লেখক : সৈকত প্রসাদ রায়
নদীয়া জেলার শান্ত, স্নিগ্ধ প্রকৃতির কোলে, মাজদিয়া থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার পথ পেরোলেই এক মহাকালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শিবনিবাস গ্রাম। এটি শুধু বাংলার মানচিত্রের একটি স্থান নয়, এটি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের দূরদর্শিতা, তাঁর প্রজা-প্রেম এবং এক অস্থির সময়ের সাহসিক আত্মরক্ষার প্রতীক। এই পবিত্র মাটির প্রতিটি ধূলিকণা যেন রাজকীয় আবেগ, ভক্তের আর্তি আর স্থাপত্যের এক নিরবধি গল্প বলে চলে। ২৩ জেলার রূপ-বৈচিত্র্য ও দর্শনীয় স্থান বর্ণনা করতে গেলে শিবনিবাসের নাম প্রথম দিকে উঠে আসে।
সময়টা ছিল বাংলার ইতিহাসের এক তমসাচ্ছন্ন অধ্যায়—১৭০০ শতকের মাঝামাঝি। মারাঠা বর্গীদের অশ্বের খুরের দাপট বাংলার মাঠে-ঘাটে যেন এক বিভীষিকার সৃষ্টি করেছিল। বর্গীর আক্রমণে শান্তি বিঘ্নিত, জীবন বিপন্ন। রাজধানী কৃষ্ণনগরের নিরাপত্তা যখন প্রশ্নের মুখে, তখন প্রজাহিতৈষী মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর রাজ্য এবং প্রজাদের সুরক্ষিত আশ্রয়ের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। এই অস্থির পরিস্থিতিতেই জন্ম নিল এক নতুন তীর্থভূমি—শিবনিবাস। এই স্থানের আবিষ্কারও যেন দৈবের এক অপূর্ব লীলা। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র তখন নসরত খাঁ নামক এক দুর্ধর্ষ ডাকাতকে দমন করার উদ্দেশ্যে মাজদিয়ার কাছে এক নিবিড় গহন অরণ্যে উপস্থিত হন। ডাকাতকে পরাস্ত করার পর, সেই বিজয়ের রাতে তিনি সেখানেই অবস্থান করেন। প্রকৃতির মাঝে, গভীর বনের নিস্তব্ধতায়, হয়ত তিনি এক নতুন পথের সন্ধান করছিলেন।
পরদিন প্রভাতে মহারাজ নদীতীরে গিয়ে প্রকৃতির শীতল জলে মুখ ধুচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে ঘটল সেই অলৌকিক ঘটনাটি – একটি তাজা রূপোলি রুই মাছ লাফিয়ে উঠে সরাসরি মহারাজের সামনে এসে পড়ল! এ তো শুধু মাছ নয়, এ যেন নিয়তির এক স্পষ্ট ইঙ্গিত! মহারাজ তখন তাঁর আত্মীয়, আনুলিয়া নিবাসী কৃষ্ণরামের দিকে তাকালেন। কৃষ্ণরাম সেই মুহূর্তের গুরুত্ব অনুধাবন করে মহারাজকে যে কথাটি বললেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রইল: “এ স্থান অতি রমণীয়, উপরন্তু রাজভোগ্য সামগ্রী নিজে থেকেই মহারাজের সামনে এসে হাজির হয়। তাই এই স্থানে মহারাজ বাস করলে মহারাজের নিশ্চয়ই ভাল হবে।”
এই বাণী মহারাজের হৃদয়ে গভীর আস্থা জোগালো। তিনি তো এইরকমই এক নিরাপদ, শুভ স্থান খুঁজছিলেন, যেখানে প্রকৃতির আশীর্বাদ আর মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে। বর্গীর অত্যাচার থেকে প্রজাদের মুক্ত করার আকাঙ্ক্ষা আর এই দৈব ইঙ্গিত মিলেমিশে গেল এক বিন্দুতে। সেই শুভক্ষণে সিদ্ধান্ত হ’ল—এই স্থানেই হবে নতুন রাজধানী। আর শিবের নামে শ্রদ্ধায় ও ভালবাসায় সেই স্থানের নামকরণ করা হ’ল—শিবনিবাস।
