিন। সে নিশ্চয়ই রমনা পার্কের কোন গাছ থেকে চুরি করেছে।
“ভিজেছ কেন? ছাতা নাওনি কেন?” অপরাজিতা ধমক দিল। কিন্তু ধমকের সুরে কোন রাগ নেই, আছে উদ্বেগ।
“বর্ষাকালে ছাতা নেওয়া পাপ। আকাশ জল ঢালছে আমাদের ভেজানোর জন্য, আর আমরা ছাতা দিয়ে সেটা আটকাব? এটা প্রকৃতির অপমান। এই নাও, কদম ফুল।”
“চুরি করেছ?”
“প্রেমের জন্য চুরি করা জায়েজ। আর এটা তো ফুল, কারও সম্পত্তি না। প্রকৃতির দান।”
“পাগল একটা! ঘরে এস, জ্বর আসবে তো।”
ইমাদ ঘরে ঢুকল। তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বলল, “অপরাজিতা?”
“হুম?”
“আজ কিন্তু আমাদের শর্ত মানার দিন।”
“কোন শর্ত?”
“মনে নেই? তোমার বাবাকে বলেছিলাম, মাসে একদিন বৃষ্টিতে ভিজব। আজ সেই দিন। চলো, ছাদে যাই।”
“এখন? এই সন্ধ্যায়?”
“সন্ধ্যাই তো পারফেক্ট টাইম। আলো-আঁধারি। বৃষ্টির শব্দে কেউ কারও কথা শুনবে না। শুধু আমি আর তুমি।”
অপরাজিতা না করতে পারল না। ইমাদের পাগলামির সাথে সে এখন অভ্যস্ত। বরং এই পাগলামিটা তার ভাল লাগে। নিয়মমাফিক জীবনে এই একটু অনিয়মই তো বাঁচার আনন্দ।
ছাদে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। অপরাজিতা আর ইমাদ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। অপরাজিতার পরনে সেই নীল শাড়িটা। বৃষ্টিতে ভিজে নীল রঙটা আরও গাঢ় হয়েছে। ইমাদ অপরাজিতার হাত ধরল।
“অপরাজিতা?”
“বলো।”
“তুমি কি সুখী?”
অপরাজিতা ইমাদের দিকে তাকাল। বৃষ্টির পানির ফোঁটা ইমাদের চশমার কাচ বেয়ে পড়ছে। ঝাপসা চোখ, কিন্তু দৃষ্টিটা স্বচ্ছ।
“সুখী হওয়ার সংজ্ঞা কী ইমাদ?”
“সংজ্ঞা নেই। সুখ কোন অঙ্ক না, যে সূত্র দিয়ে মিলবে। সুখ হ’ল অনুভূতি। এই যে এখন বৃষ্টিতে ভিজছ, আমার হাত ধরে আছ— তোমার কি মনে হচ্ছে আর কিছু না থাকলেও চলত?”
“হুম, মনে হচ্ছে।”
“তাহলেই তুমি সুখী।”
অপরাজিতা ইমাদের কাঁধে মাথা রাখল। “জানো, প্রথম দিন যখন তুমি আমাকে ‘মেমসাহেবা’ বলেছিলে, আমার খুব রাগ হয়েছিল।”
“তাই নাকি?”
“হ্যাঁ। মনে হয়েছিল, এই ছেলেটা এত ফাজিল কেন? কিন্তু পরে বুঝলাম, ফাজলামির আড়ালে মানুষটা খুব একা। তোমার একাকিত্বটা আমাকে ছুঁয়েছিল।”
“আর এখন? এখন কি আমি একা?”
“না। এখন তুমি আর আমি মিলে ‘আমরা’। আর এই বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আমাদের সাক্ষী।”
ইমাদ হঠাৎ বলল, “একটা গান গাও তো।”
“এই বৃষ্টিতে?”
“হ্যাঁ। বৃষ্টি আর গান একে অপরের পরিপূরক। রবীন্দ্রসংগীত।”
অপরাজিতা গুনগুন করে গাইল—”আজি ঝরঝর মুখর বাদর দিনে… জানিনে, জানিনে… কিছুতে কেন যে মন লাগে না…” গানের সুর বৃষ্টির শব্দের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেল। ইমাদ অপরাজিতাকে জড়িয়ে ধরল, খুব শক্ত করে। যেন এই ঝড়ের রাতে মেয়েটা উড়ে না যায়, কিংবা এই সুখের মুহূর্তটা ফুরিয়ে না যায়।
বছর দুই পরে। ইমাদ আর অপরাজিতা তাদের মেয়েকে নিয়ে পার্কে এসেছে। মেয়ের নাম রাখা হয়েছে ‘হিম’। অপরাজিতা চেয়েছিল অন্য নাম রাখতে, কিন্তু ইমাদ নাছোড়বান্দা। সে বলেছে, মেয়ের নাম হিম না হ’লে তার ব্যক্তিত্ব বিকশিত হবে না। হিম নীল ফ্রক পরে ঘাসের ওপর হাঁটছে। ইমাদ বাদাম ছিলছে আর অপরাজিতার হাতে তুলে দিচ্ছে।
“শুনছেন?” অপরাজিতা ডাকল।
“জি, শুনছি। কানের মেশিন ঠিক আছে।”
“সেই যে বলেছিলেন বাবাকে, সারা জীবন ভালবাসবেন। বেতনের টাকা সব আমার হাতে তুলে দেবেন। এখন তো দেন না। কিছু টাকা নিজের কাছে রেখে দেন।”
“আরে, ওটা তো রাখি তোমার জন্য সারপ্রাইজ গিফট কেনার জন্য। এই যেমন আজ তোমার জন্মদিন।”
অপরাজিতা অবাক হ’ল। “আজ আমার জন্মদিন? আমার তো মনে নেই!”
“নিজের জন্মদিন নিজের মনে থাকে না। অন্যকে মনে করিয়ে দিতে হয়। পকেটে হাত দাও তো আমার।”
অপরাজিতা ইমাদের শার্টের পকেটে হাত দিল। একটা ছোট কাগজ ভাঁজ করা। সে কাগজটা খুলল। তাতে লেখা—
“প্রিয় অপরাজিতা,
মানুষ বাঁচে কত বছর? ষাট, সত্তর? এই তুচ্ছ জীবনে তোমাকে পাওয়াটা ছিল আমার জীবনের সেরা ম্যাজিক। তুমি আমার সেই ম্যাজিক লণ্ঠন, যা জ্বালালে পৃথিবী রঙিন হয়ে যায়। শুভ জন্মদিন, মেমসাহেবা।
ইতি,
তোমার উন্মাদ ইমাদ।”
অপরাজিতা চিঠিটা বুকে চেপে ধরল। তার চোখ ভিজে উঠল। এই মানুষটা জানে কীভাবে তাকে স্পেশাল ফিল করানো যায়। হীরা জহরত দিয়ে নয়, সামান্য কাগজের টুকরো আর একবুক ভালবাসা দিয়ে।
“কাঁদছ কেন? পার্কে মানুষ আছে। সবাই ভাববে আমি তোমাকে মারধর করছি।”
“কাঁদছি না। চোখে সুখের কণা পড়েছে।”
“সুখের কণা? ওটা বের করার দরকার নেই। থাকুক।”
হিম ছুটে এল। তার হাতে একটা শুকনো পাতা। “বাবা! বাবা! দেখো, পাতা!”
ইমাদ মেয়েকে কোলে তুলে নিল। “মা, এটা শুধু পাতা না। এটা হ’ল একটা চিঠি। গাছ মাটিকে লিখেছে। আমরা পড়তে পারি না, কিন্তু মাটি পড়তে পারে।”
অপরাজিতা হাসল। বাপ-মেয়ে দুজনেই এক ধাঁচের। গল্পবাজ।
বিকেলের সোনা রোদ এসে পড়েছে অপরাজিতার মুখে। ইমাদ মুগ্ধ হয়ে দেখল। সেই প্রথম দিনের মত, যেদিন সে বলেছিল— “সাজলে আপনাকে অসম্ভব সুন্দর লাগে”। আজ অপরাজিতা সাজেনি। তবুও তাকে সুন্দর লাগছে। মানুষের চোখে সব সময় প্রিয় মানুষটিকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর লাগে। এটা কোন লজিক না, এটা ধ্রুব সত্য। ইমাদ মনে মনে বলল, “তুমি অপরাজিতা। তোমাকে জয় করা যায় না। শুধু ভালবাসা দিয়ে বেঁধে রাখা যায়। আমি সেই বাঁধনেই আটকে থাকতে চাই আমৃত্যু।”
দূরে কোথাও আজান দিচ্ছে। পাখিরা ফিরছে নীড়ে। ইমাদ, অপরাজিতা আর তাদের ছোট্ট পৃথিবীও বাড়ির পথে পা বাড়াল। তাদের গল্পটা সিনেমার মত জমকালো নয়, কিন্তু বড় বেশি আপন, বড় বেশি সত্য।
রাতে বারান্দায় বসে চা খাচ্ছে ইমাদ। অপরাজিতা মশারি টাঙিয়ে এসেছে।
“শুনছ ইমাদ?”
“বলো।”
“আজ রাতে চাঁদ উঠবে। বাবা ফোন করেছিলেন। মনে করিয়ে দিলেন তোমার সেই শর্তের কথা। পূর্ণিমার রাতে ছাদে বসা।”
“সোবহান সাহেব মানুষটা কঠিন হ’লেও স্মৃতিশক্তি ভাল। চলো, ছাদে যাই।”
“হিম ঘুমিয়ে পড়ুক।”
“হিম ঘুমাবে না। ওকেও চাঁদ দেখাব। ও জানুক, ওর বাবা-মা পাগল কিসিমের।”
তিনজন মিলে ছাদে গেল। বিশাল চাঁদ উঠেছে আকাশে। শহরের ধোঁয়াশায় চাঁদটাকে একটু ঝাপসা লাগছে, তবুও আলো কমছে না। অপরাজিতা ইমাদের হাত ধরল।
“ইমাদ, আমরা বুড়ো হয়ে গেলেও কি এভাবে ছাদে আসব?”
“অবশ্যই আসব। তখন আমাদের হাতে লাঠি থাকবে। দাঁত থাকবে না। আমি হয়ত বলব, ‘মেমসাহেবা, দাঁত তো নেই, চাঁদ চিবিয়ে খাব কী করে?’”
অপরাজিতা হাসল। “তুমি কখনও বদলাবে না।”
“বদলানো মানেই তো মৃত্যু। আমি প্রেমিকের মৃত্যু চাই না।”
ইমাদ অপরাজিতার কপালে আলতো করে চুমু খেল। চাঁদের আলোয় দু’টি ছায়া এক হয়ে গেল।
পৃথিবীতে অনেক জটিলতা আছে, অনেক দুঃখ আছে। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন মনে হয় জীবনটা আসলেই সুন্দর। বেঁচে থাকাটা একটা উদযাপন। অপরাজিতা নামক মেয়েটি যে ইমাদ নামক বাউন্ডুলে ছেলেটির ঘরকে স্বর্গ বানিয়ে দিয়েছে, সেটা আকাশের চাঁদ ছাড়া আর কেউ জানল না। আর জানল ইমাদ, যে প্রতিদিন সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করে— একটি “অন্য কারণ” খুঁজে পাওয়ার জন্য। সেই তীব্র কারণ, যার নাম ভালবাসা।
লেখক পরিচিতি : সামিরা হিমু
সামিরা হিমু ঢাকা শহরের ব্যস্ত কোলাহলের মাঝে বাস করলেও তাঁর মূল শিকড় লুকিয়ে আছে রুপসী বরিশালের শান্ত-স্নিগ্ধ প্রকৃতিতে। ২০২২ সালে হুট করেই শুরু হয়েছিল কলম ধরা, যা আজ তাঁর জীবনের অন্যতম অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কিন্তু পড়ালেখার প্রথাগত ঘেরাটোপের বাইরে সাহিত্যই তাঁর সবচেয়ে আপন ও নিরাপদ আশ্রয়। সামিরা বিশ্বাস করেন, মানুষের আসল পরিচয় কেবল তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা পড়ালেখায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; মানুষের ভেতরের সৃজনশীলতা ও সুপ্ত প্রতিভাও তাঁর স্বতন্ত্র সত্তাকে অনন্য রূপ দেয়। যদিও তাঁর খুব কাছের মানুষ বা পরিবার মনে করে সাহিত্য চর্চার মত বিষয়ে জীবনের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, তবুও নিজের ভেতরের তাগিদেই তিনি লিখে চলেন। সমাজের বাঁধাধরা নিয়মের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজের ভালোলাগা ও সৃজনশীলতাকে বাঁচিয়ে রাখাই তাঁর মূল প্রেরণা। অনুভূতির নিখুঁত বুণনে অনুগল্প, বড়গল্প, উপন্যাস এবং অনুভূতির কাব্যে তিনি নিজের ভেতরের আবেগগুলোকে রূপ দিয়ে থাকেন। যৌথ সংকলন “জলতরঙ্গের অনুপ্রাস” গ্রন্থে তাঁর লেখা প্রথম বইয়ের পাতায় জায়গা করে নেয়। এছাড়াও বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর অসংখ্য স্পর্শকাতর লেখা পাঠকদের হৃদয় ছুঁয়েছে। বিশাল সাহিত্যজগতে সামিরা হিমু অত্যন্ত বিনয়ী ও প্রচারবিমুখ। তারকাখ্যাতি বা অগণিত মানুষের কাছে পরিচিত হবার কোনো তীব্র ব্যাকুলতা তাঁর নেই। তাঁর একমাত্র চাওয়া—তাঁর লেখা কয়েকটি বাক্য বা অনুভূতির গল্প পড়ে যদি কোনো অজানা পাঠক ক্ষণিকের জন্য হলেও আনন্দ পান কিংবা নিজের জীবনের কোনো একটা কোণকে খুঁজে পান, তবেই একজন লেখক হিসেবে তাঁর সার্থকতা। নিজের এই নিভৃত সাহিত্যচর্চা দিয়েই তিনি ধীরে ধীরে নিজস্ব এক স্নিগ্ধ পাঠকবৃত্ত তৈরি করে নিতে চান।