স্থানটি মনোনীত হওয়ার পর, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র কেবল একটি শহর নির্মাণ করেননি; তিনি তৈরি করেছিলেন এক দুর্ভেদ্য আশ্রয়। তিনি ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এলাকাটিকে কঙ্কণাকারে বেষ্টিত করে তুললেন। নদীই হয়ে উঠল প্রকৃতির স্বাভাবিক বেষ্টনী, যা বহিঃশত্রুর প্রবেশ কঠিন করে তুলল। এখানেই নির্মিত হ’ল তাঁর সুন্দর রাজপ্রাসাদ। রাজকীয় জাঁকজমক, শিল্পকলা এবং নিরাপত্তার অপূর্ব মিশ্রণে শিবনিবাস হয়ে উঠল মহারাজের আশা ও স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। এই নতুন রাজধানীতেই মহারাজ স্থাপন করলেন তাঁর আরাধ্য দেব-দেবীর মন্দির। শিবনিবাস, নামেই যার শিবের বাস তা কেবল রাজার বাসস্থান নয়, হয়ে উঠল এক পবিত্র ধর্মস্থান।
শিবনিবাসকে কেবল রাজনৈতিক গুরুত্ব দিয়ে নয়, আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মহারাজ। এই মাটিতেই তিনি আয়োজন করেন এক মহা মহিমান্বিত অনুষ্ঠান—অগ্নিহোত্র বাজপেয় যজ্ঞ। এই যজ্ঞের ধর্মীয় গভীরতা ও রাজকীয় সমারোহ ছিল অবিস্মরণীয়। এই মহাযজ্ঞে অংশ নিতে ভারতবর্ষের দূর দূরান্ত থেকে সমাগত হয়েছিলেন কাশীর পাণ্ডিত্যপূর্ণ নগরী, কাঞ্চীপুরম সহ বিভিন্ন স্থানের দিকপাল পণ্ডিতমণ্ডলী। যজ্ঞের সফলতা ও মহারাজের নিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়ে এই বিদ্বান সমাজ তাঁকে এক বিরল সম্মানে ভূষিত করেন: ‘অগ্নিহোত্রী বাজপেয়ী’। এই উপাধি মহারাজের জীবনের এক শ্রেষ্ঠতম অর্জন। এই সময় শিবনিবাসের খ্যাতি এমন উচ্চতায় পৌঁছায় যে, এটি ‘কাশীতুল্য’ পবিত্র স্থান হিসেবে পরিগণিত হতে শুরু করে। ভাবুন একবার, বাংলার এক প্রত্যন্ত অঞ্চল, যার খ্যাতি পৌঁছে গিয়েছে সুদূর কাশীর পাদদেশে! এই আবেগই শিবনিবাসকে অমর করে রেখেছে |
কালের নিষ্ঠুর হাতে রাজপ্রাসাদের জৌলুস হয়ত আজ আর অবশিষ্ট নেই, কিন্তু মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের স্থাপিত তিনটি মন্দির আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি মন্দিরের উচ্চতা প্রায় ৬০ ফুট—এই বিশালতা যেন অতীতের রাজকীয় মহিমাকে ধারণ করে। এই তিনটির মধ্যে প্রথম এবং প্রধান দেবালয়টি হ’ল ‘রাজরাজেশ্বর শিবমন্দির’। স্থানীয় মানুষের কাছে, ভালবাসার এক চিরন্তন বন্ধনে এটি পরিচিত ‘বুড়োশিবের মন্দির’ নামে। ১৭৫৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত এই মন্দিরটি বাংলার মন্দিররীতিতে এক বৈপ্লবিক সংযোজন। এই মন্দির যেন বাংলার স্থাপত্যশিল্পীর এক অনন্য সৃষ্টি—প্রচলিত কোন শ্রেণী বা রীতিতে এটিকে বাঁধা যায় না। মন্দিরটি স্থাপিত হয়েছে এক সুউচ্চ ভিত্তিবেদির উপর, যা এর বিশালতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। এর প্রস্থচ্ছেদ অষ্টকোণাকার, এবং এর শীর্ষদেশ এক সুবিশাল ছত্রাকার রূপে নির্মিত। খাড়া দেওয়ালের আটটি কোণে মিনার-আকৃতির আটটি সরু থাম যেন এর উচ্চতাকে আকাশের দিকে টেনে নিয়ে গেছে। তবে এর সবচেয়ে মনকাড়া বৈশিষ্ট্য হ’ল এর ‘গথিক’ রীতির প্রভাব—যা বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় প্রবেশদ্বারের খিলান এবং দেওয়ালের ভরাট করা নকল খিলানগুলিতে। বাংলার নিজস্ব শিল্পকলার সঙ্গে পশ্চিমের স্থাপত্যশৈলীর এই মিশ্রণই কৃষ্ণচন্দ্রের উন্নত রুচি এবং শিল্পানুরাগের প্রমাণ বহন করে। মন্দিরের গর্ভগৃহে বিরাজমান, ভক্তির আধার হলেন এক বিশাল ৯ ফুট উঁচু কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ। এই শিবলিঙ্গের দর্শনে ভক্তের মন আপনা থেকেই শ্রদ্ধায় নত হয়ে আসে। শিবলিঙ্গের এই বিরল উচ্চতার জন্যই আজও নিত্যপূজার সময় শিবের মাথায় জল, দুধ ইত্যাদি ঢালতে ব্যবহার করতে হয় বিশেষ সিঁড়ি।
শিবনিবাসের যে পবিত্র ভূমিতে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের স্থাপত্যের কীর্তি ও ভক্তির মহিমা আজও অক্ষুণ্ণ, সেই স্থানেই ‘বুড়োশিবের মন্দির’ বা রাজরাজেশ্বর-এর ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দেবালয়টি—যা ‘রাজ্ঞীশ্বর’ শিবমন্দির নামে পরিচিত। প্রথম মন্দিরের বিশালতা ও কাঠামোর বিপরীতে, এই মন্দিরটি বহন করে এক শান্ত, স্নিগ্ধ ও ঐতিহ্যবাহী বাংলার স্থাপত্যের ছাপ, যা গভীর আবেগে এক রাজকীয় প্রেমের গল্প ফিসফিস করে বলে। রাজ্ঞীশ্বর শিবমন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র এবং তাঁর দ্বিতীয়া মহিষীর এক গভীর যোগসূত্র। এই মন্দিরটির প্রতিষ্ঠাফলক আজও তার সেই ঐতিহাসিক গুরুত্বকে বহন করে চলেছে। ফলকে উৎকীর্ণ লিপি থেকে জানা যায়, মহারাজের দ্বিতীয়া মহিষী ছিলেন যেন স্বয়ং মূর্তিমতী লক্ষ্মী, যিনি রাজপরিবারের ঐশ্বর্য ও শুভ্রতাকে মূর্ত করে তুলেছিলেন। ইতিহাসের গবেষকরা মনে করেন, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর প্রথমা মহিষীর প্রতি ভালবাসার নিদর্শনস্বরূপ যেমন রাজরাজেশ্বর মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন, ঠিক তেমনই এই রাজ্ঞীশ্বর (অর্থাৎ রাজ্ঞী বা রানীর ঈশ্বর) মন্দিরটি তিনি নির্মাণ করেছিলেন তাঁর দ্বিতীয়া মহিষীর প্রতি সম্মান ও ভালবাসার প্রতীক হিসেবে। এই মন্দিরটি কেবল একটি স্থাপত্য নয়, এটি একজন মহারাজার হৃদয়ের কোমল অনুভূতির প্রকাশ—যা পাথর কেটেও চিরন্তন প্রেমের বার্তা দেয়। মন্দিরটির প্রতিষ্ঠা কাল ছিল ১৬৮৪ শকাব্দ, যা ইংরেজি সাল অনুযায়ী ১৭৬২ খ্রিষ্টাব্দ। অর্থাৎ, প্রথম মন্দির রাজরাজেশ্বর (১৭৫৪ খ্রিষ্টাব্দ)-এর প্রতিষ্ঠার প্রায় আট বছর পরে, মহারাজ তাঁর জীবনের এক অন্য পর্যায়ে এই দ্বিতীয় মন্দিরটি স্থাপন করেন। প্রথম মন্দির রাজরাজেশ্বর যেখানে ছিল অষ্টকোণাকার ও গথিক-রীতির দ্বারা প্রভাবিত, সেখানে রাজ্ঞীশ্বর শিবমন্দির ধারণ করেছে বাংলার চিরায়ত মন্দিররীতির বৈশিষ্ট্য। এটি নির্মিত হয়েছে এক উঁচু ভিত্তিবেদির উপরে, যা মন্দিরটিকে এক মহৎ উচ্চতা ও দৃঢ়তা দান করেছে। রাজ্ঞীশ্বর মন্দিরের মূল কাঠামোটি বর্গাকার প্রস্থচ্ছেদের উপর স্থাপিত, যা স্থাপত্যের দিক থেকে সুষম ও ঐতিহ্যবাহী। এর চূড়াটি বাংলার অতি পরিচিত ও অত্যন্ত প্রিয় স্থাপত্যশৈলী—চারচালাযুক্ত। চারচালা রীতির স্থাপত্য মন্দিরের ছাদকে চারটি ঢালু অংশে বিভক্ত করে, যা এক বিশেষ নান্দনিকতা সৃষ্টি করে এবং বর্ষার জল নিকাশেও সাহায্য করে। এই কাঠামোটি কেবল চোখ জুড়ানোর জন্য নয়, এটি বাংলার মাটির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এক শিল্পশৈলী, যা এই স্থানে এসে যেন এক নিবিড় শান্তি ও স্বস্তি এনে দেয়। রাজ্ঞীশ্বর মন্দিরের গর্ভগৃহে যে শিবলিঙ্গটি নিত্যপূজিত হন, তা প্রথম মন্দিরের শিবলিঙ্গের চেয়ে আকারে কিছুটা ছোট হলেও, ভক্তির গভীরতায় কোন অংশে কম নয়। এই শিবলিঙ্গের উচ্চতা সাড়ে সাত ফুট । বিশাল কষ্টিপাথরের এই শিবলিঙ্গটিও তার বিশালতা দিয়ে ভক্তদের মনে অপার শ্রদ্ধা ও বিস্ময় সৃষ্টি করে। প্রথম মন্দিরের মতই, এখানেও শিবলিঙ্গের মাথায় জল ঢালবার জন্য সিঁড়ির ব্যবস্থা রয়েছে। এই সিঁড়ি যেন ভক্তের ভক্তি ও দেবতার উচ্চতার মাঝে এক সেতু রচনা করে। সাড়ে সাত ফুট উচ্চতার এই শিবলিঙ্গের মাথায় জল ঢালতে সিঁড়ির ব্যবহার কেবল একটি নিয়ম নয়, এটি হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা এক নিরবচ্ছিন্ন ভক্তিধারার প্রতীক, যা আজও শিবনিবাসের এই দ্বিতীয় দেবালয়ে একই নিষ্ঠা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে পালিত হয়। রাজ্ঞীশ্বর শিবমন্দির তাই কেবল একটি ঐতিহাসিক কাঠামো নয়—এটি মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনের এক স্পর্শকাতর অধ্যায়, বাংলার ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের এক সুন্দর নিদর্শন, এবং তাঁর দ্বিতীয়া মহিষীর প্রতি এক রাজার অমর ভালবাসার প্রতীক হয়ে আজও শিবনিবাসের বুকে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে।
শিবনিবাসের পবিত্র প্রাঙ্গণে, যেখানে রাজরাজেশ্বর ও রাজ্ঞীশ্বর শিবমন্দিরদ্বয় আপন মহিমায় উজ্জ্বল, সেখানেই তাঁদের পাশে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে তৃতীয় দেবালয়টি—যা ‘রামসীতার মন্দির’ নামে পরিচিত। এই মন্দিরটি কেবল দেব-দেবী রাম ও সীতার পুণ্যস্থান নয়, এটি স্থাপত্য-শৈলীর এক বিরল নিদর্শন, যেখানে ঐতিহ্য ও বিদেশী রীতির এক অভূতপূর্ব মিলন ঘটেছে। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের শিল্পভাবনার শেষ প্রান্তে এই মন্দিরটি যেন এক আশ্চর্য স্থাপত্যের স্বাক্ষর বহন করে চলেছে। রামসীতার মন্দিরটিও ১৭৬২ খ্রিষ্টাব্দে, অর্থাৎ রাজ্ঞীশ্বর শিবমন্দিরের সমসময়েই প্রতিষ্ঠিত হয়। এই স্থাপনাটিও এক উঁচু ভিত্তিবেদির উপর স্থাপিত, যা শিবনিবাসের মন্দির নির্মাণের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। এই উঁচু ভিত্তি শুধু দৃঢ়তাই দেয় না, বরং স্থাপনাটিকে এক রাজকীয় মর্যাদা দান করে। এই মন্দিরের মূল কাঠামোটি স্থাপত্যের দিক থেকে অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। এটি আংশিক দালান আকারের কোঠার উপর নির্মিত। অর্থাৎ, মন্দিরটির নিম্নভাগ একটি দালানের মত বিস্তৃত এবং এর উপরেই স্থাপিত হয়েছে প্রধান চূড়া বা শিখর। এই শিখরটি অনেকটা বর্গক্ষেত্রাকার, যা এটিকে অন্য দুটি মন্দিরের চূড়া থেকে স্বতন্ত্রতা দিয়েছে। এই কাঠামোটি যেন বাংলার সাধারণ মন্দির শৈলীর থেকে বেরিয়ে এসে এক নতুন পরীক্ষামূলক রীতির জন্ম দিয়েছে।
রামসীতার মন্দিরের স্থাপত্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি হ’ল এর অভ্যন্তরের ছাদের জটিল ও বিরল জ্যামিতিক নকশা। দালান আকারের অংশটির প্রতিটি ছাদ নির্মিত হয়েছে সমদ্বিবাহু ট্রাপিজিয়াম আকৃতিতে। এই বিশেষ জ্যামিতিক কাঠামোটি মন্দিরের অভ্যন্তরে এক অদ্ভুত ভারসাম্য ও নান্দনিকতা সৃষ্টি করেছে। যেখানে অন্যান্য মন্দিরে গর্ভগৃহের ছাদ সাধারণত ত্রিভুজাকার বা গোলাকার হয়, সেখানে এই মন্দিরের গর্ভগৃহের প্রতিটি ছাদ এক বিরল আকৃতি ধারণ করেছে। এটি ত্রিভুজাকার না হয়ে অনেকটা ঘণ্টার লম্বচ্ছেদের মত বিরল আকৃতির। এই ঘণ্টার আকারের ছাদটি কেবল দেখতেই সুন্দর নয়, এটি আলো-ছায়ার খেলায় এবং ধ্বনি-সঞ্চারণে এক বিশেষ প্রভাব ফেলে, যা উপাসনার পরিবেশকে আরও গভীর করে তোলে। এই ধরনের ছাদ-নির্মাণ নিঃসন্দেহে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সময়কার স্থপতিদের উচ্চমানের দক্ষতা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার মানসিকতার প্রমাণ। রামসীতার মন্দিরটিও, রাজরাজেশ্বর মন্দিরের মত, বিদেশী স্থাপত্যশৈলীর দ্বারা প্রভাবিত। মন্দিরটির দালান এবং শিখরের খিলানগুলি গথিক রীতি অনুযায়ী নির্মিত। গথিক রীতির এই সুউচ্চ, সূক্ষ্ম খিলানগুলি ভারতীয় স্থাপত্যের সঙ্গে মিশে এক অপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। এটি প্রমাণ করে যে অষ্টাদশ শতকের বাংলায় শিল্প ও স্থাপত্যে আন্তর্জাতিক প্রভাবের প্রবেশ ঘটেছিল এবং মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র সেই নতুনত্বের একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হ’ল, শিবনিবাসের এই মন্দিরগুলিতে ‘টেরাকোটা’র কোন কাজ নেই। বাংলায় মন্দির স্থাপত্যে যেখানে টেরাকোটার নিপুণ কাজ ঐতিহ্য ও অলংকরণের প্রতীক, সেখানে কৃষ্ণচন্দ্রের এই মন্দিরগুলি সাদামাটা ও মসৃণ দেওয়াল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই অনুপস্থিতি সম্ভবত বিদেশী রীতির প্রতি ঝোঁক, অথবা বর্গীর আক্রমণের কারণে দ্রুত নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা—এই দুইয়ের কোন একটির ফল হতে পারে।
শিবনিবাসের এই স্থাপত্য-ঐশ্বর্য কেবল স্থানীয় মানুষের চোখেই নয়, সুদূর ইউরোপীয় বিদ্বানদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে বিশপ হেয়ার সাহেব, যিনি ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ ধর্মযাজক ও পর্যটক, নৌকা করে ঢাকা যাওয়ার পথে এই শিবনিবাসে নেমেছিলেন। মন্দিরগুলি দেখে তিনি মুগ্ধ ও অভিভূত হন। ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতি এবং ভারতীয় কাঠামোর এই সংমিশ্রণ তাঁকে এতই প্রভাবিত করেছিল, যে তিনি এই স্থাপত্যগুলিকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করানোর সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর এই মুগ্ধতার ফলস্বরূপ, ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে লণ্ডন থেকে প্রকাশিত একটি জার্নালে তিনি এই মন্দিরগুলির বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করেন। এই বিবরণী কেবল ঐতিহাসিক তথ্য ছিল না, এটি ছিল শিবনিবাসের শিল্প-ঐশ্বর্যের প্রতি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। বিশপ হেয়ার সাহেবের এই প্রতিবেদন শিবনিবাসকে বাংলার স্থাপত্যের ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান দেয় এবং প্রমাণ করে যে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের এই নির্মাণগুলি ছিল তৎকালীন সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক সম্পদ।
শিবনিবাস কেবল ইট-পাথরের স্থাপত্য নয়, এটি বাংলার এক স্বর্ণযুগের স্পন্দন। এখানে ইতিহাস, ধর্ম, শিল্প এবং মানুষের আবেগ এক হয়ে মিশে গেছে। এটি বাংলার এক হারানো গৌরবগাথা, যা আজও আমাদের হৃদয়ে গভীর শ্রদ্ধার দাবি রাখে।
তথ্যসূত্রঃ
নদীয়া কাহিনী – শ্রী কুমুদনাথ মল্লিক
লেখক পরিচিতি : সৈকত প্রসাদ রায়
সৈকত প্রসাদ রায় আধ্যাত্মিক ও সাহিত্যিক বিষয় নিয়ে লেখেন। তিনি সারদা মা-কে নিয়ে লিখেছেন বই “Teachings of The Holy Mother”, যেখানে সারদা মার জীবন, আদর্শ ও শিক্ষা নিয়ে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এছাড়া তিনি মাদার টেরেসা-কে নিয়ে লিখেছেন বই “The Universal Love of Mother Teresa”, যেখানে মানবতার প্রতি মাদার টেরেসার অমোঘ প্রেম এবং দয়ালু কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়েছে।এছাড়া তিনি বিভিন্ন জনপ্রিয় সাহিত্যিক গল্পগ্রন্থ রচনা করেছেন, যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো “সাতরঙা প্রেম”, যা পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে।লেখক সৈকত প্রসাদ রায় প্রতিলিপি, সববাংলা ব্লগ-সহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত লেখালিখি করেন। এছাড়া তাঁর লেখা আনন্দবাজার পত্রিকা, বর্তমান পত্রিকা এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

